হৈচৈ ধারাবাহিক ভ্রমণ কাহিনী তে ঈশানী রায়চৌধুরী (পর্ব – ১৬)

চললুম ইউরোপ

ক্রিসমাস ইভ এনজয় করে আমরা আবার ইন্টারলেকেন ওয়েস্টে ফিরলাম রাত প্রায় দশটা। দোকানপাট সব বন্ধ হয়ে গেছে। এইরে এবার খাব কোথায় আমরা! পেটে তো ইঁদুরের ঘোড়দৌড় চলছে। হঠাৎ মনে পড়ল একটা ইন্ডিয়ান রেস্তোরাঁ দেখেছিলাম না… ছেলেকে বললাম চল চান্স নেওয়া যাক। বোর্ডে লেখা আছে Litle Indian Namaste (Restaurant )।
ভেতরে লোকজন আছে। আমরা মাংস ভাত চাইলাম। গরমাগরম খেয়ে আবার সেলাম ঠুকলাম আমার ইন্ডিয়াকে। অতঃপর রাতে দারুণ ঘুম হল আর সকালে উঠে জানলার পর্দা সরাতেই আবার
দিগন্তজুড়ে সেই তুষারকিরীট। যা চোখে ধরল নিলাম, আর যা ধরল না তা ক‍্যামেরায় নেওয়ার চেষ্টা করতে লাগলাম। ব্রেকফাস্ট সেরে 25th December আমরা রওয়ানা দিলাম লাগেজ নিয়ে।
এলাম ইন্টারলেকেন ইস্ট (oost)। স্টেশনের লকারে মালপত্র রেখে বেরোলাম। হাঁটছি ইউথ হস্টেলের পাশ দিয়ে। রোদ ঝলমল দিন, ঝকঝকে নীল আকাশ। রাস্তার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সর্বাঙ্গে বরফের পোশাক পরা নয়নরঞ্জন পাহাড়। আমরা হাঁটতে হাঁটতে একটা ব্রীজ পেরিয়ে ঢুকলাম India Village. হ‍্যাঁ এই নামটাই লেখা আছে ওখানে। হীরের কুচির মত ঝকঝক করছে জল, এত স্বচ্ছ যে নিচের প্রত‍্যেকটা পাথর দেখা যাচ্ছে। এরা বলছে এটা খাঁড়ি, দুটো লেককে সংযুক্ত করেছে। ক‍্যানভাস জুড়ে আছেন তুষারমৌলি মহামহিম আল্পস। উজ্জ্বল নীল আকাশে মাথা রেখে রাজকীয় তাঁর ভঙ্গি। মনে হচ্ছিল এই মূহুর্ত যেন শেষ না হয় ! অনন্তকাল এই আনন্দে মিশে থাকি। তবু পথের নিয়মে চলতে চলতে যে জায়গায় পৌঁছালাম সেখানেও আবার চমক। আমাকে হতবাক করে দাঁড়িয়ে আছেন যশ চোপড়া। মানে তাঁর স্ট‍্যাচু। আমি যে খুব হিন্দী সিনেমার ভক্ত বা যশ চোপড়ার ফ‍্যান তা নই; তবে সুইতজারল‍্যান্ডে এসে নিজের দেশের একজনকে এত মান‍্যতা এমন সম্মান পেতে দেখে মুগ্ধ হয়ে গেলাম। প্রকৃতির এই অপার ঐশ্বর্যের মাঝে আমার প্রণাম রাখলাম জীবনেশ্বরের পায়ে।

আবার স্টেশনে ফেরত এলাম। পরবর্তী গন্তব‍্য লুজার্ণ (Luzern)।তবে একটা জিনিস বাকি ছিল…. ঝগড়া। সেটাও ষোলকলা পূর্ণ হল ফুডশপে এসে। বাবাই লকারে গেছে লাগেজ আনতে, এই সুযোগে আমরা একপ্রস্থ ঝালাই করে নিলাম। আম্পায়ার এসে বলে দিল শান্তি শান্তি ! ব‍্যস আবার গটগট করে ইন্টারলেকেন লুজার্ণ এক্সপ্রেস চড়লাম। চললাম লেক দেখতে দেখতে আবার উল্টোদিকে পাহাড়ে ঘুরপাক খেয়ে ফাইনালি লুজার্ণ। মধ‍্যযুগীয় স্থাপত‍্যের জন‍্য বিখ‍্যাত এই শহর। লেক লুজার্ণের বুকের কাছে ছোট্ট শহর, ব‍্যাস মাত্র ৩৭ কিলোমিটার। চারপাশে পাহারায় আছে মাথায় বরফের শিরস্ত্রাণ পরা পাহাড়। আমরা লেকের ওপর ব্রীজ দিয়ে হাঁটছি… লেকে অজস্র সিগাল আর সাদা আর কালো ছোট ছোট হাঁসের মত পাখি। পান্না সবুজ জলে এই সাদা কালো পাখিরা সৌন্দর্যে অন‍্য মাত্রা যোগ করেছে। ডানায় রোদ মেখে একটা সিগাল পাখা মুড়ে বসল ব্রীজের রেলিংয়ে। মুখোমুখি আমরা… তবে সে একটুও ভয় না পেয়ে আমাদের অভ‍্যর্থনা করল। অনেকক্ষণ সে আমাদের সঙ্গে…… ও কি খাবার চাইছে ? আমার কাছে ওকে খেতে দেওয়ার মত কিছুই নেই। মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল। আবার ফিরে এসে খেতে দেব তারও উপায় নেই। অগত‍্যা ব্রীজ থেকে নেমে আমরা ওল্ড টাউনে ঢুকলাম । আমাদের গাইড (আমার ছেলে) কিছুটা হাঁটিয়ে আমাদের যে জায়গায় নিয়ে এল সেখানে বিশাল এক চতুষ্কোণ চবুতরা । আর চারপাশের বাড়িগুলোর প্রত‍্যেকটার গায়ে অসাধারণ চিত্রকলা। অবাক হয়ে দেখলাম সব আশ্চর্য ছবি। মাঝখানে একটা পাথরের ফোয়ারার পাশে দাঁড়িয়ে
অনেক ছবি তুললাম। ঘন্টাখানেক কাটিয়ে সুটকেসের চাকায় ঘড়ঘড় শব্দ তুলে এসে বসলাম ক‍্যানালের পাশে। হাতে হাতে ধোঁয়া ওঠা কফি আর কেক। লেকের ওপারে তখন গীর্জার ঘন্টা বাজছে। ট্রামের মত বাসও এখানে দিব্বি ওভারহেড তারে ট্রলি লাগিয়ে দৌড়চ্ছে। প্রায় বিকেল হয়ে আসছে আমরা পায়ে পায়ে এসে দাঁড়ালাম চ‍্যাপেল ব্রীজে। ১৯৩৩ সালে তৈরী এই কঠের ব্রীজ আজও স্বমহিমায় ট‍্যুরিস্ট আকর্ষণ করে চলেছে।মাথায় ঢাকা দেওয়া এই আপাদমস্তক কাঠের ব্রীজ শুধু পদব্রজে চলা যাত্রীদের জন‍্য। ১৭০০ শতাব্দীর অনেকগুলো পেইনটিং আছে এই ব্রীজে। যদিও অনেকগুলো আজ কালের গর্ভে বিলীন।

Kepellbrucke হল ইউরোপের প্রাচীনতম কাঠের আচ্ছাদিত সেতু। চটপট স্টেশনে ফিরে লেগে পড়লাম রসদ সংগ্রহে কারণ আজ ক্রিসমাস তাই খাবার দোকানপাট বন্ধই থাকবে।ধনী দেশ তাই আমাদের মত উৎসবের দিনেও পশরা সাজিয়ে অপেক্ষা করে না। বছরের সেরা রোজগারপাতির আশায় আনন্দ না করতে পারার দুঃখ আমরা পুষিয়ে নিই। এদেশে আনন্দ সবার জন‍্যে। পরের ডেস্টিনেশন জুরিখ ( Zurich )। সুইতজারল‍্যান্ডের সবচেয়ে বড় শহর এই জুরিখ, হ্রদের উত্তর পশ্চিম প্রান্তে ছড়ানো। জুরিখ বিমানবন্দর আর রেলস্টেশন সুইতজারল‍্যান্ডের মধ‍্যে ব‍্যস্ততম। এই শহর দেশের অর্থনৈতিক রাজধানী , বলা হয় পৃথিবীর সবচেয়ে দামী শহর এই জুরিখ। বিলাসবহুল জীবনযাত্রা, পেইনটিং আর চকোলেট এশহরের ইউএসপি। আমরাও তাই পাশ কাটিয়ে চলে গেলাম পরের স্টেশন Wipkingen ।
স্টেশনের কাছেই Easy Hotel। আবার self check in…… বাবাই অসহায় মুখে দাঁড়িয়ে থাকা দুজন তরুণ তরুণি কেও হেল্প করল চেক ইন করতে। যেহেতু হোটেল কতৃপক্ষ অনুপস্থিত তাই জল আনতে বাইরে গেল ছেলে । সন্ধে তখন ছটা…. হেঁটে জুরিখ চলে গিয়ে আট লিটার জল নিয়ে ট্রেনে করে বাবাই হাজির। সত‍্যি তো সঙ্গে ওর বাবা-মা তাদের কোন অসুবিধা।


………নৈব নৈব চ।
ফ্রেশ হয়ে দিব্বি গল্প গুজব করতে লাগলাম। এই যে এত দেশ ঘোরা বেড়ানো এ সব কি বেশি দামী আমাদের কাছে? সবচেয়ে দামী ছেলের সান্নিধ‍্য। ও হাসলে, গল্প করলে আমি মুগ্ধ হয়ে চেয়ে থাকি। ভাগ‍্যিস কি কি বলছে জিগ‍্যেস করে না। এইরে ছেলের কথায় ঢুকে গেলে ভ্রমণকাহিনী তামাদি হয়ে যাবে ! তার চেয়ে বলি এরপর কি হল…. বেশ চলছিল হাসিঠাট্টা, কোলে শুয়ে মাথায় হাত বোলানো ইত‍্যাদি হঠাৎ বাবুমশায়ের মনে হল বড়দিনে বাবা মাকে শুধু শুকনো খাবার খেতে হবে! চট করে উঠে তিনি মোবাইলে দেখতে শুরু করলেন কাছাকাছি কোন দোকান খোলা আছে কিনা । কিমাশ্চর্যম! একশ’ মিটারের মধ‍্যে আছে ভারতীয় দোকান তাজ প‍্যালেস । রাত প্রায় দশটার সময় আমরা পায়ে হেঁটে পৌঁছে গেলাম তাজে।
বাকিটা বললে আরও অবাক হবেন হোটেলের মালিক ভারতীয় উপরন্তু বাঙালি । তিনি এবং তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে আলাপ এবং তৎক্ষনাৎ বন্ধুত্ব হয়ে গেল। বাঙালিদের বদনাম যতই থাক আল্পসের এই কোলের ভেতর বাঙালি দেখলে বিগলিত হয়ে যাব না এতখানি পাষাণ আমি নই। আর একটা মজার কথা না বলে পারছি না যে এখানে ১০ ইউরো দিয়ে একটা সিঙ্গাড়া খেয়েও মনখারাপ হল না। কারণ বাঙালি – ম‍্যাজিক! তানইলে ৮৫০ টাকা দিয়ে একটা সিঙ্গাড়া কিছুতেই হজম হত না। তবে ডিনার শেষে ফ্রী চা খাওয়ালেন ওনারা।
মধুরেণ সমাপয়েৎ !

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।