সাপ্তাহিক ধারাবাহিক কথা সাগরে যুথিকা সাহা (গল্প – পর্ব ১)
দাসী
[আমার সেই ছেলেবেলার চোখে দেখা বাস্তব জীবনের ঘটনা যা আজও মনকে নাড়া দেয় ,তাই তার দুকথা গুছিয়ে নিয়ে কলমে তুলে ধরলাম ধারাবাহিক গল্পে…..]
তখন গরম কাল ,ইস্কুলে ছুটি পড়েছে তাই আমরা জুটি বেঁধে বকুল গাছের তলায় বসে মাটি দিয়ে গড়া পুতুল নিয়ে খেলছিলাম, পাশেই কলপাড় সেখানে সবাই জল নিতে এয়েছেন। গ্ৰামের মাসী দিদা ,কল্পনার মা আরো অনেকেই, তারা যেন ফিসফিস করে কি কইছিলেন …..
আমরা তখন খেলায় মত্ত ছিলাম ,আমরা বললাম এই পুতুলের বিঁয়ে দিবি ,সবাই রাজী দুভাগ হয়ে বললাম ,তোরা বর পক্ষ আর আমরা মেয়ে পক্ষ …
একজন বলল দেখ বর পক্ষ আমরা আমাদের কিন্তু পণ দিতে হবে ,নইলে ছেলের বিঁয়ে দেবোনা,আমি বললাম সে আবার কি কথা!!
পুতুল তো আমাদের এক জায়গাতেই থাকবে ,তাতে আবার এসব কি?
বলল না বিঁয়ে হয়ে গেলে সব আমি নিয়ে যাবো আর আমি যখন যেদিন বলব আবার খেলা ।
আমি বললাম সে আবার কি এটা তো এমনি খেলব ,খেলা শেষ হলে আবার গুছিয়ে রাখবো। ওরা বলল দেখিস না বিঁয়ে হয়ে গেলে মেয়ে শ্বশুর বাড়ির কথা ছাড়া চলতে পারে না ,এমনকি সে কি খাবে তাও ওরা ঠিক করে দেয় ,আর শাশুড়ি যা বলে তাই করতে হয় ,কারো সাথে কথা কইতে পারবে না ।
পুরুষ মানুষ কে মুখ দেখাবে না ,এত্তো বড়ো ঘোমটা দিয়ে থাকতে হবে তুই জানিস না?
আমাদের ঠাকুমা এসব করে আমার মার সাথে ,আর আমার মায়ের তিন মেয়ে বলে কত কথা শোনায় রে বুড়ি।
এগুলো আমার বাড়ির মানুষের কথা সই ,আমার কথায় রাগ করিস না কেমন …
আমি বললাম তুই তো কখনও বলিস নি ।
না মা বলতে মানা করেছে পাঁচজন জানলে ঠাকুমার কানে গেলে বাবাকে বলবে ,আর মায়ের ওপর অত্যাচার চালাবে রে ..বলে কাঁদতে লাগল ..
আমি তখন সব পুতুল ছুঁড়ে দিয়ে বললাম—–ধোর পুতুল টুতুল আর খেলব না। ছেলেদের মতো খেলবো ,ছেলেরা যা করে আমরাও তাই করবো দেখি তো কে কি করে চল তো!!
ওবলল ওরে করিসনা আমার ঠাকুমা কে চিনিস না ,জানলে আর আমি খেলতে আসতে পারবো নারে ..
আর হ্যাঁ কাল থেকে আমি এমনিতেই কদিন খেলতে আসতে পারবো না—-বলে জড়িয়ে ধরে বললো তোরা মণিমেলায় গিয়ে খেলবি তাই না বল ?
কি মজা তোদের বলেই ওর চোখ দুটো ছল ছল করে উঠল …
আমি বললাম নারে ধুর আমরাও খেলতে যাবো না ,বাড়িতে বসে মায়ের কাছে অনেক প্রশ্ম করবো আমার অনেক কিছুই জানার আছে ।
তখন সবাই বলল আমরাও বাড়িতে থাকবো।আচ্ছা কেন আসবি না সেটা বললি না যে বড় ?
ও আমার মেজ কাকা,কাকিমা, দাদা আর বোন আসবে ,দুমকা থেকে ,বাবা বলে কাকা নাকি বড় চাকরী করে, আর দাদা বোন ইংলিশ ইস্কুলে পড়ে ,আর ওরা ইংরাজী তে কথা বলতে পারে ।
আমি বললাম তাতে কি ওদের ওখানে ওসব আছে ,আমাদের নেই কি হবে ,তাই বাব্বা!!
বাঘ না ভাল্লুক যে ওরা তো মানুষ রে বাবা !!
জানিস তো ওরা এলে আমাদের খুব যতন করতে হয় একটু কম হলে বাবা তো বকেই আরো বলে দেখ ওরা কত ইংরেজি জানে ,কত ইস্মার্ট তোর মতো?
খালি গান্ডে পিন্ডে গিলিয়েই মরলাম !!
এখন গরমের দিন ওদের পাখা দিয়ে বাতাস করবি আর মাকে বকে বলতো শিক্ষা তো দিলে না!
শুনে বললাম ভালোই হলো আমরা যাবো তোদের বাড়ি দেখতে তোর দাদা,বোন,কাকিমা কে কেমন ;
ও ভয়ে বলল যাবি !!কিন্ত …কিন্ত জানিনা দেখবো আর যাবোই …
ও বাড়ি চলে গেল ।
পরদিন আমরা সবাই গিয়ে ওদের বাড়ি গিয়ে দেখলাম ও পাত কুয়ো থেকে বড় বড় লোহার বাল্টিতে জল ভরছে দড়ি দিয়ে একটা লোহার বাল্টি বাঁধা সেটাকে নীচে কুয়োর মধ্যে ফেলছে আর সমানে জল তুলছে ।ওর বাবা বারান্দায় নীচে বসা আর একজন চেয়ারে ,তখন বুঝলাম ওটা ওর কাকা ,ওর বাবা আমাদের দেখে বলল ,এই তোরা কি করতে এসেছিস?
ও এখন তোদের সাথে যাবে না ।
উনি নাকি ভাই অন্ত প্রান ,ছেলে মেয়েদের থেকেও তাদের বেশি ভালোবাসে ,ওদিক থেকে ওর কাকিমা বললো, এই টুকি আমায় আর এক বালতি জল দিয়ে যা ?
ও একখানা বড় লোহার বালতি ভরতি জল নিয়ে দিতে যাচ্ছে দেখলাম ওটা ওর নিতে কষ্ট হচ্ছ ওই টুকু মেয়ে আর পারে !
জল দিয়ে এসে ও যেন হাঁপাচ্ছিল ,দেখে খুব কষ্ট হচ্ছিল ।এর মধ্যে ওর বাবা মাকে বলল, তোমার রান্না হল ওরা টাইমে খায় ,এই রান্না করতে দিন কাটিয়ে দিচ্ছো!
ওর বোন ঘর থেকে বেড়িয়ে বলল জেঠু এখানে খুব গরম পারছি না উফ্ বাব্বা !!
ওর বাবা তখন আর এক মেয়ে ওর দিদি কে ডাকল ,সে সব খাবারের আসন জলের জোগাড় করছিল ,বললো এই পাখা দিয়ে বাতাস কর এদিকে আয়। এর মধ্যে ওর কাকিমা চান করে বেরিয়ে বলল বাবা বড়দি তোমাদের এখানে চানের খুব কষ্ট!!!
ও তো কতক্ষন পর এক বালতি করে জল দিচ্ছে একটু কাজ কর্ম শেখাতে পারোনি!
ওদের পড়াশুনা করিয়ে কি হবে আর সেই বিঁয়ে দেবার সময় আমাদের কাছে হাত পাতবে ,এই অজ পাড়াগাঁয় তোমার ঐ কেলো মেয়েকে কোন রাজপুত্র আসবে শুনি ,সেগুড়ে বালি এই বললুম …।
এখানে কত তাঁত টাত বোনা ছেলে দেখেই দিও। তোমাদের কি সেই সামর্থ্য আছে আর না স্ট্যাটাস আছে যে ভালো লোক আসবে ,যে যেরকম তার সেটাই করা উচিৎ।
তোমার তো আবার আকাশ ছোঁয়া স্বপ্ন দেখা …
তাও আবার তিন খানা মেয়ে !!
ওকে বলল এই আমার কাপড় তোয়ালে কেচে মেলে দিবি ।
এরপর খাওয়া শুরু একজন বাতাস করে ,আর ওর বাবা তদারকি করছে, ওর মাকে বলছে এই বড় মাছ দাও ,মাথাটা তপতী কে দাও মানে ওর কাকিমা, সমর কে দুটো দাও ,বাবু কে দাও ,মনিকে দাও সে মানে দেবতা ভোজন বাপরে !!!
আমরা পাশের বাড়ি বুলিদের জানলা থেকে দেখছিলাম ..ওর মা তো সারাদিন শুধু খাটছেন ,এবলছে কফি দাও ,অমুক তমুক বাব্বা বাব্বা ..!
এর মধ্যে গোপালের মা এসে বলল কি গো তোমার দেবররা এসেছে ?
ওর বাবা গোপালের মাকে কিছু বলতো না ,একটু সম্মান করতো ।
আসুন দিদি ,হ্যাঁ দেখতে এলাম ওনার ছেলে কলকাতায় থাকে তার পয়সা করি আছে ,আবার ধর্ম মেয়ে আছে সে চাকরী করে ,তাই তাকে একটু খাতির …
ওকে দেখে বলল বড় বৌ এতটুকু মেয়েকে দিয়ে জল তোলাচ্ছ আর ওদের কাপড় কাচাচ্ছো ,ঈস!! হাতটা যে লাল হয়ে গেছে শোন বুড়োর বাবা এটা ঠিক নয় ।
তুমি আর বলোনা এতদূর থেকে ওরা এয়েছে ওদের টা করবে না বলো কি তুমি ?..
ওর কাকিমা বললো আপনি আর মাথায় তুলেন না !
কি করবে চাকরী? সে মু্রোদ আছে ,এই গ্ৰামে সব তাঁত বোনা মানুষ ওর কি ওদের মতো পাত্র ছাড়া জুটবে ,সেখানে করতে হবে না ।
আপনি কি বিঁয়ের দায়িত্ব নেবেন ,সেই ভাসুর আমার কর্তার ঘাড় ভাঙবে ,আমি বাপু একজনের বেলায় হয়তো কিছু দেবো ,আর গুলোর কথা বলতে পারবো না ।যেমন ভাগ্য করে এসেছে তেমন হবে ,আমার মেয়ের সঙ্গে ওদের তুলনা হয় ..!
বড় হয়ে শুনেছি ওর মার বিঁয়ের প্রায় অনেক দিন পর ওর দাদা হয়েছে ,তার জন্য ওর ঠাকুমা কথা শোনাতো আটখুঁড়ো,বাজা মেয়ে মানুষ ,তার ঘাড়ের ওপর দেওর ,ননদ সবার দেখভাল করা ,বাসন মাজা,রান্না করা আরো কত কাজ ,মাঝে মাঝে ওর বাবা কাকারা ওর মাকে অকথ্য ভাষায় গাল দিতো মারধোর করতো ,মুখ বুজে সব সইতো বেচারী ,তার বাপের বাড়ি বলতে বিধবা মা আর এক বোন …কেউ ছিলো না বলেই হয়তো এই দুর্গতি …..