গারো পাহাড়ের গদ্যে জিয়াউল হক

বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ আব্দুল কাদের সরকার
বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ আব্দুল কাদের সরকার, এফ.এফ. ভারতীয় তালিকা নম্বর-৩৬০৪২, গেজেট নম্বর-রায়গঞ্জ-১০৮৪, লাল মুক্তিবার্তা নম্বর-০৩১২০৭০০৯৩, এমআইএস নম্বর-০১৮৮০০০০৩১৬, মোবাইল নম্বর-০১৭৩৫৪৪৪১৫৮, পিতা ঃ মন্তাজ আলী সরকার, মাতা ঃ ওবিরন নেছা, স্থায়ী ঠিকানা ঃ গ্রাম ঃ হোড়গাঁতী, ডাকঘর ঃ রশিদাবাদ, উপজেলা ঃ রায়গঞ্জ, জেলা ঃ সিরাজগঞ্জ। বর্তমান ঠিকানা ঃ ঐ।
বাবা মায়ের ৩ ছেলে ৪ মেয়ের মধ্যে আব্দুল কাদের ছিল দ্বিতীয়। ১৯৭১ সালে তিনি তৎকালীন পাবনা জেলার রায়গঞ্জ থানার আমডাঙ্গা-উলিপুর হাই স্কুলের ৯ম শ্রেণিতে পড়াশুনা করতেন। স্কুলে পড়াকালীন সময়ে ক্লাশ ক্যাপ্টেন হিসাবে তিনি বুকে সাহস ও নেতৃত্ব দেওয়ার গুনাবলী অর্জন করেন। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ শুরুর পটভূমিতে ৭ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানের জনসভায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দেওয়া ভাষণ শুনে সারা বাঙালি জাতীয় মতো আব্দুল কাদেরের বুকেও স্বাধীনতার স্বপ্ন জেগে ওঠে। ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনারা সারা বাংলাদেশের উপর আক্রমণ শুরু করলে সেই স্বপ্ন বুকে নিয়ে তিনি নিজ এলাকার জাতীয় পরিষদ সদস্য মওলানা আব্দুর রশিদ তর্কবাগীশের অধীন নিজ এলাকাতেই মুক্তিযদ্ধের প্রশিক্ষণ নিতে শুরু করেন। প্রশিক্ষণ শেষে অস্ত্র জোগাড় না হওয়ায় তারা বন্ধুরা মিলে দেশ ছেড়ে ভারতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। সিদ্ধান্ত মোতাবেক তারা সিরাজগঞ্জের পাশের কাজীপুর থানার যমুনা নদীর চর থেকে নৌকাযোগে যাত্রা করে ভারতের আসাম রাজ্যের মানকার চরে গিয়ে হাজির হন। সেখানে অল্প কিছু দিন অবস্থান করার পর মুক্তিযুদ্ধে উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য তাদের মেঘালয়ের তুরা প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে প্রেরণ করা হয়।
তুরাতে ২৮ দিন প্রশিক্ষণ শেষে কে এম শামীম পান্নার নেতৃত্বে ১৫০ জন মুক্তিযোদ্ধার একটা গ্রুপ পঠন করে আব্দুল কাদেরদের অস্ত্র ও গোলাবারুদ প্রদান করে মহেন্দ্রগঞ্জ সীমান্তে প্রেরণ করা হয়। মহেন্দ্রগঞ্জ এসে তারা কর্নেল আবু তাহেরের নেতৃত্বে পাকিস্তানি সেনাদের শক্ত ঘাঁটি ধানুয়া-কামালপুর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। এই যুদ্ধে কর্নেল তাহের আহত হলে মুক্তিযোদ্ধারা ছত্রভঙ্গ হয়ে মহেন্দ্রগঞ্জ ক্যাম্পে ফিরে আসেন। তাহের সাহেব আহত হয়ে যুদ্ধক্ষেত্র ছাড়ার পর লেফটেন্যান্ট হান্নান দায়িত্ব গ্রহণ করার ২ দিন পরই কে এম শামীম পান্নাকে কমান্ডার এবং তারা মিয়াকে ডেপুটি কমান্ডার করে আব্দুল কাদেরদের ১৫০ জন মুক্তিযোদ্ধাকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে রংপুর জেলার হাতীবান্দা থানার ভেতরে প্রেরণ করেন। সেখানে দুই নদীর মধ্যবতর্ী স্থানে একটা স্কুলে সুরক্ষিত ক্যাম্প স্থাপন করে তারা অবস্থান করতে থাকেন। নতুন ক্যাম্পে অবস্থানের ২ দিন পর ঙঁঃ ঢ়ড়ংঃ থেকে জানানো হয় দুটি ল দ্রুত গতিতে তাদের ক্যাম্পের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। এই খবর পেয়ে বিপদ আঁচ করতে পেরে কমান্ডার শামীম সকল মুক্তিযোদ্ধাদের সত্বর যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করতে বলেন। কিন্তু তাদের যুদ্ধ প্রস্তুতি গ্রহণের পূর্বেই শত্রুসেনারা দুই দিক থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের উপর বৃষ্টির মতো গুলিবর্ষণ শুরু করে। পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনা করে শত্রুর বিরুদ্ধে প্রতিরোধযুদ্ধ না করেই যার যার মতো নিজেদের জীবন বাঁচানোর নির্দেশ প্রদান করে কমান্ডার শামীমও ক্যাম্প ত্যাগ করেন। তারপর শত্রুদের গোলাগুলির মধ্যে মুক্তিযোদ্ধারা জীবনের মায়া তুচ্ছ করে সাঁতরে নদী পার হয়ে বন ও কৃষি ক্ষেতের মধ্যে লুকিয়ে অনেকটা রাস্তা পাড়ি দিয়ে ১৫০ জনের মধ্যে ৭৫ জন মুক্তিযোদ্ধা ভারতের মহেন্দ্রগঞ্জ ক্যাম্পে গিয়ে হাজির হন। পরে খোঁজ নিয়ে জানা যায় শত্রুদের সেই আকস্মিক আক্রমণে ১০ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হয়েছেন। বাকিরা পার্শবতর্ী মানকার চর ক্যাম্পে গিয়ে হাজির হয়েছেন। হাতীবান্ধা বিপর্যেয়র পরের দিনই হান্নান সাহেব আব্দুল কাদেরদের সিরাজগঞ্জ গ্রুপের ৭৫ জনের সাথে টাংগাইল জেলার আরও ৭৫ জনকে যুক্ত করে ১৫০ জন মুক্তিযোদ্ধাকে টাংগাইলের রামালেই চরে যুদ্ধ করার জন্য প্রেরণ করেন।
কমান্ডার হান্নান সাহেবের নির্দেশ মোতাবেক টাংগাইলের রামালেই চরে যাওয়ার পর দুই জেলার মুক্তিযোদ্ধারা আলোচনা করে অজানা স্থানে যুদ্ধ না করে নিজেদের পরিচিত স্থানে শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। সিদ্ধান্ত মোতাবেক তারা মিয়ার নেতৃত্বে সিরাজগঞ্জ মুক্তিযোদ্ধারা কাজীপুর থানার ভূয়াপাড়া গ্রামে সেল্টার গ্রহণ করেন। তাদের সেল্টারের পাশেই ভাতকিয়া স্কুলে শত্রুসেনাদের একটা ক্যাম্প ছিল। নভেম্বর মাসের মাঝের দিকে রাতের আঁধারে তারা মিয়ার নেতৃত্বে আব্দুল কাদেরদের মুক্তিযোদ্ধা গ্রুপটি শত্রুদের ক্যাম্পের উপর উপর আক্রমণ করে ৭ জন পাকিস্তানি সেনা ও ৪৫ জন রাজাকারের সকলকেই হত্যা করে। যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই ব্যর্থতা আর ব্যর্থতা। নিজেদের চেনা পরিবেশে প্রথম একটা অপারেশনে সফলতা লাভের পর তারা খুশিতে আত্মহারা হয়ে উঠে। ভাতকিয়া অপারেশনের পর গ্রুপটি ভুল করে বগুড়া জেলার ধুনট থানার মহিষামারী গ্রামে এক স্বাধীনতাবিরোধীর বাড়িতে সেল্টার গ্রহণ করেন। বাড়ির লোক গোপনে পাকিস্তানি সেনাদের খবর দিলে শত্রুসেনাদের অতর্কিত আক্রমণে তারা কোন মতে জীবন বাঁচিয়ে সেখান থেকে পলায়ন করেন। তবুও সেখানে ২ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। তারপর গ্রুপটি নিজ এলাকা রায়গঞ্জ থানার লক্ষীখোলা গ্রামে সেল্টার গ্রহণ করেন। সেখান থেকে ২৭ নভেম্বর রাতের বেলায় তারা পাকিস্তানি সেনাদের রায়গঞ্জ থানা আক্রমণ করেন। রাত ১ টা থেকে সারা রাত যুদ্ধ চলার পর শত্রুদের প্রবল আক্রমণের মুখে টিকতে না পেরে তারা পিছু হটে আসতে বাধ্য হন। এই যুদ্ধে আব্দুল কাদেরের আপন ভাতিজাসহ ৭ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। অবশেষে ১২ ডিসেম্বর সিরাজগঞ্জ এলাকার সকল মুক্তিযোদ্ধা গ্রুপের সাথে একত্রিত হয়ে আব্দুল কাদেরদের গ্রুপ সিরাজগঞ্জের পাশের শিলাবাড়ি যুদ্ধে পাকিন্তানি সেনাদের পরাজিত করার পর সিরাজগঞ্জ শহর শত্রুমুক্ত হয়। শেষ হয় তাদের ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ। আব্দুল কাদেরের মতো সাহসী মুক্তিযোদ্ধারা যুদ্ধ করে আমাদের স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ উপহার দিয়েছেন। তাই তাদের প্রতি জানাই অকৃত্তিম শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।