গারো পাহাড়ের গদ্যে জিয়াউল হক

বীর মুক্তিযোদ্ধা চন্দন কুমার চক্রবর্তী
আমি চন্দন কুমার চক্রবর্তী, এফ.এফ. এফ.এফ.নম্বর-৩১৬৫, গেজেট নম্বর-পাবনা সদর-৬২,লাল মুক্তিবার্তা নম্বর–০৩১১০১০০৪২, এমআইএস নম্বর-০১৭৬০০০০২৬৩, মোবাইল নম্বর-০১৭১২০৭৭০৯১, পিতা ঃ কালাচাঁদ চক্রবর্তী, মাতা ঃ বিজয়া চক্রবতর্ী, স্থায়ী ঠিকানা ঃ গ্রাম ঃ কুচিয়ামোড়া, ডাকঘর ঃ সাঁখারীপাড়া, থানা ঃ আতাইকুলা, উপজেলা ও জেলা ঃ পাবনা। বর্তমান ঠিকানা ঃ ঐ।
১৯৭১ সালে আমি পাবনা জেলার সদর থানার সাঁখারীপাড়া হাই স্কুলের ১০ম শ্রেণির ছাত্র ছিলাম। ১৯৭০ সালের পাকিস্তান জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়লাভ করার পরও তাদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর না করায় সারা বাংলাদেশে প্রচন্ড গণআন্দোলন শুরু হয়। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানের জনসভায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার ভাষণে ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলার সাথে সাথে যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুকে মোকাবেলার আহবান জানান। বঙ্গবন্ধুর এই আহবানের পর বাঙালিরা স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন। তখন সারা দেশে মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি শুরু হয়ে যায়। জরুরী পরিস্থিতি মোকাবেলায় জন্য এলাকায় এলাকায় আওয়ামী লীগের নেৃত্বে সংগ্রাম কমিটি গঠন করা হয়। অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান পূর্ব পাকিস্তানে এসে যুদ্ধের প্রস্তুতি সমাপ্ত করার জন্য শেখ মুজিবের সাথে আলোচনার নামে সময়ক্ষেপন করতে থাকেন। যুদ্ধের প্রস্তুতি সমাপ্ত হওয়ার পর ইয়াহিয়া খান আলোচনা ভেঙ্গে দিয়ে বাঙালিদের উপর আক্রমণের দির্দেশ জারী করে ২৫ মার্চ বিকেলে চুপিসারে পূর্ব পাকিস্তান ছেড়ে পশ্চিম পাকিস্তানের পথে যাত্রা করেন।
প্রেসিডেন্টের নির্দেশ পাওয়ার পর ২৫ মার্চ রাতে পাকসেনারা সারা বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের উপর আক্রমণ করে বাড়িঘরে অগ্নি সংযোগ এবং অকাররে মানুষ হত্যা শুরু করে। একই রাতে রাজশাহী থেকে ১ কোম্পানী পাকসেনা পাবনায় এসে ডাকবাংলো, টেলিফোন ভবন ও তৎকালীন ইপসিক শিল্প এলাকায় ক্যাম্প স্থাপন করে মানুষ হত্যা শুরু করে। পাকসেনাদের এই নৃশংস হত্যাকান্ডের বদলা নিতে পাবনার বিপ্লবী জনতা পাকসেনাদের ক্যাম্পের উপর আক্রমণ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। সিদ্ধান্ত মোতাবেক ২৭ মার্চ সকাল থেকে শুরু হয় পাকিস্তানি সেনাদের টেলিফোন ভবন ক্যাম্পের উপর আক্রমণ। সেদিন বিকেলের মধ্যেই টেলিফোন ভবনের সকল পাকসেনাকে হত্যা করা হয়। এই খবর পেয়ে ২৮ মার্চ আমি আতাইকুলা থেকে শহরে এসে দেখতে পাই পাবনা অস্ত্রাগার থেকে ইচ্ছুক যুবকদের মাঝে অস্ত্র বিতরন করা হচ্ছে। নাম তালিকাভূক্ত করে আমাকে একটা ৩০৩ রাইফেল ও গুলি দিয়ে কতৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ রাখতে বলা হলো। আমি অস্ত্রটা নিয়ে আতাইকুলা ফিরে গেলাম। কয়েক দিন পরেই খবর এলো শত্রুসেনারা যাতে ঢাকা থেকে নগরবাড়ি ঘাট হয়ে পাবনায় আসতে না পারে তার জন্য আমাদের নগরবাড়ি ঘাটে প্রতিরোধযুদ্ধে যেতে হবে। আমরা তখন বকুল ভাইয়ের সাখে জীপ গাাড়িতে নগরবাড়ি ঘাটে গিয়ে অবস্থান গ্রহণ করলাম। পরের দিন সকালে পাক বিমান বাহিনীর হেলিকপ্টার থেকে আমাদের উপর মেসিনগানের গুলিবর্ষণের সাথে সাথে শত্রুসেনারা আরিচা ঘাঠ থেকে গানবোট যোগে যাত্রা করে মর্টারের গোলাবর্ষণ শুরু করলো।
দ্বিমুখী আক্রমণে আমরা ছত্রভঙ্গ হয়ে গেলে শত্রুরা বিনা বাধায় পাবনা শহরে প্রবেশ করে। আমরা রাইফেল হাতে শত্রুসেনাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছি। তাই আমাদের জন্য দেশে থাকা কোন মতেই সমিচীন হবে না বলে মে মাসের ১৫ তারিখে আমি মুক্তিযুদ্ধে যোগদানের উদ্দেশ্যে দেশ ছেড়ে ভারতের পথে যাত্রা করলাম। তারপর বাংলাদেশের বর্ডার পার হয়ে ভারতের কেচুয়াডাঙ্গা গিয়ে আশ্রয় গ্রহণ করলাম। সেখানে কিছু দিন থাকার পর কল্যাণি ও পাশ্চিম দিনাজপুর জেলার বালুর ঘাটের পাশের কুরমাইল ঈয়ুথ ক্যাম্প হয়ে মুক্তিযুদ্ধের উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য আমাদের শিলিগুড়ির পানিঘাটা প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে প্রেরণ করা হয়। সেখানে ৩০ দিন প্রশিক্ষণ শেষে ৭ নম্বর সেক্টর হেডকোয়ার্টার তরঙ্গপুর থেকে অস্ত্র ও গোলাবারুদ প্রদান করে আমাদের সোনা মসজিদের পাশের মাহাদীপুর সরব-সেক্টরে প্রেরণ করা হয়। সেখান থেকে প্রতিদিন সন্ধ্যারাতে, মাঝরাতে এবং শেষ রাতে পালা করে আমরা পাকসেনাদের সোনা মসজিদ ক্যাম্পের উপর আক্রমণ চালাতাম। সেখানে বেশ কিছু দিন থাকার পর নৌকাযোগে আমাদের তৎকালীন রাজশাহী জেলার ভোলাহাট থানার দলদলি ক্যাম্পে প্রেরণ করা হয়। সেখান থেকে একদিন রাতে ৭ নম্বর সেক্টর কমান্ডার কাজী নূরুজ্জামানের নেতৃত্বে আমরা পাশের শত্রু ক্যাম্পের উপর আক্রমণ পরিচালনা করি। রাত ১২টা থেকে ৪টা পর্যন্ত যুদ্ধ চলার পর শত্রুর অনেক ক্ষতি সাধন করে আমরা নিজেদের দলদলি ক্যাম্পে ফিরে আসি। ডিসেম্বর মাসে নিয়মিত যুদ্ধ শুরু হলে কানসাট, শিবগঞ্জ হয়ে বারঘোরিয়া আসার পর ১৬ ডিসেম্বর আমরা স্বাধীনতা লাভ করি। এক সাগর রক্তের বিনিময়ে আমরা যে স্বাধীন বাংলাদেশ অর্জন করেছি, তা রক্ষা করার জন্য দেশের প্রতিটা নাগরিককে সর্বাত্বক ত্যাগ স্বীকার করতে প্রস্তুত থাকতে হবে।