গারো পাহাড়ের গদ্যে জিয়াউল হক

বীর মুক্তিযোদ্ধা ভারত চন্দ্র বড়–য়া
বীর মুক্তিযোদ্ধা ভারত চন্দ্র বড়–য়া, এফ.এফ. ভারতীয় তালিকা নম্বর-২০৯৭৯, লাল মুক্তিবার্তা নম্বর-০২০৩০৩০৭১০, এমআইএস নম্বর-০১১৫০০০০২৭২, মোবাইল নম্বর-০১৮৮৯৮২৩২৩৪, পিতা ঃ ভুবন মোহন বড়–য়া, মাতা ঃ শৈলবালা বড়–য়া, স্থায়ী ঠিকানা ঃ গ্রাম ঃ জাহানপুর, ডাকঘর ঃ ফতেপুর, উপজেলা ঃ ফটিকছড়ি, জেলা ঃ চট্টগ্রাম। বর্তমান ঠিকানা ঃ বাসা নম্বর-৩৮৫/৩৫১২, ভারত চন্দ্র বড়–য়ার বাড়ি, ৪ নম্বর গলি, মহল্লা ঃ আদর্শপাড়া, ওয়ার্ড নম্বর-৮, ডাকঘর-পিটিআই-৪২০৯, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন, চট্টগ্রাম।
৩ ছেলে ৪ মেয়ের মধ্যে ভারত চন্দ্র বড়–য়া ছিলেন বাবা মায়ের তৃতীয় সন্তান। স্কুল জীবন থেকেই তিনি ভালো ফুটবল খেলোয়ার হিসাবে যেমন সুনাম অর্জন করেন তেমনি ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে জড়িত হয়ে রাজনৈতিক সচেতন হয়ে উঠতে খাকেন। ১৯৭১ সালে তিনি চট্টগ্রাম পলিটেকনিক ইনিস্টিটিউটের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র এবং কলেজ শাখা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন। ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে জড়িত থাকার সুবাদে তিনি ১৯৬৯ সালে স্বৈরাচারী আইয়ুব সরকার বিরোধী গণআন্দোলনে অংশগ্রহণ এবং ১৯৭০ সালের পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের নির্বাচনের সময় এলাকার আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রাথর্ীর পক্ষে নির্বাচনী প্রচার কাজে সক্রিয় ভাবে অংশগ্রহণ করেন। সেই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়লাভ করার পরও তাদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর না করে সরকার অযথা বিলম্ব করতে থাকেন। যার ফলে দেশের আপামর মানুষ ক্ষিপ্ত হয়ে সরকারের বিরুদ্ধে প্রচন্ড গণআন্দোলন গড়ে তোলেন। শুধু তাই না বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশে সরকারের বিরুদ্ধে শুরু হয় অসহযোগ আন্দোলন। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানের এক বিশাল জনসভায় বঙ্গবন্ধু তার নীতিনির্ধারণী ভাষণ প্রদান করেন। তিনি তার ভাষণে এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম বলে ঘোষণা দেওয়র পর থেকেই বাংলাদেশের মানুষ স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন এবং সেই লক্ষ্য পূরণের উদ্দেশ্যে মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি শুরু করে দেন। পরবতর্ী কার্যক্রম নিধার্রণের লক্ষ্যে ভারত চন্দ্র বড়–য়ারা তখন ছাত্রনেতাদের সাথে নিয়মিত আলোচনা চালিয়ে যেতে থাকেন।
২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনারা সারা বাংলাদেশের মানুষের উপরে আক্রমণ করে নির্বিচারে মানুষ হত্যা এবং মানুষের বাড়িঘরে আগুন দিয়ে শহর, বন্দর, গ্রাম জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দিতে শুরু করে। কলেজ বন্ধ থাকা সত্বেও আন্দোলনের স্বার্থে ভারত চন্দ্র বড়–য়ারা তখন কলেজ হোস্টেলে অবস্থান করছিলেন। ২৬ মার্চ রাতের আঁধারে তিনি হোস্টেল ছেড়ে পালিয়ে গ্রামে বাড়ি চলে যান। গ্রামে অবস্থান কালে দেশের এই চরম মুহুর্তে করণীয় নির্দারণের জন্য এলার সকল যুবক ছেলেদের সাথে আলোচনা শুরু করেন। আলোচনার সিদ্ধান্ত মোতাবেক মুক্তিযুদ্ধে যোগদানের উদ্দেশ্যে ১৫ জন যুবক ছেলেকে সাথে নিয়ে তিনি ভারতের পথে যাত্রা করেন। তারপর ফেনী নদী পার হয়ে ভারতের সাব্রুমে গিয়ে প্রথমে শরনাথী শিবিরে আশ্রয় গ্রহণ করেন। সেখানে প্রায় ১ মাস অবস্থান করার পর মে মাসের মাঝের দিকে মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ গ্রহণের জন্য তিনি হরিণা ইয়ুথ ক্যাম্পে গিয়ে ভর্তি হন। সেখানে আরও ২০ দিন অবস্থান করার পর মুক্তিযুদ্ধের উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য তাদের ২৫০ জন যুবককে বাছাই করে আগরতলা হয়ে তাদের ভারতের আসাম রাজ্যের গভীন অরণ্যের মধ্যে অবস্থিত লোহারবন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে প্রেরণ করা হয়। ভিনদেশে আত্মীয় স্বজনহীন নতুন পরিবেশে কঠোর প্রশিক্ষণের ধকল সইতে প্রতিটা মুক্তিযোদ্ধাকেই অনেক কষ্ট করতে হতো। তারপরও স্বাধীনতার চেতনা বুকে নিয়ে তারা সকল দুঃখ কষ্টকে হাসি মুখে মেনে নিয়ে ১ মাস ১০ দিন প্রশিক্ষণ শেষে ভারত চন্দ্রের নেতৃত্বে একটা মুক্তিযোদ্ধা প্লাটুন গঠন করে তাদের অস্ত্র ও গোলাবারুদ প্রদান করা হয়। তারপর তাদের আবার হরিণা অপারেশন ক্যাম্পে ফিরিয়ে আনা হয়।
ভারত চন্দ্র বড়–য়ার নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধা দলটিকে আগষ্ট মাসের মাঝের দিকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রেরণ করা হয়। দলটি তখন সাবরুম থেকে রামগড় হয়ে ফটিকছড়ি থানার জাহানপুর গ্রামের পাশের বার্মাছড়ি পাহাড়ি এলাকায় অবস্থিত বকিতুল্লাহর খামারে সেল্টার গ্রহণ করেন।
রাউজান থানার আমিরহাটের যুদ্ধ ঃ আমিরহাটের ফুড গোডাউনে পাকিস্তানি সেনাদের ক্যাম্প ছিল। ভারতচন্দ্রদের অবস্থান ছিল আমির হাটের পাশের সত্তার খাল এলাকায়। নভেম্বর মাসের প্রথম দিকে রাতের আঁধারে কয়েক গ্রুপের প্রায় ১৫০ নজন মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে ভারত বড়–য়ারা ৩ দিক থেকে শত্রু ক্যাম্পের উপর আক্রমণ পরিচালনা করেন। রাত ১২টা থেকে ভোর ৪টা পর্যন্ত উভয় পক্ষের মধ্যে তুমুল যুদ্ধ চলার পর পংকজ বড়–য়া ও আব্দুল মান্নান নামের ২ জন মুক্তিযোদ্ধা শহিদ হওয়ার পর তারা নিজেদের প্রত্যাহার করে নেন। এই যুদ্ধে শত্রুসেনারাও অনেক ক্ষয়ক্ষতির সন্মুখীন হয়। এই যুদ্ধের আগে তারা পাকিস্তানি সেনাদের সাথে সন্মুখ যুদ্ধ এবং নাজিরহাট ব্রিজ পাহারারত শত্রুসেনাদের বাঙ্কারে গ্রেডে বিস্ফোরণ গটালে তার পরের দিন ব্রিজ পাহারা বন্ধ করে পরের দিন শত্রুরা এলাকা ছেড়ে চলে যায়। ভারত চন্দ্র বড়–য়াদের মতো বীর মুক্তিযোদ্ধাদের চরম আত্মত্যাগের বিনিময়েই অর্জিত হয়েছে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। তাই সকল মুক্তিযোদ্ধাদেরকে আমাদের যথাযথ সম্মান দেওয়া উচিৎ।