গারো পাহাড়ের গদ্যে জিয়াউল হক

বীর মুক্তিযোদ্ধা ইসমাইল হোসেন সিদ্দিক

আমি ইসমাইল হোসেন সিদ্দিকী, বিএলএফ, গেজেট নম্বর- ফুলপুর-৫৬১৬, এমআইএস নম্বর-০১৬১০০০৮২৩৬, মোবাইল নম্বর-০১৭৮১৮৮৯০৪৮, পিতা ঃ আবু বকর সিদ্দীক, মাতা ঃ রাহাতুন্নেছা, স্থায়ী ঠিকানা ঃ চর নিয়ামত পশ্চিমপাড়া, ডাকঘর ঃ গোয়াডাঙ্গা, উপজেলা ঃ ফুলপুর, জেলা ঃ ময়মনসিংহ। বর্তমান ঠিকানা ঃ সিদ্দিকী মঞ্জিল, ১১৫/৩, চরপাড়া বাইলেন,হার্ট ফাউন্ডেশন রোড়, ময়মনসিংহ।
১৯৭১ সালে আমি চট্টগ্রাম পলিটেকনিক ইনিস্টিটিউটের প্রথম বর্ষের ছাত্র ও ছাত্ররাজনীতির সাথে জড়িত ছিলাম। ঢাকা থেকে নেতৃস্থানীয় ছাত্রনেতারা চট্টগ্রামে এসে আমাদের সাথে রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে আলোচনা করতেন। অন্যদিকে চট্টগ্রাম শহর ছিল জয় বাংলার ঘাঁটি। কিন্তু আমাদের অবস্থা ছিল একেবারেই ভিন্ন। আমাদের কলেজের আশেপাশের কয়েকটি বিহারি কলোনি থেকে বিহারিরা এসে এলাকার বাঙালিদের উপর খবরদারী করতো। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে জয়লাভের পর বাঙালিরা তাদের কতৃত্ব মেনে নিতে চাচ্ছিল না। তাই সেখানে ৭ মার্চের আগেই বাঙালিদের সাথে বিহারিদের গন্ডোগোল শুরু হয়। এরপর থেকে রাস্তাঘাটে আমাদের কলেজের ছাত্রদের পেলেই তারা নানা ভাবে হয়রানী করতো। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঢাকার রেসকোর্স ময়দানের জনসভায় ভাষণ দিবেন শুনেই আমারা কয়েকজন বন্ধু মিলে ঢাকায় গিয়ে হাজির হই। ৭ মার্চ লক্ষ লক্ষ জনতার সামনে বঙ্গবন্ধু তার ঐতিহাসিক ভাষণ দিলেন। তার ভাষণ শুনেই বুঝতে পারলাম যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করা ছাড়া আমাদের সামনে আর কোন পথ খোলা নেই। ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম ফিরে আসার পর দেশের পরিস্থিতি ক্রমান্বয়ে খারাপ হতে থাকলো। বিহারি কলোনির সামনে দিয়ে মিছিল নিয়ে যাওয়ার সময় তারা আমাদের উপর লাঠিসোটা নিয়ে আক্রমণ ও গুলিবর্ষণ করলো। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনের বাইরে চলে গেলে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেল। তখন অনেক কষ্ট করে আমি গ্রামের বাড়ি ফিরে এলাম।
গ্রামে এসেও শান্তিতে থাকতে পারলাম না। তখন পাকসেনারা গ্রামে গ্রামে আক্রমণ করে যুবক ছেলেদের ধরে নিয়ে যাচ্ছিল। তাই জুন মাসের প্রথম দিকে আমরা কয়েকজন বন্ধু মিলে গ্রাম ছেড়ে মুক্তিযুদ্ধে যোগদানের জন্য ভারতের পথে যাত্রা করলাম। তারপর ময়মনসিংহ জেলার নালিতাবাড়ি বর্ডার পার হয়ে ভারতে প্রবেশ করে ডালু ইয়ুথ ক্যাম্পে গিয়ে আশ্রয় গ্রহণ করলাম। সেখানে ১০ দিন থাকার পর বাংলাদেশ সরকারের একদল প্রতিনিধি এসে বিমান বাহিনীর জন্য লোক ভর্তির কথা বলে যারা এস.এস.সি বা ততোধিক লেখাপড়া জানেন তাদেরকে ফর্ম ফিলিং করালেন। তারপর সেখানে উপস্থিত কয়েক শত যুবক ছেলেদের মধ্যে থেকে আমাদের ২০ জনকে বাছাই করে সেনাবাহিনীর ট্রাকে করে মেঘালয়ের ছেঁড়াপাড়া ট্রানজিট ক্যাম্পে নিয়ে গেলেন। এই ক্যাম্পে গিয়ে সবার বায়োডাটা পরীক্ষা করে ২০ জনের মধ্যে ২ জনকে বাদ দেওয়া হলো। পরের দিন আমাদের ১৮ জনকে পাশের গাঙ্গাইগাঁও রেল স্টেশনে থেকে ট্রেনে করে দার্জিলিং জেলার শিলিগুড়ি হয়ে পাশের বাগডোগরা বিমান বন্দর থেকে বিমানে করে উত্তর প্রদেশের শাহরানপুর বিমান বন্দর হতে মিলিটারী ট্রাক যোগে দেরাদুন জেলার টান্ডুয়া মুজিব বাহিনীর প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে জুলাই মাসের ১ তারিখ থেকে আগষ্টের ১৫ তারিখ পর্যন্ত দেড় মাস প্রশিক্ষণ শেষে আমাদের আবার ছেঁড়াপাড়া ট্রানজিট ক্যাম্পে ফিরিয়ে আনা হয়। সেখানে ৭ দিন থাকাকালীন সময়ে বদরুল আলমকে কমান্ডার করে ফুলপুর পশ্চিমের জন্য আমাদের ১০ জন মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে একটি গ্রুপ এবং সাদেকুল আলমকে কমান্ডার করে ফুলপুর পূর্বের জন্য ১৩ জনের অন্য আর একটি মুকিÍযোদ্ধা গ্রুপ গঠন করে আমাদের অস্ত্র ও গোলাবারুদ প্রদান করা হয়।
আগষ্টের ২৫ তারিখে আমরা বাংলাদেশের ভেতরে প্রবেশ করে, আমাদের গ্রুপ লিডার বদরুল আলমের গ্রামের বাড়ি আরারপাড়া ভাইতকান্দিতে সেল্টার গ্রহণ করলাম। ময়মনসিংহ থেকে ফুলপুর হয়ে হালুয়াঘাট সীমান্ত পর্যন্ত একটা পাকা রাস্তা ছিল। পাকসেনারা এই রাস্তা ব্যবহার করে অতি সহজে ময়মনসিংহ থেকে হালুয়াঘাট সীমান্ত পর্যন্ত যাতায়াত করতে পারতো। এই রাস্তায় ফুলপুরের পাশে কাকনী নামক স্থানে একটা ব্রিজ ছিল। শত্রুসেনাদের অবাধ চলাচল বন্ধের লক্ষ্যে আমাদের উর্ধ্বতন কতৃপক্ষ এই ব্রিজ ধ্বংসের জন্য বার বার তাগাদা দিয়ে আসছিলেন। কিন্তু ব্রিজটি পাহারা দেওয়ার জন্য শত্রুরা সেখানে একটা রাজাকার ক্যাম্প স্থাপন করেছিল। সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম দিকে কমান্ডার বদরুল আলমের পরিবর্তে রফিজউদ্দিনের নেতৃত্বে আমরা কয়েক গ্রুপের প্রায় ২৫ জন মুক্তিযোদ্ধা প্রথমে রাজাকার ক্যাম্প আক্রমণ করলে তারা নিজেদের অস্ত্রসস্ত্র ফেলে ক্যাম্প ছেড়ে পালিয়ে যায়। সেখান থেকে আমরা ১৭টা ৩০৩ রাইফেল উদ্ধার করি। তারপর ডিনামাইট বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ব্রিজটি সম্পূর্ণভাবে উড়িয়ে দেয়ার সাথে সাথে শত্রুদের সীমান্ত পর্যন্ত অবাধ চলাচলের পথ বন্ধ হয়ে যায়।
নারায়নখোলা পাকসেনা ক্যাম্প আক্রমণ ঃ ফুলপুর ও নকলা থানার বর্ডারে নারায়নখোলা ব্রক্ষ্মপুত্র নদীর তীরে পাকসেনাদের একটা শক্ত ঘাঁটি ছিল। সেখানে ৭০ জন পাকসেনা অবস্থান করছিল। সেখান থেতে ৩ মাইল পূর্বে ভাইতকান্দিতে আমাদের সেল্টার ছিল। শত্রুরা প্রায়ই ময়মনসিংহ থেকে এসে এই ক্যাম্পের স্পিডবোট ব্যবহার করে ব্রক্ষ্মপুত্র নদীর বিভিন্ন চরে হানা দিত। শত্রুরা যাতে এই ক্যাম্প ব্যবহার করতে না পারে সেই লক্ষ্যে আমরা ক্যাম্পটি আক্রমণের সিদ্ধান্ত নিলাম। সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য সেপ্টেম্বর মাসের ১০ তারিখে ভোর রাতের দিকে বিভিন্ন গ্রুপের প্রায় ৫০০ মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে চার দিক থেকে আমরা এই ক্যাম্পটি আক্রমণ করলাম। শত্রুরাও পাল্টা আক্রমণ শুরু করলো । উভয়পক্ষের মধ্যে ২ দিন অবিরাম যুদ্ধ চলার পর কাকনী ব্রিজ ভাঙ্গা থাকায় ময়মনসিংহ থেকে অগ্রসর হতে না পেরে জামালপুর থেকে নকলা শেরপুর হয়ে ১০/১২ ট্রাক পাকসেনা এসে আমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যোগদান করার পর তাদের সামনে টিকতে না পেরে তৃতীয় দিন রাতের বেলায় কভারিং ফায়ার দিতে দিতে আমরা পিছু হটে আসি। আমরা পিছিয়ে আসার পর পাকসেনারা আশেপাশের বিভিন্ন গ্রামে অগ্নি সংযোগ ও মানুষ হত্যার হলি খেলায় মেতে ওঠে। এই যুদ্ধে পাকসেনাদের অনেক জানমালের ক্ষতি হয়। আমাদের পক্ষে ৪ জন মুক্তিযোদ্ধাসহ প্রায় ৩০০/৪০০ এলাকাবাসী শহীদ হয়।
তাছাড়াও আমরা ময়মনসিংহ সদর থানার ডিগ্রির চর, বৈঠামারী ও কাকনীর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করি। ৩ ডিসেম্বর নিয়মিত যুদ্ধ শুরু হলে ভারতীয় বাহিনী সাথে ফুলপুর ও ময়মনসিংহ শহরের যুদ্ধে অংশ গ্রহণের পর আমরা স্বাধীনতা লাভ করি। জীবন বাজী রেখে যুদ্ধ করে আমরা দেশ স্বাধীন করেছি, তাইতো আমাদের হৃদয় সব সময় দেশপ্রেমে ভরপুর থাকে।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।