সাপ্তাহিক ধারাবাহিক কথা সাগরে কৌশিক চক্রবর্ত্তী (পর্ব – ১৭)

কলকাতার ছড়া

প্রতিদিন একটু একটু করে বেড়ে উঠেছিল কলকাতা। নতুন রাস্তা, চৌরঙ্গীর জঙ্গল কেটে ঘরবাড়ি, পুকুর, নতুন নতুন মানুষ। একেবারে অচেনা রূপে আত্মপ্রকাশ হতে থাকলো লন্ডনের পরে ব্রিটিশদের নিজ উদ্যোগে নির্মিত দ্বিতীয় এই কল্পনগরী। অচেনা তার ধরণ, না দেখা কত ব্যবস্থাপনা, আইনকানুন। ভারতবর্ষের অন্যান্য শহরগুলোর থেকে তাই একেবারে ভিন্ন শহর কলকাতা। তাই কলকাতা চিরকালই ছিল ব্রিটিশদের অন্যতম প্রিয় শহর। দিল্লীতে রাজধানী স্থানান্তরিত হবার পরে সম্রাট পঞ্চম জর্জ বলেছিলেন – ‘যদিও দিল্লী আমার সাম্রাজ্যের রাজধানী হইল, তথাপি কলিকাতার গর্ব ও গৌরব কিছুতেই খর্ব হইবে না’। কিন্তু কোম্পানির একক প্রচেষ্টায় মহানগরীর গোড়াপত্তন হলেও তার পিছনে মিশে আছে বহু এদেশীয় মানুষের শ্রম আর অর্থ। এইসূত্রে কোম্পানির ইচ্ছেয় বর্গী আক্রমণ থেকে রক্ষা পেতে শহরবাসীর মারাঠা ডিচ খোঁড়ার কথা বলতেই হয়। বর্গীদের থেকে রক্ষা পেতে কোম্পানির টাকা স্যাংসানের অপেক্ষা পর্যন্ত না করে খালের জন্য চাঁদা তোলা শুরু হয় শহরে৷ যদিও এই শহরে মারাঠা আক্রমণ হয় নি৷ আর মারাঠা ডিচও আর সম্পূর্ণ হয় নি তারপরে। যাই হোক, কলকাতা শহরের পথঘাট ও সাধারণ উন্নতির লক্ষ্যে ১৮১২ সালে তৈরি হল লটারি কমিটি। লটারি বিক্রির টাকায় রাস্তাঘাট উন্নয়ন, পুকুর কাটা ইত্যাদির শুরু হয়। তখন থেকেই এ শহর ধীরে ধীরে পেতে শুরু করে বর্তমানের আধুনিক রূপ। আজও মহানগরীর আশপাশে তাকালে খুঁজে পাওয়া যায় সেযুগের ডাকবাক্স, জলের কল, দমকলের বার্তা প্রেরণ যন্ত্র অথবা নর্দমা। লটারির টাকায় কলকাতা সংস্কারের পরে কলকাতার মানুষ বিভিন্ন ছড়া আওড়াতেন-

“আজকাল, কলিকাতাতে বড়ই সুখ
দেখতে পাচ্ছি ভাই।
সব রাস্তাঘাটের শৃঙ্খলাতে
বলিহারী যাই।”

আবার প্রথম রাস্তার ধারে ফুটপাথ তৈরি হবার পরে-

“রাস্তা ধারের নর্দমা সব কেমন গেল বুজে
মানুষ চলার ফুটপাথ হল চলে যাও চোখবুজে।”

কলকাতায় সর্বপ্রথম গ্যাসের আলো লাগানো হয় হ্যারিশন রোডে (বর্তমান মহাত্মা গান্ধী রোড)। স্যার হেনরী লেল্যান্ড হ্যারিশন ছিলেন সেযুগের কড়া আই সি এস। তৎকালীন বেঙ্গল গর্ভমেন্টের জুনিয়র সেক্রেটারি পদে ভারতে আসার পরে হ্যারিশন সাহেব প্রোমোশন পান কলকাতা কর্পোরেশনের চেয়ারম্যান এবং পুলিশ কমিশনার পদে। তখন এই দুটি পদ একই ব্যক্তি দ্বারা চালানোর রীতি ছিল। তাঁর হাত ধরে আমূল বদলে যেতে থাকে কলকাতা। হাওড়া থেকে শিয়ালদা পর্যন্ত তৈরি হয় কলকাতার অন্যতম সড়ক সেন্ট্রাল রোড (পরে হ্যারিশন রোড)। ১৮৯১ সালে প্রথম বৈদ্যুতিক আলোয় ঝলমল করে ওঠে এই রাস্তা। তখন প্রচলিত ছিল এই ছড়া –

“রাত্রিতে গ্যাস লাইট জ্বালো
আর অন্ধকার নাই
অন্ধকারে রাত্রে
দিনের মত চলে যাই।”

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।