T3 || মলয় রায়চৌধুরী স্মরণে || লিখেছেন জয়িতা ভট্টাচার্য

বাংলা সাহিত্যের স্পার্টান —

মলয় রায়চৌধুরী

মানুষের গতানুগতিক একহারা জীবনধারা যেমন একটা নিরাপত্তার বোধ ও আরাম দেয় তেমনই এটাও সত্য যে সেই একই রকম যাপনের রুটিন এক সময় বা দু একটি প্রজন্মের পর পরিবর্তন জরুরি হয়ে পড়ে পরিবর্তিত আর্থ সামাজিক ও রাজনৈতিক বদল অনুসারে।এই বাঁক বদল সাহিত্য সংস্কৃতির ব্যাপারেও প্রযোজ্য। তাই সাহিত্য যা কেবল একসময় ধর্ম কথা বলত কবিতায় তা পরে গদ্য রূপ নেয় মাইকেল মধুসূদন নিয়ে আসেন অসামান্য পরিবর্তন, রবীন্দ্রনাথের লেখা তাঁর সমসাময়িক লেখকদের দ্বারা প্রবল সমালোচিত হয় তেমনই বুদ্ধদেব বসু ,কল্লোল গোষ্ঠীর সচেতন প্রয়াসে দেখা গেছে গতানুগতিক ধারাকে পাল্টে দেখার প্রবণতা।আর কে না জানে স্রোতের উল্টো যখনই কোনো বিপরীত গতি তা বিরোধের মুখোমুখি হবেই।
মলয় রায়চৌধুরীর সঙ্গে বাংলা সাহিত্যে হাংরি আন্দোলন ওতোপ্রতো জড়িত।মলয়দা বলেছেন হাংরি আন্দোলন শব্দ বন্ধটিতে ব্যবহৃত “হাংরি” মানে কিন্তু ক্ষুধার্ত শব্দের সম্পর্ক নেই। শব্দটি এসেছে “In The Sowre Hungry Time” থেকে
যার অর্থ ‘পচনরত কালখণ্ড।’
সাজানো গোছানো সাহিত্য তথা কবিতাকে ধাক্কা দিয়ে মাটিতে নামিয়ে আনা ছিল হাংরি আন্দোলনের প্রধান উদ্দেশ্য।
হাংরি আন্দোলন শুরু হয় ১৯৬০
সালে। ১৯৬২__১৯৬৩ তে এই আন্দোলনে যুক্ত হন,
সমীর রায়চৌধুরী,শক্তি চট্টোপাধ্যায়,শৈলেশ্বর ঘোষ,দেবি রায়,বিনয় মজুমদার, শম্ভু রক্ষিত,সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়,উৎপলকুমার বসু,করুণানিধান মুখোপাধ্যায়,রবীন্দ্র গুহ,বাসুদেব দাশগুপ্ত,সুবো আচার্য, সুকুমার মিত্র,সুবিমল বসাক প্রমুখ সাহিত্যিক।আর ছিলেন মলয় রায়চৌধুরী।
মলয় রায়চৌধুরীর তিন বছর জেল হয় কবিতায় অশ্লীলতার (প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার) অভিযোগে।পরে উচ্চ আদালতের রায়ে জামিন পান।কোর্টে তাঁর পক্ষে সাক্ষ্য দিয়েছিলেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ও বিরুদ্ধে সাক্ষী দিয়েছিলেন শক্তি চট্টোপাধ্যায়।
হাংরি আন্দোলনের কবিতা সুষমাবিহীন উষর এবড়োখেবড়ো খোঁচালো।দেশের তলার শ্রেনিতে বসবাসকারী মানুষের মতো রুক্ষ ও বেসুর।সচেতনভাবে প্রতিষ্ঠান বিরোধী।
মলয় রায়চৌধুরীর নাম সর্ব বিদিত হলেও তাঁর লেখা সম্পর্কে ধারনা কম শুন্য দশকের বেশিরভাগ সাহিত্য করতে আসা মানুষের। তাঁরা না পড়ে শুনে শুনে কিছু ধারনা করে নিয়েছেন মলয় রায়চৌধুরী ও হাংরি আন্দোলন সম্পর্কে। রাজনৈতিক বা সাহিত্যিক কোনো আন্দোলনই ব্যর্থ হয় না।নতুন পথ দেখায়।পরবর্তী কালে তার প্রচ্ছন্ন প্রভাব থেকেই যায়।হাংরি আন্দোলন তার ব্যতিক্রম নয়।
মলয় রায়চৌধুরী
(২৯ অক্টোবর ১৯৩৯_২৬ অক্টোবর ২০২৩)একজন বিশ্ব বিখ্যাত প্রাবন্ধিক,ঔপন্যাসিক, গদ্যকার ,অনুবাদক, কবি ও গনবুদ্ধিজীবী।লিখেছেন দুই শতাধিক গ্রন্থ। লিখেছেন দুটি ডিটেকটিভ উপন্যাস, দশটি উপন্যাস, একটি ইরোটিক নভেলা,একটি কাব্য নাটিকা,জীবনী গ্রন্থ,ও অসংখ্য কবিতা অনুবাদ ও প্রবন্ধ। বেশ কিছু প্রবন্ধ ও একটি উপন্যাস অসমাপ্ত রইল যা সম্পর্কে প্রয়াণের দুই দিন আগেও আমাকে বলেছিলেন।
মলয়দা পরাবাস্তব কবিতার অনুবাদ করেছেন বেশি,বিট আন্দোলনের মহিলা কবিদের কবিতা অনুবাদ করেন।বুদ্ধদেব বসুর পর তিনি প্রথম বাঙালি যিনি সমগ্র বোদল্যয়র অনুবাদ করেছেন।লোকনাথ ভট্টাচার্য র পরে তিনিই জঁ আর্তুর রাঁবোর নরকে এক ঋতু ও ইলুমিনেশন্স অনুবাদ করেন।
পরবর্তীকালের কবিতাগুলি তিনি নিজেই বদলেছেন স্টাইল।
তবে ব্যক্তিগত ভাবে মনে করি মলয় রায়চৌধুরী কে জানতে হলে পড়তে হবে তাঁর প্রবন্ধগুলি এবং ম্যাজিক রিয়েলিজম ভিত্তিক উপন্যাসগুলি।তাঁর ছিল অগাধ পাণ্ডিত্য সাহিত্যের সমস্ত শাখায়।উত্তরাধুনিক চর্চার পুরোধা তিনি।প্রথম পর্বের পর দশ বছর আর্থারাইটিসের কারনে লিখতে পারেননি।বারবার হার্ট এট্যাকে শারীরিক ভাবে প্রায় পঙ্গআঙুল আর্থারাইটিসে বেঁকে যাওয়ায় কলম ধরতে পারতেন না। বহু বছর পর শেষে কম্পিউটারে লিখতেন।হাঁটতে পারতেন না বিশেষ আর।একটি চোখে দেখতেও পেতেন না।স্ত্রী প্রায় শয্যাগতা।রান্না আজকাল নিজে খিচুড়ি রেঁধে নিতেন দুজনের জন্য।লিখেছিলেন শেষ সপ্তাহে,আমরা বুড়ো-বুড়ি ঠাকুর দেখতে যাই না বহু বছর।একদিন রান্না করে তিন চারদিন খাই।তাঁর শক্তিশালী লেখনি থেকে কেউ কল্পনাও করতে পারবে না তাঁর এই পরিস্থিতি।দিনরাত লেখা লেখা এবং লেখা।অনমনীয় তাঁর মনোবল,বিরাট তাঁর হৃদয়ের কথা আমরা জানি।লেখা প্রকাশ হলে কেউ তাঁর কথা লিখলে বাচ্চাদের মতো সরল উচ্ছসিত হতেন।
তাঁর বয়স তাঁর প্রজ্ঞা তাঁর সাফারিং তাঁর একক সংগ্রাম ও ডেডিকেশন না জেনে অনেকেই তাঁকে কু-কথা বলেছেন,বলেন,মৃত্যুর পরেও।হয়ত এই আধুনিক নেতি আত্মবিজ্ঞাপনের পন্থা তিনি নিজেও চাইতেন।মজা পেতেন।তবে পছন্দ করুন আর নাই করুন বাংলা সাহিত্যে মলয় রায় চৌধুরী এমন একটি পাকাপোক্ত স্তম্ভ যা প্রমোটারেরা চেষ্টা করলেও কোনোদিন উপড়ে ফেলতে পারবে না।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।