দুগ্গা দুগ্গা বলে যাত্রা শুরু হল আমি মনে মনে ভাবলাম কত নিরলস চেষ্টায় এইসব যাত্রার সুরক্ষা আর স্মুদ
চলাচল ব্যবস্থা বজায় রাখতে হয় ! কতটা পরিশ্রমী আর সিনসিয়র হলে কাজটা এত নিখুঁত ভাবে করা যায়। সোজা চড়াই ভাঙতে ভাঙতে উঠছি আমরা। কখনও দুপাশে যেন বরফের মরুভূমি। আবার অন্য ঢালে নিচু পাহাড় জোড়া শহর যেন বরফের জলছবি। চলেছি……গর্ণারগ্রাথ (Gornergrat) শীর্ষভ্রমণে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে উচ্চতা ৩০৮৯ মিটার বা ১০১৩৫ ফুট। ২৯টা শৃঙ্গ দিয়ে ঘেরা এই অঞ্চল। পার্বত্যবনভূমি থেকে সমতল সব পুরু বরফে মুড়ি দিয়ে আছে অথচ তীব্রস্রোতা নদী চলছে কাঁচের মত জল নিয়ে। সমুদ্রে যেমন অনন্ত জলরাশি চিত্ত বিকল করে এও অনেকটা তেমন ক্লান্ত করে দেয়। অগত্যা কামরার মধ্যে চোখ ফিরিয়ে উত্যক্ত করতে চেষ্টা করলাম কর্তামশাইকে। কি গো তোমার কেমন লাগছে ? এত বরফ দেখতে দেখতে আমি তো হাঁফিয়ে যাচ্ছি। আমার তুষারপ্রেমিক ছেলে অমনি বলে উঠল ‘ শোন মা, জারম্যাট শহর থেকে মাত্র ৩৩মিনিট সময় লাগে অথচ ১৪৬৯ মিটার খাড়া আরোহণ সেতু। এদেশটা স্পেশালি স্কীয়িংয়ের জন্যে দ্য বেস্ট । সারা পৃথিবী থেকে মানুষ আসেন এই আনন্দ নিতে। একটু পরেই দেখবে মানুষের মিছিল। ‘
সত্যি তাই দেখলাম একটা জায়গায় ট্রেন থামল আর সেখানে লেভেল ক্রসিংয়ের মত গেট আছে এমনকি গেটকিপারও আছে। অনেক মানুষ নামলেন বিশেষ পোশাক আর স্কী করার যন্ত্রপাতি নিয়ে। বাব্বাঃ আট থেকে আশি সব বয়সের লোকজন যেন উৎসাহে টগবগ করছে ! অথচ বাইরে তখন মাইনাস ফাইভ টেম্পারেচার যদিও আমরা বসে আছি ১৫ ডিগ্রী উষ্ণতায় ট্রেনের ভেতর। গেটের কাছেই বিশেষ জায়গা করা আছে ভেজা পোশাক আর যন্ত্রপাতি সমেত যাত্রীদের অপেক্ষা করার জন্যে। ফেরার পথে দেখেছি বরফের কাদায় মাখামাখি ক্লান্ত অথচ ঝলমলে চোখের স্কীয়ারদের। উত্তুঙ্গ পাহাড়ের ঢাল বেয়ে মানুষ কোথাও পাখির মত কোথাও বিন্দুর মত ভেসে চলেছেন। আমি শিউরে উঠে ভাবলাম এই তীব্র ঢালে হঠাৎ যদি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে যায়! বাবাই বলল,
‘ মা এখানে যথেষ্ট সুরক্ষা ব্যবস্থা আছে। প্রয়োজনীয়
নজরদারি থাকে ‘।
সমুদ্রযাত্রায় যেমন চিত্ত বিকল হয় অসীম জলরাশি দেখতে দেখতে এখানেও শীর্ষভ্রমণে এসে তুষার বলয় কিছু ক্লান্ত করে বৈকি। এখানে সবথেকে উঁচু শৃঙ্গ ১৩০০০ ফুট। চারপাশে অনেক গ্লেসিয়ার…. তার মধ্যে গর্ণার নিজে আল্পস পর্বতমালার দ্বিতীয় দীর্ঘ হিমবাহ। ১৪৬৯ মিটার খাড়া আরোহণ সেতু । আশ্চর্য গ্যালারি আর টানেলের মধ্যে দিয়ে চলা বিশ্বের সেরা প্যানোরামা এই গর্ণারগ্রাথ।
অবশেষে যাত্রা শেষ…… আমরা দাঁড়ালাম গর্ণারগ্রাথ রেলস্টেশনে।
লোহার গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকলাম…. একটু গিয়ে একটা বিরাট টিকেট- কাউন্টার, অনেক লোক বসে আছে। বাবাই বলল ‘এখানে টাইম ওয়েস্ট করা যাবে না, ঐ ওপরে দেখ একটা রেস্তেরাঁ আছে। এই অল্টিচিউডেও টোট্যালি ইকুইপ্ট। ‘ আমি আঁতকে উঠলাম এই বরফে আল্পসের গা বেয়ে ওখানে উঠব কি করে ! আমি যাব না… তোমরা পারলে যাও। বাবাই হাত ধরল ‘ মা কোন ভয় নেই। তুমি তো আমার সঙ্গে যাবে। ঠিক পারবে মা…এসো। ‘ ছেলের হাত ধরে খুব ভয়ে ভয়ে প্রথম পা রাখলাম আর হুস করে অনেকটা পা গেঁথে গেল। তবে পড়ে যাব বা পিছলে যাব এরকম মনে হল না। পরের পা ফেললাম সেটাও ঠিকঠাক। বাবাইয়ের ফেলে যাওয়া পায়ের ছাপ দেখে দেখে এগোতে লাগলাম। চারদিক তো বরফে একাকার, দিক ঠিক করতে আর ঘাড় উঁচু করে তাকাতে হচ্ছে না। একটা কথা মনে হ’ল, এই বরফই তাহলে আগলে রাখে লড়াকু পর্বতারোহীদের ; পড়ে যেতে দেয় না ! এত গভীর মনোযোগে আগে কোন কাজ করেছি বলে মনে পড়ল না। একসময় রাস্তা ফুরোল আর আমরা লিফ্টে করে উঠে গেলাম তিনতলা সমান উঁচু সেই রেস্তেরাঁয়। দেওয়াল জোড়া ম্যাটারহর্ণের পাশ কাটিয়ে একটা টেবিলে জায়গা পেলাম। সব ব্যবস্থা এমনকি টয়লেট পর্যন্ত আপডেটেড, কে বলবে জায়গাটার উচ্চতা দশহাজার ফিট। জানলার কাঁচ অনেকটা দখল করে আছে বরফের ক্রিস্টাল ডিজাইন। যাই হোক ছেলে যেন কি একটা নতুন খাবার খাওয়াবে বলেছে। এল টুকরো টুকরো টোস্টেড ব্রেড , গুলাশ (Goulash), আর কফি। বাঃ গরম গুলাশ তো দিব্বি খেতে! মুচকি হেসে শ্রীমান বললেন, বলতো কি খেলে? এর মধ্যে বীফ আছে। দারুণ খাবার না! আমার ছানাবড়া চোখ আস্তে আস্তে নরম হয়ে এল ওর খুশি দেখে। এরপর মা ছেলে বেরোলাম বাইরে উঁকিঝুঁকি মারতে যদি ম্যাটারহর্ণের একঝলক দেখা যায়! নাঃ তিনি ঘন মেঘে ঘোমটা দিয়ে রেখেছেন। কি আর করা , কিছুক্ষণ এই তুষাররাজ্যে দিশাহারা হয়ে ছবি তুললাম, বরফের বল নিয়ে ছুঁড়ে মারলাম ছেলের দিকে। ছেলে যেন বাবার মত আমার এই ছেলেমানুষি উপভোগ করতে লাগল। একবার পাখির মত দুহাত ( ডানা) মেলে বলছি বাবাই ছবি তোল, ছবি তোল।আবার বলছি আমি বরফে হাঁটছি ভিডিও কর। ভাগ্যিস সিনিয়র মহারাজ এ বালখিল্যে যোগ দেন নি নাহলে তাঁর চোখের তাচ্ছিল্যে আমার এই হুটোপুটি মাটি হয়ে যেত। যতই মাতামাতি করি না কেন বারবার চোখ চলে যাচ্ছে মেঘের ঘোমটা পরা ম্যাটারহর্ণ চূড়ার দিকে। তিনি নারাজ হয়ে দর্শন দিলেন না আমাদের। ভাবগতিক দেখে বেশ বুঝলাম আজ আর আশা নেই। ছেলের মনটা খারাপ… মা বাবাকে শৃঙ্গ দেখাতে পারল না। ওভারকোটের বরফ ঝাড়তে ঝাড়তে বললাম আরে কোই বাত নেহি। তুমি জান টাইগার হিল দেখতে কেউ কেউ নাকি ২৯বার চেষ্টা করেও দেখতে পায়নি। পাহাড়ের ঢালে স্কিয়ারদের দূরে হারিয়ে যাওয়া দেখতে কেমন নেশা লেগে যাচ্ছে। যে মনটা হারিয়ে যেতে ভয় পায়না সে যেন ওখানে ওদের সঙ্গে উড়ে বেড়াচ্ছে। কিন্তু দ্রুত সময় ফুরিয়ে আসছে আর আমাদের রিটার্ন জার্নির সময় হয়ে আসছে।
টার্নস্টাইলে টিকেট টাচ করিয়ে ট্রেন ধরতে এসে জানলাম বিশেষ কারণে এই ট্রেন দেরীতে আসবে। ট্র্যাকে কিছু এমারজেন্সি কাজ চলছে। বরফের গুঁড়ো উড়ছে জোরালো হাওয়ায়। বেশ কিছু ট্যুরিস্ট দাঁড়িয়ে আছেন আমাদের মত। জানিনা কতক্ষণ লাগবে…. মিনিট পনেরোর মধ্যে ট্রেন এল আমরা উঠে বসলাম…. গরম কামরায়। তবে বিকেল চারটে পনেরোর ট্রেন ছাড়ল পাঁচটা কুড়িতে। অবশেষে ফিরে এলাম জারম্যাট।