সাপ্তাহিক ধারাবাহিক কথা সাগরে কৌশিক চক্রবর্ত্তী (ইতিহাস কথা পর্ব – ১৩)
by
·
Published
· Updated
শ্রীরামপুরের কথা
তখন সমস্ত প্রতিকূলতা পিছনে ফেলে নিজেদের গুছিয়ে তুলেছেন রেভারেন্ড ডঃ কেরী, মার্শম্যান সাহেবরা। কলকাতার পণ্ডিত ও খ্রীষ্টান সমাজের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ তাদের। পরপর বইও প্রকাশ হচ্ছে মিশন প্রেস থেকে। কলেজেও প্রতিদিন দলে দলে আসছে সম্ভ্রান্ত ঘরের বাঙালী ছেলেরা। কিন্তু ১৮৩১ সালে ধেয়ে এলো আবার এক ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয়। ভয়ানক ঘুর্ণিঝড় হঠাৎ আছড়ে পড়লো ভাগীরথীর তীরে ছবির মতো সাজানো ছোট্ট ড্যানিশ শহরটায়। তার সঙ্গে বৃষ্টি ও বন্যা। তখন সামান্য বৃষ্টিতেই দামোদরের ভয়াল বন্যার কথা আগেই বলেছি। সেইদিনও বিপদসীমার ওপর দিয়ে বইতে শুরু করলো ভাগীরথী। আর মিশনারীদের সমস্ত ভবন ও কলেজ একেবারে নদী তীরবর্তী হওয়ায় সবকিছুই ডুবে গেল জলের নীচে। ডুবে গেল মিশনারীদের আদি বাড়ি, কলেজের একাংশ। ভেঙে পড়লো কাঁচাঘর। আর সবচেয়ে ক্ষতি হয়ে গেল কেরীসাহেবের অবশিষ্ট বেঁচে থাকা বাগানটুকুর। আগেও একটি ঝড়ে ক্ষতি হয়েছিল কেরী’স বোটানিক গার্ডেনটির। কিন্তু সাধের বাগানটুকু ও মূল্যবান গাছগুলি যেটুকু নিজের যত্ন দিয়ে বাঁচিয়ে রাখতে পেরেছিলেন রেভারেন্ড কেরী, সেটুকুও আর বাঁচলো না এই ঝড়ে। জলমগ্ন উদ্যানে ডুবে একেবারে নষ্ট হয়ে গেল বাগানটি (আজ যেখানে ইন্ডিয়া জুটমিল)।
কলকাতায় নিজের দেশভাইদের কাছে প্রত্যাখ্যাত হবার পরে শ্রীরামপুরে ড্যানিশ সরকারের সবরকম সাহায্য পেলেও কম প্রতিকূলতা আসে নি মিশনারীদের সামনে। প্রথমত একেবারে অচেনা একটি পরিবেশ। ইংল্যান্ড থেকে সরাসরি এসে পড়া একটি আদ্যোপান্ত অচেনা দেশ। অথচ সমস্ত বাধার সামনেও নিজেদের উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে কঠিন লড়াইটা জিততে হয়েছে তাঁদের। ইংরেজ কোম্পানির হাত ধরে কলকাতার শহর হয়ে ওঠার পদ্ধতির মধ্যেই যেখানে প্রতিদিন নিয়ম করে প্রাণ দিয়ে চলেছেন বিলেতের সদ্য আসা সেনা অফিসার থেকে সিভিল কর্মচারীরা, ভারতের মাটিতে পা দেবার পরের দিনই যেখানে কলেরার প্রকোপে কবরে ঠাঁই হয়েছে ১৮ বছরের ইংরেজ যুবকেরও, খোলবার মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে সম্পূর্ণ জায়গা ভর্তি হয়ে যাবার কারণে যেখানে বন্ধ করে দিতে হয়েছে সাউথ পার্ক স্ট্রিট সিমেট্রি, সেখানে সব প্রতিকূলতা নিয়েও শ্রীরামপুরের মাটিতে দাপিয়ে ধর্মপ্রচার ও সমাজসংস্কারের কাজ করে যাওয়া মিশনারীরা তাই সত্যিই প্রাতঃস্মরণীয়।
যাই হোক, এভাবেই আবার ঝড় ও বন্যায় একেবার নষ্ট হয়ে গেল শ্রীরামপুর নগরীর সমস্ত শ্রী। তারমধ্যেই হঠাৎ মার্কিন দেশ থেকে এসে পৌঁছলো একটা চিঠি। রেভারেন্ড ওয়ার্ড কলেজের জন্য টাকা তুলতে একসময় ঘুরেছিলেন সে দেশের দোরে দোরে। তুলেছিলেন অর্থও। কিন্তু কলেজের বিজ্ঞান শিক্ষার জন্য সে টাকা ব্যয় হোক তা চায় না মার্কিনি এস টটন সাহেব। তাঁদের প্রদেয় অর্থ ব্যয় হোক বাঙালী যুবকদের থিওলজি বা খ্রীষ্টান ধর্মতত্ত্ব পড়ানোর জন্য। এই দাবী তাঁদের। উত্তরে একখানি কড়া চিঠি লিখে ফেললেন অধ্যক্ষ কেরী সাহেবও। কলেজে শিক্ষাদানের সাথে আপোষ করবার মানুষ তিনি নন। সঠিক বিজ্ঞানচর্চা ছাড়া মার্কিন দেশের কোন খ্রীষ্টান যুবক সঠিক পথে শিক্ষিত হতে পেরেছে, সেই প্রশ্ন করলেন তিনিও। তবে কলেজে বিজ্ঞানের সাথে সাথেই সমান তালে পড়ানো হতে থাকলো থিওলজি। শুধুমাত্র ধর্মান্তরিত খ্রীষ্টান যুবকরাই নয়, কৌতূহলবশত এই বিষয়ে ভর্তি হল স্থানীয় যুবকরাও। থিওলজি পড়ানোর জন্য ১৮২৭ সালের ২৩শে ফেব্রুয়ারী ডেনমার্কের রাজা ষষ্ঠ ফ্রেডরিক রাজকীয় সনদবলে (Royal Charter) কলেজকে ইউরোপীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সমতূল্য এশিয়ার প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বীকৃতিদান করেন। তারপর থেকেই ব্যাপ্টিস্ট মিশনারীর তত্ত্বাবধানে ধর্মতত্ত্ব চর্চার শুরু যা আজও অব্যাহত। ১৮১৮ সালে তিন মিশনারীর হাত ধরে কলেজের জয়যাত্রা প্রথমে শুরু হয়েছিল অল্ডিন হাউসের ভবনে (ভগ্নপ্রায় অবস্থায় আজও বিদ্যমান)। বাড়িটি তৈরি করে দেন কেরী সাহেবের বন্ধু মিশনারী রেভারেন্ড ডেভিড ব্রাউন সাহেব। ১৮২২ সালে কলেজ অল্ডিন হাউস থেকে উঠে আসে গঙ্গাতীরের বিশাল সুদৃশ্য ভবনে। এরপর সবটুকুই ইতিহাসে সোনার অক্ষরে মোড়া।
কলেজ ভবন তৈরি করতে খরচ হয় ১৫ হাজার পাউন্ড। আজও ভারতের বিভিন্ন কলেজ ও বিদ্যালয়ের দর্শনীয় ভবনগুলির মধ্যে অন্যতম সেরা এই কলেজবাড়িটি। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যালেন্ডারে শ্রীরামপুর কলেজ নিয়ে একসময় লেখা ছিল – ‘The College building, erected in 1818 by Mr. Carey and his colleagues still remains one of the finest college building in India’.
১৮৫৭ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সময়ে যে আটটি কলেজ এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্ভুক্ত ছিল, তারমধ্যে অন্যতম এই কলেজ।
১৮২২ খ্রীষ্টাব্দে ১৩ই জুলাই শ্রীরামপুর থেকে প্রকাশিত সমাচার দর্পণে প্রকাশিত একটি বিজ্ঞাপনে কলেজে ইউরোপীয় ধাঁচে ইংরাজি শিক্ষার বিষয়টি দেশবাসীর সামনে তুলে ধরা হয়। বিজ্ঞাপনটি এইরকম –
‘শ্রীরামপুরের কলেজ অথবা বিদ্যালয়- এই বিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ সাহেব লোকে বাসনা করিয়াছেন যে এতদ্দেশীয় ভাগ্যবান হিন্দু কিম্বা মুসলমানের সন্তানদিগকে ইংরাজি বিদ্যা শিক্ষা করান। যে সকল ভাগ্যবান লোকের সন্তানেরা ইংরাজি শিক্ষার্থে আসিবেন তাঁহারা অত্যল্প ব্যয়েতে বিদ্যা পাইবেন। ঐ বিদ্যার্থীরা অন্যত্র বাসা করিয়া থাকিবেন, কিন্তু কলেজের রীত্যনুসারে তাহাদিগকে চলিতে হইবে অর্থাৎ সময়ানুসারে গমনাগমন ইত্যাদি করিতে হইবে। এই বিদ্যালয়ে যে ২ ইউরোপীয় বিদ্যা প্রচার আছে তাহার মধ্যে যিনি যাহা শিক্ষা করিতে বাসনা করেন তিনি এই কলেজের শিক্ষাদাতা শ্রীযুত রিবরেন্ড জন ম্যাক সাহেবের দ্বারা শিক্ষা পাইবেন। এই কলেজে ইউরোপীয় বিদ্যাশিক্ষা করিলে যত লাভ হয় তত লাভ ভারতবর্ষের কোন স্থানে হয় না যেহেতুক এই কলেজে যে সাধারণ ইংরেজি বিদ্যা যে পাইবেন এমত নয় কিন্তু বৃহৎ ২ যন্ত্র দর্শনে ভূগোলবিদ্যা ও খগোলবিদ্যা ও রসায়নবিদ্যা ও শিল্পবিদ্যা পূর্ব্ব বৃত্তান্ত বিদ্যা প্রভৃতি শিক্ষা পাইবেন। অতএব এই বিদ্যালয়ে যে কেহ আপন সন্তানকে পাঠাইতে বাসনা করেন তিনি শ্রীরামপুরস্থ কালেজে শ্রীযুত রিবরেন্ড ডাক্তার কেরী সাহেবের নামে পত্র পাঠাইলে বিশেষ জানিতে পারিবেন।’
এই প্রসঙ্গে উঠে আসে শিক্ষাবিদ জন ম্যাকের নাম। কেরী, মার্শম্যান ও ওয়ার্ড সাহেবের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যে ব্যক্তি নিজেকে সঁপে দেন বাংলাভাষায় বাঙালী যুবকদের বিজ্ঞান শিক্ষাদানে, তিনিই জন ম্যাক। এডিনবরায় জন্মগ্রহণ করা ম্যাকসাহেব ১৮২১ সালে এদেশে এসেছিলেন রেভারেন্ড ওয়ার্ড সাহেবের আন্তরিক ডাকে। এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞানে স্নাতক ম্যাক ছিলেন গণিত ও রসায়নের অসামান্য পণ্ডিত। বিভিন্ন যন্ত্রের সাহায্যে প্র্যাকটিকাল ক্লাসের মাধ্যমে তিনি বরাবর ছাত্রদের বিজ্ঞানের পাঠে উৎসাহিত করতেন। বিলেত থেকেই বিভিন্ন রসায়নের বই ও যন্ত্র তিনি নিয়ে আসেন শ্রীরামপুরে। সেইগুলো দিয়ে তিনি কলেজে এমন একটি ল্যাবরেটরি তৈরি করেন যা তখন ভারতের অন্যকোনো কলেজ বা বিদ্যালয়ে চিন্তাভাবনারই বাইরে ছিল। তাই দূর দূর থেকে শুধুমাত্র ম্যাক সাহেবের কাছে বিজ্ঞান শিক্ষার জন্য ছুটে আসত ছাত্ররা। বড়লাট লর্ড ওয়ারেন হেস্টিংস এশিয়াটিক সোস্যাইটিতে রসায়ন বিষয়ক বক্তৃতা দেবার জন্য তাঁকে কলকাতায় আমন্ত্রণ জানান। এরপর সোস্যাইটিতে তাঁর জন্য একটি ঘর পর্যন্ত বরাদ্দ করে দেন ও ১০৫ পাউন্ড পুরস্কার হিসাবে দেন। তিনি সেই অর্থও শ্রীরামপুর মিশনে দান করে দেন। ছাত্রদের সাথে ছিল তাঁর নিবিড় সম্পর্ক। জন ম্যাক সাহেবের লিখিত Principles of Chemistry পরে কেরীসাহেবের বড়ছেলে ফিলিক্সকেরী বঙ্গানুবাদ করেন। বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান শিক্ষার ক্ষেত্রে তাঁর নাম কখনো ভোলবার নয়। কেরী ও মার্শম্যানের পরে তিনি অধ্যক্ষ হিসাবে শ্রীরামপুর কলেজের দায়িত্বও গ্রহণ করেন। ১৮৪৫ সালের ৩০শে এপ্রিল তিনি শ্রীরামপুরের মায়া ত্যাগ করে মিশনারীদের কবরে চিরশায়িত হন। কলকাতার হিন্দু কলেজ যেমন ডিরোজিও, টাইটলার, রিচার্ডসন সাহেবদের আলোয় আলোকিত ছিল, ঠিক তেমনই ছিল শ্রীরামপুর কলেজে উইলিয়াম কেরী বা জন ম্যাকের প্রভাব। সেকেলে সনাতনী শিক্ষার গণ্ডিতে দাঁড়িয়ে শ্রীরামপুর কলেজ যে পথ দেখিয়েছিল, তা বাঙালীর বিদ্যাশিক্ষায় আজও একটা সম্পূর্ণ অধ্যায়।