গারো পাহাড়ের গদ্যে জিয়াউল হক

বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ ফজলুল রহমান

বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ ফজলুল রহমান, এফ.এফ. ভারতীয় তালিকা নম্বর-১৪৩৬৯, গেজেট নম্বর-নেত্রকোনা সদর-২৮, লাল সুক্তিবার্তা নম্বর-০১১৬০১০১৯৯, এমআইএস নম্বর-০১৭২০০০৩৬৪২, মোবাইল নম্বর-০১৭৪৩২৩৪৯১৬, পিতা ঃ চাদ আলী, মাতা ঃ ফুলবানু, স্থায়ী ঠিকানা ঃ গ্রাম ঃ সিংরাজান, ডাকঘর ঃ টাকুরাকুনী, উপজেলা ঃ নেত্রকোনা সদর, জেলা ঃ নেত্রকোনা। বর্তমান ঠিকানা ঃ ঐ।
বাবা মায়ের ৯ পুত্র ও ৩ কন্যা সন্তানের মধ্যে ফজলুর রহমান ছিলেন তৃতীয়। ১৯৬৮ সালে এসএসসি পরীক্ষা পাশ করেন। স্কুলে পড়াকালীন সময়ে ইন্টার স্কুল ফুটবল দলের সদস্য হিসাবে লেখাধুলায় তিনি অনেক সুনাম অর্জন করেন। এসএসসি পরীক্ষা পাশের পর আর লেখাপড়া না করে বাবার সাহায্য নিয়ে এই অল্প বয়সেই তিনি নিজেই বাড়ির পাশের বাজারে একটা মুদিখানা দোকান চালু করেন। ছাত্র জীবনের খেলোয়ার হিসাবে সুনাম অর্জন, এবং অতি অল্প বয়সে বাবামায়ের সংসারের বোঝা হয়ে না থেকে নিজেই ব্যাবসা শুরু করার মাঝে ফজলুর রহমানের চরিত্রের একটা বিশেষ দিক লক্ষ্য করা যায়। আর তা হলো তিনি ছিলেন সাহসী, কর্মঠ এবং স্বাধীনচেতা মানুষ। গ্রামের বাজারে দোকানদারী করার সময় তিনি আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে জড়িত হয়ে ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সদস্য নিবাচিত হন। ১৯৭০ সালের পাকিস্তান জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে নেত্রকোন সদর আসনে আওয়ামী লীগ মনোনীত এমএনএ প্রাথর্ী আব্বাসউদ্দিনের পক্ষে নির্বাচনী প্রচার কাজে সক্রিয় ভাবে অংশগ্রহণ করেন। এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ একক সংখ্যাগষ্ঠিতা অর্জন করার পরও তাদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর না করায় সারা বাংলাদেশে প্রচন্ড গণআন্দোলন শুরু হয়। দেশের এহেন উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানের জনসভায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহগমান এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম বলে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ডাক দেন। বঙ্গবন্ধুর এই ডাকে সাড়া দিয়ে ফজলুল রহানসহ সারা বাংলাদেশের মানুষ স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রস্তুতি শুরু করে দেন।
২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনারা সারা বাংলাদেশের উপর আক্রমণ করে মানুষ হত্যাসহ মানুষের বাড়িঘরে আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দিতে থাকে। শত্রুসেনাদের এই নৃশংস অত্যাচারের প্রতিবাদ ও মুক্তিযুদ্ধে যোগদানের জন্য ৮ এপ্রিল ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সভাপতি আব্দুল খালেকের নেতৃত্বে ফজলুল রহমানসহ ৩৫ জন যুবক তৎকালীন ময়মনসিংহ জেলার কমলাকান্দা থানার বর্ডার পার হয়ে ভারতের মহাদেব নামক স্থানে গিয়ে একটা অস্থায়ী ক্যাম্পে আশ্রয় গ্রহণ করেন। সেখানে কয়েক দিন থাকার পর লংলা হয়ে তারা বাগমারা ইয়ুথ ক্যাম্পে গিয়ে ভর্তি হন। বাগমারায় ১৮ দিন অবস্থান করার পর মুক্তিযুদ্ধের উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য ফজলুল রহমানদের বাছাই করে তুরা উচ্চতর প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে প্রেরণ করা হয় হয়। ফজলুল রহমানরা ছিলেন এই কেন্দ্রের প্রথম ব্যাচের সদস্য। তাই ভারতীয় সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে পাহাড়ের জঙ্গল কেটে তাবু টাঙিয়ে নিজেদের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র প্রস্তুত করার পর তাদের প্রশিক্ষণ শুরু হয়। সেখানে ৩০ দিন প্রশিক্ষণ শপথ প্যারেড পরিচালনা করার পর আব্দুল গণির নেতৃত্বে নেত্রকোনা সাব-ডিভিশনের ২৫ জন মুক্তিযোদ্ধার একটা গ্রুপ গঠন করে ফজলুল রহমানদের অস্ত্র ও গোলাবারুদ প্রদান করা হয়।
তারপর মুক্তিযোদ্ধা গ্রুপটিকে ১১ নম্বর সেক্টর হেডকোয়ার্টার ডালুতে প্রেরণ করা হয়। সেখান থেকে আব্দুল গণির নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধা গ্রুপটি বাংলাদেশের অভ্যন্তরে বিভিন্ন শত্রু ক্যাম্পে আক্রমণ পরিচালনা করে আবার নিজেদের ক্যাম্পে ফিরে আসতেন। এই সময়ে তারা এক্সপ্লোজিভ বিস্ফোরণ ঘটিয়ে হালুয়াঘাট থানার কাটাখালি ব্রিজ ও টিনানী ফেরিঘাট ধ্বংস করেন। তার কিছু দিন পর আব্দুল গণির নেতৃত্বে ফজলুর রহমানদের মুক্তিযোদ্ধা গ্রুপের ৫০ জন মুক্তিযোদ্ধা হালুয়াঘাট থানার বান্দরঘাটা পাকসেনা ক্যাম্প আক্রমণ করে ১৮ জন পাকিস্তানি সেনাকে হত্যা করে। এই যুদ্ধে ৭ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। নভেম্বর মাসের মাঝের দিকে ভারতীয় সেনাবাহিনীর ১০০০ সৈন্য ও ফজলুর রহমানদের গ্রুপসহ মোট ৫০০ জন মুক্তিযোদ্ধার এক বিশাল বাহিনী নিয়ে যৌথ বাহিনী পাকিস্তানি সেনাদের হালুয়াঘাট থানার তেলিখালি পাকিস্তানি সেনা ক্যাম্প আক্রমণ করেন । এখানে উভয় পক্ষের মধ্যে তুমুল যুদ্ধ সংগঠিত হয়। । এই যুদ্ধে ২৪০ জন পাকিস্তানি সেনা নিহত হয়। যৌথ বাহিনীর ৬১ জন সেনা শহীদ হন।
ডিসেম্বর মাসে নিয়মিত যুদ্ধ শুরু হলে ফজলুর রহমানদের মুক্তিযোদ্ধা গ্রুপের ৪০ জন মুক্তিযোদ্ধাকে ৬ বিহার রেজিমেন্টের সাথে যুক্ত করা হয়। হালুয়াঘাট থেকে যুদ্ধ করে পাকসেনাদের পরাজিত করে তারা ময়মনসিংহ শহরে এসে হাজির হন। সেখান থেকে তাদের ঢাকা অভিমুখে প্রেরণ করা হয়। ময়মনসিংহ থেকে যাত্রা করে শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে করতে ঢাকা শহরের ৬ মাইল দূরে থাকা অবস্থায় ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি সেনারা আত্মসমর্পণ করলে ফজলুর রহমানদের যুদ্ধ শেষ হয়। একই সাথে বাংলাদেশও স্বাধীনতা লাভ করে। ফজলুর রহমানদের মতো বীর মুক্তিযোদ্ধারা জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছিল বলেই আজ আমরা স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসাবে পৃখিবীর বুকে মাথা উঁচু করে চলতে পারি। তাই সেই সকল বীর যোদ্ধাদের আমাদের যথাযথ সম্মান ও মর্যাদা প্রদান করা উচিত।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।