গল্পে কবিতা চক্রবর্ত্তী

প্রতীক্ষা
–ও বিরু, বিরু বাপ আমার। একটু পত্তরটা লিখে দে বাপ।
কথাগুলো বলতে বলতে পদী পিসি বীরেনকে ডাকতে থাকেন।
না, পদী পিসির বর্মি বাক্সের পদী পিসি না। এই পদী পিসি সারা পাড়ার সবার পদী পিসি। বাবারও পিসি, ছেলেরও পিসি। সবার পিসি। তবে বীরেনের তিনি নিজের পিসি। যদিও বীরেনের ছেলে কিন্তু ঠাকুমার বদলে তাকে পিসি বলেই ডাকে।
প্রায় চার কুড়ি বয়েস পিসির। এখনও গায়ের রঙ পাকা গমের মত। দেখেই বোঝা যায় এককালে কত সুন্দরী ছিলেন। সবসময় কপালে বড়ো একটা লাল সিঁদুরের টিপ জ্বলজ্বল করে। হাতে শাখা পলা লোহা। আর পরনে চওড়া লাল পাড় সাদা শাড়ি। নিয়ম করে প্রত্যেক বৃহস্পতিবার আলতা পরেন। যদিও বয়সের কারণে নিজে পড়তে পারেননা। কেউ না কেউ পরিয়ে দেয়। স্বামীর মঙ্গল কামনায় কত সময় যে ঠাকুর ঘরে কাটিয়ে দেন তার ঠিক নেই। কোনো উপোস বা আচার কিছুই বাদ দেন না। তবে অসুস্থও হন মাঝে মাঝেই। তখন একমাত্র ভরসা ভাইপো বীরেন। তারও তো বয়েস হয়েছে। ঘর ভর্তি ছেলে মেয়ে মা বাবা ভাই। তাও পিসি যেমন বিরু অন্ত প্রাণ, বিরুও তেমন পিসি অন্ত প্রাণ। কথায় বলে অতি বড় ঘরণী না পায় ঘর, আর অতি বড় সুন্দরী না পায় বর। পদী পিসির কপালটাও তাই। স্বামীসুখ তার কপালে নেই। কোন ছোটো বয়েসে বিয়ে হয়েছিল শহরের সম্ভ্রান্ত ব্যাবসায়ী পরিবারের ছেলে সমরেন্দ্র নাথ রায়ের সাথে। পাল্টি ঘর আর ব্যাবসা দেখে বাবা একটু ছোটো বয়সেই বিয়ে দিয়ে দেন পদী পিসির। না, তখন তো বর বউ আগে কেউ কাউকে দেখতো না। দেখা হতো একেবারে ছাদনা তলাতে। পরিবারের বড়রাই সব দেখাশোনা করে ঠিক করতেন। শুভদৃষ্টির সময় বরকে লাজুক চোখে দেখেই তো পদী পিসির ভীষণ ভীষণ ভালো লেগেছিলো। সদ্য যুবক সমরেন্দ্রকে বার বার ঘোমটার ফাঁক দিয়ে দেখতে ইচ্ছে করছিল তার। বাসর ঘরে সবাই ঠাট্টা তামাশা করলেও পিসির চোখ বারবার চলে যাচ্ছিল বরের দিকে। এদিকে বর কিন্তু বেশ গম্ভীর। বেশি কথা কি, কথাই বলছিলো না। এসব যেন তার পছন্দই হচ্ছে না, এমন ভাব।
আজন্ম গ্রামে থাকা পদী পিসি, শহরের শশুর বাড়ি দেখে তো অবাক। এখানে কেমন কল দিয়ে জল পড়ে। রাস্তায় কত গাড়ি। কত আলো চারদিকে। আর বাড়িটা কি সুন্দর। বাড়ির লোকজনও কেমন যেন তাদের গ্রামের লোকের মত না। তাদের বেশভূষা চাল চলন সব আলাদা। এত ভালো লাগলো যে চারদিক শুধু দেখতেই থাকলো। সুন্দর বর আর সুন্দর ঘর পেয়ে আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেল।
এই দুদিনে বর কিন্তু একটাও কথা বলেনি তারসাথে। ঘরে এসেছে কোনো দরকারে, কিন্তু একটা কথাও বলেনি। ফুলসজ্জার রাতে সবাই যখন সমরেন্দ্রকে ঘরে ঢুকিয়ে দরজা বন্ধ করে দিয়েছিল, তখন ঘরে ঢুকে সমরেন্দ্র শুধু একটাই কথা বলেছিল তাকে। ঘুমিয়ে পড়ো।
চারদিন পর অষ্ট মঙ্গলায় যখন বাপের বাড়ি এসেছিল, তখন পর্যন্ত সমরেন্দ্র তারসাথে তেমন কিছু কথাই বলেনি। শুধু ফিরে যাওয়ার দিন বলেছিল, ব্যাবসার কাজে বাইরে যেতে হবে। তুমি কিছুদিন এখানে থাকো। আমি ফিরে এসে তোমাকে নিয়ে যাবো। শ্বশুরবাড়িতেও একই কথা বলে পদীকে রেখে যায় সমরেন্দ্র ।
সেই থেকেই পদী পিসি বাপের বাড়িতে। শ্বশুর বাড়িতে এর পর অনেকবার পদী পিসি গেছে বাবার সাথে। কিছুদিন করে থেকেছেও। কিন্তু প্রত্যেকবারই শুনেছে এখনও ফেরেনি। কবে ফিরবে কেউ জানেনা। বাড়িতেও একটাও চিঠি দেয়না। কেউ কোনো খবর বলতে পারেনি সমরেন্দ্রর। একটা ঠিকানা দিয়েছিল তাকে শ্বশুর বাড়ী থেকে। কিন্তু অনেক চিঠি লিখেও কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি। পদী পিসির বাবা সেই ঠিকানায় লোক পাঠিয়েছিলেন, কিন্তু সেখানে কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি সমরেন্দ্রর ।
আস্তে আস্তে দুই বাড়ির বাবা মা শ্বশুর শাশুড়ি গত হয়েছেন। পদী পিসি কিন্তু সেই থেকে বাপের বাড়িতেই রয়ে গেছেন। প্রতীক্ষা করে গেছেন স্বামীর ফেরার।
না, সমরেন্দ্র আর ফেরেননি। কিন্তু এত বছরেও ওই এক ঠিকানায় আজও নিয়ম করে চিঠি দিয়ে যান পদী পিসি। নিজের বিয়ের দিন বা পুজোর পর প্রণাম জানিয়ে চিঠি দেন। তাছাড়া প্রত্যেক মাসে তো আছেই। নিজে তিন ক্লাস অবধি পড়েছেন। একটু অক্ষর জ্ঞান আছে। তবে বহুবছর হলো তাকে প্রত্যেক মাসে নিয়ম করে চিঠি লিখে দেয় বিরু। পদী পিসি বলে যায়,আর বিরু সেটা লিখে পোস্ট অফিসে ফেলে দিয়ে আসে। আর পোস্ট ম্যান যখনই আসে, একবার পিসির কাছে এসে বলে যায় রোজ…,না পিসি আজও তোমার কোনো চিঠি আসেনি। এটা বহুবছর ধরেই চলছে। তাই পোস্ট ম্যানও কিছু জিজ্ঞাসা করার আগেই বলে যায়, কোনো চিঠি আসেনি পিসির নামে।
গ্রামের অনেকেই বলেছে যে সমরেন্দ্র আবার বিয়ে করে অন্য শহরে আছে। তারা দেখেছে। কিন্তু পিসি বিশ্বাস করেনি তাদের কথা। নিজের সিঁদুরের ওপর তার বিশ্বাস আছে। সমরেন্দ্র ঠিক ফিরবে একদিন।
পিসির ডাকে বিরু পিসির কাছে এসে বসলো। পিসির শরীরটা একদম ভালো না। একটা অ্যাটাক হয়ে গেল কিছুদিন আগে। শরীরে আর শক্তি নেই। তাই বিকারের মত করে চিঠির খোঁজ নেওয়া চাই রোজ। আর বিরুকে দিয়ে চিঠি লেখানোর জন্য খোঁজ করে যান। বিরু ঘরে থাকতে থাকতেই পোস্ট ম্যান জোরে জোরে পিসি পিসি বলে ডাকতে ডাকতে ঘরে ঢুকলো। বললো পিসি তোমার নামে চিঠি এসেছে শহর থেকে। কে এক সমরেন্দ্র লিখেছে চিঠি তোমাকে।
অশক্ত শরীরে তাড়াতাড়ি উঠে বসলেন পিসি। তাড়াতাড়ি চিঠিটা হাতে নিয়ে বুকের সাথে চেপে ধরলেন। চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। বিরু জড়িয়ে ধরলো পিসি কে। চিঠিটা বিরুর হাতে দিয়ে পিসি বললেন পড়ে শোনাতে।
চিঠির প্রত্যেকটা লাইনে লাইনে শুধু ক্ষমা প্রার্থনা করে গেছেন সমরেন্দ্র । পদী ক্ষমা না করলে তিনি মরেও শান্তি পাবেন না। এই জীবনে পদী ছাড়া আর কাউকেই তিনি গ্রহণ করেননি। সংসার তার ভালো লাগতো না। শুধু বাবার কথায় বিয়ে করতে হয়েছিল। তাই সংসার থেকে বেরিয়ে সন্ন্যাসী হয়ে গিয়েছিলেন। আর খুব শিগগিরই তিনি তার পদীর কাছে যাবেন। যদি পদী তাকে ক্ষমা করেন—।
চিঠির কথাগুলো শুনে তো মরমে মরে যাচ্ছেন পদী পিসি। এত ভালো মানুষ, অথচ লোকে কত ভুল বুঝিয়েছিল তাকে। ভাগ্যিস উনি কারুর কথা বিশ্বাস করেননি। তাহলে আজ তো স্বামীর কাছে মুখ দেখানোর উপায় থাকতো না তার। খুব খুশি আজ তিনি। বীরুকে কিছু টাকা দিলেন,আজ পাড়ার সবাইকে মিষ্টি খাওয়ানোর জন্য।
বিরু সবাইকে মিষ্টি এনে খাওয়ালো। পাড়ায় যেন উৎসব লেগে গেল। পিসির বর আসছে তাকে নিতে।
পরদিন সকাল। এখনও পিসি ঘুম থেকে উঠছে না কেন? অতি আনন্দে আবার কিছু হলো না তো! ঘরের দরজা তো বন্ধ করেননা কোনোদিন রাতে। খোলাই থাকে। আজ ভিতর থেকে বন্ধ। কি হলো? সবাই দরজায় ধাক্কা দিয়ে ডাকছে পিসি পিসি বলে।
কিছুক্ষণ বাদে দরজা খুলে বের হলেন পিসি। সবাই চমকে গেল পিসিকে দেখে। কোথায় গেল সিঁদুর,আর কোথায় গেল লাল পাড় শাড়ি শাখা পলা? সিঁদুর মুছে, শাখা পলা খুলে, লাল পাড় শাড়ি ছেড়ে অন্য রঙের পাড়ের সাদা কাপড় পড়ে দাঁড়িয়ে আছেন পিসি। বিধ্বস্থ ক্লান্ত। সারারাত কান্নার চিন্হ ফুটে উঠেছে মুখে।
বিরুকে কাছে ডাকলেন পিসি। সস্নেহে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন,
–পিসিকে খুব ভালোবাসিস রে তুই। তোদের সবার এত ভালোবাসা ফেলে আমি সারাজীবন একজনের পিছনেই কাটিয়ে দিলাম, যে একদিনের জন্য ভালোবাসা দূরে থাক, আমাকে গ্রহণ পর্যন্ত করেননি। শুধু আমার জীবনটা শেষ করে দিয়েছেন বিয়ের নামে খেলা করে। সেই মানুষটার জন্য আমি এত বছর পাগলের মত করছিলাম। কিন্তু আমার ভুল ভেঙে গেছে রে। তুই বোধহয় এত বছরে ভুলে গেছিলি যে, পিসি তিন ক্লাস পর্যন্ত পড়েছে। একটু তো জানি কিছু। কাল তুই চলে যাবার পর পত্তরটা খুলে দেখি, তাতে তো কিছু লেখা নেই। হিজিবিজি কিছু অক্ষর। যার কোনো মানে হয়না। ওটা তো পত্তরই না। বুঝলাম, তোরা আমাকে খুশি করতে চেয়ে এটা করেছিস। আমাকে ভালোবাসিস জন্য এটা করেছিস। আমি সবটা বুঝতে পেরেছি রে। তাই আজ প্রথমেই নিজের সেই এতদিনের ভুলটা শোধরালাম। যে মানুষটা কোনোদিন আমাকে স্ত্রী বলে ভাবলো না, তার জন্য কেন আমি সধবার জীবন কাটাব বলতো? তার থেকে আজ থেকে আমি জানবো আমার স্বামী মৃত। তোরাই আমার সব। তোদের জন্যই আমি বাঁচবো আজ থেকে।