সাপ্তাহিক রম্য সাহিত্যে ইন্দ্রাণী ঘোষ (পর্ব – ১০)

টান

টান শব্দটার অনুসঙ্গ বৃহৎ । টান বলতে প্রাণের টান, টাকাপয়সার টান, পৃথিবীর টান, মাটির টান, সব টান নিয়ে শব্দকোষে বিরাট টানাটানি । সুখটান, টাকাপয়সার টান এসব তো মিটিয়ে ফেলা যায় । আসল চিন্তার বিষয় হল মনের টানের সাথে পৃথিবীর টানের এক অদ্ভূত মেলবন্ধন, এ এমন এক কুয়াশা যা পৃথিবীর সব পন্ডিতদের ভাবিয়েছে আর সেখানেই বুঝি এর সৌন্দর্য্য । এমনি টানের গল্পে মানুষের ঝুলি উপচে উঠেছে বারবার আর বিস্ময়ে সে থমকে ভেবেছে, কেন? উত্তর পায় নি ।

সেটা ছিল বর্ষাকাল । সে বছর আমি সবেমাত্র পিতৃহারা । আকাশ কালো করে এসেছে । ঘ্যানঘ্যানে বৃষ্টিও নেমেছে । দুপুরবেলা কি একটা কারনে আমি গোলপার্কের দিকে গেছি । দক্ষিন কলকাতার গোলপার্ক যারা দেখেছেন তাঁরা জানেন মৌচাকের সামনের ক্রসিংটাতে কি প্রচন্ড যানজট হয় । ফার্ন রোডের দিকটা থেকে গাড়ী বেরোয় আর সাদার্ন এভ্যিনুর দিক থেকে গাড়ী ঢুকতে থাকে । আমি মৌচাকের দিক থেকে রাস্তা পার হতে যাব, ঠিক মাঝরাস্তায় পৌছে পা দুটো মনে হল রাস্তায় গেঁথে গেল, এদিকে দুদিক থেকে গাড়ী আসছে, আকাশ আরও কালো করে এসেছে, আমি কিছুতেই নড়তে পারছি না । কয়েক সেকেন্ডের জন্য মনে হল ‘আমার মেয়েটা তো বড় হয় নি, এখনি আমায় কেন পৃথিবী ছাড়তে হবে?, ঠিক তখনি কেউ যেন আমায় সজোরে ধাক্কা দিল, আমি হুমড়ি খেয়ে সামনের ফুটপাথে মোমোওয়ালার সামনে গিয়ে পড়লাম । মোমোওয়ালা জিজ্ঞেস করলো ‘ কি হয়েছিল দিদি আপনি মাঝরাস্তায় দাঁড়িয়ে পড়লেন, তারপর এরকম ছুটে এলেন যে? নিন জল খান’ । কিছু উত্তর দিতে পারি নি । কেউ বিশ্বাস করত না যে পা দুটো গেঁথে গিয়েছিল আমার মাঝরাস্তায় । আমি বিশ্বাস করি বাবা টেনে সরিয়ে দিয়েছিল আমায় ।

আমার বড়মামার যৌবনে পুনার অভিজ্ঞতার কথা আগেও লিখেছি । বছর দুয়েক আগে বম্বের বাড়ীর সিড়িতে কে যেন তাঁকে সজোরে ধাক্কা দেয়, পিছনে তাকিয়ে কাউকে দেখতে পান নি । এই ঘটনার ঠিক এক বছর আগে তাঁর প্রাণপ্রিয় আপন ছোটভাই এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যান । বড়মামা বলেন ওই ধাক্কার সম্পর্কে তাঁর কোন সন্দেহই নেই ।

সম্প্রতি ভয়াবহ পথ দুর্ঘটনায় রাজস্থানে বেড়াতে গিয়ে, কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে চলে গেছে আমার নিজের পিসতুতো দিদি । পিসি সঙ্গে ছিলেন, তিনি দশদিন হাসপাতালে লড়াই করে মুক্তি পেয়েছেন এই জীবন থেকে । জামাইবাবু অক্ষত আছেন, আঁচড় শুধু তাঁর মনে রয়ে গেছে । দিদির পনেরো বছরের ছেলে পা ভেঙে বিছানায় তিন মাস থাকার পর এখন হাটছে । এই মা, মেয়ে কেউ কাউকে ছাড়া থাকতে পারত না, দুজনেই চলে গেল একসাথে ।
। রয়ে গেল ওদের দুজনেরই পরম আদরের ‘মোগ্লী’ । মোগ্লী বাবার সাথে সেদিন ডাক্তার দেখিয়ে ফিরছিল, ওর গাড়ীতে আবার ধাক্কা লেগেছিল । মোগ্লী এবার অক্ষত আছে । গাড়ীটার মারাত্মক ক্ষতি হয়েছে । কেন বারবার এই টানের মুখে ছেলেটাকে পড়তে হচ্ছে? কে ওকে বাঁচাচ্ছে? জানি না । মোগ্লী এখন ইস্কুল যাচ্ছে, জুলাই মাস থেকে ক্রিকেট মাঠে ফেরার কথা ভাবছে । খালি ভাবছি মোগ্লীর জীবনের টান বেশি হয় যেন ।

আরেকটা গল্প শুনেছিলাম প্রখ্যাত গায়িকা, টেলিভিসন ব্যাক্তিত্ব, শিল্পী পরমা ব্যানার্জির ফেসবুক লাইভ শোতে । ভদ্রমহিলা মুম্বইতে লোকাল ট্রেনে করে রেকোর্ডিং এ যাবেন, ফ্লাইওভারের উপর থেকে দেখতে পেলেন ট্রেন দাঁড়িয়ে আছে, কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ছেড়ে দেবে । উনি সিঁড়ি দিয়ে ছুটে নেমে শেষ কামরাতে উঠতে গেছেন, কামরাটি একেবারে ফাঁকা, জন মনিষ্যি নেই, কামরার দরজার কাছের হাতলটা সবে ধরেছেন, ট্রেন ছেড়ে দিয়েছে, উনি বুঝলেন তাঁর হাতটি হাতল থেকে পিছলে যাচ্ছে, ট্রেন স্পীড নিয়ে নিয়েছে, ঠিক তখনি এক বজ্রমুষ্ঠি তাঁকে টেনে নিয়ে কাম রার ভিতরের মেঝেতে সজোরে নিক্ষেপ করল । কিছুক্ষণের জন্য তিনি পুরো চোখে অন্ধকার দেখেন, তারপর চোখ খুলতে দেখেন তাঁর মুখের উপর ঝুঁকে আছেন এক বৃষস্কন্ধ, বিরাট মানুষ । তিনি নারীও নন, পুরুষও নন, কপালে বিশাল সিঁদুরের টিপ, কানে ঝোলা দুল । তিনি পরমার চোখেমুখে জলের ঝাপ্টা দেন, জল খেতেও দেন নিজের বোতল থেকে । ইতিমধ্যে পরের স্টেশন এসে পরে এবং মানুষটি নেমে যান । পরমা ছুটে ট্রেনের কামরা দরজায় আসেন, এবং মুখ বাড়িয়ে আর কাউকে দেখতে পান নি । একদিকে রেললাইন শুয়ে রয়েছে, আরেকদিকে মুম্বাইয়ের দুপুরবেলার প্ল্যাটফর্ম ধু ধু করছে । সেই বৃষস্কন্ধ মানুষ কোথাও নেই ।

এই ঘটনার ঘনঘটার মালা গাঁথতে গিয়ে একটা কথাই মনে হয়, থাকা না থাকার, পাওয়া আর না পাওয়ার, বোঝা না বোঝার, মাঝের রেখাটি এক রূপলী কুয়াশার রেখা, যাকে বোঝা যায় না । শুধু জীবন নামক আলোটিকে খুব ভালবাসতে হয় ।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।