গারো পাহাড়ের গদ্যে জিয়াউল হক

মুক্তিযোদ্ধা মোঃ আব্দুল হাই
বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ আব্দুল হাই, এফ.এফ. এফ.এফ.নম্বর-৯৭৫১, গেজেট নম্বর ঈশ্বরদী-৯২৩, লাল মুক্তিবার্তা নম্বর-০৩১১০২০৩৮২, সমন্বিত তালিকা নম্বর-০১৭৬০০০১৯৬০, মোবাইল নম্বর-০১৭১৬৫৭৯৯৪৩, পিতা ঃ হাফিজউদ্দিন, মাতা ঃ আমেনা খাতুন, স্থায়ী ঠিকানা ঃ গ্রাম ঃ ভারইমারী, ডাকঘর ঃ বাঁশেরবাদা, উপজেলা ঃ ঈশ্বরদী, জেলা ঃ পাবনা। বর্তমান ঠিকানা ঃ ২২/৬, আহম্মদনগর, মিরপুর-১, ঢাকা-১২১৬।
৪ ছেলে ১ মেয়ের মধ্যে আব্দুল হাই ছিলেন বাবা মায়ের সর্বকনিষ্ঠ সন্তান। তিনি ১৯৭১ পাবনা সরকারী এডওয়ার্ড কলেজের উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণির ছাত্র ছিলেন। বিংশ শতাব্দির ষাটের দশক ছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদ জাগরণের সুবর্ণ সময়। এই দশকে বাঙালিদের প্রাণের ৬ দফা দাবী আদায়ের আন্দোলন, ১৯৬৯ সালে সৈরাচারী আইয়ুব সরকার বিরোধী গণআন্দোলন ও ১৯৭০ সালে পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। আব্দুল হাই স্বৈরাচারী আইয়ুব সরকার বিরোধী গণআন্দোলনে সক্রিয় ভাবে অংশগ্রহণ করেন। এই আন্দোলনের জোয়ারে আউয়ুব খান পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। তিনি পদত্যাগ করার পর জেনারেল ইয়াহিয়া খান ক্ষমতায় এসে গণতান্ত্রিক নির্বাচনের ওয়াদা করলে দেশের অবস্থা স্বাভাবিক হয়ে আসে। ওয়াদা মোতারেক জেনারেল ইয়াহিয়া খান ১৯৭০ সালের ডিসেম্বর মাসে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের নির্বাচনের আয়োজন করেন। সেই নির্বাচনের সময় আব্দুল হাই তাদের এলাকার আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রাথীর পক্ষে নির্বাচনী প্রচার কাজে সক্রিয় ভাবে অংশ গ্রহণ করেন। সেই নির্বাচনে আওয়ামী জয়লাভ করার পরও প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান তাদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর না করে সময়ক্ষেপনের নীতি গ্রহণ করেন। শুধু তাই না দেরিতে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহবান করার পর ১ মার্চ আবার তা স্থগিত ঘোষণা করেন।
আব্দুল হাই সেদিন কলেজে ক্লাশ করছিলেন। এই খবর কলেজে পৌছার সাথে সাথে সকল ছাত্ররা মিলে মুহুর্তে শহরে একটা জঙ্গী মিছিল বের করেন। আব্দুল হাইও এই মিছিলে যোগ দিয়ে জয় বাংলা, তোমার আামার ঠিকানা-পদ্মা মেঘনা যমুনা, তুমি কে আমি কে-বাঙালি বাঙালি স্লোগান দিয়ে পাবনা শহরের আকাশ বাতাস মুখর করে তোলে। এই ঘটনার পর সারা বাংলাদেশেও শুরু হয়ে যায় সরকারের বিরুদ্ধে প্রচন্ড গণআন্দোলন। দেশের অফিস, আদালত, কলকারখানা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অনির্দিষ্ঠ কালের জন্য বন্ধ হয়ে যায়। ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঢাকার রেসকোর্স ময়দানের এক বিশাল জনসভায় ভাষণ প্রদান করেন। তিনি তার ভাষণে যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুকে মোকাবেলার আহবান জানান। বঙ্গবন্ধুর এই আহবানের পর বাংলাদেশের মানুষ ভালো ভাবেই বুঝতে পারলেন, যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করা ছাড়া তাদের সামনে আর কোন পথ খোলা নেই। তাইতো সারা বাংলাদেশে শুরু হয়ে যায় মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি। কলেজ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আব্দুল হাই গ্রামের বাড়িতে এসে এলাকার যুবক ছেলেদের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে প্রচার কাজ শুরু করেন।
২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনারা সারা বাংলাদেশের উপর আক্রমণ চালিয়ে মানুষ হত্যা ও মানুষের বাড়িঘরে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিতে শুরু করে। একই দিন মাঝ রাতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা প্রদানের পর পরই পাকিস্তানি সেনাদের হাতে গ্রেফতার হন। তিনি গ্রেফতার হলেও তার ঘোষণা অনুযায়ী সারা বাংলাদেশে প্রতিরোধযুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। পাবনা, কুটিয়াসহ বাংলাদেশের অনেক জেলাতেই প্রতিরোধযোদ্ধারা শত্রুসেনাদের পরাজিত করে নিজেদের কতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন। কিন্তু তা ছিল একেবারেই সাময়িক ঘটনা। আস্তে আস্তে শত্রুসেনারা নিজেদের কতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন। এপ্রিল মানের ১৭ তারিখে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের শপথ গ্রহণ এবং তার অল্প কিছু দিনের মধ্যে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র চালু হওয়ায় বাঙালিরা আবার আশার আলো দেখতে পান। কলেজ বন্ধ থাকায় আব্দুল হাই তখন গ্রামের বাড়িতে থেকে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অনুষ্ঠান শুনে সময় পার করছিলেন। স্বাধীন বাংল বেতার কেন্দ্রের অনুষ্ঠান শুনে তিনি জানতে পারেন ভারতে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ শুরু হয়েছে। কিন্তু কি ভাবে কোথায় গেলে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করা যায় তা জানা না থাকায় তার মুক্তিযুদ্ধে যোগদান বিলম্বিত হচ্ছিল। অবশেষে যাত্রা পথের সন্ধান পাওয়ার পর মুক্তিযুদ্ধে যোগদান করার জন্য তিনি দেশ ছেড়ে ভারতের পথে যাত্রা করেন। তারপর অনেক কষ্ট করে পায়ে হেঁটে বাংলাদেশের কুষ্টিয়া জেলার বর্ডার পার হয়ে ভারতের কেচুয়াডাঙ্গা ইয়ুথ ক্যাম্পে গিয়ে ভর্তি হন।
সেখানে অল্প কিছু দিন অবস্থান করার পর তাদেরকে ভারতীয় সেনাবাহিনী পরিচালিত মালদা জেলার গৌড়বাগান প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে প্রেরণ করা হয়। সেখানে আরও ১০/১৫ দিন অবস্থান করার পর মুক্তিযুদ্ধের উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য বাছাই করে আব্দুল হাইদের শিলিগুড়ির পানিঘাটা প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে প্রেরণ করা হয়। সেখানে প্রথমে ৩০ দিন গেরিলা প্রশিক্ষণ ও ১০ দিন এ্যাডভান্স প্রশিক্ষণ প্রদানের পর ভারতীয় সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে তুফানি ব্যাটেলিয়ন নামে একটা ব্যাটেলিয়ন গঠন করা হয়। আব্দুল হাই এই ব্যাটেলিয়নের চার্লি কোম্পানীতে অন্তভ্থর্ূক্ত হন। তাদের কোম্পানী কমান্ডার ছিলেন ভারতীয় সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন ডিএন ডিলন। ব্যাটেলিয়ন গঠনের পর ৭ নম্বর সেক্টর হেডকোয়ার্টার তরঙ্গপুর থেকে অস্ত্র ও গোলাবারুদ প্রদানের পর তাদের পশ্চিম দিনাজপুর জেলার হিলি সীমান্তের ডিফেন্সে প্রেরণ করা হয়। ডিফেন্সে এসে এই ব্যাটেলিয়নের মুক্তিযোদ্ধারা সীমান্তে ট্রেন্স ও বাঙ্কার কেটে নিয়মিত সৈনিকদের মত ২৪ ঘন্টা সেন্টি ডিউটি দেওয়া শুরু করেন। শত্রু ক্যাম্পের সম্বন্ধে তথ্য সংগ্েরহর জন্য তারা নিজেদের ক্যাম্প থেকে মাঝের মাঝেই বাংলাদেশের অভ্যন্তরে রেকি করতে বের হতেন। এই রেকির ফলাফলের উপর ভিত্তি করে তুফানি ব্যাটেলিয়নের মুক্তিযোদ্ধারা তৎকালীন রাজশাহী জেলার ফার্সিপাড়া পাকিস্তানি সেনা ক্যাম্প আক্রমণের পরিকল্পনা প্রণয়ন করেন।
ফার্সিপাড়া অপারেশন ঃ একদিন রাতের বেলায় ভারতীয় সেনাবাহিনীর পাশাপাশি তুফানি ব্যাটেলিয়নের মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানি সেনাদের ফার্সিপাড়া ক্যাম্প আক্রমণে বের হন। রাত ১২ টার সময় অকুস্থলে পৌছে কমান্ডারের নির্দেশ পাওয়ার সাথে সাথে মুক্তিযোদ্ধারা শত্রু ক্যাম্পের উপর বৃষ্টির মতো গুলি বর্ষণ শুরু করেন। শত্রুসেনারাও মেসিন গানের গুলি ও মর্টারের গোলাবর্ষণ করে তার প্রতিউত্তর দেওয়া শুরু করে। জীবনের প্রথম যুদ্ধের মর্টারের গোলার মুখোমুখি হয়ে মুক্তিযোদ্ধারা একটু ঘাবড়ে গেলেও তারা কোন ভয় পায়নি। উভয় পক্ষের মধ্যে প্রায় ১ ঘন্টা গোলাগুলি চলার পর কমান্ডারের নির্দেশে মুক্তিযোদ্ধারা অক্ষত অবস্থায় তাদের ক্যাম্পে ফিরে আসেন। ৩ ডিসেম্বর নিয়মিত যুদ্ধ শুরু হলে ভারতীয় সেনাবাহিনীর পাশাপাশি তুফানি ব্যাটেলিয়নের মুক্তিযোদ্ধারা দিনাজপুর জেলার ফুলবাড়ি রেল স্টেশন, রংপুর জেলার পলাশবাড়ি ও গোবিন্দগঞ্জে পাকিস্তানি সেনাদের পরাজিত করে বগুড়া শহরের উপকন্ঠে এসে হাজির হয়। বগুড়া ছিল পাকিস্তানি সেনাদের ডিভিশন হেডকোয়ার্টার। ১৩ ডিসেম্বর থেকে ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত সেখানে উভয় পক্ষের মধ্যে তুমুল যুদ্ধ চলার পর ১৬ ডিসেম্বর ঢাকায় পাকিস্তানি সেনারা আত্মসমর্পণের সাথে সাথে বগুড়ার যুদ্ধও থেমে যায়। এরই সাথে অভ্যুদয় ঘটে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের। যে দেশপ্রেমে বলীয়ান হয়ে আব্দুল হাইয়ের মতো মুক্তিযোদ্ধারা জীবন বাজি রেখে মুক্তিযদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, আজও তাদের বুকের গহীনে তা অক্ষত অবস্থায় জমা আছে।