সাপ্তাহিক ধারাবাহিক কথা সাগরে কৌশিক চক্রবর্ত্তী (পর্ব – ১৬)

কেল্লা নিজামতের পথে

তখন সবে ভোরের আলো ফুটেছে। অস্থায়ী বাসস্থান থেকে প্রস্তুতি নিয়ে বের হলাম নবাবের পথে পথে। প্রথমেই ঠিক করলাম গঙ্গা পেরবো। আর গঙ্গা পেরোলে তবেই যাওয়া যায় নবাব সিরাজের সমাধিতে। জায়গার নাম খোশবাগ। নবাব আলীবর্দির বানানো সাধের বাগান। মায়ের সমাধির জন্য নবাব আলীবর্দি এই বাগান তৈরি করিয়েছিলেন। ফুলের বাগানের সাজানো এক মনোরম উদ্যান, আর তার মধ্যেই পরপর সাজানো সমাধি। খোশবাগে মোট সমাধির সংখ্যা ৩৪ টি। মুঘল স্থাপত্যে নির্মিত মুখ্য তোরণ থেকে একেবারে মসজিদ পর্যন্ত পরপর সমাধি এবং দুপাশে সুসজ্জিত বাগান। সমাধির মধ্যে কোনটা ছোট, কোনটা বড়। কিন্তু এই সমাধিগুলো নিয়ে বিতর্কের শেষ নেই। গাইডদের ব্যাখ্যা একরকম, আর ইতিহাস বলে আরেক কথা। যেমন একটা কথা না বললেই হয়। খোশবাগে ঢুকে সে কথাইচ্ছা মাথাতে ঘুরছিল বারবার। দুটি পাশাপাশি সমাধি দেখিয়ে গাইডরা বলেন সেটি ঘসেটি বেগম আর সিরাজউদ্দৌলার মা আমিনা বেগমের সমাধি। কিন্তু ইতিহাস বলে ঘসেটি বেগম এবং আমিনা বেগম পলাশীর যুদ্ধের পর বন্দী হয়ে চলে যান ঢাকার জিঞ্জিরা প্রাসাদে। আর সেখান থেকে মীরণের নির্দেশে বুড়িগঙ্গায় নৌকায় তুলে তাদের জীবন্ত ডুবিয়ে মারা হয়। তো জলে ডুবে যাওয়া দুটি মৃতদেহ যে অত দূর থেকে মুর্শিদাবাদে এনে সমাধিস্থ করা সম্ভব নয় তা যে কেউ বলে দিতে পারি। ইতিহাস তাই গাইডদের সব মতামত কে ধোপে টিকতে দেয়ও না। ঠিক যেমনটি হয় আজিমুন্নিসার জীবন্ত সমাধি ঘিরে। মুর্শিদাবাদ আজ এই আড়াইশো বছর পরে কানে কানে সব সত্যি কথা বলে না। মুখে মুখে বদলে গেছি ইতিহাস। অনেকটাই তা আজ সমাজের ও মানুষের স্বার্থে বিকৃত। খোশবাগে ঘুরতে ঘুরতে বারবার মাথায় এসেছে সেইসব কথা। একদম প্রথম সমাধি শুরু হয় আলীবর্দী খাঁয়ের মায়ের সমাধি দিয়ে। তারপর একে একে সকলের সমাধি৷ সবশেষে নবাব সিরাজউদ্দৌলা ও আলীবর্দি খাঁ। সবকটি সমাধি নিয়ে এখানে ব্যাখ্যা করাটা উদ্দেশ্য নয়। বা সমস্ত বিতর্কের অবতারণা করে তা অবসান করাও সম্ভব নয়। কিন্তু তৎকালীন প্রেক্ষাপটে খোশবাগের গুরুত্ব এবং সামাজিক অবস্থানটুকু সুস্পষ্টভাবে দেখানোটা সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ। খোশবাগ এর মধ্যেও রয়েছে মসজিদ। মুখ্য দরজা থেকে শুরু করে একদম পিছনে মসজিদ পর্যন্ত খোশবাগ বাগানের ব্যপ্তি। একেবারে সামনে দাঁড়ালে সমান্তরালে পরপর সবকটি দরজা পেরিয়ে দেখা যায় একদম শেষে থাকা মসজিদের মুখ্য দরজাটি। মুর্শিদাবাদের প্রায় সব নবাবই নিজেদের সময়কালে বানিয়েছিলেন আলাদা আলাদা ধর্মস্থান। মুর্শিদকুলীর যেমন কাটরা মসজিদ, সুজাউদ্দিনের যেমন রোশনি বাগে নিজস্ব মসজিদ, সরফরাজ যেমন বানাতে চেয়েছিলেন ফৌতি মসজিদ, ঠিক তেমনি আলীবর্দী তার প্রিয় খোশবাগে বানিয়ে ফেলেছিলেন নিজস্ব মসজিদ। মায়ের মৃত্যুর পর তাঁকে সমাধিস্ত করবার উদ্দেশ্যে যে শান্তির বাগান তিনি বানিয়েছিলেন, পরবর্তী সময়ে তার পরিবারের সমস্ত সমাধি পরপর সেখানেই দেয়া হয়। এবং সবথেকে অবাক করা বিষয়টি হলো পলাশীর যুদ্ধের পর মাত্র কয়েকটি রাতে খোশবাগ সমাধিক্ষেত্র পরপর সমাধিতে একেবারে ভর্তি হয়ে যায়। এমনকি লোকমুখে শোনা যায় সিরাজ হত্যার রাতে তার সাথে দেখা করতে আসা ১৭ জন সিরাজ অনুরাগীকে একসাথে খুন করে সেখানে সমাধিস্থ করা হয় পরপর। ভাগীরথীর পশ্চিম পাড়ে এমনই এক ইতিহাসে মোড়া শান্তির নীড় হল খোশবাগ। খোশবাগ অর্থাৎ খুশির উদ্যান। অথচ সেখানেই আলীবর্দী পরিবারের সবার সারিবদ্ধ করা কবর। গাইডদের ব্যাখ্যায় আরো একটি বিকৃত তথ্য উঠে এলো খোশবাগ সম্বন্ধে। নবাব সিরাজউদ্দৌলার একমাত্র কন্যা উম্মে জহরা কে নিয়ে। একটি ছোট মাপের শিশু-সমাধি দেখিয়ে হয়তো আপনাকে বলা হবে এটি সিরাজ কন্যা উম্মে জহরার কবর। কিন্তু ইতিহাস সে কথাই মান্যতা দেয়ই না। কারণ সিরাজ ও তার অব্যবহিত পরে বেগম লুৎফুন্নিসার মৃত্যুর পরেও উম্মে জহরা যে বেঁচে ছিলেন এই প্রমাণ স্পষ্ট। দাবী প্রতি দাবীর মধ্যে থেকেও যেটুকু তথ্যে শিলমোহর দেয়া যায় তা হল উম্মে জহরার মৃত্যু হয়েছিল অনেক পরে। বর্তমানে ঢাকার খিলক্ষেত এলাকায় বাস করেন নবাব পরিবারের বংশধর সৈয়দ গোলাম আব্বাস আরেব। ভ্যগ্যের চাকায় মুর্শিদাবাদের রাজপথ ছেড়ে তারা এখন ছোট্ট ফ্ল্যাটে ঘরবন্দি। নবাব কন্যা উম্মে জোহরার বংশধর হিসেবে তারা আজও বহালতবিয়তে বাস করেন ঢাকায়। রাজদণ্ড গেছে, তাতে কি, এখনো রক্ত বইছে নবাবের। তাই শিশু উম্মে জহরার কবর মুর্শিদাবাদের খোশবাগে শুনলে আজও প্রতিবাদ করে ওঠেন তাঁরা। মুখে মুখে যেভাবে ইতিহাস বিকৃত হয়, হয়তো সেভাবে বদলে যায় না সত্যের জমি। নিচে উম্মে জোহরার বংশতালিকাটি একটু লক্ষ্য করা যাক।

নবাব পরিবারের নবম বংশধর সৈয়দ গোলাম আব্বাস আরেবের পূর্ববর্তী বংশধরের তালিকা –

(১)নবাব সিরাজউদ্দৌলার মেয়ে উম্মে জোহরা ওরফে কুদসিয়া বেগম (প্রথম বংশধর),
(২) জোহরার ছেলে শমসের আলী খান (দ্বিতীয় বংশধর),
(৩)তাঁর ছেলে লুৎফে আলী (তৃতীয় বংশধর),
(৪)লুৎফের মেয়ে ফাতেমা বেগম (চতুর্থ বংশধর),
(৫) তাঁর মেয়ে হাসমত আরা বেগম (পঞ্চম বংশধর),
(৬)হাসমত আরার ছেলে সৈয়দ জাকি রেজা (ষষ্ঠ বংশধর),
(৭)তাঁর ছেলে সৈয়দ গোলাম মোর্তজা (সপ্তম বংশধর)
(৮) গোলাম মোর্তজার ছেলে সৈয়দ গোলাম মোস্তফা (অষ্টম বংশধর)
(৯)এবং তাঁর ছেলে সৈয়দ গোলাম আব্বাস আরেব (নবম বংশধর)।

অর্থাৎ শিশুকন্যা হিসাবে উম্মে জোহরার কবর খোশবাগে, একথা হজম করতে একটু অসুবিধাতে যে হয় তা বলাই বাহুল্য। সুতরাং বলাই যায় ইতিহাসের ভুলে ভরা আজকের নিভে যাওয়া মুর্শিদাবাদ। কেল্লা নিজামতে হাঁটতে হাঁটতে সে কথাই যেন বারবার ধাক্কা দেয় বুকে। সকাল সকাল খোশবাগ গিয়েছিলাম সমর্পিতা দির আমন্ত্রণে। আজকের মুর্শিদাবাদের বুকে তিনি এক আশ্চর্য আগন্তুক। অথচ খুব সহজে মানুষের মন জয় করে নেওয়া যেন এক রূপকথার নায়িকা। আজ তিনি একনিষ্ঠ সিরাজ ভক্ত। সমাধি সাজানো থেকে শুরু করে, তাঁর স্মৃতি রক্ষার্থে শহর জুড়ে একাধিক কর্মসূচি, সবই আয়োজন করেন তিনি প্রায় একা। নবাবের কথা বলতে বলতে অনায়াসে চকচক করে ওঠে তাঁর চোখের কোণ৷ খোশবাগে পৌঁছে দেখলাম নিজের সমস্ত ভালোবাসা ও ভক্তি ঢেলে নবাবের সমাধি জুড়ে আতর ঢেলে ফুল দিয়ে সাজাচ্ছেন। তারপর নিজের ওড়না দিয়েই যত্ন করে মুছে দিচ্ছেন সমাজের প্রতিটা কোণও। কোথাও এতটুকু অযত্ন নেই। সহায়সম্বলহীন অনাথ ছেলেমেয়ের দল গুছিয়ে খোশবাগ চত্বরেই বানিয়েছেন নিজের ‘সবুজ সেনা’ বাহিনী। নিজেই ওপেন স্কুল খুলে নিয়মিত চালান তাদের শিক্ষাদানের প্রক্রিয়া। এভাবেই আজও ঝলমলে হয়ে আছে আলীবর্দীর খোশবাগ। পুরো চত্বর খালি পায়ে হাঁটলেও যেখানে পায়ের ধুলো গুনে বলা যায় খুব সহজে।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।