রম্য রচনায় ইন্দ্রানী ঘোষ

অচেনাকে ভয় কি আমার ওরে
দার্জিলিং এ ওলিয়েন্ডর দিদিমণির বেশ মন বসে গেল । উঁচু ক্লাসে ইংরেজি পড়ান, ছোটদের আঁকা শেখান, গান শেখান । মিশনরি ইস্কুলে আশপাশের গ্রাম থেকেও বহু ছেলেমেয়েরা এই ইস্কুলে পড়তে আসে । এমনি একটি ছোটদের দলের দ্বায়িত্বে তিনি ছিলেন । জনা দশেকের দল, সকাল থেকে তাদের লেখাপড়া, টিপিন খাওয়া, বাড়ী যাওয়া অবধি দিদিমণির দায়িত্ব । একদিন দেখেন দশজনের জায়গায় কুড়িটা বাচ্চা সেখানে রয়েছে । দিদিমণি খাতা খুলে দেখলেন সেখানে দশজনেরই নাম রয়েছে । দিদিমণি সেদিনের ক্লাস শেষ করে তাদের ডেকে নাম জিজ্ঞেস করলেন । তারা নিজেদের নাম বললে সূর্য শেরপা, দেও তামাং, শিবানী ভুটিয়া ইত্যাদি তাদের নাম । ছেলেমেয়েরা বলল ‘আমাদের নাম খাতায় থাকে না মিস, আমরা এমনি বাগানের রাস্তা দিয়ে চলে আসি’ ।
দিদিমণি অবাক হলেন তারপর মনে মনে বললেন ‘আহা ইস্কুলের মাইনে দিতে পারে না, তাই এদের এমনি আসতে দেয় ইস্কুল, খাতায় নাম তোলে না ।’ এরপর বেশ কিছুদিন কেটে গিয়েছে, দিদিমণি খেয়াল করলেন দশজনের দলটার কারুর কাছে রঙের বাক্স নেই । অন্য বাচ্চাদের থেকেও তাঁরা চাইছে না, খাতায় শুধু পেন্সিলের দাগ । দিদিমণি দু বাক্স রঙ বার করে তাদের দিলেন । তাঁরা মনের সুখে খাতায় আঁকা পাহাড়, জঙ্গল, সূর্য, পাকদণ্ডীতে রং ভরল । তারপর টিপিনে পাউরুটি, ডিমসেদ্ধ, দুধ কোকো খেয়ে বাড়ী গেল ।
বিকেলে দিদিমণি ফাদারের সঙ্গে দেখা করতে গেলে, ফাদার জিজ্ঞেস করলেন ছোটদের ক্লাশ কেমন চলছে । দিদিমণি বললেন ‘খুব ভালো, বাচ্চারা খুব মজা করে ছবি আঁকছে, গান গাইছে ।’
ফাদার বললেন : ‘হ্যাঁ ওলিয়েন্ডর মিস, এরা প্রকৃতির সন্তান, রঙ আর সুর এদের মজ্জাগত । একবার একটা দশজনের দল উপরে পাহাড়ী গ্রাম থেকে নীচে আসার সময় ধ্বসের মুখে পড়ে, সেদিন প্রচন্ড বৃষ্টি ছিল, বাচ্চাগুলো ইস্কুল আসতে বড় ভালবাসত । গরীব কুলি, শ্রমিকদের সন্তান, তারা যে কে কোথায়, কখন যাচ্ছে কেউ খবর রাখত না । এখানে এসে খেতেও পেত । পুরো দলটা ধ্বসে হারিয়ে যায় । ইস্কুলের রডোরেন্ড্রন গাছের নীচে বসে তারা ছবি আঁকত, গান শিখত । এই ঘটনার পর ওই রডোরেন্ড্রন গাছগুলোতে আর ফুল আসে না ।’
ওলিয়েন্ডর দিদিমণির শিরদাঁড়া দিয়ে ঠান্ডা স্রোত নেমে এল । তিনি চুপচাপ ফাদারের ঘর থেকে বেড়িয়ে এলেন । বাগানের রাস্তা দিয়ে নিজের কোয়ার্টারে ফিরতে ফিরতে দেখলেন রডোরেন্ড্রন গাছগুলো অজস্র কুঁড়িতে ভরে গিয়েছে আর তাতে বিকেলের সূর্যের রঙ লেগেছে ।