।। ত্রিতাপহারিণী ২০২০।। T3 শারদ সংখ্যায় যাজ্ঞসেনী গুপ্ত কৃষ্ণা

ইঁদুর
হেমন্ত হলো বিরল পোজাতির একটা ঋতু। ভীষণ রকমের পরিযায়ী। আর ছটফটে। আসতে না আসতেই পালাই-পালাই ভাব। তবু ওই সময় থেকে গোটা শীতকাল পজ্জন্ত আমাদের খাবারের তেমন কষ্ট নেই। এমনকি বসন্তকালটাও মোটামুটি চাইলে নেওয়া যায়। শীতকালে তো বেদম মজা! কত্তো কতো ফসল! ধান আলু তো আছেই , আছে আরও নানানিধি ফসল।
তখন খাও আর হাগো আর ফসলের খেতে একেবারে গাছের গোড়ায় বাসা বাইনে ঘুম্মে থাকো! অত ফসলের মাঝে চট করে কারও চোখেই পড়ে না আমাদের অস্তিত্ব। দিনের বেলা বাসার ভেতর থেকে কখনো কেমন দাঁতে কেটে খাবারের সোয়াদ নেওয়া। আসল মজা তো রাতে! সব্বাই বেরিয়ে আসা, আর পরাণ ভরে খাওয়া… ছোটাছুটি – হুল্লোড়!
কখনও কখনও বড়ো মিঞা – ওই লক্ষীর বাহন পেঁচা, সে ডানায় ঝড় তুলে ঝাপট মেরে আচমকা এসে তার পায়ের বাঁকা তীক্ষ্ণ নখে তুলে নিয়ে যায় আমাদের। হয়তো আরও কোনো নিশাচর শিকারী পাখিও ছোঁ মারে। একটু সামলে থাকলে ভয় নেই। তবুও কেউ কেউ মরণের মুখে পড়ে যায়, শিকার হয়ে যায়। দলের সবার মন খারাপ হয়ে যায় ত্যাখন। বিশেষ করে মায়েদের খুব কষ্ট হয়, বাচ্চাদের তুলে নিলে। সেটা অবশ্য খানিকক্ষণের জন্যি। আমরা জানি, পেটই আসল কথা। সে গভর না ভরলে চলে না। শোক করা বিলাসিতার সমান। সে সময়ও বিধাতা আমাদের দেয় না। তাই পেটটুকুন নিয়েই আমাদের বাঁচন।
জানি যে, দুর্ভাগ্য আমাদের সঙ্গী। তাই সব্বদা তেমন হা-হুতাশ করি না। তবে অযাচিত প্রাপ্তিতে বাঁধভাঙা আনন্দে ফাল্গুনের দমকা বাতাসের মতো মাতোয়ারা হয়ে যাই। আমরা এরকমই। আমাদের নিয়ে চক্রান্ত হয়, কুম্ভীরাশ্রুর ঢল নামে কখনও কখনও। বোকা বোকা মুখ করে বসে থাকি পাথুরে ঢিপির মতো তেকেলে বুড়ো যেমন অচল। সবাই ভাবে, যেন কিছু বুঝছি না, যেন কত শক্ত অঙ্ক। বুঝি সবই, কুলোর বাতাস আর আসন-সঙ্গতে তালপাতার বাতাসে কতখানি তফাত। কিন্তু কিছু করার ক্ষমতা নেই। কী করে থাকবে? আরে – কত হাতি-ঘোড়া সমুদ্দুরের সামনে থমকালো, আর আমরা তো ইঁদুরের জাত। আমাদের আছেটাই বা কী?
আমাদের গান নাই, কবিতা নাই, ক্যানভাস-ইজেল নাই, চোঙা নাই, ক্যামেরা নাই , ঘুরে বেড়ানোও নাই। দূর-দূরান্তরে। জগৎখানা দেখার সাধ কার না হয়? তবু যাবার ক্ষমতা নাই। নাই ইস্কুল-কলেজও। শুধু পেট ভরানোর জন্যি ছুটোছুটি আর হাজার সুলুকসন্ধান। তবে গান কি আর ভালো বাসি না? নিশ্চয়ই বাসি। আমাদের একার কোনো গান নাই, সব গান একসঙ্গে সবাই মিলে। যখন দূরে কোথাও হাতুড়িতে কয়লা ভাঙার কাজ চলে, তখন সেই কেজোরা গান ধরে। যখন চাষীর দল ছপছপ করে বীজ টেনে, রুয়ে চলে একমনে তখন গান ওঠে দিগন্আত তেকে হাওয়ার দরাজে। আকাশে তারাগুলো ঝিকমিক করে, অনেকখানা নীচে নেমে এসেছে বলে যখন মনে হয়, চাদ্দিক শুনশান হয়ে থাকে। সেইসব সময় গান ধরি সক্কলে মিলে। কেই বা শোনে সে গান? ফুল ফোটার শব্দ যেমন শোনা যায় না, চাঁদের গা থেকে জ্যোৎস্না যেমন আলগা হয়ে পৃথিবীতে নিঃশব্দ ডানা মেলে ছড়িয়ে পড়ে, মাটিতে গুবড়ে পোকাদের চলন যেমন শোনা যায় না – তেমনি আমাদেরগান তোমরা শুনতে পাবে না।সবার গান আছে, নাহলে কেউ বাঁচে কীকরে?
আমাদের ঘুরে বেড়ানোর সীমানা বাঁধা। তার বাইরে বেশিদূর যেতে পারি না।
দু-চারজনকে কোনো কিছুতেই দমানো যায় না কোথাওই। তাদের মোট্টে ভয়ডর নাই ! দূরের বাসে-ট্রেনে উঠে পড়ে। খুব হাউস তাদের। দেখতে জানতে চায় দুনিয়াটাকে, যতটা পারে। সেই যে যায় তারা, আর ফেরে না কোনোদিন। হারিয়ে যাবার জন্যিই তারা যেন জন্মায়।
তো ওই শীতকেলে আমোদ আর বসন্তের ক’টা দিন হুস করে ফুইরে যায়। সব মজা ত্যাখন গড়ের মাঠ। শুরু হয় খাবারের কষ্ট। খাবারের সন্ধানে কেটে যায় দিনের পর দিন। তখন বাধ্য হয়ে মাঠ থেকে যে যেমন পারে চেষ্টা চালায়।
আমরা ঢুকে পড়তে লাগলুম গেরস্ত বাড়ীতে। খাবারের দোকানে, মুদিখানায়, গোডাউনে। আসলে যেখানেই খাবার পাবার বিন্দুমাত্তর সম্ভাবনা আছে, বাদ দিই না তার একটাও। ঘেঁটেঘুঁটে উল্টে পাল্টে দিই যত ডাস্টবিন আর আবর্জনার গাদা। অলিগলি কিছুই বাদ পড়ে না। খোঁজ চালানো হয় বিয়েবাড়ি, আর পাঁচটা অনুষ্ঠান আর ভোজবাড়ীর। মরিয়া হয়ে দিনের বেলাও বেরিয়ে পড়ি কেউ কেউ।
সেদিন খাস্তগীরদের ছেলের পৈতে ছিলো। লজ ভাড়া নিয়ে পেল্লাই আয়োজন। লজের ভেতরে যেমন ডাস্টবিন আছে, তেমনি লজে ঢোকার মুখেও রয়েছে। ঝুঁকি আছে জেনেও পরাণটা হাতে নিয়ে সিঁড়ি পেইরে দু’জন চলে গেল দোতলায়। নীচে আমি আর পটাই ছিলুম, লজের মুখটায়। ডাস্টবিনের ভেতরে তো আর নামতে পারব না। মুখ ঢুকিয়েও খেতে পারব না। ভেতরে নামলে জম্মের খাওয়া খেয়ে আবর্জনার নীচে অক্কা পেতে হবে। তেমন তেমন জাঁদরেল কুকুর ছাড়া কেউ মুখ ডুবিয়ে খেতে পারে না। আমরা ডাস্টবিনের বাইরে কিছু পড়লে তবে খেতে পাবো।
খুব সাবধানে থাকতে হয়, আড়াল না থাকলে সে দিগরে যাবার চেষ্টাও করি না। ওইদিন যথেষ্ট সাবধানেই ছিলুম, তবু কেমন করে একটা কাক, সে বেশ তাগড়াই, পটাইকে চোখের পলকে তুলে নিয়ে পাইলে গেল। আরও দু-একটা কাক কা-কা করতে করতে উড়ে গেলো তার পেছুন পেছুন। আমি শুধু তাক্যে তাক্যে দেখলুম, কিচ্ছুটি করতে পারলুম না। কীকরে পারব? একটা ইঁদুরের কতটুকুনি আর খ্যামতা!
এমন করেই আমরা বেঁচে থাকি। সব্বদা নড়াই করে।
পটাই চলে গেলো। বিয়েবাড়ীও মিটে গেলো। ক’দিন খাবার খুব কষ্ট।
রাস্তার গা ঘেঁষে ঘেঁষে পুবমুখো রওনা দিয়েছি। পোথম বাড়ীটা মন্ডলদের। সাবধানে মন্ডলবাড়ির পেছুনে এলুম। এদিকে ওদের বাড়ির নালা। মনে হলো বাসনকোসন ধোয়। সেখান থেকে মাজেমদ্যি ভাত-তরকারির টুকরোটাকরা পড়ে থাকে। তো আমরা জনা তিনেক গেলুম। পাত্তা করতে পারলুম না। সে জায়গা ছুঁচোরা দখল করে আছে আগে থেকেই। চল! চল! পালাই -!
ও বাড়িতে ঢোকা খুব টাইট ব্যাপার। কোথাও এতটুন ফাঁক নাই মাইরি! জানলায় তারের জাল। সন্ধ্যে হতে না হতে দরজা বন্ধ।
আমরা ঢুকেছিলুম পাঁচিরের গায়ে একটা ফাটল দিয়ে। ঘরে ঢোকার গেটের সামনে ধানের একটা বস্তা ছিলো। সে রাতটা খেয়ে বাঁচলুম। ভাবলুম কিছুদিন নিশ্চিন্দি হওয়া গেল।
কিন্তুক কপাল খারাপ। আসলে সবই খুব অনিশ্চিত, আমাদের জীবনের মতোই। পরের দিনই একটা হুমদো লোক এলো। বস্তাটা পিঠে তুলে নিয়ে চলে গেল গেটের বাইরে। একটা মটর ভ্যান ভটভট করে আওয়াজ ছাড়ছে।
এ বাড়ির লোকটা বললো, “ঠিক জায়গায় বস্তাটা নামিয়ে দিস রে!”
– হ্যাঁ দাদা। সে কথা বলতে হবে না।
পাশে কটা ভাঙাচোরা জিনিস পড়েছিলো, তার আড়াল থেকে আমি জুলজুল করে তাকিয়ে দেখলুম সবটা।
– মুখের গ্রাস চলে গেল, মাইরি! আমি চেঁচিয়ে বললাম। বাকি দুজন অন্য জায়গায় লুকিয়েছিলো। অপেক্ষাকরা ছাড়া কী-ই বা করার আছে? রাতে ভাগ্য খুলে গেলো।