সাপ্তাহিক ধারাবাহিক কথা সাগরে কৌশিক চক্রবর্ত্তী (পর্ব – ১)

কেল্লা নিজামতের পথে
একটা অন্ধকার রাস্তা মিশে গেছে অনেকটা দূরে গিয়ে। আপাদমস্তক আলোহীন। বাড়িগুলো যেন ঝুঁকে এসে গিলতে আসছে রাস্তাটাকে। আশ্চর্য এক আলোআঁধার। কিন্তু কোনোভাবেই চোখের দৃষ্টি গিয়ে পৌঁছচ্ছে না ওইমাথার ল্যাম্পপোস্টটায়৷ হেঁটে গিয়ে দেখলাম আধুনিকের ছোঁয়া তো নেই সেই বাতিস্তম্ভে। বরং জীর্ণ দেহে পুরাতনী কথা। ভেঙে পড়বার পূর্বাবস্থা যেন। পাশ থেকে কে একজন দাঁড়িয়ে টান মারলো প্যান্টের পকেট ধরে৷ তাকালাম৷ তারও মুখটা যে খুব স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে তা নয়। কিন্তু শীর্ণ দেহে জীর্ণ পোশাক। মাথার চুল এলোমেলো। নিজেকে সাজিয়ে রাখতে বেশ একটা জোর করে হলেও চেষ্টা যে চলেছে সেটা পরিস্কার। কিন্তু শহরের অন্ধকার যেন জাঁকিয়ে বসেছে ছেলেটার শরীরেও৷ চোখ ঘুরলেও নসিব থেমে আছে কোনো এক হারিয়ে যাওয়া আলোয়। কী চায় এ? পয়সা? সামান্য কিছু পয়সা ছেলেটার বুকে আর এই জীর্ণ শহরে আলো জ্বালাতে পারবে? ভাবছিলাম। তখনি কানে এলো গুঞ্জন। পিছনে ঘুরলাম সেই অন্ধকারেই। চার পাঁচ জন ছুটে এসে চ্যাং-দোলা করলো ছেলেটাকে। কিন্তু অদ্ভুত ভাবে হঠাৎ নীরবতা।
রাস্তায় হেলে পড়া বাড়িগুলো যেন প্রতিনিয়ত সোজা হওয়ার লড়াই চালাচ্ছে। আর সেই ছেলেটা বাঁচার। কী অদ্ভুত এক মিল। অথচ শহরটা মিশে যাচ্ছে নিজস্ব অন্ধকারে। আলো ছিল৷ অনেকটাই ছিল। এতটাই ছিল, যে কুড়িয়ে কুড়িয়ে নিলেও শেষ হবার মত নয়। কিন্তু জন্মের দোষ ছেলেটার যেভাবে পোশাক কেড়ে নিয়েছে, যেভাবে আমার আপনার পকেট ধরতে শিখিয়েছে নির্দ্বিধায়, শহরটাও সেভাবে ফকির হয়ে গেছে ধীরে ধীরে৷
ঠিক করলাম ঘুরে দেখা নয়। খুঁজে দেখব চালচুলোহীন ছেলেটাকে। কী চায় সে? টাকা? আলো? খুঁজতে হবে। কোথায় গেলোই বা সে? বাতিস্তম্ভটা একা। গায়ে জড়ো হয়ে আছে অনেক কথা। কিন্তু আলো একবার নিভে গেলে তা যে জ্বলে ওঠা কতটা কঠিন তা জানে সে। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের যুগেও গুগলে সর্বাধিক সার্চ হয় যে শহর, সেই শহরেই সবচেয়ে জাঁকজমকহীনতা। একাবারে আস্ত রাজপাটকে গিলে ফেলবার মত। কিন্তু কী তার কারণ? কে শুষে নিল সবটুকু। দাঁড়িয়ে ভাবছি আর অনুভব করছি খিদের জ্বালায় পেটে দাপিয়ে চলেছে আরো কিছু অন্ধকার। এই আঁধারে আলো জ্বালানো আমার পক্ষে সম্ভব হলেও এই শহরের গলিকে রোশনাই দেওয়া আর কি সম্ভব? একটা আদ্যোপান্ত ফসিল কিভাবেই বা প্রাণ পায়। শুধু প্রতিদিন তলিয়ে যেতে দেখে। ধীরে ধীরে চাপা পড়ে সময়ের ওজনে। আজকের মনসুরগঞ্জও তাই। হারিয়ে যাবার আগের দিনগুলো বুকে নিয়ে লুকিয়ে পড়েছে ভাঙা ইটের স্তুপে। পকেটে টান মারা ছেলেটার মত কত প্রাণ বাঁচিয়ে রেখেছে শুধু অস্তিত্বটুকু। বাকিটা বইয়ের পাতায়। একসময় আলো দেখেছে এই শহর। হাতির পিঠে চেপে লোকলস্কর নিয়ে দেখেছে নবাবি পরিক্রমা। এতটা অন্ধকার যে কিভাবে দানা বেঁধে নিলো এত তাড়াতাড়ি, তা কেই বা খবর রেখেছে। অনেক আগেই ছেলেটার পরনের জামার মত লুটপাট হয়ে গেছে এই আলো-শহরটাও। ফিরে তাকানোর উপায়ও নেই যেন। আশপাশে কেল্লা নিজামত আজ গিলে খেতে আসে নিজের অভিশাপ বুকে নিয়ে। ভরা জঙ্গল, তারমধ্যেই দাপিয়ে হেঁটে চলা। মোবাইলটা সাড়া দিচ্ছে বিকেল হবার। এবার আর এগোব যে সেই অবস্থাও যেন নেই। নিস্তব্ধতা। এগোব৷ আরও এগোব৷ দেখা যাক কী পাই। মনসুরগঞ্জের নিস্তব্ধতা আড়াল করে দেয় যেন অনেককিছু। হীরাঝিল থেকে মনসুরগঞ্জ, এই ফিরে দেখার সময়টা বড় বেহিসাবি। শ্রীহীন মুর্শিদাবাদ। সম্পদহীন কেল্লা নিজামত। তারই আশপাশে অস্তিত্ব খুঁজে দেখা। অন্ধকার মুর্শিদাবাদে আলো চিনে নেওয়া। পথটা সহজ না। অনেকটাই কঠিন। আলোয় ফেরা যে সহজ না। এই পথে ঘুরে বেড়াবে পকেটে টান মেরে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকা ছেলেটা, থাকবে বাতিস্তম্ভ, মনসুরগঞ্জ। আসুন চেয়ে দেখি একটা অচেনা বাংলায়।