গারো পাহাড়ের গদ্যে জিয়াউল হক

বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ মজিবুর রহমান
বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ মজিবুর রহমান, এফ.এফ. এফ.এফ.নম্বর-৫১২২, ভারতীয় তালিকা নম্বর-৩৫৮৮৪, বেসামরিক গেজেট নম্বর-সুজানগর-১৭৮৭, লাল মুক্তিবার্তা নম্বর-০৩১১০৬০১৯২,এমআইএস নম্বর-০১৭৬০০০০৮৮৬, মোবাইল নম্বর-০১৫৫২৪৮৪৫৫১, পিতা ঃ গাদু মোল্লা, মাতা ঃ শলকজান, স্থায়ী ঠিকানা ঃ গ্রাম ঃ মোহনপুর, ডাকঘর ঃ নাজিরগঞ্জ, উপজেলা ঃ সুজানগর, জেলা ঃ পাবনা। বর্তমান ঠিকানা ঃ বাসা নম্বর-৩৮৩, দক্ষিণ পাইকপাড়া, আল আমিন রোড, কল্যাণপুর, থানা ঃ মিরপুর, ঢাকা-১২১৬।
বীর মুক্তিযোদ্ধা মজিবুর রহমান ১৯৭১ সালে মাধ্যমিক পরীক্ষা দেওয়ার প্রস্তুতি গ্রহণ করছিলেন। কিন্তু পরীক্ষা শুরুর আগেই ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে শুরু হয়ে যায় বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতাযুদ্ধ। মজিবুর রহমান তখন খাতা কলম ফেলে হাতে তুলে নেন রাইফেল। ঝাঁপিয়ে পড়ে মুক্তিযুদ্ধে। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানের জনসভায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার ভাষণে এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম উল্লেখ করার পর থেকেই সারা বাংলাদেশের মানুষ মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি শুরু করে দেন। ২৫ মার্চের কাল রাতে পাকিস্তানি সেনারা সারা বাংলাদেশসহ পাবনা শহরে ক্যাম্প স্থাপন করে মানুষ হত্যা শুরু করে। জেলা প্রশাসক জনাব নূরুল কাদের খানের নেতৃত্বে এলাকার বিপ্লবী জনতা পাবনায় আগত সকল শত্রুসেনাদের হত্যা করে শহরকে শত্রুমুক্ত করেন। এপ্রিল মাসের ১০ তারিখে ঢাকা থেকে আরিচা নগরবাড়ি হয়ে হানাদার সেনারা পাবনার দিকে অগ্রসর হলে তাদের প্রতিরোধের জন্য ইপিআর, পুলিশ ও সাধারণ জনতার সাথে মজিবুর রহমানও নগরবাড়ি ঘাটের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। কিন্তু শত্রুদের মর্টারের গোলা ও হেলিকপ্টার থেকে মেসিনগানের গুলিবর্ষনের মুখে তারা সকলে ছত্রভঙ্গ হয়ে গেলে সেদিনই হায়েনারা আবার পাবনা শহরের দখল গ্রহণ করে। তারপর শুরু হয় তাদের অমানুষিক নির্যাতন আর মানুষহত্যা।
দেশের এহেন উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যে মে মাসের শুরুর দিকে মজিবুর রহমান শরনাথর্ীদের নৌকায় করে কুষ্টিয়া হয়ে ভারতের নদীয়া জেলার কেচুয়াডাঙ্গা ইয়ুথ ক্যাম্পে গিয়ে আশ্রয় গ্রহণ করেন। সেখানে বেশ কিছু দিন অবস্থান করার পর ৩০/৪০ জন যুবকের সাথে মজিবুর রহমানকেও মুক্তিযুদ্ধের উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য বিহারের চাকুলিয়া প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে প্রেরণ করা হয়। সেখানে ৩০ দিন প্রশিক্ষণ শেষে ৭ নম্বর সেক্টর হেডকোয়ার্টার তরঙ্গপুর এনে মকবুল হোসেন সন্টুরে নেতৃত্বে ৪০ জন মুক্তিযোদ্ধার একটা গ্রুপ গঠন করে তাদের অস্ত্র ও গোলাবারুদ প্রদান করা হয়। তারপর তাদের গ্রুপকে বহরমপুর বিএসএফ ক্যাম্পের পাশের ধূলাউড়ি গ্রামে রাখা হয়। সেখান থেকে গ্রুপ কমান্ডার মকবুল হোসেন সন্টুর নেতৃত্বে তারা রাজশাহী সীমান্ত অ লে বেশ কয়েকটি অপারেশন পরিচালনা করেন। তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে রাজশাহী-চাপাইনবাবগঞ্জ রেল লাইনের শিতলাই রেল ব্রিজকে এক্সপ্লোজিভ দিয়ে উড়িয়ে দেওয়া ও রাজশাহী কাটাখালি পাওয়ার স্টেশনে ৩ইঞ্জি মটার্রের গোলা নিক্ষেপ করে একেবারে ধ্বংস করে দেওয়া। শিতলাই রেল ব্রিজ ধ্বংস করার পর যেমন রাজশাহী নবাবগঞ্জের মধ্যে রেল চলাচল বন্ধ হয়ে যায়, তেমনি ২৬টা মর্টারের গোলা নিক্ষেপ করে কাটাখালি পাওয়ার স্টেশন ধ্বংস করার ফলে রাজশাহী অ লের বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। কাটাখালি বিদ্যুৎ সরবরাহ স্টেশন ধ্বংস করার পরই মকবুল হোসেন সন্টুর নেতৃত্বে মজিবুর রহমানদের মুক্তিযোদ্ধা গ্রুপকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রেরণ করা হয়। বাংলাদেশের ভেতরে এসে তারা পাবনা জেলার সুজানগর থানার নাজিরগঞ্জে সেল্টার গ্রহণ করেন।
নাজিরগঞ্জে পাকিস্তানি বাহিনীর ফেরি– ধ্বংস ও অস্ত্র উদ্ধার ঃ ২৪ অক্টোবরের ঘটনা। সুজানগর থানা আক্রমণের পরিকল্পনাই তখন মুক্তিযোদ্ধাদের মনের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছিল। এরই মধ্যে পাহারারত মুক্তিযোদ্ধাদের একজন এসে খবর দিল দূর থেকে ফেরির আঙয়াজ শোনা যাচ্ছে। মনে হচ্ছে শত্রুসেনারা আসছে। এই খবর পেয়ে সাধারণ জনগণ ভয়ে পালানো শুরু করলো। আর মজিবুরসহ ৩০ জন মুক্তিযোদ্ধা শুরু করলো শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার প্রস্তুতি। পদ্মা নদীর মূল স্রোত তখন নাজিরগঞ্জ বাজারের পাড় ঘেসে প্রবাহিত হচ্ছিল। মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে ৬টি এলএমজি, বাকিদের হাতে এসএলআর ও রাইফেল। নদীর পাশে বিভিন্ন সুবিধাজনক স্থানে অবস্থান নিয়ে তারা অপেক্ষা করতে থাকেন। পরিকল্পনা হলো বুঝে উঠার আগেই শত্রুদের শেষ করে দিতে হবে। দুপুর ১২ টার দিকে শত্রুদের ফেরি তীরের পাশে আসার সাথে সাথে প্রথমে ৩টি এলএমজি থেকে অবিরাম ব্রাশ ফায়ার শুরু হলো । তারপর একযোগে সকল অস্ত্র গর্জে উঠলো। তখন ফেরি নিয়ন্ত্রন হারিয়ে তীরে এসে ধাক্কা খেয়ে আটকে গেল। বেশ কিছু সময় গুলি চলার পর মুক্তিযোদ্ধারা চিৎকার করে সবাইকে আত্মসমর্পণের আহবান জানালেন। সেই আহবানে সাড়া দিয়ে বেশ কিছু পাকিস্তানি মিলিশিয়া ও রাজাকার হাত উঁচু করে সারেন্ডারের ভংগীতে নিচে নেমে এলো। তাদের সবাইকে বন্দী করা হলো। এই যুদ্ধে ৫০ জন মিলিশিয়া ও ১২ জন রাজাকার নিহত হয়। তাছাড়াও ফেরি থেকে ৪৭টি রাইফেল, প্রচুর গুলি, ২৫ ড্রাম কেরোসিন, ১০০ বস্তা চাল, ২৫ বস্তা ডাল, শরিষার তেলসহ প্রচুর পরিমান রেশন সামগ্রি উদ্ধার করা হলো। মিলিশিয়া ও রাজাকারদের এই গ্রুপটি ঢাকা থেকে পাকিস্তানী সেনাদের জন্য রেশন নিয়ে কুষ্টিয়া যাচ্ছিল। ভয়ঙ্কর এ যুদ্ধের খবর স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে ফলাও করে প্রচার করা হয়। এই যুদ্ধের পর ১৩ ডিসেম্বর সুজানগর থানার সকল মুক্তিযোদ্ধাসহ মজিবুররা কয়েক ভাগে বিভক্ত হয়ে চার দিক থেকে সুজানগর থানায় অবস্থিত পাকিস্তানি সেনাদের ক্যাম্পের উপর আক্রমণ পরিচালনা করেন। ৩ দিন অবিরাম যুদ্ধ চলার পর অনেক জানমালের ক্ষতি স্বীকার করে ১৬ ডিসেম্বর ভোররাতে শত্রুরা পাবনায় পালিয়ে যায়। সেদিন বিকেলে ঢাকায় পাকসেনাদের আত্মসমর্পণের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করে। দেশের স্বাধীনতার জন্য মুজিবুরসহ যে সকল বীর মুক্তিযোদ্ধারা যুদ্ধ করেছে, তাদের সকলকে জানাই বিপ্লবী সালাম।