গারো পাহাড়ের গদ্যে জিয়াউল হক

বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ আব্দুল গফুর

বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ আব্দুল গফুর, এফ.এফ. এফ.এফ.নম্বর-৭৬০০, গেজেট নম্বর পাবনা সদর-০৯৬, লাল মুক্তিবার্তা নম্বর-০৩১১০১০২০১, সমন্বিত তালিকা নম্বর – ০১৭৬০০০১৩১৩, মোবাইল নম্বর-০১৭৯৭২৭৯২২০, পিতা: আকছেদ আলী সরদার, মাতা: আমেনা বেগম। স্থায়ী ঠিকানা: গ্রাম: চর প্রতাপপুর, ডাকঘর: বি.পি.নাজিরপুর, উপজেলা ও জেলা: পাবনা। বর্তমান ঠিকানা: গ্রাম: চক পৈলানপুর, ১২ নম্বর ওয়ার্ড, পাবনা পৌরসভা, পাবনা।
৬ ছেলে ও ২ মেয়ের মধ্যে আব্দুল গফুর ছিলেন বাবা মায়ের ৪র্থ সন্তান। ১৯৭১ সালে তিনি পাবনা শহরের আর.এম.একাডেমিতে ১০ম শ্রেণির ছাত্র ও ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন। ১৯৭০ সালের পাকিস্তান জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়লাভ করার পরও পাকিস্তানের তৎকালীন সামরিক প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান তাদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে রাজি ছিলেন না। তাইতো নানা অযুহাতে তিনি সময়ক্ষেপন করতে থাকেন। নির্বাচনে জয়লাভ করার পর থেকেই একতাবদ্ধ বাঙালি জাতি যেন আরও সাহসী হয়ে ওঠেন। তারা রাস্তায় নেমে এসে সরকারের বিরুদ্ধে প্রচন্ড গণআন্দোলন গড়ে তোলেন। দেশের এই টালমাটাল অবস্থার মধ্যে ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঢাকার রেসকোর্স ময়দানের এক বিশাল জনসভায় ভাষণ প্রদান করেন। তিনি তার ভাষণে যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুকে মোকাবেলার আহবান জানান। বঙ্গবন্ধুর এই আহবানের পর বাংলাদেশের মানুষ স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন। সারা দেশে শুরু হয়ে যায় মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি। আব্দুল গফুর তখন বন্ধুদের সাথে নিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের পক্ষে প্রচার কাজ শুরু করে দেন।
২৫ মার্চ পাতে পাকিস্তানি সেনারা সারা বাংলাদেশের উপর আক্রমণ করে মানুষ হত্যার পাশাপাশি মানুষের বাড়িঘরে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিতে শুরু করে। সেদিন মধ্যরাতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়ার পর পরই পাকিস্তানি সেনাদের হাতে গ্রেফতার হন। তিনি গ্রেফতার হলেও তার নির্দেশনা অনুযায়ী সারা বাংলাদেশে প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। প্রথম দিকে এই প্রতিরোধযুদ্ধের কিছুটা সফলতা দেখা গেলেও সামরিক প্রশিক্ষণ ও আধুনিক অস্ত্রের অভাবে তা স্তিমিত হয়ে পড়ে। ১৭ এপ্রিল প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার শপথ গ্রহণ এবং স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র চালু হওয়ার পর খুলে যায় নতুন দিগন্ত। প্রবাসী সরকার তখন মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য প্রশিক্ষণ ও আধুনিক অস্ত্রের যোগান দিতে শুরু করেন এবং স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অনুষ্ঠানের মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধাদের নানা গৌরবগাথা প্রচার হতে থাকে। এই ভাবে দিনে দিনে মুক্তিযুদ্ধ আরও বেগবান হতে থাকে। মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ প্রদান করা হচ্ছে এই সংবাদ পেয়েই আব্দুল গফুর দেশ ছেড়ে ভারতের পথে যাত্রা করেন। তারপর অনেক কষ্ট করে পায়ে হেঁটে বাংলাদেশের কুষ্টিয়া জেলার বর্ডার পার হয়ে ভারতের নদীয়া জেলার কেচুয়াডাঙ্গা যুব শিবিরে গিয়ে ভর্তি হন। সেখানে কিছু দিন অবস্থান করার পর মুক্তিযুদ্ধের উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য বাছাই করে আব্দুল গফুরদের শিলিগুড়ির পানিঘাটা প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে প্রেরণ করা হয়।
আত্মীয়স্বজনহীন ভিন দেশে প্রশিক্ষণ কালীন সময়ে পাকিস্তানি সেনাদের অন্যাচার ও নির্যাতনের স্মৃতি এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যতের চিন্তায় মুক্তিযোদ্ধারা প্রায়ই উতলা হয়ে উঠতো। কিন্তু দেশমাতৃকাকে শত্রুমুক্ত করার প্রতিজ্ঞায় বলিয়ান হয়ে তারা সফলতার সাথে ৩০ দিনের প্রশিক্ষণ সমাপ্ত করেন। প্রশিক্ষণ শেষে ৭ নম্বর সেক্টর হেডকোয়ার্টার তরঙ্গপুর এসে আব্দুর রশিদের নেতৃত্বে একটা মুক্তিযোদ্ধা দল গঠন করে আব্দুল গফুরদের অস্ত্র ও গোলাবারুদ প্রদান করা হয়। তারপর তাদের বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রেরণ করা হয়। ভারত থেকে যাত্রা করে এই মুক্তিযোদ্ধা দলটি পাকশির রূপপুর হয়ে ঈশ্বরদী থানার কামালপুর গ্রামে সেল্টার গ্রহণ করেন।
সানিকদিয়াড় চরের যুদ্ধ ঃ মুক্তিযোদ্ধারা বাংলাদেশের ভেতরে প্রবেশ করেই জানতে পারেন নকশালরা শ্রেণিশত্রু খতমের নামে নিরিহ মানুষ হত্য এবং অবস্থাপন্ন মানুষের সম্পদ লুট করা শুরু করেছে। মুক্তিযোদ্ধারা প্রথমেই নকশালদের শায়েস্তা করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। সিদ্ধান্ত মোতাবেক বেশ কিছু যুদ্ধে তারা নকশালদের পরাজিত করার পর সকল নকশালরা সানিকদিয়াড় চরে গিয়ে আশ্রয় গ্রহণ করেন। সানিকদিয়াড় চর ছিল নকশাল নেতা টিপু বিশ্বাসের গ্রামের বাড়ি। তখন এলাকার সকল মুক্তিযোদ্ধা গ্রুপ মিলে নকশালদের সানিকদিয়াড় চরের ক্যাম্প আক্রমণ করা হয়। ভোর থেকে যুদ্ধ চলার মুক্তিযোদ্ধারা যখন বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে, ঠিক তখনই ট্রাক ভর্তি পাকিস্তানি সেনারা এসে নকশালদের পক্ষে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। তখন মুক্তিযোদ্ধাদের পিছু হটে আসা ছাড়া কোন পথ খোলা ছিলনা। তারপর এই মুক্তিযোদ্ধা দলটি সুজানগর থানার আমিন বাজার এলাকায় সেল্টার গ্রহণ করেন। সেখান থেকে ১৩ ডিসেম্বর খেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত সুজানগর থানা মুক্ত করার যুদ্ধে অংশগ্রহণ করার পর বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ কবরে। যে দেশপ্রেম বুকে নিয়ে আব্দুল গফুর মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন, আজও তা তার অন্তরে লালন করে যাচ্ছেন।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।