।। ত্রিতাপহারিণী ২০২০।। T3 শারদ সংখ্যায় কুবলয় ব্যানার্জী

হাড়ের তৈরি চাবুক

দীপ্তেন্দুর জ্যাঠামশাই আর বেঁচে নেই। তাই এবার আমি নিশ্চিন্তে ঘটনাটা বলতে পারি। তবে, নিলামঘরটা এখনও আছে। সে জন্যে ঠিকানাটা যথাযথ দিলাম না। জায়গাটা কলকাতার সাহেবপাড়া – এর বেশি কিছু বলব না। সেদিন, মানে সে রাতে যে চিনে পুতুলগুলো ভেতরে রাখা ছিল, সেই পুতুলগুলো এখন বাইরের জানলায় আছে। ফুটপাথ ধরে যাওয়ার সময় চোখ পড়ে। পোর্সেলিনের তৈরি চিনা মহিলা এক চোখ হাসেন। উনি সবটাই জানেন, কিন্তু কিছুই বলবেন না।
দীপ্তেন্দুর সঙ্গে আলাপ কলেজে। সে ইংরিজি পড়ত, আমার ইতিহাস। ওই আলাপ হয় তো কোনওদিনই ঘনিষ্ঠতায় পরিবর্তিত হত না, যদি না দৈবগতিকে ওর জেঠুর সঙ্গে আলাপ হত। সুযোগ পেলেই ডালহৌসিতে এন সি দাঁর বন্দুকের দোকানে চলে যেতাম পায়ে পায়ে। কী জানি কী ভেবে ওঁরাও প্রশ্রয় দিতেন। এটা কোন দেশের বন্দুক, ওটার বিশেষত্ব কী – এই সব কথা হত। বন্দুকের প্রতি ছোট থেকেই দুর্নিবার আকর্ষণ আমার। সত্যি বলতে কী, শতরঞ্জ কে খিলাড়ি ছবিতে যে পিস্তল দুটো ব্যবহার করেছিলেন সত্যজিৎ, সেগুলো এখান থেকেই ধার করা। সে দুটো দেখতেই প্রথম ওই দোকানে যাওয়া।
সেদিন গিয়ে দেখি এক প্রৌঢ় এসেছেন। সিরিয়াস কথা হচ্ছে। ওপর থেকে একটা বন্দুক নামানো হল। আমার মুখ ফস্কে বেরিয়ে গেল, ডবল ব্যারেল ম্যাচলক। ভদ্রলোক মুখ ঘুরিয়ে দেখলেন। অবাক হয়েছেন। একটু মজার গলায় বললেন, কে হে তুমি ছোকরা বন্দুকবাজ? কী কর?
কলেজের নাম শুনে বললেন, আমার ভাইপো ওই কলেজে পড়ে। চেন? ব্যাস সেই থেকে দীপ্তেন্দু আর তার জেঠু – দুজনেই আমার বন্ধু। শুরু হল ওদের বাড়িতে আসা যাওয়া। জেঠুর পুরোনো জিনিসের ব্যবসা। কলকাতার নামকরা এক সাহেব পাড়ায় নিলামের দোকান। রবিবার বাড়িতে গেলেই জমাটি খাওয়া আর ইতিহাসের গল্প। মাঝে মাঝে বিদেশ থেকে পার্সেল আসে। সেগুলো মহা উৎসাহে খুলে ভেতর থেকে বের করা হয় বাঁকানো ছোরা না হলে বিকট মুখোশ বা বিচিত্র কোনও মূর্তি। সঙ্গে তার ইতিহাস লেখা থাকে। দোকানে নিয়ে যাওয়ার আগে নিজেই ডকুমেন্টেশন করেন জেঠু। কখনও আমরা সাহায্য করি।
সেদিন দোকানে একটা কল্যাপসেবল গেট মেরামত হচ্ছিল। কোনও এক আত্মীয়র অসুস্থতার জন্যে দীপ্ত দিল্লি গিয়েছে। দোকানে জেঠু একা বসে মিস্ত্রীর কাজ দেখছেন। আমাকে ঢুকতে দেখে বেশ একটু কুণ্ঠিত মুখে বললেন, একটা উপকার করবে? বললাম, কী বলুন না? উনি বললেন, আজ গেটটা বন্ধ করা যাবে না। আমাকে একটা ওষুধ খেতে হয় রাতে। আমি থাকতে পারব না। তুমি একটা রাত দোকানে থাকবে? কাচের পাল্লাটা বন্ধ করে দিও। আলো জ্বালিয়ে রেখ। বাইরে পুলিশ ঘোরে, অসুবিধা হবে না। কী মনে হল, রাজি হয়ে গেলাম।
বাড়িতে বললাম রাতে দীপ্তর বাড়ি থাকব। কেউ আপত্তি করল না। সন্ধে হতে দোকানে ঢুকলাম। জেঠু টুকটাক কয়েকটা জিনিস বুঝিয়ে দিলেন। কেউ ডাকলে দরজা না খুলতে এমনকি সাড়াও না দিতে বললেন। দোকানে দুষ্প্রাপ্য ও দামী জিনিস আছে। কোনও জিনিসে হাত দিতেও বারন করলেন। ঠিকই তো। পুরোনো জিনিস, ভেঙে গেলে বিপদ হবে।
রাত ৯টা নাগাদ উনি চলে গেলেন। আমি আগাথা ক্রিস্টি নিয়ে প্রকাণ্ড একটা সোফায় গা এলিয়ে দিলাম। দোকানের আলোটা তেমন জোর নয়। ঘন্টা তিনেক পড়ার পর চোখ জ্বালা করতে শুরু করল। বইটা রেখে চার পাশে দেখলাম। পোর্সেলিনের তৈরি প্রায় ১০ ইঞ্চি লম্বা এক চিনা মহিলার মূর্তি আমার সামনেই। একটু পাশে একটা বন্ধ বাক্স। মিশরীয় মূর্তি, জাপানি বাদ্যযন্ত্র, রুশ সামোভার … আরও গাদা পুরোনো জিনিস। নিষেধ অমান্য করেই একটা পুরোনো খঞ্জর নেড়েচেড়ে রেখে দিলাম। তারপর আলোটা নিভিয়ে ঘুমের চেষ্টা করলাম।
ঘুম এসে গিয়েছিল, এমন সময় খুব কাছে একটা কর্কশ আওয়াজে ঘুম ভেঙে গেল। কাঠের বাক্সে পাথর ভরে জোরে ঝাঁকালে এমন শব্দ হয়। আলো জ্বালাতেই চিনা মহিলা মুচকি হাসলেন। কিন্তু আওয়াজটা একটু পাশ থেকে আসছে যেন। বন্ধ ওই বাক্স থেকে। ওটা কি একটু নড়ছে? আমার অবশ্য নড়া বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। একবার ভাবলাম ইঁদুর, পরে মনে হল এতক্ষন চুপ করে মাঝরাতে এমন করবে কেন?
বাক্সটা তুলে জোরে ঝাঁকালাম। তেমন ভারী নয়তো! কিন্তু ভেতরে কিছু নড়ছে। সারা রাত ওই ভাবেই রইলাম। আলো ফোটার পর শব্দটা থেমে গেল।
সকালে জেঠু আসতে সবটা বললাম। উনি খুব গম্ভীর মুখে বললেন, চলো এখনই বেরোব। আমি বললাম কোথায়? উনি বললেন প্রিন্সেপ ঘাট। তারপর একটা ছোট শাবল জাতীয় জিনিস দিয়ে চাড়া মেরে বাক্সটা খুললেন। উঁকি মেরে দেখতে গেলাম, তার আগেই ঢাকা বন্ধ করে দিলেন। প্রিন্সেপ ঘাটে গিয়ে একটা নৌকা ভাড়া করে মাঝিকে বললেন একটু ঘুরিয়ে আনতে। তারপর আমার দিকে ঘুরে একটা গল্প শোনালেন।
১৭ শতকের মাঝামাঝি সময়। আমেরিকার দখল নিয়ে ব্রিটেন আর ফ্রান্সের লড়াই চলছে। আমেরিকা আর কানাডার রেড ইন্ডিয়ানরা কেউ ব্রিটিশ, কেউ ফরাসি পক্ষে। এমন সময় এক ফরাসি ক্যাপ্টেনের কাছে খবর আসে, কয়েকজন ফরাসি সেনাকে বন্দি করে খুন করেছে মোহক উপজাতির যোদ্ধারা। ক্যাপ্টেন শুনলেন, এক একজন ফরাসি সেনাকে পাথরের গদা দিয়ে পিটিয়ে তাদের প্রতিটা হাড় ভেঙে খুন করা হয়। প্রতিশোধ নিতে ওই ক্যাপ্টেন মোহকদের গ্রাম আক্রমণ করেন। প্রতিটা মানুষকে বেঁধে তাদের শিরদাঁড়া খুলে নেওয়া হয়। তারপর শিরদাঁড়ার হাড় জুড়ে জুড়ে কয়েকটা চাবুক তৈরি করেন ওই ক্যাপ্টেন। গল্প থামিয়ে জেঠু এবার বাক্স খোলেন। ভেতরে তাকিয়ে গা শিউরে উঠল আমার। মোটা থেকে ক্রমশ সরু হয়ে আসা বিশাল বিছের মত একটা জিনিস পড়ে রয়েছে। কাঁধ থেকে কনুই পর্যন্ত যে হাড়ের নাম হিউমেরাস, সেটা হল ওই চাবুকের হাতল। তার পর দৈর্ঘ্য যত বেড়েছে, চাবুক তত সরু হয়েছে। জেঠু বললেন, ছোট হাড়গুলো বাচ্চাদের। সাহেব কাউকে ছাড়েনি। তারপর কিছু বুঝে ওঠার আগেই চাবুকটা বাক্স থেকে বের করে গঙ্গায় ফেলে দিলেন।
আওরঙ্গজেবের সমসাময়িক চাবুকটা মুহূর্তের মধ্যে টুপ করে ডুবে গেল। জেঠু হাত জোড় করে বললেন, ওদের সবার আত্মা শান্তি পাক। তারপর আমাকে বললেন, প্যারিসের একটা পুরোনো জিনিসের দোকান থেকে জলের দরে পেয়েছিলাম। কাউকে বিক্রি করতে পারিনি। ফেলতেও পারিনি। আজ সব শুনে ঠিক করলাম আর রাখব না। কিন্তু তুমি কথা দাও, আমি যতদিন বাঁচব কাউকে এর কথা বলবে না।
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।