“এই শ্রাবণে আষাঢ়ে গপ্পো” বিশেষ সংখ্যায় জয়ন্ত বিশ্বাস

আষাঢ়ে.. ভাদরে.. নাকি জন্মান্তরে

বাস্তবতার সব নিয়ম, দর্শন আর ফিলোজফির বাউন্ডারি ঘুচে যায় একমাত্র স্বপ্নে। কালোকে সাদা, সাদাকে লাল বলার লাইসেন্স ইস্যু হয় ওই স্বপ্নেই। তাই স্বপ্নচ্ছন্ন মানসিক প্রশান্তি অনেকাংশেই সুখ সঞ্চারি। তবে সব স্বপ্নিল অনুভূতি কি সুখানুভূতির তুল্য?এই প্রশ্নটা ইদানিং সৌরিশের মনে দারুণভাবে মাথাচারা দিয়ে উঠেছে ।
সৌরিশ বাপ-মায়ের এক ছেলে। পড়াশোনায় খারাপ নয়। তবে একটা বাজে অভ্যেস হল বিছানায় শুয়ে শুয়ে বই পড়া আর পড়ার বই হলে কিছুক্ষণ পরেই চোখ বুজে ফেলা। এই নিয়ে বাড়িতে চিৎকার চেঁচামেচির অন্ত নেই। তবে সৌরিশের বাবা এই প্রসঙ্গে বিশেষ একটা পদ্ধতি অবলম্বন করে চলেন। তিনি যখনই ছেলেকে সামনে বই খুলে ঘুমোতে দেখেন তখনই সন্তর্পনে সিলিং ফ্যানটি বন্ধ করে খোলা অবস্থায় পড়ে থাকা বইটি সঙ্গে নিয়ে চলে যান।
পরীক্ষার ঝক্কি কাটিয়ে পরিবারের সবার সাথে সৌরিশ এখন ঘুরতে এসেছে মহারাষ্ট্রে। সৌরিশের বাবার পিষেমশাই গত হয়েছেন.. সেই উপলক্ষে এখানে আসা। এই আত্মীয়দের সাথে সৌরিশের পরিচয়ও এই প্রথম। এখানে আসার প্রথম কয়েকদিন পরলৌকিক কাজকর্ম নিয়ে সবাই একটু ব্যাস্ত থাকলেও তারপর থেকেই আদর যত্নের রমরমা শুরু হয়। কত রকম নতুন নতুন পদের রান্না, কখনও চিংড়ি মাছের পিঠে কখনও বাঙালি স্টাইলের কাবাব। সবার মুখে একটাই কথা সুদীপের ছেলেটা একদম হুবহু ওর দাদুর মতোই হয়েছে। কলকাতা নিবাসী সুদীপবাবুর যেসকল আত্মীয়ের নিয়মিত আসা যাওয়া আছে ওনার বাড়িতে তারাও বলেছে যে সৌরিশকে ওর ঠাকুরদা’র মতো দেখতে।
দুপুরে খাওয়াদাওয়া সেরে পিসিঠাকুমা আর অন্যান্যদের সাথে বসে পুরনো ছবির অ্যালবাম দেখছিল সৌরিশ। হঠাৎ পিসিঠাকুমা বলে ওঠেন- সুদীপ তোর পোলার পিঠের ডাইনদিকে এই গর্তমতো এইডা কি রে? সুদীপবাবু উঠে এসে সৌরিশের পিঠের নির্দিষ্ট জায়গাটি দেখে বলেন – এটা ওর জন্মদাগ।কিছুক্ষণ পিঠে হাত বুলিয়ে দাগটা দেখে কপালে একটা চিন্তার ভাঁজ নিয়ে পিসিঠাকুমা উঠে আসেন ওখান থেকে।
এদের এই অ্যালবামটায় অনেক পুরনো ছবিও কি যত্নে রাখা। এই তো এখানে সৌরিশের দাদু-ঠাকুমা’র বিয়ের পরের ছবিও রয়েছে। ঠাকুরদা’ তো সত্যিই সৌরিশের মতো অবিকল দেখতে। পৃথিবীতে দুটো মানুষ একরকম হতেই পারে। এতে অবাক হওয়ার কি আছে। কিন্তু পরের পেজটা উল্টোতেই স্তম্ভিত হয়ে শিউরে উঠল সৌরিশ। এইতো শাড়ি পরা সেই মহিলা… ডানহাতে মোটা বালা, স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে গাল ভরা পান। হ্যাঁ! হ্যাঁ একটুও ভুল হয়নি সৌরিশের। একেই তো ও স্বপ্নে দেখে। ধীর-স্থির ছেলেটা এবার লাফিয়ে ছুটে যায় পিসিঠাকুমার খোঁজে। বারান্দায় ওর ঠাকুমা আর পিসিঠাকুমা দাঁড়িয়ে কিছু একটা নিয়ে আলোচনা করছিল। অপেক্ষা না করেই কাছে গিয়ে ছবিটা দেখিয়ে কাঁপা কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করে
– ইনি কে? এনার ছবি তোমাদের অ্যালবামে কেন?
প্রবীণা দুজন একে অপরের মুখ চেয়ে পিসিঠাকুমা অবাক হয়ে বলেন – ক্যান দাদা? তুমি চেনো এ্যারে?
– আমি অনেক বছর ধরেই এনাকে স্বপ্নে দেখি। একদিন সামনেও দেখেছি। তুমি যে জর্দা দিয়ে পান খাও ইনিও সেই জর্দাই খান। ওর কথায় আশ্চর্যের অতলে যেন তলিয়ে যান দুই ঠাকুমা।
ক্লাস নাইন থেকে টানা বছর দু’য়েক সৌরিশের অবচেতনে একই ছবির পুনরাবৃত্তি, সবুজ শাড়ি পরা খোলা চুলের এক মহিলা। কখনও একভাবে তাকিয়ে থাকে, কখনও হাঁটাচলা করে কিংবা কখনও ওদের তিনতলা ছাঁদের চার ইঞ্চি গাঁথুনির রেলিং’এর বাইরে পা ঝুলিয়ে বসে থাকে। কখন কিছু বলে না। শুধু দেখে। কে এই মহিলা! কেন বারবার একে দেখে সৌরিশ! ঘুমের মধ্যে এতবার ওই মহিলাকে দেখলেও ঘুম ভাঙার পর আর কিছুতেই মনে পড়ে না ওই মুখ।শুধু সবুজ শাড়ি পড়া আবছা একটা অবায়ব মাত্র। কিছুই বুঝে উঠতে পারে না। ইলেভেন থেকে টুয়েলভ’এর মাঝামাঝি অবধি সৌরিশ আর দেখেনি এই স্বপ্ন।
এইচ. এস’এর কেমিস্ট্রি পরীক্ষার আগের দিন দোতলার ঘরের দরজা ভিতর থেকে বন্ধ করে রাত জেগে পড়ছিল সৌরিশ। পড়তে পড়তে কখন যে নিদ্রাদেবীর বশীকরন কাজ করেছে তা ও নিজেও টের পায়নি। হঠাৎ রাস্তার দিকের খোলা জানালায় বালা জাতীয় কিছু একটা পরা এমন হাতের চাপরের শব্দে ঘুমটা ভাঙল। জানালায় কে আওয়াজ করবে এভাবে? বেশি আর কিছু না ভেবে আবার ইনঅরগ্যানিক কেমিস্ট্রিতে মন বাসায় সৌরিশ। ব্লক এলিমেন্ট্স চ্যাপ্টারটা ফাইনাল রিভাইজ দিয়ে কো-অরডিনেশান কমপাউন্ড চ্যাপ্টারটা শুরু করে। এবার জ্ঞাতসারেই ঘুম এসেছে। কিন্তু এখনও তো পড়া বাকি। যাক্গে! যা হয়েছে তা ঢের.. সকাল সকাল উঠে রিভাইজ করে নেব এই ভেবে বইপত্তর, লাইট সব বন্ধ করে শুয়ে পড়ে। অনেক দিন হল এখন আর সেই স্বপ্নের উৎপাত নেই। কিন্তু আজ হঠাৎ ঘুমের মধ্যে স্বপ্নে দেখল নিজেকেই। স্বপ্নের মধ্যেও ঘুমাচ্ছে সৌরিশ। সহষা অন্ধকারের মধ্যে থেকে বালা পরা একটা হাত এসে ঘুমন্ত সৌরিশকে ঠেলছে, যেন উঠতে বলছে। বার বার ডাকা সত্বেও যখন জাগানো গেল না তখন সেই হাতটা সজোরে একটা চড় কষায় সৌরিশের পিঠে। এখানে এসে স্বপ্ন ভঙ্গ হয়, ধরফর করে উঠে বসে সৌরিশ। আশ্চর্যজনক ভাবে পিঠে চড় খাওয়ার অনুভূতিটা বাস্তবেই স্পষ্টভাবে উপলব্ধি হচ্ছে এখনও। পরক্ষণেই খেয়াল করে তার সারা শরীর ঘামে ভেজা। তাহলে কি পাওয়ারকাট হয়েছে অনেক আগেই?অ্যানালগ মোবাইলের টর্চটা জ্বেলে বিছানা থেকে উঠে গিয়ে দেখে ফ্যানের সুইচটা অফ করা। তাহলে কি সৌরিশের বাবা এসে বন্ধ করে গিয়েছেন? তা কি করে সম্ভব! এ’ঘরে বাইরে থেকে কারোর আসা অসম্ভব কারন দরজা ভেতর থেকে বন্ধ ছিল এবং এখনও আগের মতোই বন্ধ আছে। এসব ভাবতে ভাবতে সৌরিশের ঘর্মাক্ত শরীরটায় ঠান্ডা লাগতে শুরু করেছে। একই সাথে ঘরে ম-ম করেছে একটা সুন্দর গন্ধ। ক্রমে ক্রমে ঠান্ডা আর গন্ধ দুই’ই সমানুপাতে বাড়তে থাকে।
ঘরের অন্ধকারের মধ্যেও সৌরিশ স্পষ্ট দেখতে পায় তার সামনে দাঁড়িয়ে সবুজ শাড়ি পরা এক মহিলার অবায়ব। এরকম অবায়বই তো সে দেখত স্বপ্নে। এযাবৎকাল অলৌকিকতায় অবিশ্বাসী, সাহসী ছেলেটার শিরদাঁড়ায় এবার আতঙ্কের ঠান্ডা স্রোত খেলে যায়। কাউকে ডাকার ক্ষমতাটুকু তার নেই। চুপ করে জড়োসড়ো হয়ে বসে থাকে।অন্ধকারের মধ্যে থেকে একটা নারী কন্ঠস্বর শোনা যায় – লাইট, পাখা জ্বালাইয়্য টেবিলে গিয়া পড়তে বও.. ঘুমাইলে আবারও মারমু। দ্যাখতে আছি মুই এইহানে বইয়া।
যন্ত্রের মতো এবার টেবিলে গিয়ে পড়তে বসে। সারারাত পড়েছে। ঘুম আর আসেনি। সকালবেলা মা-বাবা-ঠাকুমা’কে সব ঘটনা বলতে গিয়েও বলতে পারেনা সৌরিষ। সবাই হয়তো ওকে পাগল বলবে কিংবা কোনও অজুহাত। এসবের মধ্যেই শেষ হয় পরীক্ষা।তারপর এখানে এসে এই ছবির খোঁজ।
সমস্তটা শুনে থ মেরে গেছেন দুই ঠাকুমা’ই। নিস্তবদ্ধতা কাটিয়ে পিসিঠাকুমা বলেন – বৌদিদি এহন কি কবা কও.. সুদীপ না হয় অনেক ছোট্টকালে বাপেরে দ্যাখছে ওর মনে নাই।কিন্তু তুমি তো এতগুলা দিন দাদার লগে সংসার করলা। পিঠের দাগটা তুমি এত্তদিন কি কইরগা উড়াইয়্যা দেলা?
প্রশ্নের উত্তরের পরিবর্তে অবান্তর কথায় মেজাজটা ঝাঝিয়ে ওঠে সৌরিশের।
-পিসিঠাকুমা আমায় আগে বল ইনি কে? আমি কেন বারবার এনাকে দেখতে পাই?
-তুমি তো দ্যাখবাই দাদা। ও আমাগো দিদি.. বড়দিদি। তোমার আমার বড়দিদি।
-আমার দিদি? সহজ করে বলো..
-তুমি বিশ্বাস করো বা না করো সহজ আর সত্যকথা হইলো একটাই মানুষ দুইবার জন্মাইছে, তোমার জন্মান্তর হইচে গো দাদা। তুমিই আমার মায়ের প্যাটের দাদা। বড়দিদি সবার বড় ছিল, হেইয়ার পর তুমি, সবাইর শ্যাষে আমি। দিদি বসন্ত হইয়া মরল। হেইদিন তোমারে চোক্ষের দেখাটাও দেইখ্যা যাইতে পারে নাই। যে ভাইরে পোলার নাহান ভালো ঠেকছে হেই টান লইয়া মরছে। মুক্তি পাবে কেমনে কও? দিদির পর-পরই দুই বছরের সুদীপের থুইয়্যা তুমিও গেলা বসন্তে। বৌদিদি তোমার ছেরাদ্দশান্তি করছিল কিন্তু দিদির কাজকাম আর করা হয় নাই। দ্যাহো তুমি শুধু চেহারা নিয়াই ফেরো নাই পিঠের দাগটাও নিয়া আইছো। ছোট্টকালে পাঠশালায় না গিয়া মাছ ধরতে গেছিলা দেইখ্যা বড়দিদি রাগে খুন্তি ছুইরগা মারছিল। আর তোমার পিঠের ডাইনদিকে হেই খুন্তি আইয়া গাইথকা গেছিল। হেই দাগটা তহনও ছিল আর এহনও আছে। অবিশ্বাসের কোনও জায়গা নাই। আমি আর বড়দিদি মিঠাজর্দার পান খাইতাম.. হেইডা তো তোমার এহন জানার কথা ছিল না।
বাড়ির সবার কাছে ঝরের মতো পৌঁছে যায় সমস্ত ঘটনা। দুশ্চিন্তার অন্ধকারের পাশাপাশি সময় পেরিয়ে রাতের অন্ধকার পরিব্যাপ্ত হয় চারিদিকে। এপাশ-ওপাশ করতে করতে একসময় ঘুম আসে সৌরিশের চোখে। ওর বন্ধ চোখের পাতার অন্ধকারে এখন শ্বেতশুভ্র আলোর এক অন্য জগৎ। সেখানে বসে আছে সৌরিশ। সামনেই বসে আছেন জ্যোতির্ময় এক প্রবীণ পুরুষ। ওই তো অনতিদূরে সবুজ শাড়ি পরা সেই মহিলাও আছেন। সৌরিশকে উদ্দেশ্য করে জ্যোতির্ময় পুরুষ বলছেন – তোমার দিদির থেকে শুনেছি তুমি গীতা পড়া শুরু করেছিলে.. তা থামলে কেন? মন দিয়ে যদি সম্পূর্ণটা পড়তে তাহলে এমনিতেই তোমার সব প্রশ্ন আর কৌতুহলের নিরসন ঘটত। গীতা আর কঠোপনিষদে বলা হয়েছে; আত্মা জন্মরোহিত, নিত্য ও শাশ্বত। শরীর নষ্ট বা পরিবর্তন হলেও আত্মা কখনও বিনষ্ট বা পরিবর্তিত হয় না। তাই আত্মাকে বলা হয় কুটস্থ। যেহেতু সে জড় দেহ ধারন করে তাই নতুন দেহের জন্ম হয়।
এবার সৌরিশ বলে আপনি যা বললেন তা আমিও বিশ্বাস করি। সেই উপলব্ধিতে ও আমার দিদি তা’ও বিশ্বাস করলাম। কিন্তু আমার ক্ষেত্রে কি বলবেন? দেহেরও পূনর্জন্ম কি সম্ভব? আজকের দিনে বাস্তব প্রেক্ষাপটে মানুষ এই ঘটনাকে তো আষাঢ়ে গপ্পো বলবে।
জ্যোতির্ময় প্রবীণ হেসে বলেন সবার বিচার-বিশ্বাস তো এক নয় বাবা। তোমার কাছে তোমার বিশ্বাসটাই সর্বাগ্রে। শোনো শুধুমাত্র আমাদের সংস্কৃতিতেই না.. গ্রীসের প্লেটো, পিথাগোরাস এনারাও আত্মার দেহান্তর আশ্রয় আর পুনর্জন্মবাদ বিশ্বাস করতেন। এই মতবাদের প্রকৃত অর্থই হল একটি শরীর পরিত্যাগ করে আত্মার নতুন শরীর ধারন। প্রাকৃতিকভাব অনুযায়ী এই দেহ নির্বাচন প্রক্রিয়া হয়। ইজিপ্টেও এই ধারণা প্রচলিত ছিল। “সংস্কার সাক্ষাৎ করনাৎ পূর্বজাতিজ্ঞানম্” শ্লোকটি বলে উনি সৌরিশকে আরও বললেন, আমাদের সকলের মনের অবচেতনে অবিনাশী অতীতের সমস্ত অভিজ্ঞতা অব্যক্ত আকারে থেকে যায়। সেই অব্যক্ত অভিজ্ঞতার কেন্দ্রে মনোনিবেশ করতে পারলেই চেতনস্তরে সকল ছাপ জাগ্রত হয়ে ওঠে। তুমি সামান্য সফল হয়েছিলে বলেই তোমার দিদি কে দেখতে পাও। সম্পূর্ণ মন নিবিষ্ট করতে পারলে তোমার কাছে সবটাই ফুটে উঠত।
সৌরিশ এতকিছু জানেনা। তবে নিজে যখন এরপর সবকিছু সাজাতে বসে তখনই তার মনে পড়ে ডিএনএ-এর Self Duplication.. আকৃতি সংযুক্তি অপরিবর্তিত রেখে জিনের স্বপ্রতিরূপ গঠনের বিষয়ে। সেক্ষেত্রে দেহের পুনর্জন্ম বা প্রতিরূপ ধারন অসম্ভব ঘটনা নয়। Wordsworth, Tennyson, Whitman এদের কবিতাতেও সৌরিশ পুনর্জন্মের ইঙ্গিত পেয়েছে। তাহলে একবিংশ শতাব্দীতে ক্রমবিকাশবাদের মতো পুনর্জন্মবাদও বাস্তবজগতে সত্য!!!??
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।