তখন আমি ছোট তাই আমার বাড়ির বড়দের কাছে শোনা তারা সবই জানতেন,তখন নাকি একবার বড় বন্যা হয়েছিল ,আমার জন্ম হয়নি ।
ওই টুকির মা নাকি ওই বছর পোয়াতি হয়েছিল। ওখানে ভজন কুটিরের রুক্মিণী নামে এক সাধিকা ছিলেন তার জরিবুটি কি সব ওষুধ খেয়েই নাকি হয়েছে।
এক্বেবারে ধন্বন্তরী বিদ্যে তার !!
যাক বড় বন্যার সময় তার একটা সুন্দর ছেলে হল ।খুব ভালো কথা যাক বাপু বাজা নামটা তো ঘুচলো। এদিকে বন্যার জল ঠেঙিয়ে তারা শহরের ভাড়া বাড়িতে উঠল আর তার মা অসুস্থ হয়ে পড়লো কারন তার শরীরে তো তখন সেই ভাবে ওষুধ পড়েনি ,আর মানষিক ,শারীরিক অত্যাচারেই হোক তার মাথার নাকি গন্ডগোল শুরু হয় ,তাই, দেখে সব বলল ও পাগল হয়েছে ।
এখানে একটা কথা বলি অনেক দিন পর যদি বাচ্চা হয় আর তার শরীরে যদি,খাওয়া ঘুম, সঠিক পরিমাণে আয়রন,প্রোটিন, নিউট্রিন না পড়ে সে সুস্থ কি করে থাকবে !!
তার শরীরে হিমোগ্লোবিন যদি কমে যায় তাহলে সর্দি গরমি তো হবে তা আবার তার শিশুর ওপর পড়বে ।যেমনি কথা অমনি ছেলের হল তাই তার বুকে শ্লেষা বসে তার অবস্থা ও খারাপ।
কি করে এদিকে প্রসব হয়েছে দাইয়ের কাছে ,তাই তার নাড়ীর যন্ত্রনা শুরু হল …….
ওষুধ কেউ দেয় না ,শাশুড়ি বলছে, হুঁ আমরা বাপের কালে ওষুধ খাইনি লো আতুকি !
মা হওয়া মুখের কথা নয় অনেক সহ্য করতে হয় ,সে তো কেঁদেই চলেছে ……
এর মধ্যে তার স্বামী যাই হোক ওষুধ এনে দিয়েছিল দয়া করে এটাই বেশী, তা দেখে শাউড়ির কত কথা বাবা ..!
তার মাথার ব্যামো বেড়ে চলল ,এসব দেখে তার দেওর তাকে মেরেছিল ,সেকি মার গো!!!
সবাই বলছে এই ছেড়েদে কাঁচা পোয়াতির মা হিতে বিপরীত হয়ে যাবে ,তখন ওখান কার এক ডাক্তার দেখাতে বাধ্য হলো ,সে তাকে ভালো করলো …
আর কি ছেলে মানুষ করে আবার সংসার ঠেলে আর পান থেকে চুন খসলেই দেওর ননদের কত কথা। এর এক দেড় বছর অন্তর সে পোয়াতি হয় আর মেয়ে হল আবার পর পর আরো তিন মেয়ে হয়ে গেল ।ছেলে হবে এই আশায় ছিল ,ছেলে হল গে বংশের প্রদীপ ওই শিব ঠাকুরের সলতে …. এভাবেই ছেলে হল ঠিকই কিন্তু প্রসব করার পর মরা বাচ্চা!!!! ।
সে শোক সামলাতেই তো এতগুলো মেয়ে সন্তান হল।
তার জন্য ও বলতো এত জন্মানোর কি দরকার সাবধানে থাকতে পারোনে ..!!
তা বলি জন্ম কি তার একার দ্বারা হচ্ছে বাপু তোমার গুণধর ছেলে কি সন্ন্যাসী নাকি?
সারাদিন খেটেখুটে শান্তিতে যে ঘুমোবে তাও তো ছিল না !
কাঁচা পোয়াতির শরীরটা যে সে নিংরে খেত ,তাতে তার কি দোষ !
এমন কি ঋতুস্রাব অবস্থায় ছাড়তো না !
মানুষ না পশু !!
দেবতার বরে তো আর ঘন ঘন বাচ্চা বিয়োচ্ছে না যতসব..!!
এই করেই তার চার মেয়ে মধ্যবিত্তের সংসার ।
তার স্বামী ভাই বোন বলতে অজ্ঞান ,তাই রোজগারের বেশিরভাগ দিয়েই বোনদেরকে বিঁয়ে দিলে ।তারা সব ভালো ঘর বর পেয়ে একবারে জাতে উঠেছে তাই এখেনে এসে তাদের পোষায় না ।
কেউ আবার কপাল গুনে তখনকার দিনে বড় ইঞ্জিনিয়ার তার দেমাক ছিল বাপু…. !!!একে একে সব বিঁয়ে হল ননদ ,দেওর সবার …।
ছোট মেয়ে হবার পর তার ছোট দেওর আর শাউড়ি তার নাতিকে (ছেলেকে)নিয়ে
গেল শহরের ভাড়া বাড়িতে। এই গ্ৰামে লেখা পড়া হবেনা তাই মায়ের কাছ থেকে ছেলেকে আলাদা ….স্বাভাবিক মায়ের প্রতি টান কমবেই তাকে আর দোষ দিয়ে কি লাভ !
তাকেও তার কাকার হুকুম মেনেই চলতে হয়েছে এই করে সব বড় হল ।তার ছোট কাকিমা ভালো মানুষ ছিলেন, ভাইপোকে ভালো বাসতেন ।তার কাকাও তার স্ত্রীর সঙ্গে ভালো ব্যবহার করতো না ,আরে বাবা বংশের দোষ যাবে কোথায় !!
তার ওপর চলতো মারধর এই আর কি….
এদিকে চার মেয়ে নিয়ে বড় বৌ তার চলতো খুব কষ্টে ,মেয়েদের লেখা পড়া ঠিক মতো মাষ্টারের মাইনে দেওয়া নিয়ে খুব চাপ।
তাই বাজারে স্বামীর তরকারীর ব্যবসা ছিল। এবার বাড়িতে আনলো গরু তাই এবার তিনি ও গরুর সেবা করেন ,আর বাজারে তরকারীর ব্যবসার তরকারি আনতো গরু কে খাওয়াতে আর সেখান থেকে বড়বৌ পাড়ার লোকের কাছে বিক্রি করতো তা দিয়ে মাষ্টারের মাইনে দিত ,গরুর দুধ বিক্রি করতো আর ঠ্যালা সামলাতে হোত টুকি কে, দুধ মেপে নিয়ে যেতে হতো এবাড়ি ও বাড়ি আবার কাছের মানুষরা বাড়িতে এসে নিয়েও যেত।
স্বামীর ব্যবসা যে খারাপ ছিল তা নয় কিন্ত হ্যাঁ এই খানেই আসল কথা তা খেত অন্য জনে ।
ওইই যে বলেছিলাম কলপাড়ে ফিসফিসিয়ে কথা কইছিল সেটা হল এই কথাবার্তা ।
স্বামীর ছিল এক রক্ষিতা…. আবার কেউ কেউ তো বলে আর একজন আচে ,তার নাকি বেটা আচে তা ওনারই জম্ম দেওয়া ..!!
তাই পয়সা সব চলে যেত অন্যের কাছে ।
রোজ সেখেনে যাতায়াত ছিল তার —- কথায় আচে না ,”ঘরে তার শাক সেধেনা দত্ত বাবু তাও বোঝেনা “,…স্বভাব যায় না মোলে ,আর কয়লা যায় না ধুলে ……!
এদিকে তার মা এতদিন সংসারের ঘা খেয়ে তার ওপর স্বামীর ওই স্বভাব তাই কেমন যেন খ্যাপাটে মতো হয়ে গেল ।
মেয়েগুলো কে দিয়ে কি না করাতো ,সেই কোথায় কাঠের করাত কল ,সেখান থেকে কাঠের গুড়ো আনাতো ,তা দিয়ে কয়লার গুড়োতে তা মিশিয়ে গুল দিতে হতো মেয়েদের ,না করলেই সে রণকান্ড বাঁধাতো !!
গরুর জন্য বিচুলি কিনতে পাঠাতো ,তা আবার কোমরে করে নিয়ে আসতে হতো ,মেয়ে তো বড় হয়েছে লজ্জা পায় —বললে বলতো দেখগে ওপাড়ার গৌরী সব করে আবার প্রাইমারি ইস্কুলে চাকরি করে ,ভাইয়ের মুদিখানা দোকান সামলায়।
তুমি কোন জমিদারের বেটি ?
কিছু কইলে চুলের মুটি ধরে মারতো ……
তেনার আবার এক চোখি বড়টার আগেই বে হয়েছিল মেজ মেয়েকে খুব সুন্দর বলতো ,তাই সে তাকে তার পছন্দ মতো জামা করার টাকা দিত ওই শহরের ভালো টেলার্সের থেকে বানাতো ম্যাগাজিন থেকে ডিজাইন দিয়ে ।তাকে সবাই বলতো বাবা তোমার এ মেয়ে কত সুন্দর রাজপুত্তুরই
নিয়ে যাবে ।
সত্যিই তাকে রাজপুত্র নিয়ে গেল গো …
শুনেছি তারা নাকি হাই স্ট্যাটসের নোক ,বাবা পণ ও নিয়ে ছিল তা ভালো, ভালো থাকাই তো ভালো বাপু ।সেজ মেয়ে সে ষোল বছর বয়সেই নিখোঁজ পরে জানা গেছে এসবের জন্য কার সাথে ভাব- ভালোবাসা হয়েছিল তার সাথে পালিয়ে গিয়ে বিঁয়ে করেছে ।কিন্ত তার খোঁজ কেউ রাখেনা উপরন্ত বাড়ির উঠোনে গোবর-গঙ্গা ছেটা দিয়ে বলে ও মেয়ে মরে গেছে।
ছোট মেয়ের ওপর এবার কোপ পড়লো ,তাকে তো সবসময় কালো কপাল বড় ,তোকে ওসব মানাবে না ,চুড়িদার পড়লে ঠেঙোদের মত লাগবে এসব কথা ….
সে মন খারাপ করতো কি আর করে তাকে কে আর ধন্যি ধন্যি
করবে বাপু !!
তার রূপ ও নেই গুন ও নেই ।
যা কাঁটানুটে গাছ কেটে নিয়ে আয় ।
সে ঝুড়ি নিয়ে হাত দা নিয়ে ওগুলো কেটে নিয়ে আসতো,পুজো করতো ,বাপ ও সময়ে খেকিয়ে উঠতো ..
কেউ ভালোবাসতো না ।এই করেই বড় হওয়া ..
তার দাদা ও মেজ বোন কেই ভালবাসতো ..
সুন্দর হলেই বুঝি সবাই ভালো বাসে–তার দিকে চায়….
ওপরে সুন্দর হলেই কি সব ,তার মনটা কেউ দেখে না ,যার আত্মা সুন্দর,মন সুন্দর ,যে দয়াবান সেই তো সুন্দর …..আরে বাপু ওপরে সুন্দর ভেতরে কূটবুদ্ধি ,অপরের জিনিস দেখে হিংসে ,নিজের প্রশংসা ঢেলে করা এগুলোকে সুন্দর বলে!! জানিনে বাপু আমি তো অতদূর নেখাপড়া শিখিনে, মুখ্যুসুখ্যু মেয়ে মানুষ ,তাই আমার স্ট্যাটাস ও নেই …
সব কথা মনে পড়লে এখন ইতিহাস ।
সেই মেয়েটা এখন কোথায় আছে কে জানে?
রামায়ণ, মহাভারত, দেবতা বলো সব জায়গায় কূটনীতিক চাল ।
তাই সংসারে ও আছে এই একই জিনিস কারো ভালো কেউ দেখতে পারেনে —একটা কথা আছে যেচে কারো ভালো করতে যেও না ,
তাতে তোমার কেউ ভালো করবে না —
উপকার নিয়ে পরে তোমার পেছনেই নিন্দে করছে .. ।স্বয়ং শ্রীরামকৃষ্ণ দেব বলে গেছেন যারা তোর মনে ব্যথা দেবে ,তার দ্বিগুণ ব্যথা পাবে তখন কেউ পাশে থাকবে না ,ওরে আত্মা কে কষ্ট যে দেয় জানবি তার আত্মার শান্তি পাবে না ,কর্মের ফল যে ভোগ করতেই হয় এযুগের কর্মের ফল এযুগেই রে …
আসি তার মায়ের কথায় বলে অমুকের বিঁয়ে হল শ্বশুর বাড়ি থেকে সব দিয়ে নিয়ে গেল ।
তার বর মাকে দেখে আমার কপালে কি সেই সৌভাগ্য আছে…
একজন তো বলল বিঁয়ে দেবে গো ওই যে সোনার দোকানের কি নাম যেন কালো করে বেটে ছোরাটা ,তবে লেখা পড়া জানেনা তেমন ,তা আপনার মেয়ের তো লেখা পড়া বেশী ,তা বলি লেখা পড়া দিয়ে জল খাবে শুনি !!
সেই তো হেঁসেল ঠেলতে হবে ,আর ও নিজে থেকে বিঁয়ে করতে চেয়েছে কিছু দিতে হবেনা ,তবে শুনেছি বাপের দুই বিঁয়ে আর ও যার ছেলে সে প্রসকোয়ার্টারের মেয়ে মানুষ ।
তাকেই তার বাপ বিঁয়ে করে ঘরে তুলে ছিল।দে….খো তোমার মেয়ে কি বলে ?
তার তো এখন দেমাক আছে , এতে তোমার উপকারই হবে কারন তোমাকে টাকা পয়সা সব দেবে গো বাড়িটাও দোতলা করে দেবে ।
তোমার স্বামীর তো এখন কোন ক্ষমতা নেই ,ভালোই হবে ..