গারো পাহাড়ের গদ্যে জিয়াউল হক

বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ আবুল বশর
আমি মোঃ আবুল বশর, এফ.এফ. বভারতীয় তালিকা নম্বর-২১৪৭৯, গেজেট নম্বর-বোয়ালখালি-৩৮২৩, লাল মুক্তিবার্তা নম্বর-০২০২০৩০২২, এমআইএস নম্বর-, মোবাইর নম্বর-০১৮১৮০০৭৮২৮, পিতা ঃ মকবুল আহমেদ, মাতা ঃ হাজেরা খাতুন, স্থায়ী ঠিকানা ঃ গ্রাম ও ডাকঘর কদুরখিল, উপজেলা ঃ বোয়ালখালি, জেলা ঃ চট্টগ্রাম। বর্তমান ঠিকানা ঃ ১৩৫/১, আব্দুল হাকিম লেন, কার্পাশগোলা, চকবাজার চট্টগ্রাম।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ শুরুর আগে আমি চট্টগ্রাম স্টীল মিল সিবিএর সেক্রেটারী ছিলাম। ১৯৬৯ সালের গণআন্দোলনের সময় আমার নেতৃত্বে চট্টগ্রাম স্টীল মিলের শ্রমিকরা স্টীল মিল অফিস ঘেরাও করে। এই ঘটনার পরই জেল থেকে মুক্তি পেয়েই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শ্রমিকদের সংগঠন শ্রমিক লীগ গঠনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। তার নির্দেশনা মোতাবেক শ্রমিক লীগের ৭ সদস্যবিশিষ্ট আহবায়ক কমিটি গঠন করা হয়। সেই আহবায়ক কমিটির আহবায়ক ছিলেন এমএ হান্নান। আমি ছিলাল কমিটির একজন তরুন সদস্য। ১৯৭০ সালের পাকিস্তান জাতীয় পরিষদ নির্বাচনের সময় চট্টগ্রাম স্টীল মিলের শ্রমিকরা একচেটিয়া ভাবে আওয়ামী লীগকে ভোট প্রদান করে। নির্বাচনে জয়লাভ করার পরও পশ্চিমা শাসকেরা আওয়ামী লীগের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে রাজি ছিল না। তাইতো ১৯৭১ সালের ১ মার্চ প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান আহুত জাতীয় পরিষদের অধিবেশন বন্ধ ঘোষণা করা হয়। প্রেসিডেন্টের এই অনৈতিক ঘোষণার সাথে সাথে চট্টগ্রাম স্টীল মিলের ম্রমিকরা রাস্তায় নেমে এসে বিক্ষোভ শুরু করে।
৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঢাকায় রেসকোর্স ময়দানের জনসভায় ভাষণ দিবেন, এই সংবাদ পেয়েই এমএ হান্নানের নেতৃত্বে চট্টগ্রাম থেকে আমরা বিশাল একটা বহর নিয়ে রেসকোর্স ময়দানের জনসভায় হাজির হয়ে লক্ষ জনতার মুহুমুর্হু জয় বাংলা স্লোগানের মধ্যে বঙ্গবন্ধুর দিক নির্দেশনামূলক ভাষণ শুনে স্বাধীনতার চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে চট্টগ্রামে ফিরে আসি। ফিরে এসেই স্টীল মিলের ৩০০ ম্রমিককে সামরিক প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু করলাম। ২৩ মার্চ সন্ধ্যায় আওয়ামী লীগ সভাপতি এম.আর সিদ্দিকীর বাসায় সিনিয়র নেতাদের একটা জরুরী সভা আহবান করা হয়। সেই সভায় আমার উপস্থিত থাকার সৌভাগ্য হয়েছিল। সভায় জানানো হয় চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্টের ইনচার্জ ব্রিগেডিয়ার মজুমদার নামে একজন বাঙালি অফিসার জানিয়েছেন, সোয়াত নামক জাহাজে পাকিস্তান থেকে প্রচুর পরিমান অস্ত্র এসেছে। সেই অস্ত্র খালাস হলে বাঙালিদের বাঁচানো যাবে না। তাই যে করেই হোক জাহাজ থেকে অস্ত্র খালাসে বাধা দিতে হবে। আমাকে অস্ত্র খালসে বাধা দেওয়া ও এমএ মজিদকে সেখানে একটা জনসভা করার দায়িত্ব দেওয়া হলো। ২৪ মার্চ চট্টগ্রাম স্টীল মিলে গিয়েই প্রথমে সিকিউরিটি অফিসার মেজর আফ্রিদির নিকট জমাকৃত ৪০টা বন্দুক ও রাইফেল নিয়ে তা প্রশিক্ষণরত ৩০০ শ্রমিকের মধ্যে বিতরণ করা হলো। তারপর স্টীলের রড কেটে হাতলাঠি বানিয়ে মিলের শ্রমিকসহ প্রায় ৫০,০০০ লোক অস্ত্র খালাসে বাধা দেওয়ার জন্য সোয়াত জাহাজ ঘেরাও করা হলো। জাহাজের সৈনিকরা আমাদের দিকে অস্ত্র তাক করে আছে। সেদিন সন্ধ্যার মধ্যে ব্রিগেডিয়ার মজুমদারকে ঢাকায় বদলী করে তার স্থলে ব্রিগেডিয়ার বেগকে পোস্টিং দেওয় হলো।
দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়েই ব্রিগেডিয়ার বেগ মেজর জিয়াউর রহমানকে অস্ত্র খালাসের দায়িত্ব প্রদান করলেন। ২৪ তারিখ সন্ধ্যায় জিয়াউর রহমান তার সৈনিকদের নিয়ে অস্ত্র খালাস করতে এলেন। আমার নেতৃত্বে হাজার হাজার শ্রমিক তা বাধা দেওয়ার জন্য প্রস্তুত। দুই পক্ষের মধ্যে শুরু হলো বাদানুবাদ। কিন্তু কোন প্রকার সুবিধা করতে না পেয়ে অস্ত্র খালাস না করেই জিয়াউর রহমান ফেরত গেলেন। ২৫ মার্চ রাতে পাকসেনারা চট্টগ্রাম ইবিআরসিতে আক্রমণ করে শত শত প্রশিক্ষণরত সৈনিককে হত্যা করে। ২৬ মার্চ সকালে এম.এ.আজিজের বাসায় গেলে তিনি আমাকে ১টি রিভলভার ও ২টি গ্রেনেড দিলেন। তাই নিয়ে আমি স্টীল মিলে চলে এলাম। একই দিন বিকেলে হান্নান সাহেবের সাথে দেখা করার জন্য ইবিআরসিতে গেলে ক্যাপ্টেন রফিক আমাকে বলেন, আমি এমএ আজিজ নামে কাউকে চিনি না। ইবিআরসিতে একটা অস্ত্রের গোডাউন ছিল। সেখান থেকে সবাই অস্ত্র নিয়ে যাচ্ছে দেখে আমিও কয়েকটা অস্ত্র নিয়ে পতেঙ্গায় চলে আসি। ২৭ মার্চ সন্ধ্যায় সৈন্যরা গুলি চালালে একজন ম্রমিকের ছেলে নিহত হয়। ২৮ তারিখ ভোরে নেভি গেট মসজিদে ফজরের নামাজ পড়তে গেলে একজন বয়সি মানুষকে গুলি করে হত্যা করা হয়। শহরের এমন থমথমে অবস্থা দেখে ২৮ মার্চ আমি বোয়ালখালিতে চলে যাই। ৩০ মার্চ চট্টগ্রাম ফিরে এসে ক্যাপ্টেন রফিকের ইপিআর বাহিনীকে সাহায্য করতে থাকি। ৩১ মার্চ দুপুরে পাকসেনারা ক্যাপ্টেন রফিকের অবস্থান কোর্ট বিল্ডিংয়ের উপর ট্যাঙ্ক ও মটারের গোলাবর্ষণ করে আক্রমণ চালায়। সেদিন রাত ৪টার সময় কোট চত্বরে গিয়ে আমরা ৫ জন পাকসেনার লাশ দেখতে পাই। সকালেই আমি আবার গ্রামে চলে আসি।
১১ এপ্রিল কালুরঘাট ব্রিজ পতনের পর আমরা কয়েক বন্ধু মিলে একটি বাহিনী গঠন করলাম। আমাদের সম্বল ৫/৭টা রাইফেল। তাই নিয়েই মাঝে মাঝে চট্টগ্রাম শহরের মধ্যে ছোটখাটো অপারেশন শুরু করলাম। জুন মাসে ভারত থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে ফিরে এসে ৩ জন মুক্তিযোদ্ধা আমাদের গ্রুপে যোগ দিল। এরই মধ্যে একটা গুজব রটে গেল ১৪ আগষ্ট কিছু একটা ঘটবে। আমাদের দলের মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে ২টি এন্টি ট্যাঙ্ক মাইন ছিল। ১৪ আগস্টকে সামনে রেখে আমরা একটা আক্রমণ পরিকল্পনা প্রণয়ন করলাম। পরিকল্পনা অনুযায়ী বোয়ালখালির বুমডন্ডি স্টেশনের পশ্চিমের ১৩ ও ১৪ নম্বর ব্রিজের রেল লাইনের নিচে এন্টি ট্যাঙ্ক মাইন পেতে দূরে গিয়ে অপেক্ষা করতে থাকলাম। সৌভাগ্যক্রমে ১৪ আগষ্টের উপহার হিসাবে এই মাইন বিস্ফোরণে আর্মি পেট্রোল টীমের ১৯ জন সৈন্য নিহত হয়। ৩ বগির পুরা ট্রেনটি লাইনচ্যুত হয়। এরই মধ্যে আমরা খবর পেলাম চট্টগ্রাম থেকে পিছু হটে এসে ইপিআরের একটি গ্রুপ বোয়ালখালি পাহড়ে অবস্থান করছে। তাদের সহযোগিতায় ২৮ আগষ্ট আমরা বোয়ালখালি থানা আক্রমণ করি। এই আক্রমণে ৩ জন পাকসেনা নিহত হয়।
এতো কিছু করছি, তবুও যেন আমরা মুক্তিযোদ্ধা না । সেই কষ্ট ঘোচাতে ৩০ আগষ্ট রামগড় সীমান্ত পার হয়ে আমি ভারতে প্রবেশ করে হরিণা ইয়ুথ ক্যাম্পে গিয়ে আশ্রয় গ্রহণ করি। সেখানে ১৫ দিন অবস্থানের পর মুক্তিযুদ্ধের উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য আমাদের বাছাই করে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের পালাটোনা প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে প্রেরণ করা হয়। সেখানে ৩০ দিন প্রশিক্ষণ শেষে আমাদের আবার হরিণা অপারেশন ক্যাম্পে ফিরিয়ে আনা হয়। এখান থেকে আমার নেতৃত্বে বোয়ালখালি থানার ২৩৩ জন মুক্তিযোদ্ধার একটা গ্রুপ গঠন করে আমাদের অস্ত্রও ও গোলাবাররুদ প্রদান করা হয়। অক্টোবর মাসের ১৫ তারিখ আমরা বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করি।
খেলারঘাটের যুদ্ধ ঃ গোপন সুত্রে খবর পেয়ে আমাদের গ্রুপের মুক্তিযোদ্ধারা কয়েক ভাগে ভাগ হয়ে কর্ণফুলি নদীর খেলারঘাট এলাকায় এ্যাম্বুস পেতে অপেক্ষা করতে থাকি। পাকসেনারা চট্টগ্রাম থেকে জাহাজ যোগে কর্ণফুলি পেপার মিলে যাচ্ছিল। শত্রুসেনাদের জাহাজটি আমাদের এ্যাম্বুসের ভেতরে প্রবেশ করতেই আমরা আক্রমণ শুরু করলাম। শত্রুরাও পাল্টা আক্রমণ চালালো। আমাদের আক্রমণে বেশ কিছু পাকসেনা ও সাধারণ নাবিক নিহত হয়। তারপর তারা পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। এর পরে আরও বেশ কিছু ছোট ছোট যুদ্ধে অংশগ্রহণ করার পর ১৬ ডিসেম্বর আমরা স্বাধীনতা লাভ করি। দেশের স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করেছি, এটাই আমার জীবনের সব চেয়ে বড় অর্জন এবং গর্ব করার বিষয়।