গারো পাহাড়ের গদ্যে জিয়াউল হক

বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ সহিদুর রহমান

বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ সহিদুর রহমান, এফ.এফ. ভারতীয় তালিকা নম্বর-৪৮২৮৭, ব্যাচ নম্বর-৫, সিরিয়াল নম্বর-৩৯৮১, গেজেট নম্বর-কালিয়া-৩০৬, লাল মুক্তিবার্তা নম্বর-০৪০৭০৩০১৬৬, এমআইএস নম্বর-০১৬৫০০০৪১৬০, মোবাইল নম্বর-০১৭১২১৮০৯২৫, পিতা ঃ বচন মোল্লা, মাতা ঃ মরিয়ম বেগম, স্থায়ী ঠিকানা ঃ গ্রাম ঃ জোকা, ডাকঘর ও উপজেলা ঃ কালিয়, জেলা ঃ নড়াইল। বর্তমান ঠিকানা ঃ ৭৪/৫, পোর্ট রোড, খালিসপুর, খুলনা।
৪ ছেলে ৩ মেয়ের মধ্যে শহিদুর রহমান ছিলেন বাবা মায়ের প্রথম সন্তান। ১৯৭১ সালে ১৩খাদার নর্থ খুলনা ডিগ্রি কলেজের স্নাতক শ্রেণির পরীক্ষাথর্ী ছিলেন। তাছাড়াও তিনি কালিয়া থানা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান থেকে শুরু করে বাঙালি জাতীয়তাবাদের সকল আন্দোলনে তিনি সক্রিয় ভাবে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৭০ সালের পাকিস্তান জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়লাভ করার পরও তাদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর না করায় সারা বাংলাদেশে প্রচন্ড গণআন্দোলন শুরু হয়। দেশের এই টালমাটাল রাজনৈতিক অবস্থার মধ্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানের এক বিশাল জনসভায় ভাষণ প্রদান করেন। তিনি তার ভাষণে এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম বলে পরোক্ষ ভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা প্রদান করেন। বঙ্গবন্ধুর এই ঘোষণার পর থেকেই সহিদুর রহমানসহ বাংলাদেশের মানুষ স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন। বঙ্গবন্ধুর ঘোষণা মোতাবেক শুরু হয়ে যায় ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ার কাজ।
২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনারা সারা বাংলাদেশের উপর আক্রমণ করে মানুষ হত্যা শুরু করে। সেদিন রাতে খুলনায় আগত শত্রুসেনারা পুলিশ লাইনের উপর আক্রমণ শুরু করে। কিন্তু বাঙালি পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের প্রবল প্রতিরোধের মুখে শত্রুরা পিছু হটতে বাধ্য হয়। তারপর তারা যশোর ক্যান্টনমেন্ট থেকে আধুনিক অস্ত্র সজ্জিত অতিরিক্ত সৈন্য এনে পুলিশ লাইনের উপর নতুন করে আক্রমণ পরিচালনা করে। এই আক্রমণের মুখে সাধারণ অস্ত্রধারী পুলিশ বাহিনী শত্রুদের প্রতিরোধ করতে ব্যর্থ হয়ে খুলনা শহর ছেড়ে ভৈরব নদীর অপর পাড়ে আশ্রয় গ্রহণ করেন। তখন সাইদুর রহমান ও তাদের এলাকার অগনিত মানুষ পুলিশ বাহিনীর পাশে দাঁড়িয়ে খাদ্য সহায়তা থেকে শুরু করে সব রকম সহযোগিতা করতে থাকেন। কিন্তু অল্প কিছু দিনের মধ্যেই পুলিশ বাহিনীর প্রতিরোধ যুদ্ধ স্তিমিত হয়ে পড়লে সাইদুর রহমান তার নিজ গ্রামের বাড়িতে ফিরে যান। এরই মধ্যে শত্রুসেনারা বিশ্বাসঘাতক বাঙালিদের সহযোগিতায় রাজাকার বাহিনী বাহিনী গঠন করে জনগনের উপর চরম অত্যাচার শুরু করে। দেশের এহেন অরাজক পরিস্থিতির মধ্যে মুক্তিযুদ্ধে যোগদানের উদ্দেশ্যে জুন সাসের শেষ সপ্তাহে সাইদুর রহমান দেশ ছেড়ে ভারতের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। তারপর ভারতের বনগাঁর ৫ নম্বর টালিখোলা ইয়ুথ ক্যাম্পে গিয়ে আশ্রয় গ্রহণ করেন। সেখানে ১৫ দিন অবস্থান করার পর জুলাই মাসের মাঝের দিকে মুক্তিযুদ্ধের উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য তাদের বাছাই করে বিহার রাজ্যের চাকুলিয়া প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে প্রেরণ করা হয়।
চাকুলিয়াতে ৩০ দিন প্রশিক্ষণ শেষে ৮ নম্বর সেক্টর হেডকোয়ার্টার কল্যাণি হয়ে সাইদুর রহমানদের বয়রা সাব-সেক্টরে প্রেরণ করা হয়। সেখান এসে তার নেতৃত্বে ১০ জন মুক্তিযোদ্ধার একটা গ্রুপ গঠন করে তাদের অস্ত্র ও গোলাবারুদ প্রদান করা হয়। সেপ্টেম্বর মাসের ১২ তারিখে তাদের বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রেরণ করা হয়। বাংলাদেশের অভ্যন্তরে এসে তারা তৎকালীন যশোর জেলার কালিয়া থানার কলাবাড়িতে সেল্টার গ্রহণ করেন।
প্রথম যুদ্ধ ঃ খুলনার ১৩ খাদাতে রাজাকার বাহিনীর ক্যাম্প ছিল। অক্টোবর মাসের শেষ সপ্তাহে রাজাকাররা মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পের পাশের আটলিয়া গ্রাম আক্রমণ করে লুটপাট শুরু করে। এই খবর পেয়ে সাইদুর রহমানের নেতৃত্বে একদল মুক্তিযোদ্ধা নদীর অপর পাড় থেকে শত্রুদের উপর গুলি বর্ষণ শুরু করে। প্রায় ১ ঘন্টা গুলাগুলি চলার পর তারা লুটপাট বন্ধ করে ভয়ে সেখান থেকে পালিয়ে যায়।
মির্জাপুরের যুদ্ধ ঃ মিজার্পুর ছিল বিলের পাশের একটা ল্যান্ড স্টেশন। জেলেরা বিল থেমে মাছ ধরে বিক্রির জন্য মির্জাপুর থেকে বিভিন্ন বাজারে প্রেরণ করতো। পাকিস্তানি সেনারা মাঝে মাঝেই এই ল্যান্ড স্টেশনে এসে জেলেদের কাছ থেকে জোর করে মাছ লুট করে নিয়ে যেত। এই খবর জানতে পেরে সাইদুর রহমানসহ একদল মুক্তিযোদ্ধা একদিন ভোর বেলায় এসে ল্যান্ড স্টেশনের পাশের বনে এ্যাম্বুস পেতে শত্রুদের জন্য অপেক্ষা করতে থাকে। সকাল ১০টার দিকে সত্যি সত্যিই শত্রুসেনারা এসে হাজির হয়। হায়েনাদের দলটি এ্যাম্বুসের মধ্যে এসে পড়তেই মুক্তিযোদ্ধারা অতর্কিতে শত্রুদের উপর গুলিবর্ষণ শুরু করে। প্রথম আক্রমণেই বেশ কয়েকজন শত্রুসেনা মৃত্যুর কোলে ঢোলে পড়ে। তারপর তারা অবস্থান গ্রহণ করে পাল্টা আক্রমণ শুরু করলে মুক্তিযোদ্ধারা নিরাপদ স্থানে কেটে পড়ে। তাছাড়া নকশালরা কালিয়া থানার পেরুলে মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী কার্যক্রম শুরু করে বেশ কয়েক জন বীর মুক্তিযোদ্ধাকে হত্যা করে। নকশালদের এহেন গর্হিত কাজ কোন মতেই গ্রহণযোগ্য ছিল না। তাই কালিয়া থানার সকল মুক্তিযোদ্ধা একত্রিত হয়ে নকশালদের পেরুল ক্যাম্পের উপর আক্রমণ শুরু করে। ৩ দিন ৩ রাত যুদ্ধ চলার পর তারা আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়। ডিসেম্বর মাসের ১০ তারিখে থানার সকল মুক্তিযোদ্ধারা মিলে কালিয়া থানায় অবস্থিত পাকিস্তানি সেনাদের ক্যাম্প আক্রমণ করে সকল যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়। ৩ দিন অবরোধ থাকার পর অবশেষে ১২ ডিসেম্বর ৩৩ জন পাকিস্তানি সেনা ও ১৫০ জন রাজাকার আত্মসমর্পণ করে। ২ জন পাকিস্তানি সেনা ও ২ জন রাজাকার নিহত হয়। এই যুদ্ধে ২ জন মুক্তিযোদ্ধারও শহীদের খাতায় নাম লেখান। কালিয়া থানা দখলের পরই সাইদুর রহমানদের যুদ্ধ শেষ হয়। সাইদুর রহমানরা যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছিল বলেই আজ পদ্মা সেতু নির্মানসহ দিনে দিনে বাংলাদেশ সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাচ্ছে।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।