প্রবন্ধে ইন্দ্রজিৎ সেনগুপ্ত

জীবনানন্দের প্রতি রবীন্দ্রনাথ – রবীন্দ্রনাথের প্রতি জীবনানন্দ
সময়টা ১৯২৭। নব্য অখ্যাত কবি জীবনানন্দ দাশ কলকাতার সিটি কলেজে টিউটরের চাকরী করার সময় পত্রিকায় ছড়িয়ে থাকা কবিতাগুলি নিয়ে বই বের করতে চাইলেন। কোনো প্রকাশক না পেয়ে শেষে নিজের খরচেই বই বের করলেন, নাম দিলেন ‘ঝরা পালক’। ‘ঝরা পালক’ কবি জীবনানন্দের লেখা প্রথম কাব্যগ্রন্থ। উৎসর্গ পত্রে লিখলেন: “উৎসর্গ- কল্যাণীয়াসু”; সেখানে কারো নাম লেখা ছিল না। তবে পরবর্তীকালে জানা যায় যে জীবনানন্দ দাশ তাঁর কাকা শ্রীঅতুলানন্দের কন্যা শোভনাকে এই কাব্যগ্রন্থটি উৎসর্গ করেছিলেন; জীবনানন্দ’র দিনপঞ্জীতে ‘Y’ অক্ষর দিয়ে শোভনাকেই বোঝানো হয়েছে; শোভনার ঘরোয়া নাম ছিল বেবী (Baby)। অন্যান্য ঘটনাবলী থেকে অনুমান করা হয়েছে যে এই শোভনাই ‘বনলতা সেন’ কবিতার বনলতা সেন। সমসাময়িক কালে কবিতা প্রকাশের ক্ষেত্রে কবি ‘দাশগুপ্ত’ পদবী ব্যবহার করলেও এ কাব্যগ্রন্থের প্রকাশকালে পদবী হিসেবে গুপ্তবর্জিত কেবল ‘দাশ’ ব্যবহার করেছিলেন।
ঝরা পালক কাব্যগ্রন্থের ভূমিকায় জীবনানন্দ লিখেছেন: “ঝরা পালকের কতকগুলি কবিতা প্রবাসী, বঙ্গবাণী, কল্লোল, কালি-কলম, প্রগতি, বিজলি প্রভৃতি পত্রিকায় প্রকাশিত হইয়াছিলো। বাকিগুলি নূতন।”
ঝরা পালকের পাঠপ্রতিক্রিয়ায় ১৩৩৫ সালের ২২ অগ্রহায়ণ শান্তিনিকেতনে বসে রবীন্দ্রনাথ জীবনানন্দকে চিঠিতে লিখেছিলেন:
“কল্যাণীয়েষু, তোমার কবিত্বশক্তি আছে তাতে সন্দেহমাত্র নেই। – কিন্তু ভাষা প্রভৃতি নিয়ে এত জবরদস্তি কর কেন বুঝিতে পারিনে। কাব্যের মুদ্রাদোষটা ওস্তাদিকে পরিহাসিত করে।
বড় জাতের রচনার মধ্যে একটা শান্তি আছে, যেখানে তার ব্যাঘাত দেখি সেখানে তার স্থায়িত্ব সম্বন্ধে সন্দেহ জন্মে। জোর দেখানো যে জোরের প্রমাণ তা নয় বরঞ্চ উল্টো। ইতি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর”।
রবীন্দ্রনাথের লেখা চিঠির বৈশিষ্ঠ্যই হল, তাতে কিছু আশীর্বাদসূচক শব্দ বা বাক্য থাকবে। স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে রবীন্দ্রনাথ এই তরুণ কবির লেখা পছন্দ করেননি, বরং কোনো কারণে রেগে লিখেছিলেন, যার জন্য চিঠির শেষে আশীর্বাদ [নেই]।
জবাবে ১৩৩৫ সালের ৩ পৌষ কলকাতার ৬৬ হ্যারিসন রোডে বসে জীবনানন্দ যে দীর্ঘপত্রটি লিখেছিলেন রবীন্দ্রনাথকে, জীবনানন্দের মৃত্যুর পরও সেই চিঠি বেশ আলোচনার জন্ম দেয়। কেননা, চিঠিটা আবিষ্কৃত হলেও এটা রবীন্দ্রভবন সংগ্রহশালায় নেই। ফলে প্রভাতকুমার দাস (পত্রালাপ জীবনানন্দ) ধারণা করছেন, ভুলে হয়তো চিঠিটি তিনি (জীবনানন্দ) ডাকে দেননি। তা ছাড়া চিঠির পরিপাটি চেহারা দেখলে এই মন্তব্য বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়। রবীন্দ্রনাথের চিঠির প্রাপ্তিস্বীকার হিসেবে তিনি লিখেছিলেন:
‘আপনার স্নেহাশীষ লাভ করে অন্তর আমার পরিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।’ এই চিঠিতে জীবনানন্দ লেখেন, “আজকালকার বাংলাদেশের নবীন লেখকদের সবচেয়ে বড় সৌভাগ্য এই যে, তাদের মাথার ওপরে স্পষ্ট সূর্যালোকের মতো আধুনিক পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মনীষীকে তারা পেয়েছে”। অর্থাৎ পরবর্তীকালে জীবনানন্দ তাঁর প্রবন্ধ ও কবিতায় রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে যে শ্রদ্ধা ও সমীহ প্রকাশ করেছেন, তারুণ্যেই সে ভক্তির ভিত রচিত হয়।
প্রথম চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ ভাষা নিয়ে জবরদস্তির যে অভিযোগ করেন, সে বিষয়ে জীবনানন্দ নিজের একটি ব্যাখ্যা দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করেন। তিনি লেখেন, “কবি কখনো আকাশের সপ্তর্ষিকে আলিঙ্গন করবার জন্য উৎসাহে উন্মুখ হয়ে ওঠেন, পাতালের অন্ধকারে বিষজর্জর হয়ে কখনো তিনি ঘুরতে থাকেন। বীঠোফেনের কোনো কোনো সিম্ফনি বা সোনাটার ভেতর অশান্তি রয়েছে, আগুন ছড়িয়ে পড়ছে, কিন্তু আজও তা টিকে আছে। চিরকালই থাকবে তাতে সত্যিকার সৃষ্টির প্রেরণা ও মর্যাদা ছিল বলে।
আমার যা মনে হয়েছে তাই আপনাকে জানিয়েছি। আপনার অন্তরলোকের আলোপাতে আমার ত্রুটি অক্ষমতা মার্জিত করে নেবেন আশা করি। আপনার কুশল প্রার্থনীয়। আপনি আমার ভক্তিপূর্ণ প্রণাম গ্রহণ করুন। প্রণত শ্রীজীবনানন্দ দাশ”।
‘ঝরা পালক’-এর ছন্দে ও প্রকাশ প্রকরণে জীবনানন্দ অনেকের দ্বারা প্রভাবিত হলেও, বিষয় প্রকরণে কিন্তু নতুন বাঁকের ইশারা রাখতে পেরেছিলেন। নাবিক, অস্তচাঁদে, আলেয়া, কবি, পিরামিড ইত্যাদি কবিতায় সে ইশারা খুবই স্পষ্ট । আসলে প্রত্যন্ত বরিশালের এক অখ্যাত কবি এক আধুনিক কবিতার জগত তৈরি করবে, বাংলা কবিতার রথচক্রে যথার্থ গতিদান করবে পরিণতির দিকে – ঝরা পালক তারই প্রমাণ।
এর ঠিক বছর দুই পরে জীবনানন্দ তাঁর দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘ধূসর পাণ্ডুলিপি’ [১৯৩৬] রবীন্দ্রনাথকে উপহার পাঠিয়ে লিখেছিলেন: “পরমপূজনীয় কবিগুরু শ্রীযুক্ত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মহাশয়ের শ্রীচরণকমলেষু – শ্রদ্ধাবনত জীবনানন্দ, ২০ ফাল্গুন, ১৩৪৩।
শ্রীচরণেষু, আপনি আধুনিক পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ কবি ও মনীষী। আপনি মহামানব।…
আমি একজন বাঙালী যুবক, মাঝে মাঝে কবিতা লিখি। অনেকবার দেখেছি আপনাকে, তারপর ভিড়ের ভিতর হারিয়ে গেছি। আমার নিজের জীবনের তুচ্ছতা ও আপনার বিরাট প্রদীপ্তি সব সময়ই মাঝখানে কেমন একটি ব্যবধান রেখে গেছে–আমি তা লংঘন করতে পারিনি।…
প্রায় নয় বছর আগে আমি আমার প্রথম কবিতার বই একখানা আপনাকে পাঠিয়েছিলুম। সেই বই পেয়ে আপনি আমাকে চিঠি লিখেছিলেন, চিঠিগুলো। আমার মূল্যবান সম্পদের মধ্যে একটি।…
প্রায় আট দশ বছর আগের রচিত কবিতা কুড়িয়ে এবার আর একখানা বই বার করলুম। এই বইখানা আপনাকে উৎসর্গ করতে পারিনি। এই একটি দুঃখ এবং লজ্জা। … এই বই– এই ধূসর পাণ্ডুলিপি আপনাকে পাঠালাম একখানা। … আপনি যদি একটু সময় করে এই বইটা পড়ে দেখেন– ও তারপর বিশদভাবে আমাকে একখানা চিঠি লেখেন তাহলে আমি খুব উপকৃত বোধ করবো। … আপনি আমার ভক্তিপূর্ণ প্রণাম গ্রহণ করুন। ইতি স্নেহাকাঙ্ক্ষী জীবনানন্দ’ ২০ ফাল্গুন, ১৩৪৩।
রবীন্দ্রনাথ তাঁর ধূসর পাণ্ডুলিপি পড়ে মন্তব্য করেছিলেন: ‘কল্যাণীয়েষু, তোমার কবিতা পড়ে খুশি হয়েছি। তোমার লেখায় রস আছে, স্বকীয়তা আছে এবং তাকিয়ে দেখার আনন্দ আছে। ইতি ১২।৩।৩৭ [২৮ ফাল্গুন ১৩৪৩] রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর”।
এই প্রসঙ্গে স্মরণীয় যে, এ-চিঠিটি লিখবার আগেই একটি চিঠিতে জীবনানন্দের কবিতা বিষয়ে রবীন্দ্রনাথ মন্তব্য জানিয়েছিলেন বুদ্ধদেব বসুর কাছে [৩ অক্টোবর ১৯৩৫], সে চিঠি ছাপাও হয়েছিল কবিতা পত্রিকায় [প্রথম বর্ষ, দ্বিতীয় সংখ্যা]। মন্তব্যটি ছিল, “জীবনানন্দ দাশের চিত্ররূপময় কবিতাটি আমাকে আনন্দ দিয়েছে”…। ১৯৩৮ সালে ‘বাংলা কাব্য-পরিচয়’ সম্পাদনাকালে প্রথম সংখ্যা ‘কবিতা’য় প্রকাশিত সেই কবিতাটিকেই [মৃত্যুর আগে] অন্তর্ভূক্ত করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। অন্তর্ভূক্তিকালে ‘ধূসর পা্ডুলিপি’ গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়ে গেছে, রবীন্দ্রনাথের কাছেও তার কপি থাকবার কথা। কিন্তু লক্ষণীয় এই যে ‘আধুনিক কাব্যপরিচয়’ গ্রন্থে ‘কবিতা’ পত্রিকার পাঠটিই গৃহীত, ‘ধূসর পাণ্ডুলিপি’ সেখানে ব্যবহৃত হয়নি। উপরন্তু মূল কবিতার প্রথম ও তৃতীয় স্তবক এবং শেষ স্তবকের প্রথম চার লাইন রবীন্দ্রনাথের সংকলনে বর্জিত।
আমরা হেঁটেছি যারা নির্জন খড়ের মাঠে পউষ সন্ধ্যায়,
দেখেছি মাঠের পারে নরম নদীর নারী ছড়াতেছে ফুল
কুয়াশার; কবেকার পাড়াগাঁর মেয়েদের মতো যেন হায়
তারা সব; আমরা দেখেছি যারা অন্ধকারে আকন্দ ধুন্দুল
প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ করা যায়, জীবনানন্দ ‘দাস’-এর ‘মৃত্যুর আগে’ কবিতাটি নেওয়া হয়েছিল, কিন্তু ‘কেটেছেঁটে’! হতবাক বুদ্ধদেব ‘কবিতা’-র ওই প্রবন্ধেই লিখেছিলেন ‘অঙ্গহানিতে কবিতাটির ক্ষতি হয়েছে।… সাহিত্যক্ষেত্রে কেউ কারুর কৃপাপ্রার্থী নয়।’
মাঝে রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে জীবনানন্দের লেখায় উল্টো সুরও শোনা গিয়েছিল। ‘নভেলের পাণ্ডুলিপি’ উপন্যাসে জীবনানন্দ লেখেন:
“… সত্তর বছর থাকলেই যথেষ্ট; অজস্র বই লেখা হবে, নাম হবে, অনেক টাকা হবে, ইউরোপ-আমেরিকা দেখব – নোবেল প্রাইজ পাব, একজন মেয়ের জায়গায় হাজার মেয়ের প্রেম পাব – মেয়েদের ভালবাসার চিঠি নিয়ে ছিনিমিনি খেলব – বুড়ো হব – জয়ন্তী হবে – আমার নামে ছেলেরা কবিতা লিখবে, আমার গোল্ডেন বুক হবে – সমস্ত নোবেল লরিয়েট আমাকে কাঁধে নিয়ে চেয়ার করবে…
নভেলের পাণ্ডুলিপি উপন্যাস লেখা হয় ১৯৩২ সালে আর রবীন্দ্রনাথের সত্তর বছর জন্মদিন উপলক্ষে ‘গোল্ডেন বুক অফ টেগোর’ প্রকাশিত হয় ১৯৩১ সালে। সাহিত্যিকরা মনে করছেন এ বক্তব্য যেন রবীন্দ্রনাথকে উদ্দেশ্য করেই লেখা।
জীবনান্দ দাশের চোখে রবীন্দ্রনাথ কেমন ছিলেন? এ প্রশ্নের উত্তরে প্রথমেই যেটা বলতে হয় তা হল সকল লোকের মাঝে বসে, নিজের ‘মুদ্রাদোষে’ একা হয়ে যাওয়া কিংবা আলাদা থাকতে গিয়ে বরিশাল শহরে যে মানুষটি সহকর্মী-শিক্ষার্থী ও প্রতিবেশীদের কাছে ‘নিভৃতচারী’ বা কখনো ‘অসামাজিক’ হিসেবে পরিচিত, সেই মানুষটিকেই তখন দেখা গিয়েছিল রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুতে, রাজপথে, শোকমিছিলে।
প্রশ্ন হলো, হৃদয়ের কোন টান, কোন অনুভূতি এ রকম একজন নিভৃতচারী মানুষকে অনেক লোকের সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে কলেজ ক্যাম্পাস থেকে বরিশাল শহরের টাউন হল পর্যন্ত নিয়ে গেল এবং শুধু তা-ই নয়, পারতপক্ষে যিনি দু-চার লাইনের বেশি কথাও বলতেন না, সেই মানুষটির মুখ থেকে পরবর্তীকালে তাঁর শিক্ষার্থীরা এমন কিছু কথামালা বের করে আনলেন, যা প্রবন্ধ হিসেবে ছাপা হয় ওই কলেজেরই ম্যাগাজিনে!
প্রসঙ্গত, ‘রবীন্দ্রনাথ’ শিরোনামের পাঁচটি কবিতা জীবনানন্দের জীবদ্দশায় এবং মৃত্যুর পরে প্রকাশিত কোনো কাব্যগ্রন্থে প্রকাশিত হয়নি। এগুলো পরবর্তীকালে তাঁর রচনাবলি ও রচনাসমগ্রতে ‘অন্যান্য কবিতা’ হিসেবে গ্রন্থভুক্ত হয়েছে। ২০০৬ সালে ঐতিহ্য প্রকাশিত ৬ খণ্ডের রচনাবলির দ্বিতীয় খণ্ডে তিনটি, তৃতীয় খণ্ডে একটি এবং পঞ্চম খণ্ডে একটি কবিতা গ্রন্থভুক্ত হয়েছে।
‘ঊষা’ পত্রিকায় প্রকাশিত ‘রবীন্দ্রনাথ’ শিরোনামে কবিতাটি এ রকম:
‘মানুষের মনে দীপ্তি আছে
তাই রোজ নক্ষত্র ও সূর্য মধুর—
এ রকম কথা যেন শোনা যেতো কোনো একদিন,
আজ সেই বক্তা ঢের দূর
চলে গেছে মনে হয় তবু’; …
‘পূর্বাশা’র রবীন্দ্রসংখ্যায় (১৯৪১) ‘রবীন্দ্রনাথ’ শিরোনামে একটি বড় কবিতা লেখেন জীবনানন্দ দাশ, যেখানে রবীন্দ্রনাথকে ‘মানুষের হৃদয়ের প্রীতির মতন বিভা’ বলে উল্লেখ করেন:
‘অনেক সময় পাড়ি দিয়ে আমি অবশেষে
কোনো এক বলয়িত পথে
মানুষের হৃদয়ের প্রীতির মতন এক বিভা
দেখেছি রাত্রির রঙে বিভাসিত হয়ে আপনার প্রতিভা
বিচ্ছুরিত করে দেয় সংগীতের মতো কণ্ঠস্বরে।’
ওই বছরই ‘পরিচয়’ পত্রিকায় ‘রবীন্দ্রনাথ’ শিরোনামে কবিতায় তিনি কবিগুরুকে তুমি বলে সম্বোধন করে লেখেন:
‘তোমার বিভূতি, বাক-বেদনার থেকে উঠে নীলিমাসংগীতি
আমাদের গরিমার বিকীরণে ডুবে, গড়ে গেছে সব মানুষের প্রাণ।’
এর পরের বছর ১৯৪২ সালে পাবনা থেকে প্রকাশিত ‘পঁচিশে বৈশাখ’ (শ্রাবণ ১৩৪৯ সংখ্যা) নামে সংকলনে ‘রবীন্দ্রনাথ’ শিরোনামের কবিতাটি তিন স্তবকের। শুরুটা এ রকম:
‘আজ এই পৃথিবীতে অনেকেই কথা ভাবে।
তবুও অনেক বেশি লোক আজ শতাব্দী-সন্ধির অসময়ে
পাপী ও তাপীর শববহনের কাজে উচাটন
হয়ে অমৃত হবে সাগরের বালি, পাতালের কালি ক্ষয়ে?’
১৩৯১ সালে ‘প্রতিক্ষণ’ পত্রিকায় প্রকাশিত ‘রবীন্দ্রনাথ’ শিরোনামে কবিতায় জীবনানন্দ লিখেছেন, তার (রবীন্দ্রনাথ) জন্য পৃথিবী অপেক্ষা করছিল:
‘তারপর তুমি এলে
এ পৃথিবী সলের মতন
তোমার প্রতীক্ষা করে বসেছিল।’
তবে রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ও বাস্তবানুগ বক্তব্যের সন্ধান মেলে জীবনানন্দ দাশের প্রবন্ধগুলোতে। কবিগুরুর মৃত্যুর পরই রবীন্দ্রনাথ ও আধুনিক বাংলা কবিতা প্রবন্ধে জীবনানন্দ দাশ লিখেছিলেন,
“রবীন্দ্রসত্তার সঙ্গে বাংলাদেশের প্রকৃতি ও বাঙালী জাতি, কোনো চিরায়ুষ্মান শরীরে তার মন আত্মার মতো, যে রকম মিশে রয়েছে, অন্য কোনো একজন ব্যক্তিবিশেষের সঙ্গে তাদের সেরকম মিলন কোনো দিনও হয়নি”।
‘রবীন্দ্রনাথ’ নামের আরেকটি প্রবন্ধ—যেটিকে প্রবন্ধসংগ্রহের সম্পাদক দেবীপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায় খসড়া বলে চিহ্নিত করেছেন। এ রচনাটি জীবনানন্দ দাশ শুরু করেছেন ছোট একটি বাক্য দিয়ে। “রবীন্দ্রনাথ লোকোত্তর পুরুষ।” এখানে তিনি জানান, লোকোত্তর কবিরা নিজেদের কল্পনা ও অন্তদৃষ্টির বলে আগামী ভবিষ্যতের একটা রূপ পাঠকের চোখের সামনে ফুটিয়ে তোলেন। জার্মান কবি গ্যোটে এমন মহীয়ান ছিলেন। রবীন্দ্রনাথকেও তেমন কবি বলে গণ্য করেন জীবনানন্দ।
জীবনানন্দের মতে রবীন্দ্রনাথের দুটি বিশিষ্ট দিক ছিল যা বিশ্বের শ্রেষ্ঠ কবিদের থেকে তাঁকে পৃথক করেছে। এগুলো: প্রতিভার ভেতরকার অলৌকিক ধীশক্তি এবং তার নিপুণ প্রয়োগবৈচিত্র্যর বিশিষ্টতা। এই দুইটি ধারার নিবিড় সামঞ্জস্য তাঁকে একজন অসাধারণ গীতিকবির শ্রেণী থেকে অলোকসামান্য বিশ্বকবির পর্যায়ে উন্নীত করেছে। এর সঙ্গে আধুনিক বৈজ্ঞানিক পৃথিবীর এবং ঔপনিষদিক ভারতবর্ষের মানুষ বলে একটি তৃতীয় সূক্ষ্মানুভূতি ও সংবেদনশীলতা সব সময়েই তাঁর সাহিত্যের মধ্যে ছিল যা পৃথিবীর আর কোনো কবির মধ্যে ছিল না।
রবীন্দ্রনাথের মধ্যে বস্তুতান্ত্রিকতার অভাব নিয়ে কিছু কথা ওঠে অনেক মহল থেকে সেই বিষয়ে জীবনানন্দ দাশ মনে করেন এগুলো অসৎ সমালোচনা। গল্পগুচ্ছ, উপন্যাস ও গভীর সমাজচেতনাধর্মী আলোচনা ও প্রবন্ধগুলো রচনাকালেই এ ধরনের সমালোচনা দেখা গেছে। যখন তিনি বাংলার স্বদেশি আন্দোলনের ঋত্বিক ও কর্মী ছিলেন। জীবনানন্দ এ ধরনের সমালোচানর বিরুদ্ধে সবচেয়ে শক্তিশালী যুক্তি হিসাবে তুলে ধরেন বোলপুরের শান্তিনেকেতনের শূন্যভূমিকায় একা একটি গৌরবময় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করাকে। তিনি মনে করেন, এটি অতীভ বস্তুতান্ত্রিকতার মনীষা।
তিনি লিখেছেন, “বস্তুচেতনা ও সমাজচৈতন্যের অভাব রবীন্দ্রসাহিত্যে কোনোদিনই লক্ষ্যণীয় জিনিস নয়। বস্তুত রামমোহনের পরে— বাংলাদেশে—তথা ভারতবর্ষে দেশ ও সমাজ ও বিশ্বচেতনার এমন জাগ্রত পুরোহিত আমরা পাইনি—ভবিষ্যতে অনেকদিন পর্যন্ত পাব কিনা সন্দেহ।”
রবীন্দ্রনাথের বিচিত্র প্রতিভার মধ্যে আরেকটি দিক জীবনানন্দ বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন। দেশে-বিদেশে যত লোকের সঙ্গে যত কথা বলেছেন, আলাপ করেছেন সেগুলো সংগ্রহ করা হলে রবীন্দ্রনাথকে কনভারসেশনালিস্ট হিসাবেও গণ্য করা যেত।
এ রচনার শুরুর দিক থেকে শেষের দিকে জীবনানন্দ দাশের মধ্যে একটি স্ববিরোধী উক্তিও পাওয়া যায়। প্রথম দিকে তিনি লিরিকপ্রতিভা নিয়ে যে ধরনের উক্তি করেছেন, শেষের দিকে এসে আবার বিপরীত ধরনের কথা বলেছেন। তিনি বলেন, “রবীন্দ্রপ্রতিভা বহুবর্ণে রঞ্জিত হলেও আমার মনে হয় কবিতায়ই তিনি নিজেকে বিশিষ্টভাবে অর্পণ করার সুযোগ পেয়েছেন ব’লে সেই প্রেরণার সমগ্রতার ভিতরেই তাঁর শ্রেষ্ঠ উৎকর্ষ সম্ভব হয়েছে”। এর পরে জীবনাননন্দ রবীন্দ্রনাথের নানা কাব্যের কবিতা নিয়ে মন্তব্য করেছেন। ‘সোনার তরী’তে কাব্যসৌন্দর্য, ‘ক্ষণিকা’র সুর এবং ‘বলাকা’র দুর্বার স্রোতে। ‘গীতাঞ্জলি’ ও ‘গীতালি’র সূক্ষ্ম রসানুভূতি ও আপাত সহজ রূপায়ণের বৈচিত্র্য এক সময় বিশ্বকে মুগ্ধ করেছিল।
যাই হোক, রবীন্দ্রনাথের মতো সূর্যসদৃশ প্রতিভার সর্বপ্রসারী আলো যে জীবনানন্দের মতো মহান কবি আত্মাকেও প্রভাবিত করবেন এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু একথাও দিবালোকের মতো পরিষ্কার যে, জীবনানন্দের কবিতায় রবীন্দ্রনাথের কাব্যবৈশিষ্ট্যের বিশেষ কোনো প্রভাব পরিস্ফুট নয়; প্রভাব যা ছিল অন্তরে, কবিতা নির্মাণের অভ্যন্তরে। কেননা, কারো প্রভাবে প্রভাবিত হয়ে আপন মৌলিকত্বকে বিসর্জন দেওয়ার মতো মধ্যম সারির কবিপ্রতিভা ছিলেন না জীবনানন্দ দাশ। বরং রবীন্দ্রনাথের মতো মহাপ্রতিভার পর জীবনানন্দের মতো আরো এক মহৎ প্রতিভার আবির্ভাবের কারণেই আমরা পেয়েছি আধুনিক বাংলা কবিতার সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ও পরিপূর্ণ কাব্য আস্বাদনের স্বাদ।
ঋণ: জীবনানন্দ দাশের কাব্যগ্রন্থ; নভেলের পাণ্ডুলিপি; রবীন্দ্রনাথের চিঠিপত্র ষোড়স খণ্ড।