গারো পাহাড়ের গদ্যে জিয়াউল হক

বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ খালেকুজ্জামান

বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ খালেকুজ্জামান, এফ.এফ. এফ.এফ.নম্বর-৩০৩০, গেজেট নম্বর-পাবনা সদর-২০০৫, লাল মুক্তিবার্তা নম্বর-০৩১১০১০১৭২, এমআইএস নম্বর-০১৭৬০০০১৭৫১, মোবাইল নম্বর-০১৭১২৯৮৩৮১৪, পিতা ঃ আজিজুর রহমান মোল্লা, মাতা ঃ সালেহা খাতুন, স্থায়ী ঠিকানা ঃ গ্রাম ঃ কাথুলি, ডাকঘর ঃ দুবলিয়া, উপজেলা ও জেলা ঃ পাবনা। বর্তমান ঠিকানা ঃ হোল্ডিং নম্বর-১৪৫৪/. টগরী কটেজ, গোরস্থান রোড, শালগাড়িয়া, পাবনা।
৫ ছেলে ও ২ মেয়ের মধ্যে খালেকুজ্জামান ছিলেন বাবা মায়ের প্রথম সন্তান। বাবা ছিলেন প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষক। তিনি বঙ্গবন্ধুকে খুব ভালোবাসতেন। বাবার কারণেই ছোটবেলা থেকেই খালেকুজ্জামান রাজনীতির সাথে জড়িয়ে পড়েন। ১৯৭১ সালে তিনি সুজানগর উচ্চ বিদ্যালয়ের ১০ শ্রেণির ছাত্র ছিলেন। তিনি যেমন ১৯৬৯ সালের স্বৈরাচারী আইয়ুব সরকার বিরোধী গণআন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন, তেমনি ১৯৭০ সালের পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের নির্বাচনের সময়ে আওয়ামী লীগের পক্ষে নির্বাচনী প্রচার কাজে অংশগ্রহণ করেন। সেই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়লাভ করার পরও সামরিক প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান তাদের নিকট ক্ষমতা হস্তান্তর না করে বরং সয়মক্ষেপনের নীতি গ্রহণ করেন। প্রেসিডেন্টের এই নীতির বিরোধিতা করে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ রাস্তায় নেমে এসে প্রচন্ড গণআন্দোলন গড়ে তোলেন। দেশের এই অস্বাভাবিক পরিবেশের মধ্যেই ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঢাকার রেসকোর্স ময়দানের এক বিশাল জনসভায় তার নীতিনির্ধারণী ভাষণ প্রদান করেন। তিনি তার ভাষণে এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম উল্লেখ করার সাথে সাথে বাংলাদেশের মানুষ স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন। বঙ্গবন্ধুর ঘোষণা অনুযায়ী খালেকুজ্জামান তখন সমবয়সী বন্ধুদের নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে প্রচার কাজ শুরু করেন।
২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনারা সারা বাংলাদেশের উপর আক্রমণ করে নির্বিচারে মানুষ হত্য ও মানুষের বাড়িঘরে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিতে শুরু করেন। শত্রুসেনাদের অত্যাচারে দেশের অবস্থা দিন দিন খারাপ হতে থাকে। এই অস্বস্তিকর অবস্থার মধ্যে মুক্তিযুদ্ধে যোগদানের জন্য খালেকুজ্জামান তখন দেশ ছেড়ে ভারতের পথে যাত্রা করেন। তারপর বাংলাদেশের সীমান্ত পার হয়ে ভারতের কেচুয়াডাঙ্গা ইয়ুথ ক্যাম্পে গিয়ে আশ্রয় গ্রহণ করেন। সেখানে থেকে পশ্চিম দিনাজপুর জেলার পতিরামপুর হয়ে মুক্তিযুদ্ধের উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য তাদের শিলিগুড়ির পানিঘাটা প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে প্রেরণ করা হয়। সেখানে ৪৫ দিন প্রশিক্ষণ শেষে খালেকুজ্জামানদের ভোলাহাট থানার দলদলি ডিফেন্সে প্রেরণ করা হয়। দলদলিতে অবস্থান কালে একদিন রাত ৪টার সময় তারা ৭ নম্বর সেক্টর অধিনায়ক কাজী নুরুজ্জামানের নেতৃত্বে নৌকাযোগে পাশের শত্রুসেনা ক্যাম্প আক্রমণ করার জন্য অগ্রসর হন। মুক্তিযোদ্ধাদের আক্রমণে অনেক জানমালের ক্ষতি স্বীকার করে শত্রুসেনারা নিজেদের বাঙ্কার ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। এরই মধ্যে রোহনপুর থেকে শত্রুসেনারা মুক্তিযোদ্ধাদের উপর মর্টারের গোলা বর্ষণ করতে থাকে। শত্রুরা যখন গানবোট থেকে গুলিবর্ষণ করতে করতে সন্মুখ দিকে অগ্রসর হতে শুরু করে, তখন মুক্তিযোদ্ধারা পিছু হটে দলদলিতে ফিরে আসে। সেখানে আরও কিছু দিন অবস্থান করার পর তাদের ডিফেন্স থেকে প্রত্যাহার করে তরঙ্গপুর ফিরিয়ে আনা হয়। সেখান থেকে নিজামউদ্দিনের নেতৃত্বে ২৮ জন মুক্তিযোদ্ধার একটা গ্রুপ গঠন করে আসামের মানকার চর হয়ে খালেকুজ্জামানদের বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রেরণ করা হয়। বাংলাদেশের অভ্যন্তরে এসে এই মুক্তিযোদ্ধা গ্রুপটি পাবনা জেলার ফরিদপুর থানার বিলা লে সেল্টার গ্রহণ করেন।
কালিয়ানের যুদ্ধ ঃ ৯ নভেম্বর নিজামউদ্দিনের নেতৃত্বে সেই মুক্তিযোদ্ধা গ্রুপটি তখন ফরিদপুর থানার বারোআনি গ্রামে অবস্থান করছিল। এ্রই মধ্যে তাদের কাছে খবর আসে পাকিস্তানি সেনারা বাঘাবাড়ি ডেমড়া হয়ে ফরিদপুরের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। মুক্তিযোদ্ধারা এমন সুযোগেরই অপেক্ষায় ছিলেন। তখন আশেপাশের কয়েক গ্রুপের প্রায় ১০০ জন মুক্তিযোদ্ধা শত্রুসেনাদের পিছু ধাওয়া শুরু করেন। তারপর কালিয়ান নামক স্থানে আসার পর উভয় পক্ষের মধ্যে শুরু হয় তুমুল যুদ্ধ। দুপুর থেকে কয়েক ঘন্টা যুদ্ধ চলার পর সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসে। তারপর আপনাআপনিই যুদ্ধ থেমে যায়। এই যুদ্ধে ১০/১২ জন শত্রুসেনা নিহত হয়। অপর দিকে ৭ জন মুক্তিযোদ্ধা শহিদ হয়।
সাঁথিয়া থানার যুদ্ধ ঃ ৬ ডিসেম্বর মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে খবর আসে সাঁথিয়া থানার ওসি পালিয়ে গেছে। এই খবর পেয়েই আশেপাশের কয়েক গ্রুপের ১৫০ জন মুক্তিযোদ্ধা থানায় ঢুকে অস্ত্রাগারের তালা ভেঙ্গে ৩০/৪০টি অস্ত্র হস্তগত করে তা বিভিন্ন গ্রুপের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়। পরের দিন ৭ ডিসেম্বর সকল মুক্তিযোদ্ধারা আবার থানায় হাজির হয়ে জাতীয় পতাকা উত্তোলন ও জাতীয় সঙ্গীত গাওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। সিদ্ধান্ত মোতাবেক পরের দিন মুক্তিযোদ্ধারা যখন পতাকা উত্তোলনের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখনই খবর আসে শত্রুসেনারা সাঁথিয়ার দিকে অগ্রসর হচ্ছে। সাথে সাথে মুক্তিযোদ্ধারা ৩ দিক থেকে শত্রুসেনাদের উপর গুলি বর্ষণ শুরু করেন। গুলিবর্ষণ শুরু হওয়ার সাথে সাথে শত্রুরা সন্মুখে অগ্রসর না হয়ে বকুলতলা নামক স্থানে অবস্থান নিয়ে পাল্টা গুলিবর্ষণ শুরু করে। সারাদিন যুদ্ধ চলার পর মুক্তিযোদ্ধাদের ত্রিমুখী আক্রমণের মুখে টিকতে না পেরে শত্রুরা নিজেদের জীপ ও ট্রাক ফেলে রেখে পিছু হটে যায়। আর এখানেই শেষ হয় খালেকুজ্জামানদের ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ। খালেকুজ্জামানদের মত বীর মুক্তিযোদ্ধারা জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছিল বলেই আজ আমরা স্বাধীন দেশের নাগরিক । তাই আমাদের জাতির সেই সব বীর সন্টতানদের যথায়থ মূল্যায়ন করা উচিৎ।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।