সাপ্তাহিক ধারাবাহিক কথা সাগরে কৌশিক চক্রবর্ত্তী (পর্ব – ১৪)

কলকাতার ছড়া

হিন্দু কলেজ। তৎকালীন সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি এডওয়ার্ড হাইড ঈষ্ট, এইচ এইচ উইলসন, ডেভিড হেয়ার সাহেবদের প্রত্যক্ষ নেতৃত্বে গড়ে ওঠা বাংলার রেনেসাঁসে এক প্রাতঃস্মরণীয় প্রতিষ্ঠান। শুধু টোলে সংস্কৃত পড়লেই যে বাঙালীর আধুনিক শিক্ষা সম্পূর্ণ হবে না, তা প্রথম ঠাওর করেছিলেন ডেভিড হেয়ার, প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর, রাজা রামমোহন রায়ের মত পথিকৃৎরা। আগেও বলেছি ডেভিড হেয়ার সাহেব বন্ধু রামমোহনকে পেয়ে তাঁর পৈত্রিক ঘড়ির ব্যবসায় ইতি দিয়ে মেতে উঠেছিলেন এদেশীয় ছেলেমেয়েদের ইংরাজি শিক্ষার হাতেখড়ি দিতে। তাঁরা সকলেই চিন্তা করলেন কলকাতায় একটি ইংরাজি স্কুল প্রতিষ্ঠার বিষয়ে, যেখানে হিন্দুঘরের তরুণরা আধুনিক ইংরাজি শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে উঠতে পারবেন। যেমন ভাবনা তেমনই কাজ। স্কুলের জন্য চাঁদা তোলার দায়িত্ব দেওয়া হয় দেওয়ান বৈদ্যনাথ মুখার্জীকে। তিনি সর্বসাকুল্যে ১,১৩,১৭৯ টাকা তুললেন। যার মধ্যে ছিল বর্ধমানরাজ তেজচাঁদ বাহাদুরের দান, তেমনই ছিল জানবাজারের রানী রাসমণির অবদানও। অর্থ সংগ্রহের পর সেই অর্থ রাখা হয় জোসেফ বেরোটো নামক এক জনৈক সওদাগরের হাতে৷ কিন্তু ইতিমধ্যে তাঁর ব্যবসা দেউলিয়া ঘোষণা হওয়ায় সেই টাকার অধিকাংশই ব্যয় হয়ে ২৩০০০ টাকা অবশিষ্ট পড়ে থাকে। তাই ১৮২৪ সালে কলেজ কমিটিকে বাধ্য হয়েই গভর্নমেন্টের দ্বারস্থ হতে হয়। গভর্নমেন্ট তখন এইচ এইচ উইলসন সাহেবকে কলেজের পরিদর্শক নিয়োগ করে প্রতিমাসে অর্থসাহায্য দিতে রাজি হয়। সেইসময় হিন্দু কলেজে একটি নিয়ম ছিল। স্কুল সোসাইটি থেকে বাছাই করা ছাত্রদের কলেজে ফ্রি ছাত্র হিসাবে পড়াশোনার সুযোগ করে দেওয়া হত৷ আর শোনা যায় এই সুযোগ লাভের জন্য হেয়ার সাহেবের বাড়িতে নাকি প্রতিদিন জমা পড়ত অগণিত চিঠি। সেযুগের বিখ্যাত বাঙালী রামতনু লাহিড়ী বা রাজা দিগম্বর মিত্রও হেয়ার সাহেবের হাত ধরে এই ফ্রি ছাত্র হিসাবেই কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন। ১৮১৭ সালের ২০শে জানুয়ারী প্রথম ২০ জন ছাত্র নিয়ে কলকাতায় শুরু হয়েছিল হিন্দু কলেজ। প্রথম স্কুল বসে গরাণহাটায় গোরাচাঁদ বসাকের বাড়িতে। ধীরে ধীরে ১৮২৮ সালে কলেজের ছাত্রসংখ্যা দাঁড়ায় ৪০০ জন। এইসময়েই কলেজে শিক্ষক হিসাবে যুক্ত হন অ্যাংলো ইন্ডিয়ান সাহেব হেনরী লুইস ভিভিয়ান ডিরোজিও। সঙ্গে বিজ্ঞান বিভাগে পড়াতেন তৎকালীন কলকাতার প্রখ্যাত শিক্ষক রস সাহেব ও গণিতজ্ঞ টাইটলার সাহেব। কিন্তু সেইযুগ থেকেই হিন্দু কলেজের চার দেওয়ালের মধ্যে শুরু হয় ভারতবর্ষের এক ব্যতিক্রমী নবজাগরণ। ধীরে ধীরে তা ছড়িয়েও পড়তেও শুরু করে দিকে দিকে। অধ্যাপক ডিরোজিও এবং তাঁর অ্যাকাডেমিক অ্যাসোসিয়েশন ও ইয়ং বেঙ্গলের অনুপ্রেরণায় দলে দলে হিন্দুঘরের বাঙালী দামাল তরুণ ঝাঁপিয়ে পড়তে শুরু করেন হিন্দুত্বের নামে গোঁড়া ধর্মতত্ত্বের প্রকাশ্য বিরোধিতায়। গোঁড়া ব্রাহ্মণ বংশের ছেলে কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায় থেকে শুরু করে রাধানাথ শিকদার, সকলে পার্টিতে গোমাংস পর্যন্ত ভক্ষণ করতেন নির্দ্বিধায়। একবার রামতনু লাহিড়ী মহাশয় তাঁর সহপাঠী রামগোপাল ঘোষ ও দক্ষিণারঞ্জন মুখোপাধ্যায়ের সাথে ডিরোজিওর বাড়ি গেলেন। ছাত্রদের আতিথেয়তার জন্য চা তৈরি করলেন সাহেব। কিন্তু কুলীন ব্রাহ্মণ বংশের ছেলে রামতনু কিছুতেই ফিরিঙ্গীর ঘরে চা পান করতে রাজি হলেন না। কিন্তু দুই বন্ধু তাঁকে একরকম জোর করে সেই চা পান করাতে যান। সেযাত্রায় তিনি চিৎকার করে রক্ষা পান বটে, কিন্তু সেযুগের এইসব বাঙালী তরুণদের গোঁড়া হিন্দু সমাজের প্রচলিত রীতির বিরুদ্ধাচারণের একটা ধারণা পাওয়া যায় এই ঘটনা থেকে। গেল গেল রব উঠে যায় কলকাতা শহরের রক্ষণশীল সমাজে। সংস্কৃত কলেজের গোঁড়া ব্রাহ্মণ অধ্যাপকরা পাঁচিল লাগোয়া হিন্দু কলেজকে আখ্যা দেন ম্লেচ্ছশিক্ষার কেন্দ্রবিন্দু হিসাবে। এমনকি কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়কে সমাজ থেকে একঘরে করার পর গৃহত্যাগ পর্যন্ত করতে বাধ্য করা হয়। তাঁর মত বহু তরুণ দীক্ষা নেন খ্রিস্টানধর্মে। বাল্যবিবাহ, বহুবিবাহের মত বিভিন্ন হিন্দু কুসংস্কারের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করতেও পিছপা হন না তাঁরা।
সেই সময়ে ডিরোজিওর ছাত্রদের তথাকথিত দুর্বিনীত ও অন্যায় ব্যবহারে বিরক্ত হয়ে সংস্কৃত কলেজের তৎকালীন অধ্যাপক জয়গোপাল তর্কালঙ্কার মহাশয় এই শ্লোকটি লিখেছিলেন…

“দক্ষিণারঞ্জনো রামো রসিকং কৃষ্ণমোহনঃ |
তারাচাঁদো রাধানাথো গোবিন্দশ্চন্দ্রশেখরঃ ||

হরচন্দ্রো রামতনুঃ শিবচন্দ্রশ্চ মাধবঃ |
মহেশোহমৃতলালশ্চ প্যারীচাঁদো মধুব্রতাঃ ||

ফিরিঙ্গী পুঙ্গব শ্রীমদ্ ডিরোজিও কুশেশয়ে |
মধুপানরতাঃ সম্যগ্ দিগ্ বিদিগ্ জ্ঞানবর্জ্জিতাঃ ||”

কবিতাটিতে উল্লিখিত দক্ষিণারঞ্জন মুখোপাধ্যায়, কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়, রাধানাথ শিকদার, হরচন্দ্র ঘোষ, রামতনু লাহিড়ী, প্যারীচাঁদ মিত্র, শিবচন্দ্র দেব প্রভৃতি সকলেই হিন্দু কলেজে ডিরোজিওর ছাত্র ও ইয়ং বেঙ্গলের সদস্য ছিলেন।

ক্রমশ

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।