গারো পাহাড়ের গদ্যে জিয়াউল হক

বীর মুক্তিযোদ্ধা বি এম ইকরামুল হক

বীর মুক্তিযোদ্ধা বি এম ইকরামুল হক, এফ.এফ. ভারতীয় তালিকা নম্বর-৪৮২৬১, গেজেট নম্বর-২৮১, লাল মুক্তিবার্তা নম্বর-০৪০৭০৩০০৭১, এমআইএস নম্বর-০১৬৫০০০১৩৫৯, মোবাইল নম্বর-০১৭১১৩১০৩৩৪, পিতা ঃ আবুল কাশেম বিশ্বাস, মাতা ঃ বেহুলা বেগম, স্থায়ী ঠিকানা ঃ গ্রাম ঃ বেন্দার চর, ডাকঘর ঃ বেন্দা, উপজেলা ঃ কালিয়া, জেলা ঃ নড়াইল। বর্তমান ঠিকানা ঃ ঐ।
৪ ভাই ৫ বোনের মধ্যে ইকরামুল হক ছিলেন বাবা মায়ের প্রথম সন্তান। ১৯৭১ সালে কালিয়া পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের ৯ম শ্রেণিতে পড়াশুনা করতেন। তার চাচা মরহুম এখলাসউদ্দিন ছিলেন যশোর জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এবং পাঁচ সদস্য বিশিষ্ট জেলা সংগ্রাম কমিটির অন্যতম সদস্য। চাচার উৎসাহে স্কুল জীবন থেকেই তিনি রাজনীতির সাথে জড়িত হয়ে পড়েন। ১৯৭০ সালের পাকিস্তান জাতীয় পরিষদ নির্বাচনের প্রচার কালে কালিয়া পাইলট হাই স্কুলের ছাত্রলীগের সমর্থকদের সাথে মুসলিম লীগের ছাত্র সংগঠন এনএসএফের মধ্যে কথা কাটাকাটির সূত্র ধরে মারামারি সংগঠিত হয়। এই মারামারিতে ইকরামুল হক ও তার বন্ধুরা অংশগ্রহণ করেন। যার ফলে তৎকালীন সরকার কালিয়া বহুমুখী হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষকসহ ইকরামুলদের ১৫ জনের বিরুদ্ধে সামরিক আদালতে মামলা দায়ের করেন। সেই মামলায় তাদের সকলকে গ্রেফতার করা হয়। সামরিক আদালতের মামলা হওয়ায় শত চেষ্টা করেও তাদের জামিন করানো সম্ভব হয়নি। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়লাভ করার পর তাদের জামিন মঞ্জুর করা হয়। জেলখানা থেকে মুক্ত হয়ে বাইরে এসেই ইকরামুলরা দেখতে পান দেশের অবস্থা দিন দিন আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। কারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়লাভ করার পরও তাদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর না করে পাকিস্তানের তৎকালীন সামরিক প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান নানা টালবাহানা শুরু করে দিয়েছেন। দেরিতে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহবান করেও পরে তিনি তা স্থগিত ঘোষণা করেন। প্রেসিডেন্টের এই ঘোষণায় সারা বাংলাদেশের মানুষ ক্ষুব্ধ হয়ে রাস্তায় নেমে এসে প্রচন্ড গণআন্দোলন শুরু করেন। দেশের এহেন পরিস্থিতিতে ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঢাকার রেসকোর্স ময়দানের এক বিশাল জনসভায় ভাষণে যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুকে মোকাবেলার আহবান জানান। বঙ্গবন্ধুর ভাষণের পর সারা বাংলাদেশের মানুষ স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্নে বিভোর হয়ে মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি শুরু করে দেন।
বাঙালিদের এই আন্দোলন দমন করতে ২৫ মার্চ কাল রাতে পাকিস্তানি সেনারা আধুনিক অস্ত্র হাতে সারা বাংলাদেশের উপর আক্রমণ করে মানুষ হত্যা শুরু করে। সেই দিন মধ্যরাতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়ার পর পরই শত্রুসেনাদের হাতে গ্রেফতার হন। তিনি গ্রেফতার হলেও তার ঘোষণা অনুযায়ী সারা বাংলাদেশে প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। এপ্রিল মাসের শেষ সপ্তাহে পাকিস্তানি সেনারা খুলনা থেকে গানবোটে এসে মটার্রের গোলা ও মেসিন গানের গুলি বর্ষন করে কালিয়া বাজারের উপর আক্রমণ ও লুটপাট চালায়। তখন শত্রুসেনাদের ভয়ে ইকরামুলরা বনে জঙ্গলে পালিয়ে নিজেদের জীবন রক্ষা করতে থাকেন। শত্রুসেনাদের অত্যাচারের মাত্রা আরও বেড়ে গেলে জুন মাসের প্রথম দিকে একরামুল ও তার চাচাতো ভাই শাহজাহান বিশ্বাস মুক্তিযুদ্ধে যোগদানের উদ্দেশ্যে দেশ ছেড়ে ভারতের পথে যাত্রা করেন। তারপর বাংলাদেশের বর্ডার পার হয়ে ভারতের বনগাঁ টালিখোলা ইয়ুথ ক্যাম্পে গিয়ে আশ্রয় গ্রহণ করেন। সেখানে প্রায় ১ মাস অবস্থান করার পর মুক্তিযুদ্ধের উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য বাছাই করে জুলাই মাসের শেষ সপ্তাহে তাদের ভারতের বিহার রাজ্যের চাকুলিয়া প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে প্রেরণ করা হয়। প্রশিক্ষণ কালীন সময়ে কঠোর পরিশ্রম, অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ, নতুন খাদ্যাভ্যাস ও আত্মীয় স্বজনহীন নিরানন্দ জীবনের চাপে তাদের সকলেরই মন খারাপ থাকতো। কিন্তু শত্রু নিধনের নেশায় সব কিছুকে উপেক্ষা করে ৩০ দিন প্রশিক্ষণ শেষে আগষ্ট মাসের শেষ সপ্তাহে তারা ৮ নম্বর সেক্টর হেড কোয়ার্টার কল্যাণি হয়ে বয়রা সাব-সেক্টরে এসে হাজির হন। সেখান থেকে এস এম সাইদুর রহমানের নেতৃত্বে ১০ জন মুক্তিযোদ্ধার একটা গ্রুপ গঠন করে তাদের অস্ত্র ও গোলাবারুদ প্রদান করা হয়। ইকরামুল হক ছিলেন এই গ্রুপের ডেপুটি লিডার। বয়রা থেকে তারা একদিন বাংলাদেশের অভ্যন্তরে পাকিস্তানি সেনাদের চৌগাছা ক্যাম্পের উপর আক্রমণ পরিচালনা করে। সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহে একরামুলদের মুক্তিযোদ্ধা গ্রুপটি বাংলাদেশের ভেতরে প্রবেশ করে কালিয়া থানার কলাবাড়িয়াতে সেল্টার গ্রহণ করেন।
পেরুল নকশালদের বিরুরেদ্ধ যুদ্ধ ঃ কালিয়া থানার পেরুলে নকশালরা একটা ক্যাম্প স্থাপন করে মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী কার্যক্রম শুরু করে। এমনকি তারা বেশ কিছু বীর মুক্তিযোদ্ধাদের নির্মম ভাবে হত্যাও করে। নকশালদের এই ধরণের উদ্ধত আচরণ কোন মতেই গ্রহণযোগ্য ছিল না। তাই তাদের চিরতরে উৎখাতের লক্ষ্যে কালিয়া থানার মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার ওমর ফারুকের নেতৃত্বে এলাকার সকল মুক্তিযোদ্ধা গ্রুপকে একত্রিত করে ইকরামুলরা প্রায় ১০০ মুক্তিযোদ্ধা নকশালদের পেরুল নকশাল ক্যাম্প আক্রমণ করেন। ৩ দিন ২ রাত অবিরাম যুদ্ধ চলার পর প্রায় ৬০ জন নকশাল মুক্তিযোদ্ধাদের নিকট আত্মসমর্পণ করে। বাকিরা ক্যাম্প ছেড়ে পালিয়ে যায়। এই ৬০ জনের মধ্যে বিচার করে ২০ জনের মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হয়। অপরাধ প্রমান না হওয়ায় বাকিদের মুক্তি দেওয়া হয়। তারপর থেকে পেরুল মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প হিসাবে আত্মপ্রকাশ লাভ করে। অক্টোবর মাসের শেষের দিকে একদিন ভোর রাতে খুলনার ফুলতলা থেকে পাকিস্তদানি সেনারা এসে মুক্তিযোদ্ধাদের পেরুল ক্যাম্পের উপর আক্রমণ চালায়। সারা দিন উভয় পক্ষের মধ্যে তুমুল যুদ্ধ চলার পর সন্ধ্যার দিকে শত্রুরা পিছু হটতে বাধ্য হয়। তাছাড়াও ১৩ খাদার আটলি থেকে এসে শত্রুরা মুক্তিযোদ্ধাদের লোহারগাতি ক্যাম্পের পাশের গ্রামে আক্রমণ চালালে ইকরামুলদের সময়োচিত পদক্ষেপ গ্রহণের ফলে শত্রুরা পিছু হটতে বাধ্য হয়। সর্বশেষে কালিয়া থানা মুক্ত করার যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করার পর ইকরামুলদের যুদ্ধ শেষ হওয়ার কয় দিন পরই বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করে। শেষ হয় এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের। সেই সব দুর্ধর্ষ যুদ্ধ দিনের সোনালী স্মৃতি বুকে নিয়েই কেটে যায় বয়োবৃদ্ধ ইকরামুলদের জীবনের অন্তিম সময়।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।