গারো পাহাড়ের গদ্যে জিয়াউল হক

বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ ঈসা রুহুল্লা

বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ ঈসা রুহুল্লা, এফ.এফ. গেজেট নম্বর ভোলা সদর-২১০৩, সমন্বিত তালিকা নম্বর-০১০৯০০০০৫৩৭, মোবাইল নম্বর-০১৭১০৮০৫৪১৯, পিতা ঃ জয়নুল আবেদিন, মাতা ঃ হাজেরা আবেদিন, স্থায়ী ঠিকানা ঃ বাড়ি নম্বর-৭১, রোড নম্বর-১১, কসমোপলিটন আবাসিক এলাকা পাঁচলাইশ, চট্টগ্রাম। বর্তমান ঠিকানা ঃ ঐ।
৬ ছেলে ৪ মেয়ের মধ্যে ঈসা রুহুল্লা ছিলেন বাবা মায়ের জ্যেষ্ঠ সন্তান। ১৯৭১ সালে তিনি চট্টগ্রাম কলেজের উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণির ছাত্র এবং ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন। তিনি যেমন ১৯৬৯ সালে স্বৈরাচারী আইয়ুব সরকার বিরোধী গণআন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন তেমনি ১৯৭০ সালের পাকিস্তান জাতীয় পরিষদ নির্বাচনের সময় তাদের এলাকায় আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রাথর্ীর পক্ষে নির্বাচনী প্রচার কাজে সক্রিয় ভাবে অংশগ্রহণ করেন। সেই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়লাভ করার পরও পাকিস্তানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান তাদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর না করার উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহবান করেও ১৯৭১ সালের ১ মার্চ পুনরায় তা স্থগিত ষোষণা করেন। প্রেসিডেন্টের এই অন্যায় ঘোষণায় প্রতিবাদে বাংলাদেশের আপামর মানুষ রাস্তায় নেমে এসে সরকারের বিরুদ্ধে প্রচন্ড গণআন্দোলন গড়ে তোলেন। আন্দোলনের পরবতর্ী কর্মসূচি ঘোষণার জন্য ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মমুজিবুর রহমান ঢাকার রেসকোর্স ময়দানের এক জনসভার আয়োজন করেন। সেই জনসভার ভাষণে তিনি এবারের সংগ্রআম আমাদেও স্বাধীনতার সংগ্রাম বলে ঘোষণা দেওয়ার পর থেকেই বাংলাদেশের মানুষ স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন। সারা দেশে শুরু হয়ে যায় মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি। ঈসা রুহুল্লা ও তার বন্ধুরা তখন মিটিং আর মিছিল করে দেশের যুব সমাজকে স্বাধীন বাংলাদেশের পক্ষে উদ্বুদ্ধ করার কাজ শুরু করেন।
২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনারা সারা বাংলাদেশের উপর আক্রমণ চালিয়ে নির্বিচারে মানুষ হত্যা শুরু করে। সেই দিন মাঝরাতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়ার পর পরই পাকিস্তানি সেনাদের হাতে গ্রেফতার হন। বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা সর্বপ্রথম চট্টগ্রাম শহরে এসে পৌছানোর পর বেঙ্গল রেজিমেন্ট এবং ক্যাপ্টেন রফিকুল ইসলামের নেতৃত্বে ইপিআর জওয়ানেরা শত্রুসেনাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু করেন। তারপর চট্টগ্রাম কালুরঘাট বেতার থেকে প্রথমে আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুল হান্নান ও পরে মেজর জিয়াউর রহমানের কন্ঠে বঙ্গবন্ধুর সেই স্বাধীনতার ঘোষণা পূনঃপ্রচারিত হয়। চট্টগ্রাম প্রতিরোধ যুদ্ধে সবচেয়ে বড় ভূমিকা কাখে ক্যাপ্টেন রফিকুল ইসলামের নেতৃত্বে ইপিআর সদস্যরা। ঈসা রুহুল্লার পিতা সুবেদার মেজর জয়নুল আবেদিন ছিলেন ক্যাপ্টেন রফিকুল ইসলামের টুআইসি। প্রতিরোধ যুদ্ধে তাই সুবেদার মেজর জয়নুল আবেদিনের ভূমিকাও উল্লেখ করার মতো। শত্রুসেনাদের যুগপত কামান ও বিমান আক্রমণের মুখে প্রতিরোধযোদ্ধারা আস্তে আস্তে সীমান্তের দিকে পিছু হটতে থাকেন। দেশের সঙ্কটজনক অবস্থার কথা বিবেচনা করে এপ্রিল মাসের মাঝের দিকে জয়নুল আবেদিন তার ২ ছেলেকে সাথে নিয়েই সীমান্ত পার হয়ে ভারতের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে। বাবার সাথে ভারতে প্রবেশ করে ঈসা রুহুল্লা সাবরুম হয়ে হরিণা গিয়ে পৌছান।
হরিণা ইয়ুথ ক্যাম্প তখনও তৈরি হয়নি। আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুল হান্নান, আব্দুল মান্নান ও এল.কে.সিদ্দিকীর যৌথ প্রচেষ্টায় ক্যাম্পের কার্যক্রম শুরু হয়। মুক্তিযুদ্ধে যোগদানের প্রত্যূাশা নিয়ে প্রথম থেকেই ঈসা রুহুল্লা ক্যাম্পে ভর্তি হন। সেখানে দেড় মাস অবস্থান করার পর জুন মাসের প্রথম দিনেক মুক্তিযুদ্ধের উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য বাছাই করে ঈসা রুহুল্লাদের আসাম রাজ্যের ওম্পিনগর প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে প্রেরণ করা হয়। প্রথম ব্যাচের মুক্তিযোদ্ধা হওয়ায় তাদের নিজ হাতে পাহাড়ের জঙ্গল সাফ করে প্রশিক্ষণ কেন্দ্র প্রস্তুত করতে হয়। তারপর শুরু হয় তাদের কঠোর সামরিক প্রশিক্ষণ।
সেখানে সফলতার সাথে ৩০ দিন প্রশিক্ষণ শেষে তাদের আবার হরিণা ক্যাম্পে ফিরিয়ে আনা হয়। ঈসা রুহুল্লার বাবা সুবেদার মেজর জয়নুল আবেদিন ক্যাপ্টেন রফিকুল ইসলামের অধীনে সীমান্তে তখনও জীবন মরণ যুদ্ধে লিপ্ত। এই খবর হরিণা ইয়ুথ ক্যাম্প কতৃপক্ষের অজানা ছিল না। বাবা ছেলেকে একসাথে এই বিপদের মধ্যে ঠেলে দেওয়া যায় না। তাই ক্যাম্প কতৃপক্ষ তাকে নতুন দায়িত্ব দিয়ে সেখানেই রেখে দিলেন। তার নতুন দায়িত্ব হলো প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের হরিণা ক্যাম্প থেকে বৈষ্ণবপুর নিয়ে গিয়ে সেখানে অবস্থান করে রোড ক্লিয়ারেন্স পাওয়ার পর তাদের বাংলাদেশের ভেতরে মাচারিপাড়া পর্যন্ত পৌছিয়ে দেওয়া। মাঝে মাঝে তাকে তাইদং হয়ে ফটিকছড়ি পর্যন্ত যেতে হতো। যে কোন সময় শত্রুসেনাদের এ্যাম্বুসে পড়ার কথা ভেবে যাত্রাপথের প্রতিটা বাঁকে তার বুক দুর দুর করতো। জুলাই মাস থেকে শুরু করে ডিসেম্বর মাসে যুদ্ধ শেষ হওয়ার আগে পর্যন্ত প্রতি সপ্তাহে তাকে অন্তত ৪ দিন এই বিপদসংকুল পথে চলতে হতো। তার পর আসে বাঙালিতের সেই চির আকাঙ্ক্ষিত বিজয়ের দিন ১৬ ডিসেম্বর। ঈসা রুহুল্লার মতো বীর মুক্তিযোদ্ধারা যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছিল বলেই আজ আমরা অর্থনৈতিক ভাবে সফল এক নতুন বাংংলাদেশকে দেখতে পাচ্ছি।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।