ক্যাফে গল্পে জয়ন্ত বিশ্বাস

মরনঃ শ্যাম ইব সুন্দরঃ

মৃত্যুর ছবি দেখে দেখে চোখ দুটো আজ ভীষণ ক্লান্ত। প্রিয়মানুষটা একদিন বলেছিলো মৃত্যু শ্যামের মতো সুন্দর। জরা-ব্যাধি, দুঃখ – যন্ত্রণার উর্ধ্বে গিয়ে যে মানুষটা মৃত্যুর অন্ধকারে কোলে মাথা রেখে অনাবিল শান্তিতে ঘুমলোন, হয়তো তার কাছেই সেই কালো আঁধার রাধার চোখ ধাঁধানো কালো রঙের মতোই সুন্দর…….হয়তো। কিন্তু ওই মানুষটাকে অবলম্বন করে যে মানুষগুলো! তাদের কাছে কতটা সুন্দর মৃত্যু?
পাঁচিলের ওপারের বাড়িতে এক দম্পতি থাকেন। বিগত বছরের মহামারীতে ভদ্রলোকটির জীবনাস্ত হয়েছে। ভদ্রমহিলাকে পেটের টানে এখন কাজে বেরোতে হয়। রোদ্দুরে তেতেপুড়ে যখন পেট গলে যাওয়া মাছ কিনে ফেরেন তখন তার অন্তরালে অভিযোগ থাকে। কি পেলাম জীবনে এমন হিসাব-নিকাশের অভিযোগ না। অভিযোগ একটাই ‘কেন চলে গেলে’। “এই ছোট ছোট তোপসে তুমি কত ভালোবাসতে.. ওহ্ ভগবান, আজ মানুষটা থাকলে কটা ভাত বেশি রাধতাম গো” – কান্না ভেজা গলায় এইরকমই অভিযোগ আজও শুনি।
শ্বশুরবাড়িতে টাকা-পয়সার অশান্তিতে মেয়েটা বাপের বাড়ি এসে উঠেছে। অর্থনীতির গতিধারা মুখ থুবড়ে পড়ায় তার শ্রমিক বাপের মিলের ঝাপ বন্ধ হয়েছে। ওদিকে শ্বশুরবাড়ি থেকে টাকা চেয়ে ফোন আসে রোজ রুটিন মেনে। ব্যার্থ বাবার টানাপোড়েন মেটাতে অসহায় মেয়েটা অ্যাসিড খায়। শেষ রক্ষা হয়নি। নিন্ম মধ্যবিত্ত রোজগারহীন বাবার সংসারে দেড় বছরের ছেলেকে রেখে মুক্তির স্বাদ জিতে নেয় মেয়েটা। ওই শিশুটার কাছে, মেয়েটার বাবা-মায়ের কাছে মৃত্যু বোধহয় মোহিনী রূপধারী।
স্বর্নাভ, আমার সবচেয়ে ছোট্ট ছাত্র। প্রতিদিনের ক্লাসে ওর জ্বালায় অতিষ্ঠ আমি। আড়ালে আমার ছবি আঁকার রঙের টিউব থেকে রঙ দিয়ে সে হাত ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে জিলিপি গড়তো। সরস্বতী পুজোর আয়োজনে তার উৎসাহ সর্বার্ধে। শেষ ক্লাসে আমায় বলেছিল “স্যার, তুমি তো এখন আর খেল না। তোমার ব্যাট টা আর ক্যারামবোর্ডটা আমায় দেবে?” ওর আদুরে মুখটা দেখে সেদিন মনে মনে কেমন খুশী হয়েছিলাম। কিন্তু তারপর আর আসে নি ওগুলো নিতে। আর কোনোদিন আসবেও না। শেষ ক্লাসে যে জামাটা পড়ে এসেছিল ওই জামাটাতেই ওকে ঘুমিয়ে থাকতে দেখেছি। একটু কান মুলতেই যে বাচ্চাটা ঠোঁট ফুলিয়ে ঝাপসা চোখে আমার দিকে তাকাতো, সেই আদুরে বাচ্চাটার শরীরটা সেদিন দেখলাম শক্ত করে দড়ি দিয়ে বাঁধা। ওর সাথে সাথে ক্লাসের প্রাণ চলে গেছে। সরস্বতী পুজো অতীত হয়েছে। আজ স্বর্নাভকে সামনে না দেখে অতিষ্ঠ হই। যে মৃত্যু একটা শিশুর চাওয়াকে দেহের সাথে পুড়িয়ে দিয়ে বলে ‘শান্তি.. শান্তি’ সে সুন্দর না কি ভীষনাকার দৈত্য?
সংক্রামনের কারনে স্বতঃস্ফূর্ত ভদ্রমহিলাটি গত চারদিন হলো সংসারের ঋণ চুকিয়ে গিয়েছেন। ভদ্রলোক কাঁদতে কাঁদতে বলছেন “আজ একবার তোমাকে ছুঁয়েও দেখতে পারলাম না তোমার জ্বরটা কমলো কি না। কতটা ঠান্ডা হল তোমার শরীর তা ও জানা হল না। কত ভালোবাসতাম তোমাকে। মাথায় করে রাখতাম তোমাকে। মাঝ পথে ফেলে চলে গেলে”।
‘কত’ ভালোবাসা আজ ‘ভালোবাসতাম’ হল। মৃত্যুর সাথে সাথে অতীত হল ভালোবাসাও। তাহলে কি পরেরদিন থেকে ওই ভদ্রলোক আর সেভাবে ভালোবাসেন না তার স্ত্রীকে?
স্মৃতির ঝুলি আগলে রেখে মূহুর্তে যাপন করলেও রোমন্থন আসলে এক পর্যায়ে বেদনাদায়ক। এই ক্ষনিকের সুখ আর এক আকাশ পরিব্যাপ্ত যাতনার জন্যেই কি “মরণ রে, তুঁহু মম শ্যামসমান”?
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।