শীতের বেলায় টুকুস করে সন্ধ্যা নামে।তাড়াহুড়ো করে পালায় আলো। বুড়ি কাদম্বিনী কম্বলটা ভালো করে টেনেটুনে গুটিয়ে বসে।একটু পরে নিতাই বুড়ো আসবে সারাদিন হরিনাম করে।
ট্রেনে অথবা মেলায় যেখানে সুযোগ।এসে শীত গ্রীষ্ম চান করবে বাইরের কলতলায়।গা থেকে পিছলে পড়বে জল। সেই আওয়াজে এখন কাদম্বিনীর শীত জাঁকিয়ে বসে আরো। সব জানলা দরজা বন্ধ। টালির চালের নিচে প্লাস্টিকের পড়ত। তবু শীত যায় কৈ। এমন ছিলো না আগে।আগে মানে অনেক আগে,কিছুদিন আগে অথবা বহুদিন।
সময়টা তার সারাদিনের শনের দড়ি পাকানোর মতো জড়িয়ে যায় সঠিক অনুপাতে।
নিতাই গরম চা ধরে মুখের কাছে।গায়ের কাছে বসে।
তার আগে মেঝেতে পাটি পেতে নামাজ পড়ে।
নিতাই অনেক ছোটো তাই খাটতে পারে বেশি।
কাদম্বিনী বাতের ব্যথায় কাবু ।সে আর নিতাইয়ের সঙ্গে ট্রেনের কামরায় সঙ্গী নয়।
নেতাই অথবা নিতাই ঠাকুর গান গায়।কৃষ্ণ লীলা,রাধার বিরহ।
টুপটাপ হিম পড়ে। বাঁশের ফাঁকে তক্ষক।
মেঝেতে নামাজ পড়ে যখন কাদম্বিনী সোজা হয়ে বসে।শুতে অস্বস্তি হয়। কাদম্বিনী ঘোষাল কাদু বিবি কদম বোষ্টমী।
কত জেলা কত গ্রাম কত,পাড়া শেষে থিতু হয়েছে এসে এই নাজিমগঞ্জের হাকিমপাড়ার ঘরে।তাদের ঘর।সারাজীবন মাধুকরী।
সেসব ঘরছাড়াদের সময়। কার বসন্ত কবে আসে কে জানে।
মেঝেতে ছেঁড়া একটা কাঁথা বিছিয়ে বসে নিয়াজুল।
বাইরেটা নিশ্চুপ ধোঁয়া ধোঁয়া।পাতা খসে খসে পড়ে।
জীবন। আর ধর্ম। জড়িয়ে ধরে কেটে গেল কত বছর। উদাস হয় নেতাই ওরফে নিয়াজুল। মাথায় এখন মাত্র গুটিকতক পাতলা সাদা চুল মুখে বলিরেখা।খঞ্জনিটা অকারণেই মুছতে থাকে।
ইনশাল্লাহ্। চার ওয়াক্ত নমাজ আর সারাদিন কৃষ্ণনাম। উদাস হয়ে তাকিয়ে থাকে দেওয়ালে মলিন কোরানের বানীর পাশেই রাধা কৃষ্ণ ছবি।দুটোই মেলায় কেনা।
কাদম্বিনী এখনো মোহিত হয়ে দেখে রাজুকে। কত বছর আগের কথা।পৃথিবীর কাছে রাজু মৃত ওরফে মশিউর মালেক এর ছেলে নিয়াজুল।
শুধু কাদম্বিনীর আবছা স্মৃতি এখনো ঘরে পাক খায়।
বয়স মোটে ষোলো। প্রতি রাতে কাকার নিঃশব্দ লালসা ,সারাদিন শয্যাশায়ী কাকির গু-মুত ঘাঁটা। মাঝে মাঝে যোনি ফেটে রক্ত, নবীন কুঁড়ি মতো স্তন পিষ্ট হতো কর্কশ হাতে। অনাথ মেয়েটার কিছু করার ছিলো না। রাজু উল্টো দিকের দোকানে বসে দেখত। মাঝে মাঝে আর্ত চিৎকার চাপাস্বরে।
মেয়েটি তেমন সুন্দর নয়।রং শামলা।বেঁটেখাটো। শুধু চোখ দুটো গভীর বিষাদসিন্ধু যেন।
তবুও গল্প হয়।তবু জীবন নাটকের চেয়েও কখনো নাটকীয় হয়ে যায়।
বিনা নোটিশে জীবন আচমকাই পরিবর্তন হয়ে যায়। যেমনটি
এক অমাবস্যা রাতে ।
ছুটে বেরিয়ে এসেছিল মেয়ে ক্ষত বিক্ষত,ছিন্ন পরিধানে মেয়েটা ঘর ছেড়ে।
দোকান বন্ধ করে রাজু বাপের হাতে চাবি দিয়ে সেই যে প্রায় সংজ্ঞাহীন মেয়েটাকে জড়িয়ে ধরেছিল আর ছাড়েনি।
কাদম্বিনী স্টোভে ভাত ডাল আলু আর কুমড়ো বসায়। ধোঁয়া,চালফোটার গন্ধ আর কাদম্বিনীর গায়ের গন্ধ মিলে মিশে নাকে ঢুকছে নিতাইয়ের। রাজু মরে গেছে।পীরবাবার কথার সঙ্গে শিব গোঁসাইয়ের কথা ফারাক নেই।ভালোবাসার কথা।
সবই তো ভালোবাসা। এই ফুটন্ত চাল, যৌবন থেকে প্রৌঢ় কাদম্বিনী, ট্রেনের কচি ছেলেমেয়ে গুলো,এমনকি এই জারুল গাছের ডাল থেকে ঝুলে আছে যে চাঁদ সেও তো ভালোবাসার কথাই বলে প্রতি রাতে।
যত্ন করে ভাত বেড়ে দেয় কাদুবিবি।
মাঝরাতে আরো শীত হয়,বাইরে পেঁচার ডানা ছুঁয়ে যায় পলকা কঞ্চির ফাঁক।
কাদম্বিনী আরো জোরে কম্বলের ভেতর জাপটে ধরে নেতাইঠাকুরকে ।দুজনে প্রাণপণে জাপটে জড়িয়ে উষ্ণতার মধ্যে ডুব দেয়।
ফাটা আগল দেওয়া দরজার সামনে থেকে ফিরে যায় ধর্মঠাকুর নিশীথরাতে।