প্রবন্ধে ইন্দ্রজিৎ সেনগুপ্ত

ইন্দিরা গান্ধী – রবীন্দ্রনাথের ‘‌চার্মিং চাইল্ড’‌, গুরুদেবের ‘প্রিয়দর্শিনী’ 

ইন্দিরা গান্ধীর বিখ্যাত একটা কথা আছে সুচিত্রা মিত্রকে নিয়ে। ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বলতেন, ‘‘সুচিত্রার কন্ঠে ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে, তবে একলা চলরে’ শুনে আমি একলা চলার প্রেরণা পাই।’’
সোনিয়া গান্ধী লিখেছেন, “Rabindranath Tagore’s ‘Walk Alone (Ekla Chalo Re)’ never fails to move and inspire me. This poem was also a favourite with Indira Gandhi. Not satisfied with existing translations in English, she wrote her own. This poem is special because it is such an eloquent and passionate evocation of the virtue of courage – the courage to listen to one’s inner voice, the courage to stand by one’s convictions in the face of oppositions, and the courage to unflinchingly face danger in defence of truth and justice.
এটির প্রচলিত ইংরেজি অনুবাদগুলি হয়ত তাঁর পছন্দ হয়নি, তাই তিনি নিজে এটির অনুবাদ করেছিলেন।
“If no one listens to your call
Walk alone.
If in fear they cower, mutely facing the wall,
O hapless one,
Open your mind and speak out alone.
If, as you cross the wilderness, they turn and desert you,
O hapless one,
Tread firmly on the thorns along the blood-lined track, and travel alone.
If, in the storm-troubled night, they dare not hold aloft the light,
O hapless one,
Ignite your own heart with the lightning and pain, and yourself become
The guiding light”.
Rabindranath Tagore
(Translated from the Bengali by Indira Gandhi)
মনে পড়ে শতাব্দীর আশির দশকের প্রথম দিক। ডিসেম্বর মাস। গাছগাছালিতে ঘেরা আশ্রম–মাঠের ঈশান কোণ থেকে ভেসে আসছে বায়ুসেনার কপ্টারের শব্দ। জানান দিচ্ছে বিশ্বভারতীর সমাবর্তনে আচার্য ইন্দিরা গান্ধীর শান্তিনিকেতনে আসার খবর। যিনি ভারতের মতো এক বিরাট দেশের দোর্দণ্ডপ্রতাপ প্রধানমন্ত্রীও বটে। তাঁর কপ্টার বর্ধমানে অল্প সময়ের জন্য থামবে এবং তিনি সাংবাদিকদের সঙ্গে কথাবার্তা বলবেন এই রকম ব্যবস্থা । সেই সব পর্ব সেরে তিনি গেলেন বর্ধমান জেলার জেলা-শাসকের বাড়িতে এবং বললেন তাঁর কিছু লেখার কাজ আছে। টেবিল-চেয়ারের ব্যবস্থা হল । তিনি লিখতে লিখতে জেলা-শাসককে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন রবীন্দ্রনাথের ‘সংকোচের বিহ্বলতা’ গানটি তার পরিচিত কি না। ইতিবাচক উত্তর পেয়ে বললেন তাঁকে সেটি পড়ে শোনাতে।
জেলা-শাসক পড়তে শুরু করে যখন ‘দুরূহ কাজে নিজেরি দিয়ো কঠিন পরিচয়’ লাইনটিতে পৌঁছেছেন, তখন তিনি তাকে থামতে বলে অনুরোধ করলেন যে ঐ লাইনটি রোমান হরফে তাঁকে লিখে দিতে । তিনি তাঁর শান্তিনিকেতনের বক্তৃতার মধ্যে লাইনটি পড়তে চান!
অতীতে পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে বিশ্বভারতীর সমাবর্তনে পিতা জওহরলাল নেহরুর সঙ্গে, পরবর্তীতে দীর্ঘদিন আচার্য থাকাকালীন প্রায় ফি–বছরই তিনি কখনও পৌষ–মাঘ মাসে, কখনও পলাশরাঙা বসন্তে শান্তিনিকেতনে আসতেন। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত কবির স্মৃতিবিজড়িত শান্তিনিকেতনের সঙ্গে ছিল তাঁর নিরবচ্ছিন্ন সম্পর্ক, যার সূচনা হয় স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের উপস্থিতিতে, ১৯৩৪ সালে। রবীন্দ্রনাথের কাছে তিনি ছিলেন ‘‌চার্মিং চাইল্ড’‌। আমৃত্যু রবীন্দ্রনাথকে তিনি বিনম্রচিত্তে গুরুদেব বলে সম্বোধন করে গেছেন।
রবীন্দ্রনাথের গুণগ্রাহী জওহরলাল নেহরু অবগত ছিলেন কবির স্বপ্নের বিশ্বভারতীর শিক্ষা পদ্ধতি নিয়ে। ভরসা ছিল কবির শিক্ষা দর্শনে। তিরিশের দশকে স্বাধীনতা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে নিরবচ্ছিন্ন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সমগ্র দেশ প্লাবিত হলেও শান্তিনিকেতন বহু পরিমাণে শান্ত। কবি বিশ্বমৈত্রীর স্বপ্ন দেখতেন। তাঁর নেতৃত্বে বিশ্বভারতী তখন সম্পূর্ণভাবে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য শিল্প–সংস্কৃতির প্রকৃত মিলনক্ষেত্র।
১৯৩৪ সালে দুটি বিশেষ ঘটনা জওহরলাল ও রবীন্দ্রনাথকে আবারও কাছাকাছি নিয়ে এল । কন্যা ইন্দিরার স্কুলের গণ্ডী পেরিয়ে কলেজে যাবার সময় আসছে । ১৬ই জানুয়ারী কলকাতা থেকে জওহরলাল কবিকে তার পাঠালেন এই মর্মে যে তিনি ও তাঁর পত্নী শান্তিনিকেতনে আসতে চান কবিকে শ্রদ্ধাজানাতে। ১৯ তারিখে ট্রেনে এসে পৌঁছলেন নেহরু-দম্পতি । কবি তাঁদের অভ্যর্থনা করলেন সাদরে, নিজকন্ঠে বেদ মন্ত্রোচ্চারণের মাধ্যমে । বিলেতে শিক্ষিত জওহরলালের সংস্কৃত জ্ঞান ছিল হয়ত স্বল্প, কিন্তু কৌতূহল ছিল অদম্য । তিনি ঐ সংস্কৃত মন্ত্রগুলির ইংরেজি অনুবাদ কবির একান্ত সচিব অনিল চন্দের কাছে চেয়ে পাঠান। বিদায় নেবার সময় তাঁর মন্তব্যে লিখে গেলেন – “জীবনের যাত্রাপথের একটি আনন্দময় দিনের স্মৃতিতে ” (in memory of a delightful day in life’s journey)। নেহরু-পত্নী কমলাও সই করলেন মন্তব্যটির নীচে । ইন্দিরাকে শান্তিনিকেতনে পড়ানোর ব্যাপারে নেহরু-দম্পতি কবির সঙ্গে কথা বলেন । যে চিন্তা থেকে তিনি ইন্দিরাকে শান্তিনিকেতনে পাঠাতে চেয়েছিলেন সে সম্বন্ধে তিনি বিস্তারিত লিখেছেন যার সার-সংক্ষেপ হল – শান্তিনিকেতনের আবহাওয়া থেকে , এবং বিশেষত, গুরুদেবের উপস্থিতিতেও তাঁর সাহচর্যে , ইন্দিরা কিছু আহরণ করতে পারবে (she would imbibe something of the atmosphere of the place and, more particularly, profit by the presence of and contact with Gurudev)। নতুন শিক্ষাবর্ষের গোড়ায়, ১৯৩৪ সালের জুলাই মাসে, ইন্দিরা যখন কলেজ-ছাত্রী হিসেবে শান্তিনিকেতনে এলেন জওহরলাল তখন জেলে এবং কমলা নেহরু অসুস্থ অবস্থায় শয্যাশায়ী । কবির সঙ্গে ইন্দিরার প্রথম সাক্ষাত অবশ্য এর আগেও একবার হয়েছিল, সেটা ছিল ১৯৩২সালে, পুণার যারবাদা জেলে । মহাত্মা গান্ধী তখন সেখানে অনশনে । কবি স্বয়ং এসেছেন তাঁর সমব্যাথী হিসেবে সঙ্গ দিতে; কিশোরী ইন্দিরাও, হয়ত মহাত্মার সেবায় সাহায্য করতে। পিতা জওহরলাল দেরাদুনের জেলখানা থেকে ইন্দিরাকে লিখলেন যে ভারতের আর একজন মহাপুরুষ রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে যে তাঁর (ইন্দিরার) দেখা হওয়ার সুযোগ হল এটা সৌভাগ্যের ব্যাপার।
রবীন্দ্রনাথের সম্মতিতে গ্রীষ্মাবকাশের পর ৭ জুলাই মা কমলা নেহরুর হাত ধরে কৈশোর উত্তীর্ণা ১৭ বছরের ইন্দিরা বম্বে থেকে ম্যাট্রিক পাশ করে বিশ্বভারতীতে আইএ পড়তে আসেন। বিভিন্ন তথ্য থেকে জানা যায়, জওহরলাল বিশেষভাবে চেয়েছিলেন, ইন্দিরা যেন আশ্রমের আর–পাঁচজন ছাত্রীর মতোই সাদামাঠা জীবনযাপন করে, তার জন্য যেন স্বতন্ত্র ব্যবস্থা না করা হয়।
শান্তিনিকেতনে পৌছে ছাত্রী ইন্দিরা গুরুদেবকে প্রণাম জানাতে গেলেন। কবি তাঁকে সম্ভাষণ করলেন তার নামের সঙ্গে “প্রিয়দর্শিনী” বিশেষণটি যোগ করে! ইন্দিরা পরে এই নামটি প্রায়শই তাঁর মধ্যম নাম হিসেবে ব্যাবহার করতেন। যেমন ইন্দিরা প্রিয়দর্শিনী গান্ধী।
শান্তিনিকেতনের ব্যবস্থাদির সঙ্গে ইন্দিরা ভালই মানিয়ে নিয়েছিলেন, নিজের হাতে কাজকর্ম করা এবং সহপাঠীদের সঙ্গে আশ্রমের দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়া এই ব্যবস্থার অঙ্গ ছিল। তখনকার দিনের একমাত্র ছাত্রীনিবাস শ্রীসদনে তাঁর জায়গা হল। লাজুক, সহজ-সরল ইন্দিরাকে কাছে টেনে নিলেন সহপাঠিনীরা, যাঁদের মধ্যে ছিলেন অশোকা সিংহ, জয়া আপ্পাস্বামী, সোমা যোশি, সুশীলা বাদকারের মতো আরও অনেকে। প্রত্যক্ষভাবে রবীন্দ্রনাথের সান্নিধ্য লাভ, শিক্ষক ও বন্ধুবান্ধবীদের সাহচর্যে, বিশ্বপ্রকৃতির কোলে ইন্দিরা যেন জীবনের নবমন্ত্রে দীক্ষিত হলেন। তিনি গভীরভাবে উপলব্ধি করলেন গুরুদেবের তত্ত্বাবধানে শান্তিনিকেতনের আকাশ–বাতাসে প্রবাহিত সেকালের উন্মেষশালিনী প্রতিভার প্রাণস্পন্দনকে। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ছাড়াও শিক্ষক হিসেবে ইন্দিরা পেয়েছিলেন ক্ষিতিমোহন সেন, নন্দলাল বসু, প্রভাত মুখোপাধ্যায়ের মতো জ্ঞানীগুণী মানুষদের। ভাষা, সাহিত্য, ইতিহাস প্রভৃতি বিষয়ে চর্চা ছাড়াও তিনি গভীর অধ্যবসায়ের সঙ্গে শিল্পকলা, নৃত্য ও রবীন্দ্রসংগীতে তালিম নিতেন। শান্তিনিকেতনে তখন দুবেলা ক্লাস হত। বিকেলে আম্রকুঞ্জের কারমাইকেল বেদিতে অবাঙালি ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে ইন্দিরাও প্রভাত মুখোপাধ্যায়ের কাছে বাংলা শিখতেন।
শান্তিনিকেতনের খোলা-মেলা অন্তরঙ্গ পরিবেশ তাঁর খুবই পছন্দ হল। তিনি লিখলেন জীবনে এই প্রথম তিনি নিজেকে ‘বন্ধন-মুক্ত’ বলে অনুভব করছেন। আর গুরুদেব নিজে যখন পট সাজিয়ে তুলি নিয়ে ছবি আঁকতে বসতেন, ইন্দিরা পাশ দিয়ে যেতে হলে যেতেন পা টিপে টিপে, পাছে তাঁর কারণে কোনও ব্যাঘাত না সৃষ্টি হয় । রবীন্দ্রনাথ নিজেও ‘ক্লাস’ নিতেন, খোলা-হাওয়ায় বসে পড়ুয়াদের সঙ্গে নিয়ে গল্প করতেন । একদিন তিনি ইন্দিরাকে জিজ্ঞেসই করে বসলেন – “আমাকে কি তুমি ভয় পাও? কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে মাথা নামিয়ে ইন্দিরা উত্তর দিলেন “আপনার কাজে ব্যাঘাত ঘটাতে চাইনা”। আর একজন শিক্ষক ইন্দিরার বিশেষ পছন্দের ছিলেন, নাম ফ্র্যাঙ্ক ওবারডর্ফ, জাতে জারমান, পড়াতেন ফ্রেঞ্চ । শান্তিনিকেতন ছেড়ে চলে যাবার পরে অনেক বছর পর্যন্ত ইন্দিরা এই শিক্ষকটির সঙ্গে নিয়মিত পত্র-বিনিময় করতেন।
আশ্রমের বিভিন্ন কাজে নিজেকে সানন্দে যুক্ত করেছিলেন ইন্দিরা। প্রতি বুধবার মন্দিরের উপাসনায় যোগ দেওয়া, বন্ধুদের সঙ্গে পাশের গ্রামগুলি ঘুরে দেখার পাশাপাশি দেশ–বিদেশ থেকে আগত বিদগ্ধ পণ্ডিত মানুষদের আলাপ–আলোচনা, সভা–সমিতিতে অল্পবয়সি ইন্দিরার উপস্থিতি ছিল লক্ষণীয়। তখন ছাত্রছাত্রীদের নিজেদের ঘর পরিষ্কার, কাপড় কাচা, খাওয়ার পর বাসন মাজা, সবই নিজেদের হাতে করতে হত। ইন্দিরা নেহরুও ব্যতিক্রম ছিলেন না। বাংলা–হিন্দি মিশিয়ে কথা বলতেই বেশি স্বচ্ছন্দ বোধ করতেন। কোপাই নদীর তীরে কাশের বনে বনভোজন, পৌষ উৎসব, বসন্তোৎসব, সব কিছুতেই অংশ নিতেন বিপুল উৎসাহে। বসন্তোৎসবে আম্রকুঞ্জের মঞ্চে সমবেত নৃত্য ছাড়াও আশ্রম প্রাঙ্গণে প্রদক্ষিণরত নাচের মিছিলে ইন্দিরার সঙ্গী হতেন কলাভবনের ছাত্রী নিবেদিতা বোস, যিনি পরে নন্দলাল বসুর পুত্রবধূ হয়েছিলেন।
শান্তিনিকেতনের ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে ইন্দিরার শিক্ষামূলক বাঁশবেড়িয়া ভ্রমণও বেশ স্মরণীয়। ১৯৩৪ সালের ডিসেম্বর মাসে ইন্দিরা ও রামকিংকর বেইজ–সহ তিরিশ জনের একটি দল নিয়ে নন্দলাল বসু যান বাঁশবেড়িয়ার জমিদারের পোড়ো বাড়ির উঠোনে। তাঁবু ফেলে আস্তানা তৈরি হয় ঐতিহাসিক হংসেশ্বরী মন্দিরের সামনে। নন্দলাল বসু ও রামকিংকর বেইজ মন্দিরের কিছু টেরাকোটা কাজের ছাঁচ সংগ্রহ করেছিলেন। সেই কাজে ইন্দিরাও তাঁদের সাহায্য করেছিলেন। তিনিই সযত্নে সেগুলো শান্তিনিকেতন পর্যন্ত নিয়ে এসেছিলেন। রাত্রে ক্যাম্প ফায়ারের সামনে আড্ডা জমে উঠেছিল। ছাত্রছাত্রীরা হঠাৎ করেই পরস্পরের হাত দেখতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। লাজুক ইন্দিরাও বাড়িয়ে দিয়েছিলেন নিজের হাত। সেদিন শিল্পাচার্য নন্দলাল বসু, বয়স তখন মাত্র ৫২, বাঁশবেড়িয়ায়, হঠাৎ চলন্ত ট্রেন থেকে নিচে পড়ে যাওয়ার মুর্হূতে সাক্ষাৎ মৃত্যুর হাত থেকে তাঁকে বাঁচান সেই লাজুক সপ্তদশী সুদর্শনা ইন্দিরা। আর নন্দলাল বসু হচ্ছেন সেই সুদর্শনার ‘মাষ্টারমশায়’ ও ‘লোকাল গার্জেন’।
শান্তিনিকেতনের ঋতু-উৎসবগুলি ইন্দিরার প্রিয় ছিল । একবার কবির ‘চিত্রাঙ্গদা’ নৃত্যনাট্যটি মঞ্চস্থ হল, মুগ্ধ ইন্দিরা কাহিনীটির আদ্যপ্রান্ত সহপাঠীদের কাছে জানতে চাইলেন । কিন্তু ইন্দিরার জীবনের শান্তিনিকেতন পর্ব সুখের হলেও দীর্ঘ স্থায়ী হয় নি , এক বছরেরও আগে তাঁকে চলে যেতে হয় । কিন্তু যদিও তাঁর অভিজ্ঞতা অল্পকালের, তাঁর জীবনে শান্তিনিকেতনের প্রভাব হয়েছিল চিরস্থায়ী । সুচিত্রা মিত্র , কণিকা বন্দ্যোপাধায়ের মত সংগীতশিল্পীরা গল্প করতেন যে তাঁদের সঙ্গে দেখা হলেই ইন্দিরা রবীন্দ্রসংগীত শুনতে চাইতেন এবং অনেক সময় কোনও বিশেষ গান ফরমায়েস করতেন । ‘একলা চল রে’ তাঁর অন্যতম প্রিয় গানছিল।
শান্তিনিকেতনে বার্ষিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হতে চলেছে, চারদিকে আনন্দের পরিবেশ ছেয়ে রয়েছে। ইন্দিরা খুব খুশী কারণ সেদিন তাকে নাচতে হবে মনিপুরি নাচ। তিনি মেক-আপ রুমে বসে রয়েছেন আর অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে আছেন কখন তাঁর পালা আসবে। হঠাৎ কেউ একজন মেক-আপ রুমে এসে ইন্দিরাকে ডেকে বললেন, “গুরুদেব এক্ষুণি আপনাকে দেখা করতে বলেছেন”। হঠাৎ এভাবে গুরুদেবের ডাকে তিনি কিছুটা চিন্তিত হয়ে পড়লেন। যখন তিনি গুরুদেবের সামনে এসে দাঁড়ালেন, আর তাঁর হাতে একটি টেলিগ্রাম দেখে চিন্তিত হয়ে পড়লেন। গুরুদেব তাঁকে বললেন, “ Daughter, this Telegram is from your Papu. Your mother has become very sick. He has asked you to come to Allahabad Immediately”.
সেদিন ইন্দিরাকে অনুষ্টানের মাঝখান থেকে চলে যেতে হয়েছিল। সে যাত্রার জন্য তিনি শারীরিক ও মানসিকভাবে নিজেকে প্রস্তুত করতে শুরু করছিলেন।তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে এখন সেই সময় এসেছে যখন তাকে জীবনের যুদ্ধের ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে। তিনি ভয় পান নি। গুরুদেব তাঁর সামনেই বসে ছিলেন। তিনি নীরব ছিলেন। মনে হচ্ছিল যেন তিনি ধ্যান করছেন। তবে তাঁর গানটি যেন ইন্দিরার কানে বারবার প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল – ‘একলা চলো রে’ (Walk Alone). ইন্দিরা গান্ধী তাঁর বন্ধুবান্ধবদের বিদায় জানিয়ে, শান্তিনিকেতন ছেড়ে চলে গেলেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যে জীবন-শিক্ষা দিয়েছিলেন তা স্মৃতির অন্তরে রেখে এলাহাবাদের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন। সেদিন থেকে তাঁকে জীবনের যুদ্ধে একলা চলতে হয়েছিল। আচমকাই ছন্দপতন! মা কমলা নেহরু গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লেন। চিকিৎসকদের পরামর্শে তাঁকে বিলেতে নিয়ে গিয়ে চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিল। জওহরলাল নেহরু সেই সময় আলমোড়া জেলে বন্দি। সরকারের অনুমতিতে একদিনের জন্য স্ত্রীকে ভাওয়ালিতে দেখতে এসে তিনি সেখান থেকে অসহায় অবস্থায় রবীন্দ্রনাথকে ১০ এপ্রিল ১৯৩৫ সালে এক পত্রে লিখলেন,
“Owing to the rapid deterioration in my wife’s health, it was decided to send her to Europe for treatment. I was then in Almora Jail and I continued to remain there, though I was allowed out for a day to visit Bhawali Sanatorium to bid her good-bye. My daughter, Indira, who was at Shantiniketan, accompanied her mother to Europe”.
‘‌As I am incapacitated from accompanying her, it has become all the more necessary that Indira should go with her’।
শেষে লিখলেন ‘I had been fortunate enough to choose Shantiniketan for her education at this stage of her life.‌.‌’
ইন্দিরা তাঁর নিজ স্বভাবগুণে যে আশ্রমের সকলের মন জয় করেছেন, সেকথা রবীন্দ্রনাথের অজানা ছিল না। প্রত্যুত্তরে রবীন্দ্রনাথ ভারাক্রান্ত মন নিয়ে জওহরলালকে লিখলেন—
My dear Jawaharlal,
…It is with a heavy heart we bade farewell to Indira, for she was such an asset in our place. I have watched her very closely and have felt admiration for the way you have brought her up. Her teachers, all in one voice, praise her and I know she is extremely popular with the students. I only hope things will turn for the better and she will soon return here and get back to her studies. I could hardly tell you how sad I feel when I think of your wife’s sufferings-but I am sure, the sea voyage and the treatment in Europe will do her immense good and she would be her old self again before long. With my affectionate blessings,
Yours,
– Rabindranath Tagore

Dear Jawahar
“Our heart is very heavy today because Indira is leaving us and coming to you. Shantiniketan is needed her very much. ‌How much she was needed here, I can’t tell you. You have raised her with a lot of love and affection. I praised it wholeheartedly. She was very popular among the students here. I hope that, when the situation is amenable, you will send her again, so that, she can complete her studies here”
কিন্তু ইন্দিরা আর শান্তিনিকেতনে ফিরে আসতে পারেননি। সেরকম উপযুক্ত পরিস্থিতি আর তৈরি হয়নি। ১৯৩৫ সালের ২০শে এপ্রিল, কিশোরী ইন্দিরাকে শান্তিনিকেতন ছেড়ে চলে যেতে হয়। কিন্তু শান্তিনিকেতনের সঙ্গে অকৃত্রিম প্রণয়বন্ধন তাঁর আজীবন থেকে যায়।
ইন্দিরা এরপর অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যান, সেখান থেকে তাঁর পিতাকে একটি চিঠিতে তাঁর শান্তিনিকেতনের স্মৃতি সম্বন্ধে লেখেন – “I was glad of my stay in Shantiniketan – chiefly because of Gurudev. In the very atmosphere there, his spirit seemed to roam and hover over one with a loving and deep watchfulness. And his spirit, I feel, has greatly influenced my life and thought”.
জওহরলাল ১৯৩৬ সালের ডিসেম্বর মাসে লেখা একটি চিঠিতে কবিকে ইন্দিরার এই মন্ত্যব্যটি জানিয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথ লিখলেন,
My dear Jawaharlal,
I am indeed deeply touched by Indira’s affectionate reference to me in her letter. She is a charming child who has left behind a very pleasant memory in the minds of her teachers and fellow students. She has your strength of character as well as your ideas and I am not surprised she finds herself rather alien to the complacent English society. When you write to her next, kindly give her my blessings. We are in the midst of our anniversary celebrations and, I am afraid, the crowd and the activity mean now a great strain on my physical resources. But I wisely refrain from comparing my lot with that of yours !! With affectionate blessings,
Yours sincerely,
– Rabindranath Tagore
কবির জীবদ্দশায় ১৯৩৭ সালের ২৮শে মার্চ চীনা ভবনের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে কবি জহরলালকে আমন্ত্রণ করে লিখলেন “এই কাজের জন্য তোমার চেয়ে যোগ্য কোনও ব্যক্তির কথা ভাবতেও পারিনে”। ইন্দিরাকেও সঙ্গে আনতে বললেন। কিন্তু অসুস্থতার কারণে জওহরলাল আসতে পারলেন না, ইন্দিরাকে পাঠালেন, নিজের একটি শুভেচ্ছাবাণী সমেত – “সশরীরে থাকার মতই আমি আপনাদের সঙ্গে আত্মিকভাবে উপস্থিত থাকব । চীনাভবন চীন ও ভারতের মিলনের মূর্ত প্রতীক হয়ে উঠুক, এই আমার কামনা”। এরপর ১৯৩৯ সালের ৩১ জানুয়ারি হিন্দি ভবনের দ্বারোদ্ঘাটন মুহূর্তে পণ্ডিত জওহরলালের সঙ্গে ইন্দিরার উপস্থিতি কবির মনকে তৃপ্ত করেছিল।
১৭ ডিসেম্বর ১৯৮৩ আচার্য হিসেবে আম্রকুঞ্জে তাঁর শেষ সমাবর্তনের দীক্ষান্ত ভাষণে বেশ উদ্বেগের সঙ্গে বলেন—
“‌In this peaceful atmosphere it is difficult to imagine how full of tensions and conflict, of bitterness and hatred, the world of today is! ‌”

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।