গারো পাহাড়ের গদ্যে জিয়াউল হক

বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ আনোয়ারুল ইসলাম

আমি মোঃ আনোয়ারুল ইসলাম, এফ.এফ. এফ.এফ.নম্বর-৯৮৪৫, গেজেট নম্বর-ঈশ্বরদী – ৬৫৭, লাল মুক্তিবার্তা নম্বর – ০৩১১০২০২৬৭, এমআইএস নম্বর – ০১৭৬০০০১৩৩৫
মোবাইল নম্বর – ০১৭১৮৫৮৪৮৫১
পিতা: ইয়াজউদ্দিন শাহ, মাতা: রোকেয়া বেগম

স্থায়ী ঠিকানা: গ্রাম – চরগড়গড়ি, ডাকঘর –  বাঁশেরবাদা, উপজেলা – ঈশ্বরদী, জেলা – পাবনা, বর্তমান ঠিকানা – ঐ।

১৯৭১ সালে আমি পাবনা জেলার ঈশ্বরদী থানার বাঁশেরবাদা হাই স্কুল থেকে এস.এস.সি পরীক্ষা দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। ভালো ফলাফলের আশায় আমি তখন ঈশ্বরদীর বিহারি কলোনীতে থেকে পরীক্ষার কোচিং করছিলাম।  ১৯৭০ সালের পাকিস্তান জাতীয় পরিষদ নির্বাচনের পর থেকেই দেশের অবস্থা দিনে দিনে উত্তপ্ত হয়ে উঠছিল। ১৯৭১ সালের ১ মার্চ ইয়াহিয়া খান আহুত জাতীয় পরিষদেও অধিবেশন বন্ধ ঘোষণা করার সাথে সাথেই সারা বাংলাদেশে প্রচন্ড গণআন্দোলন শুরু হয়। ৭ মার্চ  রেসকোর্স ময়দানের জনসভায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম বলে ভাষণ দেওয়ার পর থেকেই সারা দেশে মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি শুরু হয়ে যায়। আমরা তখন ঈশ্বরদী এসএম স্কুল মাঠে  খাইরুজ্জামান বাবু ভায়ের নেতৃত্বে সামরিক প্রশিক্ষণ নিতে শুরু করি।  ২৪ মার্চ পর্যন্ত সেই প্রশিক্ষণ কার্যক্রম  ভালো ভাবেই চলে। ২৫ মার্চ রাতে পাকসেনারা সারা বাংলাদেশে আক্রমণ করে নির্বিচারে মানুষ হত্যা শুরু করে।  ঈশ্বরদী ছিল বিহারি প্রধান এলাকা। আমি বিহারি কলোনীর যে বাড়িতে থাকতাম, সেই রাতেই বিহারিরা বাড়ির মালিককে স্বপরিবারে হত্যা করে তাদের লাশ বাড়ির সামনের ইন্দারাতে ফেলে দেয়। সে রাতে এক বন্ধুর বাসায় থাকায় সৌভাগ্যক্রমে আমার জীবন রক্ষা পায়।  এই ঘটনার পর আমি বিহারি কলোনি থেকে বাবুপাড়ায় এসে ৪/৫ দিন থাকার পর গ্রামের বাড়িতে চলে আসি। গ্রামে এসেও শান্তিতে থাকতে পারলাম না। কারণ তখন আমাদের এলাকায় নকশালদের অত্যাচার শুরু হয়ে গেছে।

তাই জুন মাসের প্রথম দিকে আমি মুক্তিযুদ্ধে যোগদানের আশায় ভারতের নদীয়া জেলার কেচুয়াডাঙ্গা ইয়ুথ ক্যাম্পে গিয়ে হাজির হই। কিন্তু ক্যাম্পে তখন কলেরা রোগ শুরু হয়েছিল। তাই কলেরার ভয়ে আবার গ্রামে ফিরে আসতে বাধ্য হই। আমি যেদিন গ্রামে ফিরে এলাম, ঠিক সেই দিনই পাকসেনারা সাঁড়া ঘাটে আক্রমণ পরিচালনা করে । এরই মধ্যে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধারা আমাদের গ্রামে এসে সেল্টার গ্রহণ করে। তখন আমি তাদের সাথে কাজ করতে শুরু করি।  মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে কাজ করেও মনে কোন শান্তি খুঁজে পাচ্ছিলাম না। কারণ মুক্তিযুদ্ধে যোগদানের জন্য ভারতে গিয়েও আমি ফিরে এসেছি।  তাই সেপ্টেম্বর মাসে আবার ভারতে গিয়ে কেচুয়াডাঙ্গা ইয়ুথ ক্যাম্পে আশ্রয় গ্রহণ করি। সেখানে কয়েক দিন অবস্থানের পর মালদা জেলার গৌড়বাগান হয়ে মুক্তিযুদ্ধের উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য আমাদের শিলিগুড়ির পানিঘাটা প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে প্রেরণ করা হরা হয়।  সেখানে প্রথমে গেরিলা প্রশিক্ষণ ও পরে হায়ার প্রশিক্ষনের পর ভারতীয় সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে তুফানি ব্যাটেলিয়ন নামে একটা ব্যাটেলিয়ন গঠন করা হয়। আমি এই ব্যাটেলিয়নের  চার্লি কোম্পানীতে অন্র্Íভূক্ত হই। আমাদের কোম্পানী কমান্ডার ছিলেন ভারতীয়র সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন ডিএস ডিলন।

ব্যাটেলিয়ন গঠনের পর ৭ নম্বর সেক্টর হেডকোয়ার্টার তরঙ্গপুর থেকে অস্ত্র ও গোলাবারুদ প্রদান করে আমাদের পশ্চিম দিনাজপুর জেলার হিলি সীমান্তের অযধ্যা গ্রামের ডিফেন্সে প্রেরণ করা হয়। সেখানে আমরা ট্রেন্স ও বাঙ্কার কেটে নিয়মিত সেনাবাহিনীর মতো পালা করে দিন রাত ২৪ ঘন্টা সীমান্ত পাহারা দিতে শুরু করি। সেখানে আমাদের সীমান্তের প্রতিরক্ষার দিকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হতো। ডিসেম্বও মাসে নিয়মিত যুদ্ধ শুরু হয়ে ভারতীয় বাহিনীর পাশাপাশি আমরা  প্রথমে দিনাজপুর জেলার ফুলবাড়ি পাকসেনা ক্যাম্প আক্রমন পরিচালনা করি। হিলি যুদ্ধে পরাজয়ের পর শত্রুদের মনোবল তখন ভেঙ্গে পড়েছিল।  তাই অল্প কিছু সময় যুদ্ধ চলার পরই তারা ক্যাম্প ছেড়ে পালিয়ে যায়।  একই ভাবে সামান্য আক্রমণের ভার সহ্য করতে না পেরে তারা ভবানীপুর, পলাশবাড়ি, গোবিন্দগঞ্জ থেকে পালিয়ে যায়।  তারপর বেহুলা-লক্ষিণদরের বাসর ঘরের পাশ দিয়ে আমরা বগুড়া শহরের পশ্চিমে এসে হাজির হই। বগুড়া ছিল শত্রদের ব্রিগেড হেডকোয়ার্টার।  সেখানে তারা শক্ত অবস্থানে বসে ছিল। ১৩ ডিসেম্বর সকাল থেকে আমরা একটা গোরস্থানের পাশ থেকে শত্রুদের লক্ষ্য করে ৩ ইঞ্চি মটার্ারের গোলাবর্ষণ শুরু করি। অল্প সময়ের মধ্যে তারা আমাদের উপর পাল্টা মর্টারের গোলা বর্ষণ শুরু করে। তখন জীবন বাঁচাতে আমরা গোরস্থানের ভাঙ্গা কবরের মধ্যে আশ্রয় নিতে বাধ্য হই। ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৩ দিন তুমুল যুদ্ধ চলার পর ১৬ ডিসেম্বর পাকসেনাদেও আত্মসমর্পণের মাধ্যমে বগুড়া যুদ্ধ শেষ হয়। যে দেশপ্রেমের টানে আমি  মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলাম, আজও আমি হৃদয়ে সেই রয়েছি।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।