ফোনটা এসেছিল বিকেলের দিকে। সবেমাত্র ভোপালে ইউনিয়ন কার্বাইডের পরিত্যক্ত কারখানা ঘুরে হোটেলে ফিরেছি। সেটা ২০০৮-এর নভেম্বর। মধ্যপ্রদেশে বিধানসভা নির্বাচন কভার করতে প্রথমবারের জন্য ওই মুলুকে যাওয়া।
ফোনের ওপারের ব্যক্তি জানতে চাইলেন, তিনি কলকাতা থেকে আসা রিপোর্টার মিঃ ব্যানার্জির সঙ্গে কথা বলছেন কি না। সদুত্তর পেয়ে সরাসরি কাজের কথা এলেন। তিনি কিষেনলাল শর্মা। মধ্যপ্রদেশের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী ও কংগ্রেস হেভিওয়েট দিগ্বিজয় সিংয়ের সেক্রেটারি। ভোপালে কংগ্রেস অফিসে গিয়ে নিজের পরিচয় দিয়ে দিগ্বিজয়ের ইন্টারভিউ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছিলাম। সেখান থেকেই আমার ফোন নম্বর গিয়েছে শর্মাজির কাছে। তাঁর বক্তব্য সংক্ষিপ্ত। ‘দিগ্গি রাজা’ ইন্টারভিউ দেবেন, কিন্তু তাঁর পৈত্রিক বাড়ি, থুড়ি কেল্লায় এসে তাঁর সঙ্গে কথা বলতে হবে। জায়গাটার নাম রাঘোগড়। ভোটের প্রচার সেরে তিনি বাড়ি ঢোকেন রাত ৮টা নাগাদ। বেরিয়ে যান সকাল ৮টায়। আমাদের যদি কথা বলতে হয়, তাহলে পরদিন রাত সাড়ে ৮টার পর, অথবা সকাল সাতে ৭টার আগে। বিশেষ কিছু না ভেবে সোজা বলে দিলাম, কাল রাত সাড়ে ৮টায় দেখা হচ্ছে।
রাতে সময় নেওয়ায় প্রথমটায় গৌতমদা একটু গাঁইগুঁই করছিল। ক্যামেরাপার্সন গৌতম বাগ আমার জেলাতুতো দাদা — বাড়ি নালিকুল। ঘুমোতে ভয়ানক ভালোবাসে। আর মেশিনগান চালানোর মতো আওয়াজ করে নাক ডাকে। তাকে বুঝিয়ে বললাম, বাই চান্স রাজাসাহেব যদি রাতে কথা নাও বলেন, আমাদের হাতে সকালটা থাকবে। গৌতমদা এককথায় বুঝে গেল। ফোন করে দেওয়া হল মাংঘিরামকে। সেবার ইলেকশনে ওঁর গাড়িতেই ঘুরেছিলাম মধ্যপ্রদেশ।
পরদিন বিকেল ৩টে নাগাদ গাড়িতে বসে মাংঘিরাম বললেন, ‘রাঘোগড় প্রায় ১৬০ কিলোমিটার। রাজস্থানের দিকে। রাতে ফিরতে অন্তত দু’টো বাজবে।’ পাত্তা দিলাম না। তিন জন আছি, অসুবিধা কোথায়? যেতে যেতে রাঘোগড় নিয়ে অনেক গল্প শোনালেন মাংঘি। বলছিলেন, দিগ্বিজয় সিংয়ের এক পূর্বপুরুষ রাঘোজির নাম থেকে নাকি ওই কেল্লার নাম হয়েছে রাঘোগড়। ওখান থেকে কিছুটা দূরে আরও একটা কেল্লা আছে — মখসূদনগড়। দুই বংশে নাকি একসময় বিস্তর রক্তারক্তি রয়েছে।
সেটা নভেম্বরের শেষ সপ্তাহ। ওই দিকে বেশ ভালোই ঠান্ডা। ৮টা নাগাদ কেল্লার সামনের একটা বিরাট চাতালে গাড়িটা দাঁড়াল। হালকা কুয়াশায় পুরোনো কেল্লাটা আলো আঁধারিতে খুব অদ্ভুত লাগছিল। কেন্দ্রীয় পুলিশের এক অফিসার এসে জানতে চাইলেন, ‘কলকত্তা সে আয়েঁ হ্যাঁয় আপলোগ?’ তার পর সমাদর করে ভিতরে নিয়ে গেলেন। কিষেনলাল শর্মা আগে অনেকটা করে চা আর চিড়ের পোলাও খাওয়ালেন। খিদে পেয়ে গিয়েছিল। কাঁটায় কাঁটায় সাড়ে ৮টায় দিগ্বিজয় ইন্টারভিউ দিতে ঢুকলেন। যখন আমরা ক্যামেরা গোটাচ্ছি, তখন সাড়ে ন’টা বাজব বাজব করছে। উনি জানতে চাইলেন, ‘আপনারা এখানে কোথায় থাকছেন? এদিকে তো থাকার জায়গা …’ সহজ ভাবে বললাম, ‘আমরা ভোপাল ফিরব।’ উনি বললেন, ‘এত রাতে ভোপাল!’ তার পর আমাদের জাস্ট পাত্তা না দিয়ে শর্মাজিকে বললেন, ‘হি ইজ লাইক মাই সন।’ তার পর অনুমতি নিয়ে ঘর ছাড়লেন।
আমরা কিছু বলার আগেই শর্মাজি হাঁক পাড়লেন, ‘ছাতওয়ালা কামরা খোল দেও।’ কিছুক্ষণ পর রাতের খাওয়া সেরে যখন শর্মাজির সঙ্গে ‘ছাতওয়ালা কামরার’ সামনে এসে দাঁড়ালাম, তখন মনটা আনন্দে উলু দিয়ে উঠল। কেল্লার উপর থেকে গোটা এলাকাটা দেখা যাচ্ছে। ঘন জঙ্গলে ঢাকা চাঁদের আলোয় কেমন যেন রহস্যময়। অনেকটা দূরে একটা কেল্লা চাঁদের আলো আর কুয়াশা মেখে কেমন ঝুপসি হয়ে দাঁড়িয়ে। মাংঘিরামের কথা মনে পড়ল — মখসূদনগড়। নামটা মনে হয় বলে ফেলেছিলাম। শর্মাজি বললেন, ‘ঠিক বলেছেন ওটাই।’ ঘর খুলে আমাদের সব দেখিয়ে দিয়ে চলে যাওয়ার আগে বললেন, ‘ঘরের সঙ্গেই টয়লেট আছে। রাতে ঘর থেকে বেরোনর দরকার নেই।’ ঘরের দু’কোণে রাখা আবলুশ কাঠের দুটো শিব আর গণেশের মূর্তির দিকে দেখতে দেখতে শর্মাজির কথা মনেই রইল না।’
দান্তেওয়াড়ার চায়ের দোকানই হোক বা রাঘোগড় কেল্লা, গৌতমদার টাইমিং ভিভিএস লক্ষ্মণের চেয়েও ভালো। বালিশে মাথা দিয়েই ঘুম। আর কনসিস্টেন্সি? সেটাও ব্র্যাডম্যানের মতো — ঘুম মানেই নাকের মেশিনগান চালু। আমার সমস্যা হল, ঘুম না এলে প্যাট প্যাট করে চেয়ে থাকি আর নানা রকম আটপাট ভাবি। সেদিনও তাই হচ্ছিল। পুরোনো কেল্লা … কত মারপিট হয়েছে … এটা কি ক্ষুধিত পাষাণ হতে পারে? … দিগ্বিজয়ের ভাই লক্ষ্মণ সিংও এখানেই থাকেন শুনলাম … একজন কংগ্রেস, অন্য জন বিজেপি, ঝগড়া হয় কি না কে জানে … ১২টা বাজল মনে হয়, ভারি মিষ্টি একটা ঘড়ির আওয়াজ আসছে দূর থেকে … ঘরের আলোটা কি কমে গেল? কমবে কী করে? ওটা তো চাঁদের আলো … কাচের জানলা দিয়ে ঢুকছে … তবে কি কেউ জানলার সামনে এল? কিছু না ভেবেই চোখটা জানলার ওপর পড়ল। মনে হল কী একটা সরে গেল সট করে। লেপটা সরিয়ে পা টিপে টিপে বিছানা থেকে নেমে জ্যাকেটটা গলিয়ে নিয়ে ফট করে দরজাটা খুলেই বাঁ দিকে তাকালাম।
না, ভুল দেখিনি। সাদা একটা পোশাকের অংশ দেওয়ালের বাঁ দিকে সরে গেল। শুধু তা-ই নয়, সঙ্গে হালকা একটা আওয়াজও পেয়েছি। ধাতব শব্দ। গয়না বা ওই জাতীয় কিছুর রিনিঝিনি শব্দ। রাতের বেলা ঘরে উঁকি মারছে! কে ইনি? কয়েক পা এগিয়ে দেওয়ালের ওপাশটায় ঘোরার আগে একবার নিজে থেকেই ঘাড়টা ঘুরে গেল মখসূদনগড় কেল্লার দিকে। তেমনি নিঃঝুম, একা দাঁড়িয়ে। বাঁকটা ঘুরেই কয়েক হাত দূরে দেখলাম দাঁড়িয়ে এক অবয়ব। মহিলার অবয়ব। সাদা পোশাক, মুখ বোঝা যায় না। মাথা ওড়নায় ঢাকা। বিনুনিটা ডান দিকের কাঁধের উপর দিয়ে সামনে কোমর পর্যন্ত এসেছে। একবার ওড়নাটা ঠিক করে নিলেন। ফের টুংটাং আওয়াজটা শুনতে পেলাম। ডান হাতে একটা আংটি চাঁদের আলোতেও ঝলমল করে উঠল। হালকা একটু হাওয়া দিল। জুঁই ফুলের গন্ধে ছাদটা ভরে গেল। এত মোলায়েম অথচ ঝিম ধরানো গন্ধ জীবনে কখনও নাকে আসেনি।
প্রবল ঝাঁকুনিতে সম্বিত ফিরল। সঙ্গে গৌতম দা’র ধমক, ‘এত রাতে এখানে দাঁড়িয়ে আছ কেন? এ বাবা গা-হাত-পা তো ঠান্ডা কনকন করছে। শরীর খারাপ হয়ে যাবে তো!’ এই বলে হিড় হিড় করে টেনে আমাকে ঘরে নিয়ে গেল গৌতম দা। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলাম, পিছনে কেউ নেই। একেবারে ভোম্বল হয়ে গেলুম!
সকালে যখন ঘুম ভাঙল তার কিছুটা আগেই দিগ্বিজয় সিং বেরিয়ে গিয়েছেন। নীচে নামার আগে ছাদের ওই জায়গায় গিয়েছিলাম। অস্বাভাবিক কিছুই পাইনি। আলসের ওপারে খাদ পর্যন্ত দেওয়াল নেমে গিয়েছে। ব্রেকফাস্ট টেবিলে বসে সোজা কথার কিষেনলাল শর্মা সরাসরি আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘কাল বারন করা সত্ত্বেও আপনি ছাদে বেরিয়েছিলেন কেন?’ আমি বললাম, ‘কে বলেছে?’ উনি বললেন, ‘যে-ই বলুক। খবর পেয়েছি।’ আমি মুখের উপর বললাম, ‘এক মহিলা যখন ঘরের জানলা দিয়ে উঁকি মারছিলেন, তখন আপনার লোক কী করছিল?’ উনি হতভম্ব হয়ে বললেন, ‘মহিলা!’ আমি জোর গলায় বললাম, ‘হ্যাঁ, জুঁই ফুলের আতর মেখেছিলেন। খুঁজলেই পাবেন। আতরের গন্ধ তো কয়েক ঘণ্টায় উবে যাবে না।’
শর্মাজি স্তম্ভিত হয়ে এক বহু পুরোনো কাজের লোকের দিকে তাকালেন। উনি আগের দিন রাতেও ছিলেন। দু’জনেই একসঙ্গে ‘শিব শিব’ বলে উঠলেন। শর্মাজি আমাকে সোজা ঠাকুরঘরে টেনে নিয়ে গিয়ে মাথায় ফুল-বেলপাতা ছুঁইয়ে একটা রুদ্রাক্ষ দিলেন। বললেন, ‘এই রুদ্রাক্ষটা সব সময় সঙ্গে রেখ। আর কখনও এমন করো না কোথাও। কাল খুব জোর বেঁচে গেছ।’
গাড়িতে ফেরার সময় মাংঘিরাম অন্তত পাঁচ জায়গায় শিব মন্দিরে গাড়ি থামিয়ে আমাকে নামিয়ে প্রণাম করিয়েছিলেন। কিন্তু কেউই বলেননি আমি কী দেখেছিলাম। বলেছিলেন, ‘পুরোনো বাড়ি, কত খুনোখুনি, আত্মহত্যা, বিষ খাওয়ানো কত কী আছে। না জানলেও চলবে।’
জানতেও পারিনি। তবে ওই গন্ধটা মনে থেকে গিয়েছে। মোলায়েম অথচ ঝিম ধরানো গন্ধ। সেটার ঝলক তিন ঘণ্টা পলকের মধ্যে পার করিয়ে দিয়েছিল। এখনও বিজয়ার দিন সন্ধেয় প্রতি বছর শর্মাজি ফোন করেন। রুদ্রাক্ষটা সব সময় সঙ্গে রাখার কথা মনে করিয়ে দিতে ভোলেন না। জুঁই-গন্ধী আতরের কথা তুললেই ফোনটা কেটে দেন — কেন জানি না।