গারো পাহাড়ের গদ্যে জিয়াউল হক

বীর মুক্তিযোদ্ধা এ.এইচ.এম মুজহারুল ইসলাম
আমি এ.এইচ.এম মুজহারুল ইসলাম, ভারতীয় তালিকা – ভলিউম – ৬, নম্বর – ৪৭৬০২, লাল মুক্তিবার্তা নম্বর – ০৪০৫০১০০৭০. গেজেট যশোর সদর, নম্বর-১০, এমএইএস নম্বর – ০১৪১০০০৩৮৪৯, মোবাইলঅ নম্বর – ০১৭১১১৪২৪৯৯ পিতা: মৌলভী সামসুদ্দিন আহমেদ, মাতা: খাইরুন্নেছা খাতুন, স্থায়ী ঠিকানা: গ্রাম: দৌলতদীহি, ডাকঘর: খোজার হাট, উপজেলা: যশোর সদর, জেলা: যশোর।
বর্তমান ঠিকানা: আহমেদ ম্যানশন, পুরাতন কসবা, বিমান বন্দর সড়ক, (এসপির বাংলোর পশ্চিম পাশে), যশোর।
১৯৬৫ সালে আমি মাধ্যমিক পরীক্ষা পাশ করার পর যশোর ভূমি অফিসে সরকারী চাকুরী গ্রহণ করি। চাকুরীতে যোগদানের পর পরই যথারীতি বিবাহ বন্ধনেও আবদ্ধ হই। ১৯৭০ সালে পাকিস্তান সরকার সেই পদ বিলুপ্ত ঘোষণা করার আমি চাকুরী হারাই। একদিকে পাকিস্তানি শাসকদের ষোষণ, নির্যাতন ও বৈষম্যমূলক আচরণ, অন্যদিকে চাকুরী হারানোর বেদনায় আমার মন যখন বিদ্রোহী হয়ে ওঠেছিল, ঠিক তখনই ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঢাকার রেসকোর্স ময়দানের জনসভায় যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুকে মোকাবেলার আহবান জানান। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে সাড়া দিয়ে আমরা যশোর শহরের সর্বস্তরের জনতা সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে অসহযোগ আন্দোলন শুরু করি। শুধু তাই না, আরও এক ধাপ এগিয়ে আমরা কেশ কিছু যুবক ছেলে সামরিক প্রশিক্ষণ নেওয়া শুরু করি। ২৫ মার্চ সন্ধ্যারাত থেকেই চারিদিকে গুজব ছড়িয়ে পড়ে রাতে পাকসেনারা শহরে এসে আন্দোলনরত জনতার উপর আক্রমণ চালবে। তখন আমরা যশোর ক্যান্টনমেন্ট থেকে শহরগামী রাস্তায় গাছের গুড়ি ফেলে ব্যারিকেট সৃষ্টি করি। রাত ১২টার পর শত্রুসেনারা ব্যারিকেট সরিয়ে মেসিনগানের গুলি বর্ষণ করতে করতে শহরের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। আমরা যারা সামরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছিলাম, তারা দেশীয় বন্দুক ও অন্যান্য অস্ত্রসস্ত্র নিয়ে শত্রুদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ যুদ্ধে অবতীর্ণ হই। কিন্তু তাদের আধুনিক অস্ত্রের সামনে টিকতে না পেরে আমরা পিছু হয়ে আসতে বাধ্য হই। সেই রাতে হায়েনাদের গুলিতে বেশ কিছু নিরিহ মানুষ নিহত হয়। ২৫ মার্চ রাত থেকে ২৯ মার্চ পযন্ত শহরে অবস্থান করে পাকসেনারা ক্যান্টমমেন্টে ফিরে যায়।
৩০ মার্চ রাতে শত্রুরা যশোর ক্যান্টমেন্টে অবস্থিত বেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈন্যদের উপর অতর্কিতে আক্রমণ চালায়। এই আক্রমণে লেফটেনেন্ট আনোয়ারসহ শত শত বেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈন্য সাহাদত বরণ করেন। ক্যান্টনমেন্টের ভেতরে গোলাগুলির শব্দ শুনে আমরা রাত ভর ক্যান্টনমেন্টের দক্ষিণের চান্দুটিয়া বুকভরা বাওড়ের পাশের বাজারে অপেক্ষা করতে থাকি। পরের দিন সকালে লেঃ হাফিজের নেতৃত্বে প্রায় শতাধিক সৈন্য বিদ্ধস্ত অবস্থায় সেখানে এসে হাজির হয়। তখন মুকসুদুল হক, আমি ও বেশ কয়েকজন বন্ধু মিলে তাদের নিয়ে ভারত সীমান্তের বনগাঁ বিওপিতে গিয়ে হাজির হই। সেখানে বিএসএফ এর সেক্টর কমান্ডার মেজর কে.বি.সিং আমাদের রিসিভ করেন। বেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈন্যদের বনগাঁয় পৌছে দিয়ে আমরা আবার যশোর ফিরে আসি। ফিরে এসে দেখতে পেলাম পাকসেনারা ক্যান্টমেন্ট থেকে এসে প্রায় প্রতিদিনই শহরের উপর আক্রমণ চালিয়ে নির্বিচারে নিরিহ মানুষ হত্যা করছে। একদিকে শত্রুদের অত্যাচার, অন্যদিকে আমরা তখন স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখা শুরু করে দিয়েছি। ঘরে বসে থেকেতো আর দেশ স্বাধীন করা যাবে না। তাই ১৩ এপ্রিল দুই শিশু সন্তান ও স্ত্রীর ভালোবাসাকে তুচ্ছ করে স্বাধীনতার স্বপ্ন বুকে নিয়ে আমরা ২৫ জন যুবক আবার যাত্রা করলাম ভারত অভিমুখে। সীমান্ত পেরিয়ে আশ্রয় নিলাম বনগাঁর টালিখোলা যুবশিবিরে। তারপর শুরু হলো অপেক্ষার পালা। টালিখোলা ও চাঁপাবাড়িয়া শিবিরে দুই মাস অপেক্ষার পর জুন মাসের প্রথম সপ্তাহে মুক্তিযুদ্ধের উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য আমাদের ৫০ জন ছেলেকে নিবার্চিত করে কলকাতার পাশে কল্যাণি হয়ে আমাদের বিহার প্রদেশের চাকুলিয়া ক্যান্টনমেন্টে প্রেরণ করা হয়। জুন মাসের ১৫ তারিখ থেকে জুলাই মাসের ১৫ তারিখ পর্যন্ত ১ মাস প্রশিক্ষণ শেষে আমাদের বয়রা সাব-সেক্টরে ফিরিয়ে আনা হয়। বয়রা থেকে আমাকে কমান্ডার করে ১১ জন মুক্তিযোদ্ধার একটা দল গঠন করে অস্ত্র ও গোলাবারুদ প্রদান করা হয়। এখান থেকেই আমরা বাংলাদেশের ভেতরে বিভিন্ন শত্রুসেনা ক্যাম্পে আক্রমণ পরিচালনা করতে থাকি। যুদ্ধে অনন্য ভূমিকা রাখার পুরস্কারস্বরূপ আগষ্ট মানের শেষ সপ্তাহে আমাকে ৫০ জন মুক্তিযোদ্ধার কমান্ডার নিযুক্ত করা হয়। শ্যামনগর নন্দ শা পুকুর পাড়ের যুদ্ধ ঃ আমরা যশোর সদর উপজেলার কাশিমপুর ইউনিয়নের নওগাঁ গ্রামের সেল্টারে অবস্থান করছিলাম। ২৮ অক্টোবর ভোর রাতের দিকে গুলাগুলির শব্দ শুনে আন্দাজ করতে পারি শত্রুরা আমাদের ক্যাম্প আক্রমণ করার জন্য অগ্রসর হচ্ছে । তৎক্ষণাৎ ৪৫ জন মুক্তিযোদ্ধাকে প্রস্তুত করে সামনের দিকে অগ্রসর হয়ে লক্ষ্য করতে পারলাম যে, শত্রুরা নন্দ শা পুকুর পাড়ের উত্তর-পূর্ব কোণে একটা শুকনা জায়গায় অবস্থান গ্রহণ করেছে। তাদের অবস্থানের তিন দিকেই জলাশয়। ৪৫ জন মুক্তিযোদ্ধাকে ৩ ভাগে ভাগ করে ত্রিমুখী আক্রমণের পরিকল্পনা গ্রহণ করে আমাদের প্রথম এলএমজির ফায়ার শুরু করার সাথে সাথে শত্রুরা ভয়ডরহীন ভাবে স্টান্ডিং পজিশনে গুলি বর্ষণ করতে করতে করতে সামনের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। আমরা তখন ৩টা এলএমসজিসহ সকল অস্ত্র নিয়ে ৩ দিক থেকে একযোগে তাদের উপর গুলিবর্ষণ শুরু করি। আমাদের ত্রিমুখী আক্রমণের মুখে শত্রুরা পিছু হটতে বাধ্য হয়। এই রক্তক্ষয়ী ও লোমহর্ষক যুদ্ধে ১ জন অফিসারসহ ৩৪ জন পাকসেনা নিহত হয়। আমাদের পক্ষে আকছেদ আলী ও আব্দুল মান্নান নামে ২ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হয়।
বারিনগর রাজাকার ক্যাম্প আক্রমণ ঃ যশোর সদর উপজেলার হৈবাতপুর ইউনিয়নের বারিনগর রাজাকার ক্যাম্পে ৭৯ জন রাজাকার ছিল। তারা প্রায় প্রতিদিনই আশেপাশের গ্রামগুলোর উপর আক্রমণ করে মানুষ হত্যা, লুটপাট এবং নারীদের সম্ভ্রমহানী করতো। এই সংবাদ পেয়ে বয়রা সাব-সেক্টরের কমান্ডার খন্দকার নাজমুল হুদা আমাদেরকে এই ক্যাম্প আক্রমণের নির্দেশ প্রদান করেন। এই নির্দেশ পাওয়ার পর ১১ নভেম্বর রাত ৩টার সময় আমরা ৫৫ জন মুক্তিযোদ্ধা ৩টি এলএমজি ও অন্যান্য অস্ত্রসস্ত্র দিয়ে প্রায় ১ ঘন্টা যাবৎ আক্রমণ চালিয়ে রাজাকার ক্যাম্পটিকে ছিন্নভিন্ন করে দেই। এই আক্রমণে ১১ জন রাজাকার নিহত এবং অধিকাংশ আহত হয়। এই ক্যাম্প থেকে যশোর ক্যান্টনমেন্টের দূরত্ব ছিল মাত্র ৯ কিলোমিটার। আমাদের আক্রমণের শব্দ পেয়ে পাকসেনারা গুলিবর্ষণ করতে করতে ক্যান্টনমেন্ট থেকে আমাদের দিকে অগ্রসর হতে থাকলে আমরা পিছু হটে নিরাপদ স্থানে চলে যাই।
এই যুদ্ধ ছাড়াও ক্যাপ্টেন নাজমুল হুদার কমান্ডে আমি বর্ণি পাকসেনা ক্যাম্প আক্রমণে অংশগ্রহণ এবং সর্বাত্বক যুদ্ধ শুরু হলে মিত্রবাহিনীর কমান্ডে খুলশি, বুরুন্দিয়া মৎস্যরাঙ্গা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করি। মৎস্যরাঙ্গা যুদ্ধ চলাকালে সেলের আঘাতে আমি আহত হই। ৬ ডিসেম্বর যশোর পতন হওয়ার পর যশোর সদর হাসপাতালে চিকিৎসা গ্রহণ করার পর আমি সুস্থ হয়ে উঠি। দেশের জন্য যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছিলাম বলেই আজ আমরা স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসাবে নিজেদের পরিচয় দিতে গর্ববোধ করি।