|| শাম্ভবী সংখ্যা ২০২১ || T3 শারদ সংখ্যায় কৌশিক চক্রবর্ত্তী

বিষ্ণুপুরে আজও নবমীতে পূজিতা হন মহামারীর দেবী খচ্চরবাহিনী
সে বহুদিন আগের কথা। বিষ্ণুপুর তখনও আজকের মতো মন্দির নগরী হয়ে ওঠেনি। চারদিকে শুধু জঙ্গল আর বন্য পশুদের বিচরণ। রাজা আদিমল্ল বা প্রথম রঘুনাথ মল্লের হাত ধরে জয়পুরের কাছে প্রদ্যুম্নপুরে ততদিনে প্রতিষ্ঠা হয়ে গেছে মল্ল রাজাদের রাজপাট। কিন্তু বিষ্ণুপুর গড়ে ওঠেনি তখনও। সেযুগের দুর্ধর্ষ মল্লযোদ্ধা হিসাবে রঘুনাথের দিগ্বিদিক খ্যাতির কারণে মল্লরাজ নামেই লোকে বেশি চিনতে শুরু করে তাঁকে। আর সেই থেকেই মল্লভূম। এই রাজবংশেরই ঊনিশ তম রাজা বীর জগৎ মল্ল দেব। যুদ্ধবিদ্যায় ও প্রজাপালনে তাঁর নামডাক অনেক দূর পর্যন্ত কানে যায়। প্রদ্যুম্নপুরে রাজধানী হলেও রাজা নিয়মিত ঘোড়ায় করে যান পশু শিকারে। এ তেমনই এক দিনের কথা। ঘন জঙ্গলে ক্লান্ত রাজা শিকারের ফাঁকে একটু জিরিয়ে নিতে মনস্থির করলেন। কিন্তু তাঁর চোখে পড়লো এক অদ্ভুত ঘটনায়। একটি বাজপাখি গাছের ডালে বসে থাকা একটি বককে আক্রমণ করলেও বকের অলৌকিক ক্ষমতার কাছে রক্তাক্ত ও পর্যুদস্ত হয়ে বারবার ফিরে আসছে তাঁর আশ্রয়ে। কী এর গূঢ় অর্থ। ঘন জঙ্গলের মধ্যে পথভ্রষ্ট রাজা অবাক তো হলেনই, সঙ্গে অনুভব করলেন স্থানটির এক অলৌকিক মাহাত্মের উপস্থিতি। তারপরে দৈববাণী অনুযায়ী মাটি খুঁড়ে দেবী চণ্ডীর এক হাস্যমুখ অবয়ব পেলেন রাজা। তাঁর ভক্তি আর বীরগাথা আজও বিষ্ণুপুরের লৌকিক উপাখ্যান। দেবী মৃন্ময়ীর স্বপ্নাদেশে প্রদ্যম্নপুর থেকে তিনি রাজধানী স্থানান্তর করলেন তৎকালীন বন বিষ্ণুপুরে। বিষ্ণুর নামানুসারে বিষ্ণুপুর। আজকের মন্দির নগরী। ঝলমলে নগর। এককালের জঙ্গলে ঘেরা এই অঞ্চল ধীরে ধীরে আজকের আধুনিক রূপ পায় এই মল্ল রাজাদের হাত ধরেই। হাজার বছরেরও পুরনো রাজপাট। রাজা রঘুনাথ বা আদিমল্লের হাত ধরে জন্ম নেওয়া একটি রাজবংশ ধীরে ধীরে হয়ে উঠেছিল বাংলার বীর ভূঁইয়াদের এক শক্তিশালী রাজপীঠ। এই বংশের সাথেই পরবর্তীতে জড়িয়ে রয়েছে বারো ভূঁইয়ার এক শক্তিশালী বিখ্যাত রাজা বীর হাম্বীর মল্ল দেবের কথা। কিন্তু সে অনেক পরের কথা। ইতিমধ্যে রাজা জগৎ মল্ল দেবের হাত ধরে বিষ্ণুপুর হয়ে উঠেছে মল্ল রাজাদের গর্বের রাজধানী। আর রাজার ইচ্ছায় ও উদ্যোগে নগরী আলো করে প্রতিষ্ঠা হয়ে গেছে দেবী চণ্ডীর মৃন্ময়ী রূপ ও মন্দির। চিন্ময়ী দেবী রাজার হাত ধরে হয়ে উঠেছেন মৃন্ময়ী। সময়কাল ৯৯৭ খ্রীস্টাব্দ। প্রায় হাজার বছরেরও বেশি সময়ের কথা। বাঙালির চেনা দূর্গার থেকে একেবারে ভিন্নধর্মী এই একচালার মূর্তিতে উপরে রয়েছে স্বয়ং নন্দীকেশ্বর ও তার সঙ্গীরা। প্রতিমার চালির উপরের দিকে রয়েছেন গণেশ ও কার্তিক। নিচে রয়েছেন লক্ষ্মী ও সরস্বতী। আমাদের প্রচলিত দূর্গাপ্রতিমায় যা সাধারণত দেখা যায় না। সাধারণত উপরে থাকেন লক্ষ্মী ও সরস্বতী, যা তাহিরপুরের রাজা ও বাংলার আরও এক ভূঁইয়া রাজা কংসনারায়ণ ঘরানার বলে কথিত। বিষ্ণুপুরের দূর্গাপুজো প্রাচীন ও ভিন্নধর্মী। মল্ল রাজাদের হাত ধরে এক হাজার বছর ধরে বিভিন্ন ব্যতিক্রমী নিয়ম মেনেই আজও দূর্গাপুজো উপলক্ষে ১৯ দিন ধরে পূজিতা হয়ে আসছেন বিষ্ণুপুর রাজবংশের কূলদেবী মৃন্ময়ী। মহাষষ্ঠীর ১৫ দিন আগে শুরু হয় বিষ্ণুপুরের দুর্গোৎসব। আজও রাজকীয় নিয়মে মন্দিরের কাছে বিষ্ণুপুর দুর্গের মুখ্য তোরণদ্বারের সামনের পাহাড়ে কামান থেকে তোপ দেগে শুরু হয় মৃন্ময়ী মায়ের পুজো। আবার কামান গর্জে ওঠে সন্ধিপুজোর শুরুতে। এই ব্যতিক্রমী দূর্গাপুজোর আবহে পুজোর সাথে সাথে মেতে ওঠে সমস্ত বিষ্ণুপুর। কৃষ্ণপক্ষের নবমীর দিন নিয়ম মেনে মৃন্ময়ী মন্দিরে আসেন বড় ঠাকুরানী বা মহাকালীর পট। প্রথমে পুজো শুরু হয় এই পটেই। এছাড়াও ষষ্ঠীর দিন মন্দিরে আসেন মেজ ঠাকুরানী বা মহা সরস্বতী ও তারপর ছোট ঠাকুরানী বা মহালক্ষ্মী। দেবীর এই পটগুলো বংশ পরম্পরায় এঁকে চলেছেন বিষ্ণুপুরে শাঁখারিপাড়ার ফৌজদার পরিবার। বড় ঠাকুরানী লক্ষ্মীবিলাস শাড়ি পরিহিত। মেজো ঠাকুরানীর শাড়ি লাল এবং ছোট ঠাকুরানীর শাড়ি কমলা রঙের। দেবীপক্ষে ষষ্ঠীর দিন সন্ধ্যার পর পুরোহিত শোভাযাত্রা সহকারে ছোট ঠাকুরানির পট শ্যামকুণ্ডে নিয়ে যান স্নান করাতে৷ সেখান থেকে বোধনস্থল বিল্ববৃক্ষতলায় পুজো করে ছোট ঠাকুরানির পট মন্দিরে স্থাপন করা হয়৷ মৃন্ময়ী দেবীর মূর্তির সঙ্গে সঙ্গেই ১৯ দিন ধরে চলে এই পটচিত্রে দেবীর আরাধনা। এই মন্দিরের সম্পূর্ণ পুজোপদ্ধতি পৌরাণিক। বংশানুক্রমে অষ্টমী ও নবমীর সন্ধিক্ষণে সামনের পাহাড়ে কামান দাগেন মহাদণ্ড উপাধিধারীরা। এই কামানের শব্দ কানে এলে তবেই সারা শহরের সব মণ্ডপে শুরু হয় সন্ধিপুজোর বাজনা। আজ আর নেই রাজপাট। কিন্তু পুজোর সময় শহর কাঁপিয়ে কামানের গোলা আজও জানান দেয় বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে মল্লরাজাদের এককালের দাপট।
মহাষ্টমীর দিন রাজবাড়ী থেকে অষ্টধাতুর বিশালাক্ষী মূর্তি মন্দিরে নিয়ে আসা হয়। শোনা যায় একসময় পুজোর সময় নরবলি ও পশুবলির প্রথা থাকলেও পরবর্তীতে রাজা বীর হাম্বীর চৈতন্য অনুগামী শ্রীনিবাস আচার্যের কাছে বৈষ্ণব ধর্মে দীক্ষা নিলে বন্ধ হয় বলি। বর্তমানে সব্জীবলির প্রথা থাকলেও পশুবলির কোনো প্রথা নেই মন্দিরে।
মহামারী কেবল আজকের বিষয় নয়। বাংলায় একসময়ে কলেরা রোগ মহামারীর রূপ নিয়ে তার করাল থাবা কিভাবে বসিয়েছিল তা কে না জানে। সেযুগের মল্লভূমও বাদ যায় নি সেই সংক্রমণ থেকে। স্বভাবতই চিন্তিত হয়েছিলেন মল্লভূমের প্রজাহিতৈষী রাজপরিবারও। তখন থেকেই দেবী মৃন্ময়ীর পুজোর শেষে মহানবমী তিথিতে রীতি মেনে হয়ে আসছে খচ্চরবাহিনীর পুজো। এ এক অন্যরকম দেবী বন্দনা। কলেরার মতো মহামারী রোধে খচ্চরবাহিনীকে সন্তুষ্ট করবার এই প্রথা বিষ্ণুপুরে একেবারে স্বতন্ত্র। নবমীর মধ্যরাত্রে এই পুজোয় সাধারণ মানুষের প্রবেশ একেবারে নিষিদ্ধ। ঘটের দিকে পিছন ফিরে পুরোহিত এই পুজো করেন। শুধুমাত্র রাজবংশের উত্তরপুরুষরা বাদে এখানে প্রবেশ করেন না কেউ। আজ করোনা মহামারীর আবহে এই পুজো এক ভিন্নমাত্রা পেয়েছে বলাই বাহুল্য। আগের বছরও সম্পূর্ণ বিষ্ণুপুর দেবী খচ্চরবাহিনীর কাছে প্রার্থনা করেছে একটি রোগহীন পৃথিবীর। মহামারী যায়, আবার আসে। বিষ্ণুপুরের রাজবংশ আজও ভক্তিভরে আরাধনা করে চলেছেন সেই ভিন্নধর্মী মহামারীর দেবীর। এরপর সাড়ম্বরে আসে বিসর্জনের দিন। মৃন্ময়ী মন্দিরটি পরে মল্লরাজদের হাত ধরে বহুবার সংস্কার হলেও দেবীর মূল মূর্তিটি আজও অভিন্ন। রাজা জগৎ মল্ল নির্মিত মাটির মূর্তি মন্দিরে নিত্য পূজিতা। তাই মূর্তি বা পট বিসর্জনের রীতি না থাকলেও মহা আড়ম্বরে চলে প্রথা মেনে নবপত্রিকা বিসর্জন। এইদিন শহরের জেলে সম্প্রদায় মন্দিরে নিয়ে আসেন দই ও চ্যাঙ মাছ। তারপর দইতে চ্যাঙমাছ ছেড়ে পাঠানো হয় শুভবার্তা। সঙ্গে ওড়ানো হয় নীলকন্ঠ পাখি। শোভাযাত্রা করে নবপত্রিকা থেকে ধান ও মান গাছকে খুলে স্থানীয় গোপালসায়রে তা বিসর্জন দেওয়া হয় দশমীর দিন।
সারা বাংলায় দুই ধরনের দূর্গা প্রতিমা দেখা যায়। একটি বিষ্ণুপুর ঘরানা, আর একটি অধুনা বাংলাদেশে তাহিরপুরের রাজা কংসনারায়ণ ঘরানার। কালাপাহাড়ের হাত থেকে রাজ্যবাসীকে রক্ষার পর রাজা কংসনারায়ণ যে মহাযজ্ঞের কথা ভেবে দুর্গোৎসবের সূচনা করেন, তাই আজ আপামর বাঙালির ঘরের মেয়ে উমার রূপ। নবদ্বীপের কিংবদন্তী পণ্ডিত স্মার্ত রঘুনন্দনের লিখিত শাস্ত্র মেনে আজও দেবী দূর্গার আরাধনা হয় সারা বাংলায়। কিন্তু বিষ্ণুপুরের পুজো যেন তারমধ্যে একখণ্ড ভিন্নপুরাণ। একসময় রাজা গোপাল সিংহ দেবের সময় দুর্ধর্ষ ভাস্কর পণ্ডিতের নেতৃত্বে বর্গী দস্যুরা যে শহরকে পর্যুদস্ত করতে পারেন নি, যে রাজবংশের বীর রাজা রঘুনাথ মল্লকে নবাব শাহসুজা পর্যন্ত একসময় কারাগারে বন্দী করে রাখতে পারেন নি, আজ রাজপাট না থাকলেও স্বমহিমায় বিষ্ণুপুর রয়েছে সেই মল্লরাজাদের বিষ্ণুপুরেই। ১০২৪ বছরের পুরনো দূর্গাপুজোকে নিজের আঙ্গিকে বুকে ধারণ করে চলেছে এই শহর ও বর্তমান রাজবংশের মানুষেরা। এই বংশের শেষ মল্লাধিপতি কালীপদ সিংহ ঠাকুরের কথা না বললে অসম্পূর্ণ থেকে যায় এই আখ্যান। ১৯৩০ সালে তিনি শেষ রাজা হিসাবে নিজের হাতে তুলে নেন বিষ্ণুপুর শহরের দায়িত্ব। ১৯৮৩ সালের ২৯ শে ডিসেম্বর তাঁর মৃত্যু হলে বিষ্ণুপুরের রাজা পদটির অবসান ঘটে। কিন্তু থেকে গেছে লোককথা। থেকে গেছে ভিন্নধর্মী দুর্গোৎসব এবং আপামর বিষ্ণুপুরবাসীর উন্মাদনা ও আবেগ। দেবী দূর্গা এখানে বাংলার এক চিরায়ত বীরত্বের ইতিহাসকে ধরে রেখে আজও দর্শন দিয়ে চলেছেন দেবী মৃন্ময়ীর রূপে। আর তাঁর মূর্তিতেই আজও বেঁচে আছেন বীর মল্লরাজ জগৎ মল্ল ও তাঁর বীরত্বের দিনগুলো।