নিবন্ধে ইন্দ্রজিৎ সেনগুপ্ত

রবীন্দ্রনাথ ও বুদ্ধদেব – শ্রদ্ধা ও সমালোচনার কাব্যকথা

সময়টা ডিসেম্বর ১৯৩৮। ভবানীপুরে আশুতোষ মেমোরিয়াল হল্-এ ‘নিখিল ভারত প্রগতি লেখক সংঘে’র দ্বিতীয় সর্বভারতীয় সম্মেলনে বুদ্ধদেব যে প্রবন্ধটি পাঠ করলেন বা ভাষণ দিলেন তার সারমর্ম হল, “বাংলাদেশের বূর্জোয়া সমাজ আজ অবক্ষয়ের মুখে। ভারতের বৃটিশ শাসনের সূচনায় একটি বিরাট জিনিস সম্পন্ন হয়: তা হচ্ছে সাম্ততন্ত্রের ধ্বংসসাধন এবং সেই সঙ্গে দেশে এমন এক বুদ্ধিজীবী শ্রেণীর উদ্ভব হল ইতিপূর্বে যার কোনো অস্তিত্ব ছিল না। … মাইকেল মধসূদন দত্তই হলেন আধুনিক ভারতের প্রথম শ্রেষ্ট কবি। যে দূর্বার সাহিত্যধারা তিনি প্রবাহিত করে গেলেন তা শেষ পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথে পরিণতি লাভ করে। … বোধ হচ্ছে, রবীন্দ্রনাথের অতুলনীয় প্রতিভা আমাদের বুর্জোয়া সংস্কৃতির সমস্ত সৃজনশীল ও প্রগতিশীল শক্তিকে আত্মস্থ করে তা প্রায়নিঃশেষ করে ফেলেছে। কেননা কাব্যে অথবা গদ্যে যাঁরাই তাঁর অনুগামী তাঁরা তাঁকে অন্ধভাবে অনুসরণ করলেন আর আজ তার পরিসমাপ্তি ঘটেছে।… যে যুগ রবীন্দ্রনাথকে সৃষ্টি করেছে, বহুদিন আগে তা অতিক্রান্ত হয়েছে। আর রবীন্দ্রোত্তর শিল্পীরা – যারা তাঁদের যুগের তুলনায় অনেক পরে এসেছেন – অতি সহজেই তাঁরা এমন সব প্রচলিত সাহিত্যিক ধারার আর্ষণে মোহগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন, আজকের দিনে যার কোনও বাস্তব সত্যতা বা বাস্তবের সঙ্গে যার কোনও মিল নেই”।…
কিন্তু আঘাত পেয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। বুদ্ধদেবের প্রবন্ধটি হয়ত এত তাড়াতাড়ি হাতে পৌছায়নি তাঁর, কিন্তু তাঁর বক্তব্যের সারমর্ম টিপ্পনি-সহ বেরিয়েছিল অমৃতবাজার পত্রিকায়, তাঁর একটি বাক্যের ভুল উদ্ধৃতি সহ: “The Age of Rabindranath is over”। এরই অভিঘাতে কয়েকদিন পর রচিত হ’লো রবীন্দ্রনাথের ‘সময়হারা’ কবিতা:
“খবর এল, সময় আমার গেছে,
আমার-গড়া পুতুল যারা বেচে
বর্তমানে এমনতরো পসারী নেই;
সাবেক কালের দালানঘরের পিছন কোণেই
ক্রমে ক্রমে
উঠছে জমে জমে
আমার হাতের খেলনাগুলো,
টানছে ধুলো।
হাল আমলের ছাড়পত্রহীন
অকিঞ্চনটা লুকিয়ে কাটায় জোড়াতাড়ার দিন”।…
রবীন্দ্রনাথের এই কবিতা উদ্ধৃত করে শনিবারের চিঠিতে বুদ্ধদেবের উপর তীব্র বিদ্রুপ বর্ষণ করা হ’লো [মাঘ ১৩৪৫]। সঞ্জয় ভট্টাচার্যের পূর্বাশায় লেখা হল, “… সময়ের মাপকাঠি হাতে নিয়ে যদি বুদ্ধদেববাবু ‘রবীন্দ্রস্রষ্টাযুগ অতীত হয়েছে’ বলে থাকেন, তবে তাঁর সেই শিশুসুলভ যথার্থবাদিতা উপহাসেরও অযোগ্য”।
তবে তিনি তাঁর স্মৃতিকথায় লিখেছিলেন: “কি বলেছিলাম, ঈশ্বরের দয়ায় সবই বিস্মৃত হয়েছি; শুধু একটা কথা, যেহেতু ‘অমৃতবাজার’ সেটাকে হেডলাইনে বিঁধিয়ে খেলিয়েছিলো এবং তা নিয়ে বাগবিতণ্ডাও মন্দ হয়নি, এখনো আমাকে কৌতুকের কাণ্ডুয়ন জোগায় মাঝে-মাঝে [The Age of Rabindranath is Over]। শুনেছি রবীন্দ্রনাথও ব্যথিত হয়েছিলন কথাটা শুনে। তিনি কি জানতেন না ঘোষণাকারীর এক দণ্ড রবীন্দ্রনাথ বিনা চলে না”।
[‘আমাদের কবিতাভবন’ – শারদীয়া দেশ ১৩৮১]
রবীন্দ্রনাথের রচনার সঙ্গে প্রথম পরিচয় সম্পর্কে বুদ্ধদেব বসু লিখছেন, “চয়নিকা চোখে দেখার আগেই রবীন্দ্রনাথে আমার প্রবেশিকা ঘটে, খুব সম্ভব প্রথম অভিঘাত বই পড়াও নয়, কানে শোনা। একবার গিয়েছিলেম মেয়েদের স্কুলের পুরস্কার বিতরণ অনুষ্টানে দাদামশায়ের সঙ্গে। একটি বেশ বড়োসড়ো মেয়ে [অন্তত আমার চোখে তাই] সাধারণ শাড়ি জামা পরে এসে দাঁড়াল; দর্শকদের নমস্কার করে যে কবিতাটা বললো তার প্রথম লাইন ‘হে মোর চিত্ত পুণ্য তীর্থে জাগো রে ধীরে’। তারপর চার-পাঁচটি মেয়ে সেজেগুজে এসে অভিনয় করলো মিনিট দশেকের একটা নাটক। শ্রাবস্তীপুরে দুর্ভিক্ষ লেগেছে, ধনীর গৃহেও অন্ন নেই – কেউ কোনো সমাধান খুঁজে পাচ্ছেন না – শুধু একটি মেয়ে উঠে দাঁড়িয়ে বললো সে সকলকে অন্নদান করবে। আমার কানে লেগে রইলো সেই আবৃত্তি, সেই রচনা, ‘জয়সেন’ ও ‘করিছেন’ শব্দের অসাধারণ মিল ‘চিত্ত’, ‘তীর্থ’, ‘নিত্য’ প্রভৃতি সমস্বর শব্দের অনুরণন – মেয়েদের বলা ছন্দ, ভাষা, অনুপ্রাস আমার মনে এক নতুন ও অদ্ভুত স্বাদ ছড়িয়ে দিলো। … আমার বয়স বোধহয় তখন এগারো চলছে – ‘রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর’ নামটি আমার কাছে স্পষ্ট ও প্রিয় হয়ে উঠলো।
প্রথম চয়নিকা পড়ার স্মৃতির কথা বলতে গেলে বুদ্ধদেব বসুর মনে যায়, “এক শীতের সকালে – আমরা তখন ঢাকায় বেড়াতে গিয়েছি – আমার এক আত্মীয় ঘরে ঢুকে আমাকে বললেন, ‘এই যে তোমার বই’। গলাবন্ধ কোটের পকেট থেকে বের করে দিলেন এক কপি ‘চয়নিকা’। ডবল-ক্রাউন ষোলো-পেজি আকার, ইণ্ডিয়ান প্রেসে পাইকা অক্ষরে ছাপা; লেখক ‘শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর’, সম্পাদকের নাম ‘শ্রী’ চারুচন্দ্র বন্দোপাধ্যায়। সেই বই হাতে পাওয়ার পর আমি হারিয়ে ফেললাম হেম নবীন মধুসূদনকে, এর আগে যত বয়স্কপাঠ্য বাংলা কবিতা আমি পড়েছিলাম তার অধিকাংশ আমার মন থেকে ঝরে পড়ে গেলো। এখনও অর্ধশতাব্দী পরেও আমি যখনই ভাবি রবীন্দ্রনাথের কোনো লাইন – ‘ধন্য তোমারে হে রাজমন্ত্রী/চরণপদ্মে নমস্কার’, বা ‘হাজার-হাজার বছর কেটেছে কেহ তো কহেনি কথা’ ….
প্রথমবার রবীন্দ্রনাথকে দেখার স্মৃতি রোমন্থন করে বুদ্ধদেব বসু বলেছিলেন, “রবীন্দ্রনাথকে আমি প্রথম দেখেছিলাম বুড়িগঙ্গার উপর নোঙর-ফেলা একটি স্টীম লঞ্চে, যেখানে, নিয়ন্ত্রণকর্তা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে রেষারেষি করে, ঢাকার নাগরিকেরা তার বসবাসের ব্যবস্থা করেছিলেন। উপরের ডেক-এ ইজিচেয়ারে বসে আছেন তিনি, ঠিক তাঁর ফটোগ্রাফগুলোর মতোই জোব্বা-পাজামা পরনে, আরও কেউ-কেউ উপস্থিত ও সঞ্চরমাণ, রেলিং-এ হেলান দিয়ে আমি দূরে দাঁড়িয়ে আছি। আমার মুখ চেনা একটি ব্রাহ্ম যুবক আমার কাছে এসে বললেন, ‘আপনাকে ইনট্রোডিউস করিয়ে দেবো?’ ‘আমি ত্রস্থ হয়ে বললাম, না, না, সে কি কথা’! একজন সাহিত্যঘেঁষা উপযুক্ত সরকারি চাকুরে এসে বললেন, ‘আমি ব্যস্ত ছিলাম – আগে আসতে পারিনি’, আমি ভাবলাম, এর আসা না-আসায় রবীন্দ্রনাথের কি সত্যি কিছু এসে যায়?”
অনেকদিন বাদে, ‘কবিতা’ পত্রিকার পৌষ ১৩৫২ সংখ্যায় রবীন্দ্রনাথের ‘লেখন’ কাব্যগ্রন্থের আলোচনা করতে গিয়ে তাঁর মনে পড়েছিল, – “ছেলেবেলায় আমারও একটা অটোগ্রাফ খাতা ছিল, এবং রবীন্দ্রনাথ যেবার ঢাকা গিয়েছিলেন, আরও অনেকের সঙ্গে তাঁর প্রসাদ-কণিকা আমিও পেয়েছিলাম। লজ্জার সঙ্গে স্বীকার করি যে খাতাটি আমি বহুদিন হলো হারিয়ে ফেলেছি, কিন্তু কবতাটি আমার মনে আছে, সেটি এখানে উদ্ধৃত করি, –
“বাজে নিশীথের নীরব ছন্দে
বিশ্বকবির দান
আঁধার বাঁশির রন্ধ্রে-রন্ধ্রে
তারার বহ্নি গান”।
‘রজনী হ’লো উতলা’ ‘কল্লোলে’ বুদ্ধদেব বসুর প্রথম গল্প, চতূর্থ রচনা। জ্যৈষ্ট ১৩৩৩ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল। এই গল্প প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে চতূর্দিকে ঝড়ের মতো অভিযোগ উঠল – অশ্লীলতার অভিযোগ। সজনীকান্ত দাস – তাঁর ‘শনিবারের চিঠি’ পত্রিকায়। তাছাড়া রবীন্দ্রনাথকে একটি দীর্ঘ পত্র লিখে [২৩ ফাল্গুন ১৩৩৩] তিনি এই ধরণের রচনার বিরুদ্ধে প্রতিকার প্রার্থনা করলেন,-
“লেখার বাইরেকার চেহারা যেমন বাঁধা-বাধনহারা ভেতরের ভাবও তেমনি উশৃংঙ্খল। … পৃথিবীতে আমরা স্ত্রী-পুরুষের যে-সকল পরিবারিক সম্পর্ককে সম্মান করে থাকি এই সব লেখাতে সেই সব সম্পর্ক বিরুদ্ধ সম্বন্ধ স্থাপন করে আমাদের ধারণাকে কুসংস্কার শ্রেণীভুক্ত বলে প্রচার করার একটা চেষ্টা দেখি। … দৃষ্টান্তস্বরূপ ‘কল্লোলে’ প্রকাশিত বুদ্ধদেব বসুর ‘রজনী হ’লো উতলা’ নামক একটি গল্প …. এই মাসের [ফাল্গুন ১৩৩৩] ‘কল্লোলে’ প্রকাশিত বুদ্ধদেব বসুর কবিতাটি [‘বন্দীর বন্দনা’] …. ও অন্যান্য কয়েকটি লেখার উল্লেখ করা যেতে পারে। … কোনও প্রবল পক্ষের তরফ থেকে এর প্রতিবাদ বের হওয়ার একান্ত প্রয়োজন আছে। যিনি আজ পঞ্চাশ বছর ধরে বাংলা সাহিত্যকে রূপে রসে পুষ্ট করে আসছেন তাঁর কাছেই আবেদন করা ছাড়া আমি অন্য পথ না দেখে আপনাকে আজ বিরক্ত করছি”…
[কল্লোলযুগ, অচিন্তকুমার সেনগুপ্ত]
রবীন্দ্রনাথ জবাব দিয়েছিলেন সঙ্গে সঙ্গেই।
কল্যানীয়েষু
কঠিন আঘাতে একটা আঙুল সম্প্রতি পঙ্গু হওয়াতে লেখা সহজে সরচে না। ফলে বাক্ সংযম স্বতঃসিদ্ধ। আধুনিক সাহিত্য আমার চোখে পড়ে না। দৈবাৎ কখনো যেটুকু দেখি, দেখতে পাই, হঠাৎ কলমের আব্রু ঘুচে গেছে। আমি সেটাকে সুশ্রী বলি এমন ভুল কোরো না। কেন করিনে তার সাহিত্যিক কারণ আছে, নৈতিক কারণ এ-স্থলে গ্রাহ্য না-ও হতে পারে। আলোচনা করতে হলে সাহিত্য ও আর্টের মূল তত্ত্ব নিয়ে পড়তে হবে। এখন মনটা ক্লান্ত, উদভ্রান্ত, পাপগ্রহের বক্রদৃষ্টির প্রভাব – তাই এখন বাগবাত্যার ধুলো দিগদিগন্তে ছড়াবার সখ একটুও নেই। সুসময় যদি আসে তখন আমার যা বলার বলব। ইতি ২৫ ফাল্গুন ১৩৩৩
শুভাকাঙ্খী
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
[কল্লোলযুগ, অচিন্তকুমার সেনগুপ্ত]
‘শনিবারের চিঠি’তে প্রকাশিত এই চিঠির উত্তরে মন্তব্য লিখলেন বুদ্ধদেব, ‘প্রগতি’র ‘মাসিকী’ নামক সাময়িক সাহিত্য আলোচনার স্তম্ভে [কার্তিক ১৩৩৪]
আঠেরো বছরের কিশোর বুদ্ধদেব রবীন্দ্রনাথকে আক্রমণ করে লিখলেন, “যদিও ‘আধুনিক সাহিত্য’ তাঁর ‘চোখে পড়ে না’ তবুও তাতে ‘হঠাৎ কলমের আব্রু ঘুচে গেছে’ বলে মত দিয়েছেন। আব্রু ঘুচে যাওয়ার বিরুদ্ধে কী সাহিত্যিক কারণ আছে তা রবীন্দ্রনাথ জানালেও পারতেন। সে কি এই যে, ভদ্র-শ্রেণীর উপন্যাসের নায়ক-নায়িকা হওয়া এতকাল যাঁদের একচেটে সৌভাগ্য ছিল – ও নিম্নস্তরের লোকের মধ্যে সাহিত্যের দিক দিয়ে যে-ব্যবধান এতকাল ছিলো তা হঠাৎ খ’সে গেছে; না এই যে, রবীন্দ্রনাথ ও শরৎচন্দ্র যেসব জিনিস ইঙ্গিতমাত্র করেছেন, আধুনিকেরা সেইটেই একটু স্পষ্ট করে বলেছেন। গোগোলের আমলে রুশীয় নাটক-নভেলে উচ্চপদস্থ রাজ-কর্মচারী ভিন্ন কোনও লোক স্থান পেতো না; সেই ব্যবধান লঙ্ঘন করে গোর্কি নিশ্চয়ই মহাপাতক। যুবনাশ্বের গল্প যে ভাল নয়, তার একমাত্র কারণ কি এই যে তাঁর চরিত্রগুলি পুরোনো আমলের জমিদার বা বালীগঞ্জ-নিবাসী ব্যারিষ্টার নয়”?
এই ঘটনা ঘটেছিল ১৯২৬ সালে। অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথের নোবেল প্রাপ্তির ১৩ বছর পর। যখন রবীন্দ্রনাথ বাঙালির চোখে প্রায় দেবতার আসনে আসীন। সেই সময় তাঁকে শালীন কিন্তু কঠিন ভাষায় আক্রমণ করেছেন যিনি তাঁর তখনও আঠারো বছর বয়স পুরেছে কিন্ত পোরেনি। এবং যে কিশোর রবীন্দ্রনাথকে আক্রমণ করে পত্রিকায় এইরকম তীব্র মন্তব্য লেখেন, তিনিই রাতের অন্ধকারে মশারির তলায় শুয়ে শুয়ে পাগলের মত আউড়ে চলেন ‘পূরবী’ থেকে কবিতার পর কবিতা।
‘বন্দীর বন্দনা’ সম্পর্কে বুদ্ধদেব বসু লিখছেন, “দিলীপকুমার ‘বন্দীর বন্দনা’ বইটাকে যেভাবে অভ্যর্থনা জানালেন তা ছিল আমার পক্ষে সম্পুর্ণ আশাতীত; তিনি পড়ালেন সেটা শ্রী অরবিন্দকে, একটি কাঁচি ছাঁটা কপি রবীন্দ্রনাথকে পাঠিয়ে দিলেন, অনুমোদন করলেন বন্ধুদের কাছে জনে-জনে। [আমার যৌবন; বুদ্ধদেব বসু; প্রথম সং পৃ ৮৬]
রবীন্দ্রনাথ সেই কবিতাগুলির আলোচনা করলেন ‘বিচিত্রা’য় [কার্তিক ১৩৩৮] ‘নবীন কবি’ নাম দিয়ে।
“কিছুকাল পূর্বে একবার যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের আহ্বানে ঢাকায় গিয়েছিলুম তখন বুদ্ধদেব বসুর একখানি কবিতা আমার চোখে পড়ে। সেই সময়ে তার কিশোর বয়স। মনে আছে লেখাটি পড়ে আমার কোনো-একজন সঙ্গীকে বলেছিলুম, এই কবিতার ছন্দ ভাষা এবং ভাব গ্রন্থনের যে-পরিচয় পাওয়া গেল তাতে আমার নিশ্চয়ই বিশ্বাস হয়েছে কেল কবিত্বশক্তিমাত্র নয় এর মধ্যে কবিতার প্রতিভা রয়েছে একদিন প্রকাশ পাবে।… বাংলাদেশের আধুনিক সাহিত্য সম্বন্ধে বেশি কথা বলবার অধিকার আমার নেই। … দৈবক্রমে বুদ্ধদেব বসুর লেখার প্রথম যে-পরিচয় পেয়েছিলুম তার থকে আমার মনের মধ্যে এ বিশ্বাস ছিল যে, বাংলা সাহিত্যে নিশ্চয়ই তিনি সম্মান লাভ করবেন। আগামীকালের সাহিত্যদৌবারিক যারা, যথাযোগ্য আসনে তাকে এগিয়ে নিয়ে যাবার ভার তাদেরই পরে। টিকিট তারাই দেখে নেবেন, আমরা বাইরে থেকে নমস্কার করে বিদায় নেব।…
… যে কয়টি কবিতা আমার সামনে এসে পড়েচে তার বাইরে নিশ্চয়ই আরো অনেক লেখা আছে। হয়ত কেবলমাত্র এই লেখাগুলি নিয়ে কবির বিচার করা সংগত হবে না। তাঁর হাতে যে যন্ত্রটি আছে তার কতগুলি তন্তু, তার কোন কোন পর্দায় কত রকমের সুরের মীড় লেগেছে, তা বলতে পারলুম না। যে লেখা কয়টি দেখলুম তার সমস্তগুলো নিয়ে মনে হোলো এ যেন একটা দ্বীপ। এই দ্বীপের বিশেষ একটি আবহাওয়া ফল ফুল ধ্বনি ও বর্ণ। এর সরস উর্বরতার বিশেষ একটি সীমার মধ্যে এক জাতীয় বেদনার উপনিবেশ। দ্বীপটি সুন্দর কিন্তু নিভৃত। হয়ত ক্রমে দেখা যাবে দ্বীপপুঞ্জ, হয়ত প্রকাশ পাবে উদার বিচিত্র মহাদ্বীপে ‘তমালতালীবনরাজিনীলা’ তটরেখা। কিন্তু সৃষ্টি সম্বন্ধে ফরমাস চলে না। যা পাওয়া গেল সে যদি গজমুক্তার কৌটো হয় তবে আবদার করলে চলবে না কন্ঠী কোথায়”।
বুদ্ধদেব বসুর লেখা সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ লিখছেন, “… তোমার নতুন বই ‘যেদিন ফুটল কমল’ সম্বন্ধে ধূর্জটি আমার সঙ্গে আলোচনা করেছিলেন। এই বইটি আমি পড়ি এবং আমার মত প্রকাশ করি, সেদিনকার কথায় এই তাঁর ইচ্ছাটি অব্যক্ত ছিল। সেই তাঁর অকথিত অনুরোধটি রক্ষা করতেম না যদি তোমার এই বই আমার ভালো না লাগত।
পড়তে পড়তে খটকা লেগেছে পদে পদে তোমার ভাষায়। অনেক স্থানেই বাক্যের প্রণালী অত্যন্ত ইংরেজী। মনে মনে ভাবছিলেম, এখনকার যুবকযুবতীরা সত্যিই কি এমনতর তর্জমা করা ভাষাতেই কথাবার্তা কয়ে থাকে? অন্তত আমার অভিজ্ঞতায় তো আমি এতটা লক্ষ করিনি। কথাবার্তার এরকম কৃত্রিম ঢংটাতে রসভঙ্গ হয় কেননা তাতে সমস্ত জিনিসটার সত্যতাকে দাগী করে দেয়। এই ত্রুটি সত্বেও তোমার সমস্ত বইটার একটি স্বকীয় বিশেষত্ব পাওয় যায়। তোমার এই গল্পটি বাইরে থেকে নানা উপকরণে সাজানো জিনিস নয়, এ ভেতর থেকে আপন ভাবপ্রাচূর্যে আপনি জেগে ওঠা। আয়োজনের বহুলতায় এর সম্পুর্ণতা বাধাগ্রস্ত হয়নি। এর মধ্যে অনেক মতামত আলাপ আলোচনা আছে কিন্তু রি্র পরিচয়ের সীমাকে অতিক্রম করে যায়নি। তত্ত্ববিশ্লেষণ করে দেখাবার সুযোগ সমালোচকে দাওনি, ভালো লেগেছে এই সহজ কথাটি ছাড়া আর কিছু বলবার নেই”।
ইতি ২৬ সেপ্টেম্বর ১৯৩৩
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
এই চিঠি পেয়ে বুদ্ধদেব জবাব দিলেন –
৩০/৯/৩৩
শ্রীচরণেষু
ধূর্যটিবাবুর কাছে আপনি যে চিঠি পাঠিয়েছেন তা আমি পেয়েছি। আপনার চিঠি পেয়ে ও পড়ে, খুব খুশি হয়েছি, বেশিরকম খুশি হয়েছি, তা ছাড়া আর কি বলবার আছে? … আমার কাছে – প্রত্যেক আধুনিক বাঙালি লেখকের কাছে – কিন্তু বিশেষ করে আমার কাছে আপনি দেবতার মতো। আপনার কাছ থেকে আমি ভাষা পেয়েছি। সে-ভাষা আপনার পছন্দ হয় না। আমারই দুর্বলতা, অক্ষমতা। উৎস-স্রোত স্বচ্ছ, বিশুদ্ধ, – আমি কি তাকে ঘোলাটে করে তুলি আমার বেসামাল ইংরেজি শিক্ষা দিয়ে? কিন্তু তর্ক করব না, শুধু এই সুযোগ গ্রহণ করছি আপনাকে আমার অন্তরের গভীরতম ধন্যবাদ জানাব – আপনি আমাকে ভাষা দিয়েছেন বলে।
আপনি আমার শারদীয় অভিনন্দন ও প্রণাম জানবেন।
ইতি
বুদ্ধদেব
[দুটো চিঠিরই উৎস চিঠিপত্র/১৬ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর]
বিয়ের পরে রবীন্দ্রনাথের কাছে:
বুদ্ধদেব বসুর বিবাহের পর রবীন্দ্রনাথ কলকাতায় আসেন সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি – স্যার নৃপেন্দ্রনাথ সরকারের বাসন্তী কটনমিল্সের উদ্বোধন করতে [দ্রঃ রবীন্দ্রজীবনী প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়, তৃ খণ্ড, পৃ ৩৭৯]। খবর পেয়ে বুদ্ধদেব একদিন সস্ত্রীক গেলেন দেখা করতে। সুন্দর বর্ণনা আছে প্রতিভা বসুর স্মৃতিকথায়:
“আমার বিবাহের কিছুকালের মধ্যেই রবীন্দ্রনাথ জোড়াসাঁকোতে এসেছেন শুনে বুদ্ধদেব আমাকে নিয়ে প্রণাম করতে গিয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথ খুশি হলেন বুদ্ধদেব নববধূ নিয়ে তঁর কাছে যাওয়াতে। আমি প্রণাম করে মুখ তুলতেই চোখাচোখি হয়ে গেল। পা নড়ে উঠল সঙ্গে সঙ্গে, দাড়িতে হাত বোলাতে বোলাতে বললেন, “মেয়েটিকে তো আমি চিনি গো। তা হলে এই গাইয়ে কন্যাটিকে তুমি বিবাহ করেছ?” সামান্য একটু উত্তেজিত হলেই রবীন্দ্রনাথ হাঁটু নাড়াতেন, দাড়িতে হাত বুলোতেন।
বুদ্ধদেব বাড়ি ফিরে বললেন, “তোমার সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের আগেও দেখা হয়েছে?”
‘আমি বললাম: হ্যাঁ’।
“আমাকে বলোনি তো”।
‘কি প্রসঙ্গে বলবো? তুমি তো জিজ্ঞাসা করোনি’।
“এর জন্য প্রসঙ্গ দরকার হয়”? জিজ্ঞাসা করার প্রশ্ন ওঠে? রবীন্দ্রনাথকে দেখা শোনা পরিচয় থাকা সবই তো একটা ঘটনা, একটা বলবার বিষয়”।
[‘জীবনের জলছবি’- প্রতিভা বসু। পৃ ১১৫]
কবিতা পত্রিকার জন্মকথা:
ইষৎ ভয়ে-ভয়ে এক কপি কবিতা পত্রিকা পাঠালাম রবীন্দ্রনাথকে, প্রার্থনা করলাম তাঁর একটি কবিতা। ভয় এজন্যে নয় যে আমাদের ক্ষুদ্র উপচার তাঁর পছন্দ হবে না – কিন্তু আমাদর সব দ্বিধা উড়িয়ে দিয়ে দ্রুত এলো [কলকাতা থেকে বুদ্ধদেব চিঠি পাঠিয়েছেন ৩০/৯/৩৫ তারিখে শান্তিনিকেতন থেকে রবীন্দ্রনাথ জবাব পাঠিয়েছেন ৩/১০/৩৫ তারিখে] তাঁর উত্তর – মস্ত একখানা তুলোট কাগজের এপিঠ-ওপিঠ ভর্তি সেই অনিন্দ্যসুন্দর হস্তাক্ষর, যার তুলনা আমি দেখেছিলাম বহুকাল পরে অক্সফোর্ডে এক প্রদর্শনীতে টেনিসন ও রবার্ট ব্রিজেস-এর পাণ্ডুলিপিতে; উপরন্তু এল তাঁর আনকোরা নতুন লম্বামাপের গদ্য-কবিতা ‘ছুটি’ [আশ্বিনে সবাই গেছে বাড়ি] – তাঁর সেই সময়কার শ্রেষ্ট একটি রচনা।
[চিঠিটি এখন পাওয়া যায় বিশ্বভারতী প্রকাশিত রবীন্দ্রনাথের চিঠিপত্র ১৬ তে; রবীন্দ্রনাথের চিঠি বুদ্ধদেব বসুকে, পত্র নং ৪]
কল্যাণীয়েষু
“তোমাদের ‘কবিতা’ পত্রিকাটি পড়ে বেশ আনন্দ পেয়েছি। এর প্রায় প্রত্যেকটি রচনার মধ্যেই বৈশিষ্ট্য আছে। সাহিত্য-বারোয়াঁরি দল-বাঁধা লেখার মতো হয়নি। ব্যক্তিগত স্বাতন্ত্র্য নিয়ে পাঠকদের সঙ্গে এরা নূতন পরিচয় স্থাপন করেছে। …
… আমার কাছে কবিতা চেয়েছ। জান না আমার কলমটাকে পিঁজরাপোলে পাঠাবার সময় এসেছে। অন্তর্যামী জানেন এখন না-লেখার চর্চা করাই আমার চরম সাধনা। অনেকদিন লেখা চালিয়েছি এখন যদি পরের দাবিতেও অভ্যাসের নেশায় লেখা না থামাতে পারি , তাহলে অপঘাত ধ্রুব। এই যে তোমাকে দীর্ঘ চিঠিখানা লিখলুম এটা উজান ঠেলে। শরীর আমার নিরতিশয় ক্লান্ত, মন তাই কর্মবিমুখ। তোমাদের তো সম্বল কম নেই দেখতে পাচ্চি – আমার কাছে প্রার্থনা করে লজ্জায় ফেলো না”।…
— ইতি ৩ অক্টোবর ১৯৩৫
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
সেপ্টেম্বর মাসে বুদ্ধদেব বসুর দুটো বই বেরোল; উপন্যাস ‘বাসরঘর’ ও প্রবন্ধ সংগ্রহ ‘হঠাৎ আলোর ঝলকানি’। এই বইদুটি রবীন্দ্রনাথকে পাঠালে রবীন্দনাথ লিখলেন, – “… তোমার বইখানি নিঃসংশয়েই ভালো লাগল, তাই অত্যন্ত আশ্বস্ত হয়েছি। গল্প হিসাবে তোমার এ লেখা সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। এ কবির লেখা গল্প, আখ্যানকে উপেক্ষা করে বাণীর স্রোতবেগে বয়ে চলেছে। একটি নারী ও একটি পুরুষ এ দুই তটের মাঝখানে এর আবেগের ধারা।  ধারার মধ্যে থেকে থেকে আবৰ্ত্ত পাক খেয়ে উঠছে, কিন্তু তার কারণগত আঘাত বাইরের দিক থেকে নয়, গভীর তলার দিক থেকে। কারণ যদি থাকত বাইরে, তাহলে তার ইতিহাস নিয়ে আখ্যানের উপকরণ জমে উঠতে পারত। তাহলে এর ভিতর থেকে. দস্তুরমতো একটা গল্প দেখা দিত। তুমি যেন স্পর্ধা, করেই সেটা ঘটতে দাওনি। … এই তোমার গল্প না বলা গল্পটিকে তুমি যে এমন দাঁড় করাতে পেরেছ সে তোমার কবিত্বের প্রভাবে।
একটা কথা বলে রাখি কুন্তলা নামটা ভালো লাগল না। কুন্তল মানে চুল, আকার যোগ করে তাতে স্ত্রীত্ব আরোপ করা বৃথা। কেউ কেউ মেয়ের নাম রাখে অনিলা – অনিল মানে হাওয়া। হাওয়াকে হাওয়ানী বলে ছদ্মবেশে চালানো যায় না। চুলকে চুলা বললে আরও দোষের হয়। একথা মানা যেতে পারে ‘চুলা’কে স্ত্রীজাতীয় বলে নির্দেশ করলে ভাবের ক্ষেত্রে কোনও কোনও স্থলে সংগত হতেও পারে”।…
ইতি ২৫ অক্টোবর ১৯৩৫
রবীন্দ্রনাথ [পত্র নং ৫। চিঠিপত্র ১৬।]
বুদ্ধদেব বসু উত্তর দিলেন
শ্রীচরণেষু – [২৯/১০/৩৫]
বাসরঘর সম্বন্ধে আপনার চিঠি পেয়ে সার্থক মানছি লেখকজন্ম। … আমাদের অধিকাংশ লেখকের ভাগ্যেই জীবদ্দশায় সত্যিকারের সমাদর জোটে না। আমরা অকারণে নিন্দিত হই – এবং তার চেয়েও যা শোচনীয় – প্রশংসিত হই ভুল কারণে। কবি প্রকৃত মর্মগ্রহণের আশা করেন পেশাদার ক্রিটিকের কাছ থেকে নয়, তাঁরই সমধর্মীর কাছ থেকে – অর্থাৎ তাঁর রচনার যাচাই যদি কেউ করতে পারেন, অন্য কবিই পারবেন। খবরের কাগজে তিনকলাম সুখ্যাতি বেরুলেও আমি বিচলিত হই না, কিন্তু আমার কোনও সমধর্মী – যার উপরে আমার আন্তরিক শ্রদ্ধা আছে – একটুখানি ‘ভালো লেগেছে’ বললেই নিজেকে যেন সার্থক লাগে। এই অ-ফরমায়েসি স্বতঃস্ফুর্ত চিঠি যে আমার মনে খুব একটা খুশির ঢেউ তুলবে, সেটা স্বাভাবিক মাত্র।
হঠাৎ আলোর ঝলকানি সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ:
‘হঠাৎ আলোর ঝলকানি’ বোধহয় রবীন্দ্রনাথের তেমন ভালো লাগেনি। এই চিঠির উত্তরে তিনি লিখলেন:
কল্যাণীয়েষু
‘বাসরঘর’ উপলক্ষে যে চিঠিটি লিখেছিলুম সেটা কোনও মাসিকপত্রে ছাপতে ইচ্ছে করেচ। ছাপতে পারো।
তোমার ‘হঠাৎ আলোর ঝলসানি’ [সদ্দৃষ্ট] পড়ে মনে হলো লেখাগুলিতে আলোর ঝলক ভালো করে লাগেনি। নিজের অভিজ্ঞতার স্মৃতির স্বাদটুকু নিয়ে স্বগত উক্তি অনেক সময়ে শরতের রিক্তবর্ষণ মেঘখণ্ডের মতো আকাশপটে কাজলকালীর নিবিড় রেখা কিম্বা সোনালী তুলির উজ্জ্বল সাক্ষর রাখে না। ….
পাদটীকা অংশের লেখায় জোর আছে। ইতি ৩০ অক্টোবর ১৯৩৫।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর [পত্র নং ৬ চিঠিপত্র ১৬]
শান্তিনিকেতনে যাওয়া প্রথমবার:
ছায়া প্রেক্ষাগৃহে চণ্ডালিকার অভিনয় উপলক্ষে রবীন্দ্রনাথ কলকাতায় এসে সাতদিন রইলেন [১৯ – ২৬ মার্চ]। এই সময়ে বুদ্ধদেব তাঁর সাক্ষাত প্রার্থনা করে চিঠি লিখেছিলেন। উত্তরে রবীন্দ্রনাথ লিখলেন,
“এখনি ফিরে চলেছি শান্তিনিকেতনে। তোমার সঙ্গে দেখা করবার ইচ্ছে ছিল সংবাদ দেবার সুযোগ পেলুম না। যদি শান্তিনিকেতন যেতে পার তাহলে কথাই নেই নতুবা আগামী বৎসরের প্রথম সপ্তাহে যখন কলকাতায় আর একবার আসার সম্ভাবনা আছে তখন একবার দেখা হতে পারবে। [১১ চৈত্র ১৩৪৪]
রবীন্দ্রনাথ
পরপর আরও দুটি চিঠি লিখলেন রবীন্দ্রনাথ – ভাষা থেকে বোঝা যায়, বুদ্ধদেবের পত্রের উত্তরে। এই সামান্য চিঠিদুটি থেকে রবীন্দ্রনাথের স্নেহদৃষ্টির আভাস পাওয়া যায়।
কল্যাণীয়েষু
তুমি যেদিন খুশি এসো, যখন তোমার খুশি আমার সঙ্গে দেখা করতে পারো – আলো কমে এসেছে, কাজকর্ম থেকে ছুটি নিতে বাধ্য হয়েছি। যাদের দৃষ্টিশক্তি উজ্জ্বল আছে আমার দেখা পেে তাদের বাধবে না।
ইতি ৩।৪।৩৮ [২০ চৈত্র ১৩৪৪]
রবীন্দ্রনাথ
কবে আসবে খবর দিয়ো।
আবার লিখলেন:
কল্যাণীয়েষু
সুখবর। সপরিবারে সবান্ধবে এসো। কোন গাড়িতে আসবে খবর দাওনি কেন?
ইতি ২৮ চৈত্র ১৩৪৪
রবীন্দ্রনাথ [দ্র চিঠিপত্র ১৬]
এই শান্তিনিকেতন ভ্রমণের স্মৃতিচারণ করেছেন বুদ্ধদেব, ‘পূর্বস্মৃতি’ প্রবন্ধে, তাঁর শান্তিনিকেতন বিষয়ক গ্রন্থ ‘সব পেয়েছির দেশে’তে।
রবীন্দ্র রচনালী:
রবীন্দ্র রচনালী প্রথম খণ্ড প্রকাশিত হল। বুদ্ধদেব বসু লিখলেন, “… রবীন্দ্রনাথ যে বিরল মানবদের একজন, মহাকবি আখ্যা যাঁদের সম্বন্ধে সত্যিই প্রযোজ্য, আজ আর তা নিয়ে কোনও তর্ক নেই”।…
কিন্তু তাই বলে বুদ্ধদেব রবীন্দ্রনাথের অন্ধ স্তব করেননি; যেখানে আপত্তিকর বলে মনে হয়েছে সেখানে আপত্তি জানিয়েছেন তীব্রতর ভাষায়। রবীন্দ্ররচনাবলীর তৃতীয় খণ্ডে ‘চোখের বালি’র সমালোচনায় উপন্যাসটির সমাপ্তি নিয়ে আপত্তি জানিয়ে বুদ্ধদেব লিখলেন, “…বস্তুত বিনোদিনীর এই তুচ্ছ পরিণাম আমাদের মন কিছুতেই গ্রহণ করতে পারে না, কেবলি মনে হয় এ মিথ্যা এ ফাঁকি। শেষ পরিচ্ছদটি গল্পের আভ্যন্তরীন উপাদান থেকে অনিবার্যভাবে গড়ে ওঠেনি; এটি উপর থেকে বসানো হয়েছে, ছাপার অক্ষরে যা ঘটলো জীবনেও তাই ঘটেছিলো এ আমাদের বিশ্বাস হয় না, মনে হয় এটুকু লেখকের মনগড়া”।…[‘কবিতা’ আষাঢ় ১৩৪৭]
এই সমালোচনা ‘কবিতা’য় পড়ে রবীন্দ্রনাথ বুদ্ধদেবকে চিঠি লিখলেন, – ২০ জুন ১৯৪০
কল্যাণীয়েষু
তোমাদের কবিতায় চোখের বালির সমালোচনার শেষ অংশে যে মন্তব্য দিয়েছ তা পড়ে খুব খুশি হয়েছি। চোখের বালি বেরোবার অনতিকাল পর থেকেই তার সমাপ্তিটা নিয়ে আমি মনে মনে অনুতাপ করে এসেছি, নিন্দার দ্বারা তার প্রায়শ্চিত্ত হওয়া উচিত।… একটি জিনিস দেখে খুশি হলুম যদিও তুমি মাষ্টারি করচ তবু তোমার লেখায় পণ্ডিতি ঢুকে তাকে ক্লাস পড়ানোর তলায় কাৎ করে ফেলেনি।
রবীন্দ্রনাথ
মে [১৯৪১] মাসে সপরিবারে শান্তিনিকেতনে গেলেন – রবীন্দ্রনাথের জীবিতকালে দ্বিতীয় ও শেষবার। এই দুবার শান্তিনিকেতন ভ্রমণের স্মৃতি নিয়ে বই লিখেছিলেন ‘সব পেয়েছির দেশে’। সে বইতে লিখেছেন, – “দু-তিনদিন থাকব মন করে বেরিয়েছিলুম; কিন্তু পরিপূর্ণ পদ্মের মতো এক-একটি দিন যখন ফুটে উঠতে লাগল, এক-এক করে তেরো দিন থেকে গেলুম।… স্বয়ং কবির সস্নেহ দৃষ্টি ছিল আমাদের পরে”।…
শান্তিনিকেতন থেকে কলকাতায় ফিরে আসার কয়েকদিন পর বুদ্ধদেব রবীন্দ্রনাথের কাছ থেকে এই চিঠিটি পান,
কল্যাণীয়েষু
এবারে আশ্রম থেকে তুমি অনেক ঝুড়ি বকুনি সংগ্রহ করে নিয়ে গিয়েছ। আশা করি তার বারো আনাই আবর্জনা নয়। বাজে বকুনির বাহুল্যে প্রমাণ করে খুশির প্রাচুর্যকে, সেটা নিন্দনীয় নয়। তোমাদের ক’দিন এখানে ভালো লেগেছিল। ভালো লাগা জিনিসটা ফুল ফোটার মতই রমণীয়, সেটাতে চারিদিকের লোকেরই লাভ, সেইজন্য আমরাও তোমার আনন্দসম্ভোগের প্রতি কৃতজ্ঞ আছি।… আশাকরি তোমাদের কুলায় আনন্দকাকলিতে ভরে উঠেছে। আকাশে ঘন ঘন মেঘ সুক্ষ্ম বৃষ্টির জালে অবকাশকে আবৃত করে আছে। এইরকম মেঘাচ্ছন্ন দিনে মন চায় সেই রকম কথার প্রবাহ যাতে বাক্য আছে বিতণ্ডা নেই, ভালো মন্দর বিচার নিয়ে বিতর্ক নেই। অলস মুহুর্তগুলি মুচমুচে চিঁড়েভাজার মতন এসে পড়ে পাতে, জুড়োতে বিলম্ব হয় না।
ওদিকে বাগানে ময়ূরটা ডেকে ডেকে উঠছে কেবল জানাতে যে খুশি হয়েছে।
ইতি ৪।৬।৪১
শুভাকাঙ্খী
রবীন্দ্রনাথ [চিঠিপত্র ১৬]
রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুতে বুদ্ধদেব বসু স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে লিখেছেন, “… মেঘলা ছিল সেই দিন; আমার মন সকাল থেকে উন্মন। … হঠাৎ দেখলাম আমার সামনে অমিয় চক্রবর্তী: চোখের কোণ মুছে তিনি বললেন, “রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আর নেই, একটা Shell পড়ে আছে”।… পরবর্তী ঘটনাগুলো আমি মনে করতে পারছি না, একটা দৃশ্য অন্যটার সঙ্গে মিশে যাচ্ছে। … ঝাপসা মনে পড়ে নিমতলা ঘাটে প্রবেশের চেষ্টা করেছিলাম একবার ঢুকতে না পেরে, রাস্তার দিকে বেরোতেও না পেরে অগত্যা গঙ্গার পাড়ি বেয়ে নেমে নৌকা নিয়ে ময়দানের কাছে নেমেছিলাম এসে আমরা কয়েকজন – বলছি ‘আমরা’, কিন্তু অন্যদের বিষয়ে আমার স্মৃতি অস্পষ্ট – শুধু মনে পড়ে অজিত চক্রবর্তীকে, বোধহয় ফিরতি পথে দেখা হয়ে গেলো, তার সঙ্গে ব্রিষ্টল হোটেলে বসে দুজনে পান করলাম, দু-গ্লাস শেরী অথবা ভের্মুথ – কেন হঠাৎ চিরন্তন চায়ের বদলে তা বলতে পারবো না, তখনও আমি অ্যালকোহল-সেবনে অভ্যস্থ হইনি, – কিন্তু বোধ হয় সেইজন্যেই, সেই দিনটিকে আমার কোনও বিশেষ আচরণের দ্বারা চিহ্নিত করবার জন্য।…
[‘আমাদের কবিতাভবন’ পৃ ২৫]
রবীন্দ্রনাথের নামে সাহিত্য পুরস্কার ঘোষণা করতে গিয়ে ‘কবিতা’ সম্পাদকীয়তে রবীন্দ্র মেমোরিয়াল কমিটির কাজকর্মের সমালোচনা করে লিখলেন: “রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর অব্যবহিত পরে আমরা লিখেছিলাম যে বাংলায় সাহিত্যসৃষ্টির জন্য একটি পুরস্কার রবীন্দ্রনাথের নামে স্থাপিত হওয়া উচিত। এই সুযোগে সে প্রস্তাব আবার উপস্থিত করছি। ভারতের অন্যান্য প্রদেশে বিভিন্ন সাহিত্য পুরস্কারের প্রবর্তন হয়েছে, অথচ যে-বাংলাদেশ সাহিত্য বিষয়ে চির-অগ্রণী, যে-বাংলাভাষায় রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন সেই দেশের ও সেই ভাষার সাহিত্যের জন্য আজও পর্যন্তও একটি পুরস্কারের ব্যবস্থা হ’লো না। রবীন্দ্র-মেমোরিয়াল কমিটি কি এ বিষয়ে উদ্যোগী হবেন”?
রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর পর তাঁর স্মৃতিতে সাহিত্য পুরস্কার দেবার প্রস্তাব যেমন তিনিই তুলেছিলেন, ‘স্বগতবিদায়’ কাব্যগ্রন্থের জন্য মরণোত্তর রবীন্দ্রপুরস্কার দেওয়া হ’লো তাঁকে।
ঋণ: ‘বুদ্ধদেব বসুর জীবন’: সমীর সেনগুপ্ত; ‘জীবনের জলছবি’: প্রতিভা বসু, এবং বুদ্ধদেব বসুর বিভিন্ন বই।
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।