গল্পগুজবে জয়িতা ভট্টাচার্য

জতুগৃহ

মালিনী চোখ সরাচ্ছে না আয়না থেকে যেন পলক পড়লেই হারিয়ে যাবে কোনো অপরূপ দৃশ্য।এপাশ ওপাশ ঘুরে ফিরে চোখ আটকায় বুকে।এই কুর্তিটায় বেশ কেয়ারলেস ইসারা আছে উপত্যকার কাছে।
সরকারি কাজে দুদিন কোন গণ্ডগ্রামে,মনোরঞ্জন বলতে সঙ্গের দুই পুরুষ।স্মিত হাসি খেলে যায় মালিনীর ঠোঁটে।
মালিনী বোস বদলে গেছে।আমূল বদল।
নীচে গাড়ির ডাক।ছোট্ট কিটব্যাগ আর টুকটুকে লাল ভ্যানিটি ব্যাগটা নিয়ে হাই হিল অবতরণ করে রাস্তায়।
চৌকিদারের চোখ চক চক।
ভিক্টর আর অমিতাভ ব্যানার্জি একবার শুধু তাকায়।সে আশা করেছিলো মুগ্ধতা।
এই প্রজেক্ট টা কভার করতে দুদিন লাগবে।মছলন্দপুর ছাড়িয়ে ১০কিমি ভেতরে গ্রামগুলির সার্ভে রিপোর্ট।আন্তদয়া যোজনা ও এম জি এন আর ই এ র রিপোর্ট।সরকারি এজেন্ট তারা।
__” মালিনী আপনি কিন্তু তেমন কোনো হোটেল বা অন্য সুবিধে পাবেন না ওখানে।পঞ্চায়েতের নেতার বাড়ি আর পার্টি অফিসে থাকতে হবে।
_” জানি।কী আর করা যাবে।ভদ্রস্থ খাবার দাবার নিয়েছেন ত কিছু।”
_”হুম,” অমিতাভ ফাইলে ডুবে যায়।তবুও মালিনীর সুবাস ছোঁয়া অন্যমনস্ক করে দেয়। প্রতিমার মুখ,বাপনকে নিয়ে সুখী সংসার। অপরাধবোধ কাজ করছে মন জিভ বার করছে।
ফাইলে মন দেয় অমিতাভ।ঘন্টা কেটে যা়য়।
ক্রমশ শহর ছেড়ে মফস্বল।ঘিঞ্জি দোকান পসার জিলিপি,পেটা পরোটা,কাপড়ের দোকান,কাঁচা মাছ।
কাচ তোলা।ভেতরে শীতল।মালিনীর কানে হেডফোন।চোখ বন্ধ।
ভিক্টর ও ব্রায়েন পেছনে তাকায়
__” হবে না কি জিলিপি”
__”হোক”
__” ম্যাডাম খাবেন?”
দুবার ইসারায় কান মুক্ত হয়,
_”ইশ এই সব বিষাক্ত তেলে ভাজা জিনিষ, নির্ঘাত ডায়েরিয়া হবে।নাহ”
ড্রাইভার রামশরণ ৫০০ জিলিপি আনে।তিনজনে খেয়ে নেয়।
_” অমিতাভ আপনি কলকাতায় ফ্ল্যাট নিচ্ছেন কবে”
_”ম্যাম বারুইপুরে আমাদের দুবিঘে জমি।বাড়ি দুর্গাপূজা হয়,খামার,দাদারা থাকেন মা বাবা সব ছেড়ে…….”
ভিক্টর _” আপনি কি একাই থাকেন ম্যাম”
_” ওই আর কি।একটা বাচ্চা মেয়ে রেখেছি রাতদিনের।ট্যুরে যেতে হয়।ডিভোর্সের আগেই ছেলেকে দুন স্কুলে দিয়েছিলাম”
বড়ো বড়ো পুকুর গাছ সরু রাস্তা।ক্রমশ বদলে যাচ্ছে ভুগোল।জংলা পথে সুনিবিড় ছায়া। খস খস পাতা পড়ছে অনবরত। ফাঁকা হয়ে আসছে বসতি ।সবুজ ক্ষেত আর মাঠ পেরিয়ে আবার একটি গ্রাম।ঝোপের ধারে জনহীন এরকমই একটা জায়গায় গাড়ি থেমে যায়।
ড্রাইভার জলবিয়োগ করবে। ব্যাপারটা সংক্রমণের মতো। বাকী দুজনও গাছে জল দেয়। মালিনী কোমর টানটান করে মাঠে পা দিয়ে।গরম কমে এসেছে। একটা সিগারেট ধরায় গাড়িতে হেলান দিয়ে।দূর আলপথ দিয়ে একটা আদুল গায়ে পেট ফোলা ছেলে যাচ্ছি।ফ্যালফ্যাল করে দেখছে তাকে ।দাঁড়িয়ে পড়েছে।পাশেই কাকতারুয়া।

মাত্র রাত১০টা।কলকাতা সরগরম।আর এখানে মাত্র ৪ ঘন্টার দূরত্বে নিঃসীম অন্ধকারে ডুবে আছে একটা গ্রাম।মালিনী বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। সিগারেট টা ধরাতে গিয়ে কী ভেবে নিবিয়ে দেয়।মাথার ওপর অনন্ত আকাশ থিক থিক করছে তারা।কী আশ্চর্য লাগছে। মালিনী মনে করতে পারেনা কবে এমন তারাভরা আকাশের নীচে দাঁড়িয়েছিলো একাকী। অনেক কিছু উল্টো পাল্টা ঘটে গেছে দুপুরে পৌঁছনোর পর থেকে। পঞ্চায়েত প্রধানের বাড়িতে তিন ছেলে তিন পুত্রবধূ।ছোটো ছেলে বিরোধী পার্টি করে কিন্তু শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান। স্নান করার পর বড় বউ অনিতার জোরাজুরিতে লাল ব্লাউজ আর টিয়া রং শাড়ি। আরষ্ট লাগছিলো মালিনীর।
ঘাসে পড়ে আছে কার্তিকের হিম।সামনে একটা গাছ তাকে ঘিরে অসংখ্য জোনাকি।
শেষ কবে ক্যানভাসে রং বুলিয়েছে মনে পড়েনা। আঁচলটা গায়ে জড়িয়ে নেয়।
_ ঠাণ্ডা লেগে যাবে ম্যাডাম
উল্টো দিক থেকে টর্চ হাতে বাড়ি ফিরছে মেজ ছেলে পঙ্কজ।
_” না ঠিক আছে।বেশ ভালো লাগছে হাঁটতে। ”
_” ভালো লাগছে! এই ভুশুণ্ডির গণ্ডগ্রামে আপনাদের জন্য কিছুই করা যায়নি।এবছর আসলে ফলন ভালো হয়নি।অনেক ছেলে চলে গেছে কাজের খোঁজে অন্য রাজ্যে।”
_” ফলন হয়নি কেন ?”
_” আসলে ,অনেক ব্যাপার আছে। কাল সকালে বলব ।গ্রামটা শেষ হয়ে গেছে।আগে এরকম ছিলনা”
__” এখানে জমি ত রয়েছে।চাষ বাষ হয়না কেন ঠিকমত”
__”এখন ছেলেরা চাষ করতে চায়না।শহরের নেশা লেগেছে।সেচ ব্যবস্থা নেই , সার এর যোগান কম তারপর দলাদলির ব্যাপার আছে।জমি নিয়ে দাঙ্গা লেগেই আছে”

অমিতাভ ভিক্টর গ্লাস নিয়ে বসেছে।সেও কয়েক চুমুক দিয়েছে। সাফোকেটিং লাগছিলো। এই দেশীয় রাজনীতি,স্থুল ইয়ার্কি, শেয়ারের বাজারের আলোচনা….
বেরিয়ে এসেছে সে।
পেছন থেকে অমিতাভর চাপা গলা
_” শাড়িটায় বেশ মানিয়েছে ম্যাডাম”

অনেক দুশ্চিন্তা। মাথা ভর্তি অঙ্ক।
দূর থেকে ওটা কি শেয়াল ডাকলো ? গাঢ় অন্ধকার আলপথের দুধারে চাষজমি।মরা ক্ষেত।
অনিন্দ্য বামপন্থী।বাপের ও দাদাদের বিপক্ষে। এখানে সংগঠন শক্তিশালী করতে চায়।
এখনো পরিচয় হয়নি তার সাথে।মাঠ তারপর কিছু বাড়ি।একতলা টালির চাল,মাটির কোনোটা এসবেস্টরের ছাউনি।বিদ্যুৎ অনিয়মিত।টিম টিম করছে ঘরে ঘরে আলো। কোথাওবা পাড়া ডুবে আছে নিদ্রায়।
অনিন্দ্য কেন ফেরে অনেক রাতে।
মালিনী হাতে শুকনো খড়ের টুকরো তুলে নেয়। সামনে পুকুর।ঝুপসি গাছ।
ঘাটে বসে। অনেক দূর থেকে বাঁশীর আওয়াজ ভেসে আসছে।
অমিত কেমন আছে?সুখী নিশ্চয়।ইটালিতে নতুন বউ নিয়ে। সে? জেদ করে নিজেকে পাল্টে পুল্টে প্রতিশোধ কার ওপর!!
একটি বউ।একরাশ বাসন নিয়ে ঘাটে।
তাকে অবাক চোখে দেখে হাতের লন্ঠনটা নামিয়ে।
_”নতুন এসেছ নাকি গা ?কাদের কুটুম?
__”হ্যাঁ নতুন। এতরাতে এসেছ,সাপ খোপ নেই?”
_”ওমা সাপ থাকবেনা? আছে তবে বেশির ভাগের বিষ নেই।বাসন না মাজলে সকালে চারটেয় ভাত বসবে কী করে?তা তোমার বুঝি সাপে ভয় নেই” খিলখিল করে হাসে বউটি।
মালিনী কথা ঘোরায়,
__”কে বাঁশী বাজায়?”
__”ওই যে অনিন্দ্য দাদা, কত রাত অবধি….”
হাতের চুড়ি আর বাসনের আওয়াজে হারিয়ে যায় বাকী কথা।
ঠাণ্ডা হাওয়ায় সারা শরীর কেঁপে ওঠে।
জঙ্গলপথে মালিনী আনমন।বাঁশি নেই।কিছুটা যাবার পর পেছনে পদশব্দ।”সে যে মোহ মেঘে….

–“আপনি মালিনী বসু?সরকারি দূত?”খুব আপন গলায় বলে মাথা ঝাঁকালো চুল শ্যামলা একটি ছেলে।এখনো অন্ধকার এখনো বনাকীর্ণ তবু ছেলেটি আলোর মতো পাশে।—“কী অপূর্ব গান গাও আর বাঁশি বাজাও অনিন্দ্য ”
——“আমাকে চিনে ফেলেছেন ,আমিই বাড়ি র সেই কুলাঙ্গার কনিষ্ঠ পুত্র “হাসতে হাসতে বলে অনিন্দ্য ।
মালিনী হাসে।মোড়কের হাসি নয় প্রাণখোলা হাসি।কতদিন পর।
__”আসুন এখানে বসি” ভীষণ সহজে বলে ছেলেটি যেন তার ইচ্ছে পড়ে ফেলেছে অনায়াসেই ।
গাছের তলাটা পরিষ্কার, আকাশে চাঁদ।মালিনী চুপ করে আছে।মুগ্ধতায়।
—“কাল কাজ সেরে সাবধানে ফিরে যাবেন এখন সময় ভালো নয়।”
—“তুমি ভোটে দাঁড়াচ্ছ শুনলাম, তোমার বাবা বললেন।নিজের বাবা,দাদার সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ”
—-“আমাদের গ্রামে আমার বাবার মত ছাড়া একটা পাতাও নড়ে না মালিনী ”
মালিনী হেঁয়ালির মানে বোঝে না।
–“বিয়ে করবে কবে।”
–“হা হা হা হা আমাকে সবাই ভয় পায় কে বিয়ে করবে।আমার চালচুলোহীন নেই বাঁচার ঠিক নেই”
—“একথা বলছ কেন”
কিছু না।চলুন রাত হলো।
–“কাল সার্ভে হবে কয়েকটি গ্রাম তুমি যাবে?”
—“আমি গেলে যে চৈতন্য হবে।যেমন আছে তেমন থাক।”
—“অনিন্দ্য, আমরা খবর পেয়েছি এখানে কেন্দ্রীয় যোজনার বরাদ্দ টাকা খরচ হচ্ছে না।তোমার বাবার বিরুদ্ধে খুব তাড়াতাড়ি কিছু পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হবো আমরা।তোমাদের সংগঠনটা আরো শক্তিশালী করার চেষ্টা করো।তুমি একজন সৎ নেতা হতে পারবে”
—“নেতা!!হাসালেন।বাবা অনেক হিসেবে করেই রেখেছেন।
আপনাকে বেশ আপন আপন লাগছে”
দূর থেকে দেখা যাচ্ছে বাড়ি টা।
রাতে ঘুম হয় না।নানা রকম আওয়াজ ।ওপর থেকে দেখতে পায় বাড়ির কর্তা ,কয়েকটি অন্ধকার মাখা যুবক ,ফিসফাস, হাল্কা বাতাসে পচা গন্ধ।আধো ঘুমের মধ্যে কে মাথায় হাত রাখে,নরম হাত।–“বাঁশিটা রাখুন মালিনী,আর কিছু ত নেই”
—“কলকাতা যাবে অনিন্দ্য?”লালচে ফিকে আলোয় স্মিত হেসে চলে যায় সে দিনের প্রথম আলোর কিরণে।
মালিনীর বুক চাপা কষ্ট ঘরের ঠাণ্ডা বাতাসে ঘুরপাক খেতে থাকে “আর ত কিছু নেই”।
যতটা খারাপ ভাবা গেছিলো তারচেয়েও অভাবনীয় ঘটনাবহুল কাটলো দিন। সমস্ত অঞ্চল সার্ভের পর তড়িঘড়ি পলায়মান বিডিও অফিসার পাকড়াও করতে পুলিশ ও প্রসাশন একযোগে পাহারায়।অনেক নথি গায়েব।লক্ষ লক্ষ টাকা তছরুপ হয়েছে।পঞ্চায়েত প্রধান এর বাড়ি ঘিরে আছে পুলিশ ।বাড়ি তোলপাড় করে হিসাবহির্ভুত সোনার স্তূপ,
দেওয়াল ভেঙে লুকোনো টাকার পাহাড়, সুধাময় মণ্ডলকে এরেস্ট করা গেলো গ্রাম ছাড়িয়ে একটি পুকুরের থেকে।বাঁচার জন্য জলে ঝাঁপ দিয়েও শেষ রক্ষা হয়নি।
সারাদিন অনিন্দ্য নেই কোথাও।ভালোই করেছে।হয়ত অন্য কোথাও আছে পরিস্থিতি শান্ত হলে ফিরবে।মনে পড়ছে ঘুরে ফিরে তবু মুখ টা।

এক ব্যাটেলিয়ন পুলিশ ও প্রিজন ভ্যানে প্রধান,তার সাগরেদ,বি ডি ও আর এলাকার এ এস আই সমেত যখন ক্লান্ত ফিরতি পথ ফোনটা বাজছে ।খোদ সরাষ্ট্র সচিবের ফোন” কনগ্রাজুলেশন অফিসার।আপনি ছাড়া মিশন সফল হতো না”।অবসন্ন সি বি আই অফিসার মিসেস মালিনি বোসের মন।__”স্যর অনিন্দ্য র সমস্ত তথ্য ছাড়া সম্ভব হতো না রেড।ওরা কোনো আন্দাজ করতে পারেনি এটা সি বি আই ফোর্স।ওর প্রোটেক্সন প্রয়োজন “।–“শিওর অফিসার”।

গোধূলি র শেষ আলোয় দূরে ক্ষেত,কাকতাড়ুয়াটা আধো অন্ধকারে হাতছানি দিচ্ছে ।গাড়ি থেকে নেমে পড়েন মালিনী দুজন এস আই সঙ্গে ।
অভিজ্ঞতা তাঁকে আশংকিত করে তুলছে ।
কাকতাড়ুয়ার পায়ের কাছে পড়ে আছে গলা কাটা লাশটা।রক্তে ভিজে আছে সবুজের বিছানা।
পেছন ফিরে ধীরে ধীরে গাড়িতে ওঠে মালিনী।অবিরাম অশ্রু দৃষ্টি ঝাপসা করে দিচ্ছে ।বাঁশিটায় পরম আদরে হাত বোলায় মালিনী।
(সমস্ত ঘটনা কাল্পনিক)

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।