T3 || ঘুড়ি || সংখ্যায় যাজ্ঞসেনী গুপ্ত কৃষ্ণা

স্বপ্নঘুড়ি আসলে ফিনিক্স পাখি
আমি নিজে কোনোদিন ঘুড়ি ওড়াইনি। তবে ঘুড়ি ওড়ানো আর উড়ন্ত ঘুড়ি দেখতে খুবই ভালো লাগে। আমার ঘুড়ি সংক্রান্ত তেমন উল্লেখযোগ্য কোনো স্মৃতি নেই! ঘুড়ির কথায় কেবল মনে হয়, মানুষের কত কত স্বপ্ন কাটা ঘুড়ির মতো লাট খেয়ে প্রতিনিয়ত খসে পড়ছে, সেইসব ব্যর্থ অভিমানী স্বপ্নেরা কোন নির্জন প্রান্তর বা অন্ধকার খানাখন্দে পড়ে থাকে তার সন্ধান কেউ রাখে না।
আচমকা মনে পড়ল, বছর দুয়েক আগের শীতকালের কথা। গ্রামের বাড়ি গেলে সাধারণত যা হয়, দেদার ঘুরে বেড়ানো আর ইচ্ছেমতো সময় কাটানো!
শীতের দুপুরে মাঠে বসে রোদ পোয়াতে পোয়াতে অনেকে মিলে গল্প জুড়েছিলাম। তিন চারটে জমির ওদিকে কয়েকজন কিশোর ও বালক-বালিকা ঘুড়ি ওড়াচ্ছে। ঝকঝকে নীল আকাশের বুকে দুটো পেটকাটি নজর টেনে নিল। মনের সুখে উড়ে বেড়াচ্ছে ঘুড়ি দুটো। একটা লাল আর একটা সবুজ রঙের। তারা কখনও কাছাকাছি আসছে, কখনও সামান্য দূরে সরে যাচ্ছে। সবুজটা ওই একটু নীচে নেমে এল, পরক্ষণেই লালটা তার কাছে ছুটে গেল যেন, যেন খুব যত্নে তার অভিমানের কারণ জানতে চাইছে। আবার তারা দুলে দুলে উঠে গেল খানিকটা উপরে। লালটা একবার কাছে এলো সবুজের, চট করে তার গালে হালকা ঠোঁটের স্পর্শ দিয়ে সরে গেল। মিটিমিটি হাসছে কি? তারপরই আচমকা লাল ঘুড়িটা সবুজের গায়ে সজোরে আছড়ে পড়েছে! আর আকাশের বুকে এতক্ষণ যে লাল-সবুজ পেটকাটির খেলা চলছিল, সেই খেলার মাঠ ছেড়ে পলকা তুলোর মতো একবার উল্টেপাল্টে গিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে সবুজ ঘুড়িটা।
ভোঁকাট্টা হয়ে যেতেই ছেলের দল হো হো করে ছুটল কাটা ঘুড়ি ধরতে। আমাদের থেকে অল্প দূরে বসে চুল শুকোচ্ছিলেন পদ্মাকাকীমা। আহা! তিনি বোধহয় নিজের বয়স ভুলে কিশোরী বয়সে ফিরে গিয়েছিলেন একলাফে। অমনি লাফ দিয়ে উঠে তাঁরই দিকে উড়ে আসতে থাকা ঘুড়িটা ধরার জন্য ছুট লাগালেন। কিন্তু দু-পা গিয়েই তিনি হোঁচট খেয়ে পড়লেন মুখ ধবড়ে কাটা ধানগাছের নাড়ার উপর। আমরা সবাই ছুটলাম তাঁর দিকে, ‘আহা আহা – কী হল কী হল’ বলে!
তাঁর পায়ের বুড়ো আঙুলের নখটা পুরো উড়ে গিয়ে মাথার কাছে সামান্য লেগে আছে, একেবারে রক্তারক্তি ব্যাপার! তারপর তাঁর আহত বুড়ো আঙুলে, মানে যাকে বলে পদাঙ্গুলিতে জলসিঞ্চন করে কাপড়ে রক্ত মুছে দুব্বোঘাসের রস লাগিয়ে দেওয়া হল। এর জন্য ডাক্তারখানা যাবার কথা পদ্মাকাকীমা সপাটে উড়িয়ে দিলেন। ও হ্যাঁ! যে বাচ্চাটা কাটা ঘুড়ি পেয়েছিল, সে সেটা কিনা পদ্মাকাকীমার হাতে তুলে দিল সান্ত্বনা পুরস্কারের মতো! কাকীমা তো জিভটিভ কেটে একসা!
এখনও তাঁর পায়ের আঙুলের নখ ঠিকঠাক হয়নি। নখের ভেতরটা ফোপড়া হয়ে গেছে চিরদিনের জন্য, আঙুলের মাথা উঁচু হয়ে গেছে – কাকীমার ভেঙে যাওয়া অনেক স্বপ্নের মতোই। স্বপ্নকে কল্পনার আকাশেই ভালো মানায়, বাস্তবে তাকে রূপ দিতে গেলে আমাদের আহত হতে হয় অনেক সময়।
কাটা ঘুড়ি দেখে আমার মনে অবশ্য সবসময়ই যুগপৎ আনন্দ আর নশ্বরতার বোধ জাগে, জাগে মৃত্যু চেতনা। জীবনরূপ আকাশে জীবনের ঘুড়ি উড়ে চলেছে। প্রতি মুহূর্তে কেউ না কেউ খসে পড়ছে সেখান থেকে। আবার প্রতি মুহূর্তে জন্মও নিচ্ছে কত কত কচি প্রাণ।
এই বোধের জাগরণ ঘটেই তা টুপ করে ডুবে যায় আমার চেতনার গভীরে। কারণ গুরুগম্ভীর দর্শনচিন্তা কুলোনোর মতো আমাদের মতো সাধারণ মানুষের ধারণক্ষমতা ছোট। এবং ঘুড়ি প্রসঙ্গে দর্শনকে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে সেই মুহূর্তের হুজুগে মনোভাবখানাই বেশি শক্তিশালী হয়ে ওঠে। সুতরাং ঘুড়ি ভোঁকাট্টা হলেই মানুষ মাত্রেই আনন্দ পায়। কেন পায়, তা কে বলবে? একজন অন্যের ঘুড়িকে প্যাঁচে কেটে ফেলতে পারল – তার এই সাফল্য দেখে আনন্দ? নাকি একজন বেশ জব্দ হলো, একজনকে জিতে নিয়ে গো-হারান হারানো গেল – এটা দেখে আনন্দ? সাধারণত মানুষ নিজের আনন্দে যত না আনন্দিত হয়, অন্যকে প্যাঁচে পড়তে দেখলে আনন্দ হয় তার থেকে বহুগুণ।
অন্যের ম্লানমুখ দেখেও আমাদের আনন্দ! – এইখানে নীতিশাস্ত্রের কথা এসে যাচ্ছে যে, আমাদের কাজ করার পন্থার সাথে সাথে আমাদের আচরণের ঔচিত্যও আনন্দের সঙ্গে সম্পর্কিত। সব দেশেই আলঙ্কারিক ও দার্শনিকগণ বলেছেন, আনন্দের উৎসমূলে কিঞ্চিৎ দুঃখ আছে। তাই রামায়ণ সৃষ্টি হলো। অ্যারিস্সটটল ‘ক্যাথারসিস’ বা ‘পারগেশান’এর কথা বলেছেন। ফর্তে বলেছেন, দুঃখ বা আনন্দের অনুভূতির ভেতর একটা সূক্ষ্ম পর্দা থাকলেও, দুটোর উৎসের কারণে নাকি কোনোই পার্থক্য নেই। কম পরিমাণে আঘাত ও দুঃখই আনন্দ সৃষ্টি করে বলেই কেউ আছাড় খেয়ে পড়লে আমরা মজা পেয়ে হেসে উঠি। যাক গে, এসব কথা সবারই জানা, নতুন কিছু নয়।
‘ভোঁকাট্টা’ শব্দটি আমাদের শৈশব ফিরিয়ে দেয় বারবার। পদ্মাকাকীমার পায়ের বুড়ো আঙুলখানা অবশ্য ঘুড়ির স্মৃতিকে তাঁর শৈশবের সঙ্গে প্রৌঢ়ত্বের যুগলবন্দী ঘটিয়ে দিয়েছে। অবধারিতভাবে আমার স্মৃতিও তাতে কিছুটা জড়িয়ে বেশ জড়াজড়ি রসালাপ হয়ে থাকল সন্দেহ নেই। আর এতেও সন্দেহ নেই যে, স্বপ্নঘুড়ি কখনও পুরোপুরি ধ্বংস হয় না, তা আমাদের নির্লজ্জ প্রমাণ করে ছাই থেকে বারবার জেগে ওঠে ফিনিক্স পাখির মতো।