সাপ্তাহিক ধারাবাহিক কথা সাগরে কৌশিক চক্রবর্ত্তী (পর্ব – ৩২)

কেল্লা নিজামতের পথে
সিরাজউদ্দৌলার অত্যাচার দিনে দিনে বাড়তে থাকে। দাদু আলীবর্দীর প্রশ্রয় এমন পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছোয় যে যুবরাজ সিরাজের বিরুদ্ধে কথা বলবার আগে বারবার ভাবতে হয় সব স্তরের মন্ত্রী ও আমলাদের। মুর্শিদাবাদের রাজপথে সিরাজ যেন এক মূর্তিমান যম৷ তার উশৃঙ্খলতা আর হটকারিতা সব মানুষের কাছে আতঙ্কের মত হয়ে ওঠে। আর কালের নিয়মে সেই সিরাজই সিংহাসনে। এ যেন এক অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি। বাংলার মানুষ কোন দিকে যাবে। না আছে বর্গীদের পেছনে ধাওয়া করা নবাব আলীবর্দী, আর না আছে মুর্শিদকুলীর সময়ের মত রাজনৈতিক পরিস্থিতি। পাশ থেকে বাংলার দিকে তাক করে আছে বিদেশী ইংরেজ কোম্পানি। সাথে লাইন দিয়েছে ফরাসী, আর্মেনিয়, ডাচ নাবিকরাও৷ কে নেই সেই তালিকায়৷ একে একে জাহাজ ইউরোপ থেকে এসে ভিড়ছে পশ্চিমের উপকূলে৷ আর ছলে বলে যেভাবেই হোক দিল্লীর কোনোরকমে টিকে থাকা মোঘল বাদশার থেকে তারা যোগাড় করছে ব্যবসায়ী সনদ। বাদশা তাদের দেখিয়ে দিচ্ছেন কুঠি তৈরির ঠিকানাও। এভাবেই দেশীয়দের হাত থেকে প্রায় বেহাতই হয়ে যাচ্ছে একে একে বর্ধিষ্ণু শহরগুলো৷ বাংলা সেক্ষেত্রে সোনার দেশ। এ দেশ থেকে নুন, রেশম, মশলা আর তাঁতের চাহিদা সারা পৃথিবীতে তুমুল। এদেশের দ্রব্য ইংল্যান্ডে শুধু পাঠানোর অপেক্ষা৷ বন্দরে দ্রব্য পড়লেই হুহু করে যেন নিঃশেষ হয়ে যায় মুহূর্তে। মুনাফার এই সোনার সুযোগ কেনই বা হাতছাড়া করবে বেনিয়ার জাতেরা। করেওনি। তারজন্য তারা অনেক কাঠখড় পুড়িয়েছে। অনেক ঘুষ গুনেছে। অনেক প্রাণও দিয়েছে।
তাদের এই ব্যবসায়ী মনোভাবের আড়ালে দেশ জয়ের সুপ্ত বাসনার কথা অনেক আগেই ধরতে পেরেছিলেন দূরদর্শী আলীবর্দী। নাতি সিরাজকেও ছেলেবেলা থেকে তাই ইংরেজদের আগ্রাসী মনোভাবের পরিচয় ব্যাখ্যা করেছিলেন প্রতি মুহূর্তে। আএ সিরাজও তাই তীব্র ইংরেজ বিরোধী। সাহেবরা যেন তার চোখের কাঁটা। একেই সর্বস্তরের মানুষদের সাথে তার একরকম অত্যাচারী মনোভাব প্রথম থেকেই। সেখানে আবার ইংরেজ বিরোধিতা তো আছেই। এক্ষেত্রে মনে পড়ে সিয়ার উল মুতাক্ষরিণ লেখক গোলাম হোসেনের প্রসঙ্গ। সমকালীন এই লেখক যেভাবে মুর্শিদাবাদের ছবি নিজের কলমে ফুটিয়ে তুলেছেন, তা আর কোনো বই বা দলিলে পাওয়া যায় না। সিরাজ চরিত্র বর্ণনায় যথেষ্ট সাহসী গোলাম হোসেন। মুর্শিদাবাদ ঘুরলে আজ সেসব বর্ণনার লেশমাত্র নেই৷ আজ তৈরি হয়েছে অনেক গল্প৷ বদলে যাওয়া ইতিহাস।
সিরাজের অহেতুক যুদ্ধনেশার মত ছেলেমানুষীর একটা ঘটনা বলা যাক। বিদ্রোহীদের হাতে সিরাজের বাবার মৃত্যুর পর পাটনার শাসক পদে তখন রাজা জানকীরাম। এদিকে সিরাজের কানে মন্ত্রনা দেবার মানুষের অভাব নেই। আশপাশ থেকে তার দুর্বিনীত বন্ধুবান্ধবের দল তাকে বুঝিয়ে ছাড়লো যে নবাবের স্নেহ ও ভালোবাসা কেবলই মৌখিক। পাটনার মসনদ জানকীরামকে তুলে দেবার পিছনে আসলেই প্রতারণার হিসাব বুঝিয়ে দেওয়া হল তরুণ সিরাজকে। আর সেও ছেড়ে দেবার পাত্র নয়। বর্গীহানা রুখতে নবাব যখন উড়িষ্যায়, তখনই দলবল সাথে নিয়ে গোলাবারুদ সমেত পাটনার দিকে রওনা হয় সে। এদিকে জানকীরাম নবাবের কাছের মানুষ। হঠাৎ সিরাজের আক্রমণের খবরে সে হতচকিত তো বটেই, সাথে আশঙ্কিতও। কিভাবে আঘাত করবে সে নবাবের প্রাণপ্রিয় নাতির ওপর। এ যেন ধর্মসংকট। নবাবকে খবর পাঠাবে তড়িঘড়ি, সে উপায়ও একরকম নেই। তাই দরজার সামনে মূর্তিমান বিপদের মত সিরাজ এসে দাঁড়ালে, দুর্গের দরজা বন্ধ করে দেওয়া ছাড়া উপায় নেই তাঁর সামনে। করলেনও তাই। আটকালেন সিরাজকে। প্রতিরোধ করলেন তাকে। অকারণে, অযথা কয়েকটা প্রাণ না গেলে সিরাজ হয়ত পিছু হটতেনও না। কিন্তু যুদ্ধে অযথা কিছু মৃত্যুর পর নিজের একগুঁয়ে অবস্থান থেকে সরে আসতে একরকম বাধ্য হয় সে। কিন্তু আকস্মিক এই অপ্রয়োজনীয় যুদ্ধই পরিস্কার করে দেয় হটকারি সিরাজের মানসিকতা। যার যৌবনের খেলা ছিল ভাগীরথীর জলে নৌকায় গর্ত করে যাত্রীদের ধীরে ধীরে ডুবিয়ে তা আনন্দ করে প্রত্যক্ষ করা, অথবা গর্ভবতী নারীর গর্ভে কী আছে তা কেটে দেখবার ইচ্ছা প্রকাশ করা, তার কাছ থেকে বাংলার প্রজারা আর কিই বা আশা করতে পারে।
নিজের অল্প কয়েকদিনের জীবনে অযথা যুদ্ধের পিছনে অনেক সময় ও অর্থ ব্যয় করে ফেলেন তিনি৷ সে কলকাতার যুদ্ধ হোক অথবা কাশীমবাজার কুঠি আক্রমণই হোক। কোনো কাজ করবার আগে দুবার ভাববেন এমন মানুষ তিনি কোনো দিক থেকেই নয়৷ পথ চলতে চলতে সামনে সিরাজউদ্দৌলা এসে পড়া মানে প্রজাদের মুখে যেন আপনা থেকেই এসে বসে যেত – হে হরি, রক্ষা করো।
মুর্শিদাবাদ সিরাজের জন্য আজ কাঁদে। কেমন যেন বদলে যাওয়া আচরণ। তাই না? ভাবিয়েছিলে আমাকেও। যত খুঁজতে চেষ্টা করেছি বাংলার নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে, ততই বর্তমান পরিস্থির দিকে চেয়ে অবাক হয়েছি বারবার। কোথায় সেই সিরাজ বিরোধিতা? কোথায় সেই আতঙ্ক? সবটাই মুছে গেছে কালের চক্রে। আজ চারদিকে প্রবল ভাবে সিরাজ আনুগত্য। মুর্শিদাবাদে যেদিকেই যাই, সেদিকেই নবাব সিরাজের নামে চলছে পর্যটন ব্যবসা। তিনি আজ ইংরেজদের হাতে যুদ্ধে নিহত হওয়া প্রথম শহীদ। কেন এই পালা পরিবর্তন? কিভাবেই বা এই রাজনৈতিক পটপরিবর্তন? ইংরেজদের বিরুদ্ধে লড়াইতে কোনো একজন লড়াকু যোদ্ধার মুখ ভীষণ দরকার হয়ে ওঠে দেশীয় স্বাধীনতাকামী তরুণ প্রজন্মের সামনে। সেক্ষেত্রে বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে আর কোনো ইংরেজ বিরোধী ব্যক্তিত্ব কোথায়? প্রসঙ্গত উল্লেখ্য একমাত্র নবাব সিরাজউদ্দৌলা। ইংরেজ বিরোধিতার ক্ষেত্রে তার লড়াই প্রথম দিন থেকেই। সেক্ষেত্রে কোনো ভিন্নমত নেই। কিন্তু শেষ স্বাধীন নবাবের তত্ত্ব কোনোভাবেই খাটে না। আগেই বলেছি নবাব পদ মোঘল নিয়োজিত উচ্চপদস্থ একজন শাসক মাত্র। তিনি আর যাই হোন, স্বাধীন কোনোভাবেই নন। কিন্তু তার সময়কালকে খতিয়ে দেখলে দেখা যায় তার ইংরেজ বিরোধিতার কিছু হটকারি সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপ ইংরেজ বনিকদের আরও ক্ষিপ্র করে তোলে চারদিক থেকে৷ বিলিতি বনিকবেশে শাসকদের বিরোধিতা নবাব আলীবর্দীও করেছিলেন৷ কিন্তু তার অর্থ এই ছিল না যে আকস্মিক কাশীমবাজার কুঠি আক্রমণ করে ইংরেজদের লেজে পা দেবার মত হটকারি ও অপরিণামদর্শী সিদ্ধান্ত নেওয়া৷ ওপর দিকে দেশীয় রাজন্যবর্গের সিরাজ বিরোধিতাও তীব্রতার রূপ নেয়। সবকিছুর অত্যাবশ্যক পরিণাম হয়ে ওঠে সিরাজ পতন। যেখানে মুর্শিদাবাদ জয় করার পর স্বয়ং রবার্ট ক্লাইভ বলেন যে, মুর্শিদাবাদ নগরে প্রবেশের সময় যে পরিমান মানুষ দাঁড়িয়ে ছিলেন সাহেবদের দেখতে, তারা যদি একটা করেও ঢিল ছুঁড়ে মারতো, তাহলেও সাহেবদের দলের পালানো ছাড়া গতি ছিল না। কিন্তু এসব কিছুই হয়নি৷ উপরন্তু সিরাজউদ্দৌলার মৃতদেহের ভয়ঙ্কর পরিণতি দেখেও কখনোই নড়েচড়ে বসেনি মুর্শিদাবাদের জনতা। তারা ছিল একেবারেই ভাবলেশহীন। এই ছবি কি নবাব আলীবর্দীর ক্ষেত্রে ভাবা যায়? কখনোই না। তাই আজকের মুর্শিদাবাদ সবটা দেখায় না। আজ কেবল সেইসব দিনের সত্যগুলো চাপা পড়ে আছে খোশবাগের উদ্যানে।