সাপ্তাহিক ধারাবাহিক কথা সাগরে কৌশিক চক্রবর্ত্তী (পর্ব – ৪৩)

কেল্লা নিজামতের পথে
আপনারা জানেন কলকাতার রাস্তাঘাট খুঁড়লে পাওয়া যায় পুরনো পুরনো কামান? কিছুদিন আগে এমন দুটি কামান উদ্ধার হয় দমদম সেন্ট্রাল জেলের পাশ থেকে। এছাড়াও গঙ্গার ধারে ফেয়ারলি প্লেসের আশেপাশে দু একটি মাটিতে চাপা পড়ে থাকা কামান দেখা যায়। যা আমি নিজেই দেখেছি। কামান নিয়ে চিরকালই কলকাতার মানুষজনের মনে অপার কৌতূহল। কিছুদিন আগে আমি নিজে পৌঁছে গিয়েছিলাম দমদমে উদ্ধার হওয়া সেই কামান দেখতে। দেখে তো রীতিমতো অবাক! কি বিশাল তার আকার। মাটির তলায় প্রায় সাত থেকে আট ফুট ঢুকে রয়েছে তার সম্পূর্ণ শরীর। উপরে শুধু জেগে আছে কামানের অগ্রভাগটুকু। গবেষকদের মতে সিরাজউদ্দৌলা কলকাতা আক্রমণ কালে যে সকল কামান মুর্শিদাবাদ থেকে নিয়ে এসেছিলেন তারই কিছু ফেলে গেছিলেন এই কলকাতাতেই। আর তার মধ্যেই একটি হলো দমদমে উদ্ধার হওয়া সেই কামানটি। অর্থাৎ বিগত প্রায় আড়াইশো বছর ধরে এই অবহেলিত কামান গুলি কলকাতার মাটির নিচে পুরনো এক যুদ্ধের সাক্ষ্য বহন করে চলেছে।
সিরাজউদ্দৌলা ও ইংরেজদের মধ্যে যুদ্ধ বাংলার ইতিহাসে এক বহুল চর্চিত অধ্যায়। সেখানে একে অপরের প্রতি তীব্র বিদ্বেষ এবং ঘৃণা সব থেকে লক্ষ্যনীয় একটি বিষয়। কলকাতা পুনরুদ্ধারের পর ইংরেজরাও লেগে পড়েছিল নবাবের জায়গার যেভাবেই হোক ক্ষতি করতে। সে হুগলি হোক বা মুর্শিদাবাদ। যেমন কলকাতায় ফিরে এসে ক্লাইভ বদ্ধপরিকর হয়ে ওঠেন হুগলি ও চন্দননগর আক্রমণ করতে। হুগলিতে তখন ডাচেদের বাস এবং চন্দননগরে ফরাসি। হুগলিতে মুঘলদের একটি ফৌজদারী অনেকদিন ধরেই ছিল গঙ্গার ধারে একটি কেল্লাকে কেন্দ্র করে। তাই নবাবের একটি প্রধান ঘাঁটি ছিল হুগলি। তাই প্রাথমিক আক্রমণের ছক কষে হুগলির দিকে যুদ্ধ জাহাজকে নিয়ে যাওয়াই সব থেকে সঠিক সিদ্ধান্ত বলে মনে করলেন ওয়াটসন ও ক্লাইভরা। ১৭৫৭ সালের ৪ঠা জানুয়ারি তিনটি জাহাজে সৈন্য এবং গোলাবারুদ ভর্তি করে ক্লাইভ তার সহকারি ক্যাপ্টেন কিলপ্যাট্রিককে অভিযানের নেতা নির্বাচিত করলেন। আর সঙ্গে নিলেন দক্ষ দুই যুদ্ধবাজ নেতা ক্যাপ্টেন আয়ার কুট ও ক্যাপ্টেন কিংকে। এই দুর্ধর্ষ সেনাবহর নিয়ে গঙ্গাপথে বাগবাজার, বরানগর হয়ে হুগলির অভিমুখে যাত্রা করলেন ক্লাইভ। আসলে সেই অস্থির সময়ে কেউই এক ইঞ্চি জমি ছেড়ে দেননি কাউকে। সে নবাব হোক বা রবার্ট ক্লাইভ। একবার নবাব ধেয়ে আসেন কলকাতার দিকে তো পরক্ষণে ক্লাইভ তেড়ে যান নবাবের জমি দখল করতে। এই চাপান উতরের লড়াইতে বাংলার মানুষ তখন দিশেহারা। এই দুই পক্ষের মাঝে পড়ে সাধারণ মানুষের তখন ঘর জ্বলছে খরকুটোর মত।
যাইহোক ইংরেজ রণতরী যখন হুগলিতে এসে পৌঁছালো, তখন হুগলি সম্পূর্ণ উত্তাল। মানুষ যে যেদিকে পারছে পালাচ্ছে। গোরা সৈন্যরা এক ধার থেকে সব ঘরে আগুন লাগাতে শুরু করল। সাহেবদের অত্যাচারে সবাই তখন কাঁপছে। দিন কয়েক সেই অকথ্য অত্যাচার ও সব কিছু লুঠপাট করার পরে ইংরেজরা ১৯শে জানুয়ারি আবার ফিরে আসে কলকাতায়। কিন্তু সেই খবর গিয়ে পৌঁছয় মুর্শিদাবাদে নবাবের কানে৷ তখন আর তাকে পায় কে। ইংরেজদের আবার শিক্ষা দিতে তিনি উঠে পড়ে লাগলেন৷ অনেকের নিষেধ সত্ত্বেও আবার সৈন্যবাহিনী গুছিয়ে কামান বরকন্দাজ নিয়ে এগিয়ে চললেন কলকাতার দিকে। এ তার দ্বিতীয়বার কলকাতা আগমন। কিন্তু এইবার তার রাগ যেন দ্বিগুণ। কিছুতেই শায়েস্তা করা যাচ্ছে না ইংরেজ বেয়াদপদের। নবাব সিরাজ আবার প্রস্তুতি নিলেন কলকাতা তছনছের। কিন্তু তিনি পারদপক্ষেও জানতেন না যে এবার তিনি কলকাতায় চলেছেন নিজের কফিনে প্রথম পেরেকটি মারতে। রবার্ট ক্লাইভ কে উচিত শিক্ষা দিতে প্রায় ৬০ হাজার সৈন্য, ৪০ হাজার ঘোড়সওয়ার এবং ৩০ টি কামান সঙ্গে নিয়ে তিনি আবার গঙ্গার ধার ধরে হাটা দিলেন কলকাতার দিকে। এদিকে সেই খবর গিয়ে পৌঁছল কোম্পানির কানে। আগের বছরের স্মৃতি আবার টাটকা হয়ে উঠল তাদের চোখে। কিন্তু হেরে গিয়ে পিছিয়ে যাওয়ার মানুষ ব্রিটিশরা নয় বলেই তারাও দাঁতে দাঁত চেপে নবাবের সঙ্গে লড়াইটা করে গেছিল সমানে সমানে। এবারেও নবাব এসে ঘাঁটি করল সেই হালসী বাগানেই। কিন্তু এইবার নবাব আর বাগবাজার হয়ে কলকাতায় প্রবেশ করলেন না। কারণ তিনি জানতেন ইংরেজ সেনা বাগবাজার পথেই যুদ্ধের জন্য অপেক্ষা করে আছে। তাই তিনি ত্রিবেনী হয়ে গঙ্গা পার করে বারাসাত ও দমদমের পথে কলকাতায় প্রবেশ করলেন। আমি যে কামানটি দমদম সেন্ট্রাল জেলের পাশে দেখে এসেছি, না জানি সেই কামান এই দমদম পথে প্রবেশ করাকালীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার ফেলে যাওয়া কি না। তবে যাই হোক বিষয়টি বেশ রোমহষর্ক বটে।
কিন্তু নবাব কলকাতা পৌছলে এবার ঘটনাক্রম ঘটলো একটু অন্যরকম। সামান্য ভয় পেলেও ইংরেজ পক্ষ থেকে দুজন শান্তির শর্ত করতে গেল নবাবের কাছে। তার মধ্যে একজন শোভাবাজারের নবকৃষ্ণ দেব। মেলাতে পারছেন কিছু? আসলে নবকৃষ্ণ ছিলেন ওয়ারেন হেস্টিংসের মুন্সি। ইংরেজ সাহেবদের ফারসি ও আরবি শিক্ষক হিসেবে তার ভূমিকা ছিল অগ্রণী। আর সেই নবকৃষ্ণকেই ইংরেজরা কাজে লাগিয়েছিল নবাবের কাছে বার্তা প্রেরণ করতে। এই ছিল বাংলার রাজনীতিতে শোভাবাজারের বিখ্যাত রাজা নবকৃষ্ণ দেববাহাদুরের উত্থানের শুরুটা। কিন্তু সেই শর্তে প্রথমেই ছিল নবাব কে কলকাতা থেকে চলে যাওয়ার হুমকি। সুতরাং নবাব যে সেইসব শর্ত মেনে কলকাতা থেকে লেজ গুটিয়ে চলে যাবেন না সেটাই তৎকালীন রাজনীতিতে স্বাভাবিক। হয়ওনি তাই। কিন্তু ইংরেজদের প্রধান উদ্দেশ্যই ছিল নবাব কে দিয়ে চুক্তি স্বাক্ষর করিয়ে নেওয়া। পরিবর্তে শুরু হয় আবার যুদ্ধ। ইংরেজ বাহিনী ভোরের কুয়াশায় গোটা দুয়েক কামান ও সাত আটশ গোরা সৈন্য নিয়ে নবাব শিবির আক্রমণ করলে শুরু হয় ভয়ানক যুদ্ধ। এবার নবাবকে রীতিমতো সাঁড়াশির মত আক্রমণে চেপে ধরেন রবার্ট ক্লাইভ। কিন্তু নবাবের বিশাল বাহিনীর কাছে তার এঁটে ওঠা কখনোই সম্ভব ছিল না। তাই কিছুক্ষণ যুদ্ধ করে কিছু গোরা সৈনিকের মৃত্যুর পর ক্লাইভের ফেরা ছাড়া গতি ছিল না। যুদ্ধ করতে করতেই ফোর্ট উইলিয়ামের দিকে সরতে থাকে ইংরেজ বাহিনী। তারপর যাহোক করে নবাবকে কিছুটা কাবু করে ফোর্ট উইলিয়ামে প্রবেশ করে রবার্ট ক্লাইভ ও তার সেনাদল। এবারেও তাই খুব একটা সুবিধা করতে পারেনি ক্লাইভের এর দল ঠিকই। কিন্তু আগের বারের মতো নবাব পারেনি কলকাতা শহরকে একেবারে বিধ্বস্ত করে দিতে। কারণ ইংরেজদের ক্ষমতা আগের বারের থেকে অনেক বেড়েছে। এবারে তাদের যুদ্ধনীতি ও রণকৌশলও অন্যরকম। এবং নবাব তা হাড়ে হাড়ে বুঝেছেন। তাই আর কিছু না হোক, যুদ্ধের মাধ্যমে একটা কূটনৈতিক কড়া বার্তা যে নবাবকে দেওয়া গেছে সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ ছিল না। দমে যাওয়ার পাত্র ক্লাইভ নয়। তাই এক একটি করে ব্যর্থতা এসেছে আর আরো দাঁতে দাঁত চেপে বসেছে সে। নবাবকে বারবার বেকায়দায় ফেলতে সে পিছপা হয়নি কখনো।
এই কলকাতা শহরের বুকে যুদ্ধের পরে ইংরেজদের সঙ্গে নবাব সিরাজউদ্দৌলার একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। যেখানে স্পষ্ট নবাবের দিকে কয়েকটি শর্ত ঠেলে দেয় ইংরেজ কোম্পানি। এবং পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতির উপর ভিত্তি করে সেইসব শর্ত মেনে নিয়ে তবেই মুর্শিদাবাদ ফিরে যান তিনি। চুক্তির সেইসব শর্তের মধ্যে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য শর্ত হলো ইংরেজদের কলকাতায় স্বাধীনভাবে দুর্গ নির্মাণ করার স্বাধীনতা লাভ, নবাবের দরবারে সব সময় একজন ইংরেজ প্রতিনিধির অবস্থান, ইংরেজদের বাণিজ্য ও অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নবাবের কোনরকম প্রভাব না থাকা এবং যুদ্ধে ক্ষতিপূরণ বাবদ নবাবকে কিছু অর্থ সাহায্য প্রদান। এই সমস্ত চুক্তি মেনে একরকম নৈতিক পরাজয় স্বীকার করে নবাব ফিরে যান কলকাতা শহর থেকে। বলাই বাহুল্য এটিই ছিল তার সর্বশেষ কলকাতা অভিযান। আসলে আর কিছু হোক বা না হোক নবাবের মনে একটা ভয়ের সঞ্চার তৈরি করতে পেরেছিল ক্লাইভ। সাহেব কোম্পানি নিজেরা ভয় পেয়ে গেলে ভারতবর্ষে এত বড় ইংরেজ উপনিবেশ কোনদিন স্থায়ী হতো না। তাই প্রথম দিন থেকেই লড়াইয়ের দিনগুলো ইংরেজদের জন্য ছিল এক একটি অগ্নিপরীক্ষার হিসাব। আর সেই হিসাবের দিনগুলো তারা পিছিয়ে গিয়েও আবার ফিরে আসতে দ্বিধা করেনি একবারও।