গারো পাহাড়ের গদ্যে জিয়াউল হক

বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ শফিউদ্দিন

বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ শফিউদ্দিন, এফ.এফ. এফ.এফ.নম্বর-৮৫৩৫, গেজেট নম্বর শাহজাদপুর-১৬৫৮, লাল মুক্তিবার্তা নম্বর-০৩১২০৪০০০৩, সমন্বিত তালিকা নম্বর-০১৭৩০০০০৩৩০, মোবাইল নম্বর-০১৭২৩২৭১৭০১, পিতা-কাশেম আলী আকন্দ, মাতা-গোলেজান, স্থায়ী ঠিকানা-গ্রাম-কামালপুর, ডাকঘর- খুকনি, উপজেলা-শাহজাদপুর, জেলা-সিরাজগঞ্জ। বর্তমান ঠিকানা-বাঁশবাড়ি ক্যাম্প, সৈয়দপুর, নীলফামারী।
৩ ছেলে ২ মেয়ের মধ্যে শফিউদ্দিন ছিলেন বাবা মায়ের ৩য় সন্তান। ১৯৭১ সালে তিনি শাহজাদপুর থানার অধীন খাস সাতবাড়িয়া হাই স্কুল থেকে এসএসসি পরীক্ষার দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। জীবনের প্রথম পাবলিক পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করার আশায় সব সময় তিনি বইয়ের টেবিলে পড়ে থাকতেন। শিক্ষকদের কাছে প্রাইভেট পড়তেন। কিন্তু ১৯৭০ সালের পাকিস্তান জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়লাভ করার পর থেকেই দেশের অবস্থা ক্রমান্বয়ে খারাপ হতে থাকে। পাকিস্তানের সামরিক প্রেসিডেন্ট আওয়ামী লীগের হাতে ক্ষমতা ছাড়তে রাজি ছিলেন না। তাই তিনি নানা টালবাহানায় সময়ক্ষেপনের নীতি গ্রহণ করেন। অন্যদিকে নির্বাচনে জয়লাভ করার পর থেকে বাঙালিরা কোন মতেই পশ্চিমা অবাঙালি শাসকদের মানতে পারছিলেন না। ক্ষমতা হস্তান্তরে দেরি হওয়ায় বাংলাদেশের আপামর নাগরিক রাস্তায় নেমে এসে প্রচন্ড গণআন্দোলন গড়ে তোলেন। অফিস, আদালত, কলকারখানা, শিক্ষা গ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে হয়ে যায়। সারা দেশে তখন শুধু মিটিং আর মিছিল। দেশের এই উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যে ঘরের দরজা বন্ধ করে পড়ায় টেবিলে বসে পড়াতে মনোযোগ দেওয়া কি সম্ভব ছিল? শফিউদ্দিন খোঁজ নিয়ে জানতে পারলেন তার অনেক বন্ধুই পড়ার টেবিল ছেড়ে মিটিং মিছিলে অংশ গ্রহণ করা শুরু করে দিয়েছেন। তখন তিনি ভাবলেন জীবন থাকলে পরীক্ষা দেওয়াই যাবে, কিন্তু দেশমাতৃকার ডাক অস্বীকার করে পড়ার টেবিলে বলে থাকলে বিবেকের কাছে তার উত্তর দেওয়া যাবে না। তাইতো তিনি ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এসে যোগ দিলেন সরকার বিরোধী মিছিলে। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঢাকার রেসকোর্স ময়দানের এক বিশাল জনসভায় ভাষণ দেন। তিনি তার ভাষণে এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম বলে ঘোষণা দেওয়ার পর থেকেই বাংলাদেশের মানুষ স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্নে বিভোর হয়ে মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি শুরু করে দিলেন। শফিউদ্দিনও এই প্রস্তুতি পর্বের সাথে জড়িয়ে গেলেন।
২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনারা সারা বাংলাদেশের উপর আক্রমণ করে মানুষ হত্যা ও মানুষের ঘরবাড়ি আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিতে শুরু করলেন। একই রাতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়ার পর পরই শত্রুসেনাদের হাতে গ্রেফতার হলেন। তিনি গ্রেফতার হলেও তার ঘোষণা অনুযায়ী সারা বাংলাদেশে প্রতিরোধযুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। ১৭ এপ্রিল প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের শপথ গ্রহণ এবং তার কয়েক দিনের মধ্যে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র চালু হওয়ার পর বাংলাদেশের স্বাধীনতার আন্দোলনে এক নতুন মাত্রা যোগ হয়। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণে শুনে শফিউদ্দিন তৎক্ষনাৎ মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু তাদের এলাকা থেকে ভারতে যাওয়ার কোন সহজ পথ না থাকায় খোঁজ খবর নিতে বেশ কিছুটা বিলম্ব হচ্ছিল। অবশেষে তারা যাত্রাপথের সন্ধান পায়। তখন দেরি না করে মুক্তিযুদ্ধে যোগদান করার জন্য শফিউদ্দিন বেলকুচি থানার যমুনা নদীর তীর থেকে নৌকাযোগে ভারতের পথে যাত্রা করেন। তারপর তারা ভারতের আসাম রাজ্যের মানকার চরে গিয়ে পৌছান। সেখানে বেশ কিছু দিন অবস্থান করার পর মুক্তিযুদ্ধের উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য বাছাই করে শফিউদ্দিনদের শিলিগুড়ির পানিঘাটা প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে প্রেরণ করা হয়।
সেখানে প্রথমে ৩০ দিনের গেরিলা প্রশিক্ষণ এবং পরে আরও ১০ দিন এ্যাডভান্স প্রশিক্ষণ প্রদানের পর ভারতীয় সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে তুফানি ব্যাটেলিয়ন নামে একটা ব্যাটেলিয়ন গঠন করা হয়। শফিউদ্দিন এই ব্যাটেলিয়নের আলফা কোম্পানীতে অন্তভর্ূক্ত হন। তাদের কোম্পানী কমান্ডার ছিলেন ভারতীয় সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন ডিএস ডিলন। ব্যাটেলিয়ন গঠন করার পর ৭ নম্বর সেক্টর হেডকোয়ার্টার তরঙ্গপুর থেকে অস্ত্র ও গোলাবারুদ প্রদানের পর এই ব্যাটেলিয়নকে পশিচম দিনাজপুর জেলার বালুরঘাট সীমান্তের ডিফেন্সে প্রেরণ করা হয়। ডিফেন্সে গিয়ে এই ব্যাটেলিয়নের মুক্তিযোদ্ধারা সীমান্তে ট্রেন্স ও বাঙ্কার কেটে নিয়মিত সৈনিকদের মতো পালা করে ২৪ ঘন্টা সেন্টি ডিউটি দিতে শুরু করেন। মাঝে মাঝে তারা শত্রুসেনাদের ক্যাম্প রেকি করার জন্য বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করতেন। শত্রুসেনা ক্যম্পের তথ্য সংগ্রহ করার পর প্রথমে তারা তৎকালীন রাজশাহী জেলার ফার্সিপাড়া পাকিস্তানি সেনা ক্যাম্পের উপর আক্রমণ পরিচালনা করেন। ৩ ডিসেম্বর নিয়মিত যুদ্ধ শুরু হলে ভারতীয় বাহিনীর পাশাপাশি এই ব্যাটেলিয়নের মুক্তিযোদ্ধারা দিনাজপুর জেলার ফুলবাড়ি, রংপুর জেলার পলাশবাড়ি, গোবিন্দগঞ্জ এবং বগুড়া শহরের যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করার পর ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করে। শফিউদ্দিনের মতো বীর মুক্তিযোদ্ধারা যুদ্ধ করে বাংলাদেশকে স্বাধীন করেছিল বলেই আজ আমরা অর্থনৈতিক ভাবে সফল বাংলাদেশকে দেখতে পাচ্ছি।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।