আজ ১৯শে এপ্রিল, শাওনের জন্মদিন। কিন্তু ঘুম থেকে উঠে আর পাঁচটা দিনের থেকে একটুও আলাদা লাগছিলো না তার, যদি না পাশের রান্নাঘর থেকে পায়েসের গন্ধটা নাকে এসে না লাগতো। তেজপাতা আর এলাচের ফুরফুরে গন্ধটাই মনে করিয়ে দিলো আজ তার ৩৫তম জন্মদিন। উঠে গিয়ে মাকে জড়িয়ে ধরে বললো কেনো করছো এসব?
দেখে মায়ের চোখে জল, চোখ মুছতে মুছতে বললো, খালি ভাবি তোর জীবনেই কেনো এমন ঘটলো বলতো? এমন প্রানশক্তিতে ভরপুর জীবনটা কেনো তছনছ হলো বলতে পারিস?
মাকে জড়িয়ে ধরে কাঁধে মুখ রেখে বললো, থাক না মা, আজকের দিনে আর নাই বা মনে করলে সেসব কথা। কারন মায়ের সাথে সাথে শাওনের মনটাও ভারী হয়ে এসেছিল। এখন শাওনের মনে হয় জীবন মানেই যে দুঃখ বেদনার সাথে সহবাস কিন্তু তার জীবনটা তো এমন ছিলোনা। চোখের সামনে ভাসতে থাকে সেইসব রঙীন দিনগুলো।
শাওনের আর দোষ কোথায় ছিলো, বয়সটাই যে এমন। তার ১২ বছর বয়সী মন বালিকা থেকে কিশোরীতে উত্তীর্নের সন্ধিক্ষনে দাড়িয়ে তার উপস্থিতি জানান দিয়েছিল।
পুনেতে এক আত্মীয়ের অনুষ্ঠান বাড়িতে এসে প্রথম দেখে নিশীথকে। ১৭ বছরের নিশীথ, চেহেরার গুনে স্বাভাবিক দ্যুতি ছড়িয়ে দিচ্ছে অনুষ্ঠানের মধ্যে, যেটা চোখ এড়ালো না শাওনের। প্রথম দর্শনেই একটু আলাদা লেগেছিল নিশীথকে।
সম্পর্কে নিশীথ তার পিসির দেওয়ের ছেলে, ফলে তাদের দুই পরিবার অনেক আগে থেকেই পরিচিত, যেটা একটু বাড়তি মাইলেজ দেয় এই সম্পর্ককে এগিয়ে নিয়ে যেতে। আগেও হয়তো শাওন দেখেছে নিশীথকে কিন্তু মনে রাখার মতো বয়স তখন তার ছিল না। শাওনের কাছে এই ভালোলাগা থেকেই ভালোবাসার শুরু, কথা হয়তো খুব একটা হয়নি দুজনের কিন্তু তাদের মধ্যের ‘আখোঁ কি গুশতাখিয়া’ অনেক না বলা কথা বলে দিয়েছে একে অপরকে। নিশীথের মধ্যেও পাচ্ছিল পজিটিভ ভাইব, ফলে কোনো অনুষ্ঠান বাড়ি যে এতো আনন্দের হতে পারে সেটা আগে কখনো শাওন উপলব্ধি করেনি। আর অনুষ্ঠান বাড়ির মজাটা হলো তুমি নিরাসক্ত থাকলেও দাদা, বোন, বন্ধু বান্ধবী অনবরত উসকানি দিয়ে তোমাকে প্রেম করিয়েই ছাড়বে।
অনুষ্ঠানের মধ্যে ঘরোয়া কথায় নিশীথের কথা উঠলেই সেখান থেকে শাওন উদাসীন থাকতে পারছে না, তার সম্বন্ধে আরো আরো জানতে ইচ্ছা, একেই তো ভালোবাসা বলে নাকি। শুনতে পাচ্ছে পড়াশোনায় ব্রিলিয়ান্ট নিশীথ, জীবনে কিছু একটা করতে চায়। সাথে সাথে শাওন ও চাইছে যে তার ভালোলাগার মানুষ জীবনে সব পাক তার মনের মতো করে।
অবশেষে চলে এলো সেই বিদায় লগ্ন, দুজনের চাহনিতেই ধরা দিচ্ছিল বিষাদের করুন সুর। ফিরতি পথের মনকেমন কখনো কখনো সীমা অতিক্রম করে যাচ্ছিল শাওনের উঠতি মনে, যেন কিছু একটা ফেলে চলে এসেছে। অনুষ্ঠান বাড়ি যাওয়ার আগে মনের মধ্যে কোনো শূন্যতা ছিলো না, বুঝেছিল একেই বলে ভালোবাসা। বাড়ি ফিরে কোনো কিছুতেই মন বসছিল না, না পড়াশোনায় না অন্য কিছুতে।
কিন্তু সময় বড় নিষ্ঠুর, সে কারো অপেক্ষা করে না, দিন পেরোতে থাকলো। শাওন বুঝলো নিশীথ আরো জাঁকিয়ে বসেছে তার মনের মধ্যে। সব কিছুর মধ্যেই সে নিশীথ কে খুঁজতে থাকলো, কোনো উদাসীন বিকেলে একা বসে শাওন ভেবেছে নিশীথের কথা, সে এখন কি করছে? বা শাওনের পরীক্ষা এলেও তার মন চলে যায় নিশীথের পরীক্ষার চিন্তায়। নিশ্চয় সেও ভালো ভাবে পরীক্ষা দিয়ে তার লক্ষ্যের আরো কাছে এগিয়ে চলেছে। এভাবেই বাঁচিয়ে রেখেছে তার ভালোবাসাকে। কখনও বা মন আশঙ্কায় ভরে উঠেছে নিশীথ কোনো অন্য সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েনি তো? এর মধ্যে অস্বাভাবিকতার কিছুই নেয়। শুধুমাত্র মনের জোরেই সে এই সম্পর্ককে এগিয়ে নিয়ে চলেছে। সে এতোদিনে বুঝে গেছে এটা কোনো সাধারণ ভালোলাগা না।
আজ শাওন ১৭ বছরের যুবতী, এই পাঁচ বছরে নিশীথের সাথে তার দেখা বা কথাবার্তা কিছুই হয়নি কিন্তু মনের মধ্যে কি যত্নে রেখে দিয়েছে তাদের সম্পর্ককে, এ যে বড়ো যত্নের ধন। মনের মধ্যে একটা দোলাচল থাকলেও সে এই সম্পর্কের পরিনতি চায় কারণ তার ভালোবাসাটা যে জেনুইন। কিন্তু তার জন্য বাড়ির সম্মতি দরকার, তাই মা কেই খুলে বললো সব কথা। মা সব শুনে বললো, সে যা ভাবছে নিশীথও কি তাই ভাবছে? এক হাতে তো আর তালি বাজে না কারণ এর মাঝে তাদের কোনো যোগাযোগও হয়নি। মা শাওনকে বোঝালো সম্পর্কের ভালো মন্দ, মা আরো বললো, শাওন নিজে আগে মনকে জিজ্ঞেস করুক ভালো করে, যে সে রাজি তো? তারপর না হয় এগোনো যাবে।
শাওন তার সম্মতি জানিয়ে সবটাই ছেড়ে দিলো মা এর ওপর, সে যা বলবে তাই হবে। মা বললো যে ঠিক আছে কিন্তু আগে তাদের মতামতটা জানতে হবে, তাদের সম্মতি থাকলেই এগোনো যাবে। মেয়ের বিয়ের ব্যাপারে সব মা বাবা এটাই চাই, একটা বিশ্বাসযোগ্যতা, যেটা এখানে অনেকটাই নিশ্চিত।
এরপর শাওনের মা পুনেতে নিশীথের বাড়িতে ফোন করলো, নিশীথের মা এই অপ্রত্যাশিত প্রস্তাবে প্রথমে একটু ঘাবড়ে যান পরে সব শুনে তিনিও সম্মতি দেন। এতোদিনে নিশীথ ২২ বছরের পরিপূর্ণ যুবক। কথায় কথায় শুনলো নিশীথ চাকরির জন্য বিদেশ যেতে চাই, এটাই তার স্বপ্ন, এদিকে মনে মনে শাওন ও তাই চেয়ে এসেছে।
এতো দিন পরে নিশীথের সাথে কথা বলে শাওন যেনো নিজেকে ধরে রাখতে পারছে না। নিশীথও যেন এই প্রত্যাশায় করেছিল, তার সাথে কথা বলে শাওনের মনে হলো। এতো দিনের জমে থাকা বহু কথার মুক্তি ঘটতে থাকলো এক এক করে। একে অপরের অনেক কথা যে তাদের অজানা, পরস্পরের ভালোলাগা গুলোকে মিলিয়ে নিতে হবে তবেই না আগামী পথচলা আরো মসৃণ হবে।
বছর ঘুরে গেলো, এরই মধ্যে নিশীথের মা শাওনের মা কে প্রস্তাব দিলো বিয়ের ব্যাপারে। সবই যখন ঠিক তখন আর শুভ কাজে দেরি কেনো। প্রস্তাবটা যে নিশীথই দিয়েছে তার মাকে এটা শোনার পর শাওনের ভালোবাসা আরো বেড়ে গেলো।
দিন পেরোতে থাকলো, এদিকে নিশীথ চাকরিসূত্রে কানাডা পাড়ি দেবে, তার আগেই বিয়েটা সেরে নিতে চায়। শাওনের ১৮ বছরের জীবন সেই মাহেন্দ্রক্ষণের সামনে, যাক এতোদিনের ভালোবাসা পরিনতি পেতে চলেছে। নিশীথকে সে ভালোবাসাই ভরিয়ে রাখবে নিজের সবটা দিয়ে, কোনো আক্ষেপের জায়গায় রাখবে না নিশীথের কাছে। ঠিক ৬ বছর আগে এমনই কোনো দিনে তারা একে অপরকে প্রথম দেখে, সেদিনের ভালোবাসার চারাগাছ আজ পূর্ণ বিকশিত। বিয়ের পরেই নিশীথকে কানাডা যেতে হবে, ওখানে সব সেটেল্ড করে শাওনকে তারপর নিয়ে যাবে। নিশীথের কানাডা যাত্রা আখেরে যেন শাওনেরই ইচ্ছাপূরন।
বিয়ের পরের সপ্তাহে নিশীথকে কানাডা চলে যেতে হলো। শাওনের দিন কাটতে লাগলো দুই বাড়িতে আর নিশীথের অপেক্ষায়, ফোনে তাদের পরবর্তী জীবন এগোতে থাকলো। মাঝে শাওন কানাডা যাওয়ার প্রয়োজনীয় কাগজপত্র রেডি করে রাখলো অনেক দৌড়ঝাপ করে।
দিন পেরোতে থাকলো, ধীরে ধীরে নিশীথের ফোন আসা কমতে থাকলো বা অনেক প্রতিক্ষার পর আসা ফোনে কোনো প্রাণ থাকতো না। শাওন বুঝতে পারলো কোথাও মেঘ জমছে, পরে ফোন আসা প্রায় বন্ধই হয়ে গেলো। ক্রমে শাওন বুঝতে পারলো নিশীথ তাকে জাস্ট ব্যাবহার করেছে কানাডার সিটিজেনশিপ পাওয়ার জন্য। সেখানের নাগরিকত্ব পাওয়ার জন্য হয় তার ওখানে জন্ম হতে হবে যেটা সে নয় অথবা সেখানের কোনো মেয়েকে বিয়ে করতে হবে সেটাও নয়। ফলে সর্বশেষ তার দরকার ছিল শুধু ফ্যামিলিম্যানের পরিচিতি আর সেটাই সে প্লান করে সেরে ফেললো। নিশীথের যা দরকার ছিল তা পেয়ে গিয়েছে শাওনের কাছ থেকে।
তবে শাওনের কফিনে শেষ পেরেকটা মারা হলো যেদিন এলো নিশিথের তরফ থেকে কোর্টের নোটিশ। সেই শেষ দেখা নিশিথের সাথে কোর্টে দাড়িয়ে, তখনও তার চোখে ভাসছিল বরসাজের সেদিনের নিশীথ। হয়তো অনেক কিছুই করতে পারতো শাওন, করেনি কারন সে পারেনি। দুঃখ শুধু এটাই যে শাওন জীবনসঙ্গিনী হতে পারলো না নিশীথের ব্যবহৃত সিড়ি হয়েই রয়ে গেলো। কোর্টে দাড়িয়ে দাড়িয়ে চোখের সামনে তার সাজানো স্বপ্ন গুলোকে শেষ হতে দেখলো এক এক করে। যদিও কোর্টে নিশীথ একবারের জন্যও তার চোখে চোখ মেলাতে পারলো না অথচ একদিন এই চোখই কতো কথা বলেছিল। সত্যিই তো নিশীথ কোনোদিন তাকে ভালোই বাসেনি। এই বিচ্ছেদের পরে সে কিন্তু একদম সঙ্গীহীন হয়ে পড়েনি, ঘুমের ওষুধকে জড়িয়ে নিলো আষ্টেপৃষ্টে তার জীবনের সাথে। সেদিন থেকেই একটা ডিপ্রেশনে চলে গিয়েছিল শাওন আর ছিল বিনিদ্ররাত্রীর শয্যাসঙ্গী শুধু যন্ত্রনা।
এতো বছর সে একা, এখন আর শাওনের কান্না পায়না মানে কান্না আসেই না, ভিতরটা তার মরুভূমি হয়ে গেছে। একবারে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছে শালুকের খোলের মধ্যে।
খবর বা পেপারে যখনই দেখে যে পাঞ্জাবে বহু মেয়ে এই ভাবে তার স্বামী দ্বারা প্রতারিত, তখন শাওনের নিজের ঘটনা গুলো চোখের সামনে ভেসে ওঠে। কতো জন তার মতো প্রেমে প্রতারিত, কেউ বা হয়তো শেষে আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছে। মাকে দেখে তার আরো অসহায় লাগে আবার কখনো মা এসে তাকেই সান্তনা দেয়, যে একদিকে ভালোই হয়েছে, যে মানুষ তাকে কোনোদিন ভালোই বাসেনি সে তাকে সারাজীবন সুখে শান্তিতে কি ভাবে রাখতো।
বিয়ের পর যাওয়ার সময় নিশীথ শুধু তার ব্যাগ গুছিয়েই নিয়ে চলে যায়নি সাথে নিয়ে গিয়েছিল শাওনের জীবনের সমস্ত হাসি, আনন্দ ও শান্তি।