গারো পাহাড়ের গদ্যে জিয়াউল হক

বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ রফিকুল আলম

আমি মোঃ রফিকুল আলম, বিএলএফ, বেসামরিক গেজেট: ২৮১৬ (হাতিয়া উপজেলা), লাল মুক্তিবার্তা নম্বর – ০২০৯০৬০০৭৫, এমআইএস নম্বর – ০১২৬০০০১৯৩৯, মোবাইল নম্বর – ০১৭১৫৪৭৫২২২, পিতা: ফছিহুল আলম, মাতা: নূরের নেছা, স্থায়ী ঠিকানা: ছৈয়দিয়া বাজার, হাতিয়া, নোয়াখালী। বর্তমান ঠিকানা: ২৪/৮, প্রমিন্যান্ট হাউজিং, মোহাম্মদপুর, ঢাকা।
১৯৬৬ সালে ঢাকা কলেজে পড়াকালীন সময়ে আমি ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে জড়িত হই। সেই বছরেই আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ মুািজবুর রহমান ৬ দফা দাবীনামা পেশ করার পরই ছাত্রলীগের সদস্য হিসাবে আমি এই দাবীনামার পক্ষে প্রত্যক্ষ ভাবে কাজ শুরু করি। ৬৯ সালের গণআন্দোলনের সময় আমাকে নোয়াখালী জেলার সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সদস্য ও একই সাথে ঢাকা মহানগর ছাত্রলীগের নিউক্লিয়ারের সদস্য করা হয়। ব্যাপক গণআন্দোলনের মুখে স্বৈরাচারী আইয়ুব খানের পতনের পর জেনারেল ইয়াহিয়া খান ক্ষমতায় এসে ১৯৭০ সালে পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের নির্বাচনের আয়োজন করেন। এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সমগ্র পাকিস্তানে একক সংখ্যাগরিষ্ট দল হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে। কিন্তু জেনারেল ইয়াহিয়া খান আওয়ামী লীগের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর না করায় সারা বাংলাদেশে প্রচন্ড গণ আন্দোলন শুরু হয়। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুকে মোকাবেলার আহবান জানান।
বাঙালিদের আন্দোলনকে স্তব্ধ করার উদ্দেশ্য নিয়ে ২৬ মার্চ রাতে পাকসেনারা সারা বাংলাদেশের সাধারণ বাঙালিদের উপর অতর্কিতে আক্রমণ শুরু করে। পাকিস্তানি সেনাদের এই আক্রমণের সাথে সাথে সারা বাংলাদেশে শুরু হয়ে যায় প্রতিরোধযুদ্ধ। সেই রাতে আমি হাতিয়া দ্বীপে আমার গ্রামের বাড়িতে অবস্থান করছিলাম। সাধারণ জনতার প্রতিরোধের মুখে ৩০ মার্চ ফেনী পাকসেনা ক্যাম্পের পতন হয়। সেখান থেকে ২৪টা ৩০৩ রাইফেল সংগ্রহ করে হাতিয়া দ্বীপে এনে দুইজন অবসরপ্রাপ্ত বেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈনিকের সহযোগিতায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশ মোতাবেক আমি দ্বীপের যুবক ছেলেদের মধ্যে সামরিক প্রশিক্ষণ দিতে শুরু করি। পূরা মে মাস হাতিয়া দ্বীপে অবস্থান করার পর ছাত্রনেতা আসম আব্দুর রব ও শেখ ফজলুল হক মণির নির্দেশে হাতিয়া, ভোলা ও রামগতি থানার ২০০র অধিক যুবক ছেলেদের সাথে নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ গ্রহণের জন্য আমরা কুমিল্লার গুনবতি স্টেশনের পাশ দিয়ে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের রাজনগর ও পালাটানা ক্যাম্পে গিয়ে আশ্রয় গ্রহণ করি। সেখানে কিছু দিন অবস্থানের পর মুজিব বাহিনীর উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য আমিসহ ৩০ জন ছেলেকে বাছাই করে ভারতীয় সেনাবাহিনীর ট্রাকে করে সকলকে শিলিগুড়ি নিয়ে যাওয়া হয়। শিলিগুড়ির বাগডোগরা বিমান বন্দর থেকে মিলিটারী কাগ্রো বিমান যোগে আমাদের উত্তর প্রদেশের শাহরানপুর বিমান বন্দর হয়ে দেরাদুন জেলার টান্ডুয়া প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে প্রেরণ করা হয়া হয়। সেখানে ৪ সপ্তাহের গেরিলা প্রশিক্ষণ ও ১ সপ্তাহের কমান্ডার প্রশিক্ষণ গ্রহনের পর আমাদের আগরতলা ফেরৎ পাঠানো হয়।
আগরতলায় আসার পর মুজিব বাহিনীর আসামের হাফলং থেকে প্রশিক্ষণ নেওয়া ১১ জন ও টান্ডুয়া থেকে প্রশিক্ষণ নেওয়া ১০ মোট ২১ জন মুক্তিযোদ্ধার আমাকে কমান্ডার করে অস্ত্র ও গোলাবারুদ প্রদান করা হয়। জুলাই মাসের প্রথম দিকে আগরতলা থেকে ফেনী বর্ডার হয়ে বাংলাদেশের ভেতরে প্রবেশ করে আমরা তৎকালীন নোয়াখালী জেলা মুজিব বাহিনীর জেলা কমান্ডার জনাব মাহমুদুর রহমান বেলায়েতের অধীনে যোগদান করার পর নোয়াখালীর উত্তরে সেনবাগে সেল্টার গ্রহণ করি। সেনবাগে কিছু দিন অবস্থানের পর জেলা কমান্ডার বেলায়েত ভাই আমাদের ডেকে নিয়ে জানান যে, হাতিয়া দ্বীপে পাকসেনাদের অবস্থানের কারণে ভারত থেকে প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত বরিশাল ও ভোল জেলার মুক্তিযোদ্ধারা নিজ জেলায় প্রবেশ করতে পারছে না। যে ভাবেই হোক হাতিয়া দ্বীপ মুক্ত করতেই হবে এবং হাতিয়ার সন্তান হিসাবে তোমাকেই এই দায়িত্ব নিতে হবে।
হাতিয়া থানার যুদ্ধ ঃ হাতিয়া থানা মুক্ত করার লক্ষ্যকে সামনে রেখে আমরা ৪৫ জন মুক্তিযোদ্ধা বিপুল পরিমান অস্ত্রসস্ত্রসহ ৩১ অক্টোবর রাত ১২টার সময় হাতিয়া থানার উপর আক্রমন শুরু করি। থানাতে তখন মিলিশিয়া ও রাজাকাররা অবস্থান করছিল। প্রায় ৬ ঘন্টা অবিরাম যুদ্ধ চলার পর ভোর ৬টার সময় শত্রুরা আমাদের নিকট আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়। থানা থেকে ১৫০টি রাইফেল ও প্রায় ১০,০০০ রাউন্ড গুলি জব্দ করা হয়। হাতিয়া থানা হাতছাড়া হওয়ার খবর পেয়ে পাক বিমান বাহিনী পরের দিন সকালে আমাদের উপর ব্যাপক বোমাবর্ষণ করে। কিন্তু শত্রুর সকল আক্রমণকে উপেক্ষা করে আমরা নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম হই। এই দ্বীপ মুক্তিযোদ্ধাদের দখলে আসার পর একদিকে যেমন মুক্তিযোদ্ধাদের অবাধ চলাচলের পথ খুলে যায়, অন্যদিকে উপকূলীয় নদীপথে চলাচলকারী পাক নৌযানের জন্য স্থাপিত বয়াগুলো ধ্বংস করার ফলে শত্রুদের গানবোট চলাচল একেবার বন্ধ হয়ে যায়। হাতিয়া দ্বীপে আমরা তখন সিভিল প্রশাসন চালু করি, যা দেশ স্বাধীনতা হওয়ার পর পর্যন্ত সুষ্ঠু ভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করে। শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছি, তাইতো আমি একজন গর্বিত মুক্তিযোদ্ধা।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।