সাপ্তাহিক রম্য সাহিত্যে ইন্দ্রাণী ঘোষ (পর্ব – ৬)

পলতে পাকানো সংবাদ

শ্রাবণের আজ শেষ। মাথার উপর স্বচ্ছ স্ফটিকের বাটিটা আজ বিকেলে ধুয়ে মুছে বেশ তকতকে। মা দুগগার সিংহ দেখলাম বেশ খানিক জিমনাস্টিক সেরে নিল। কেশরগুলো তাঁর রূপোলী বরফের মত চকচক করছে। মা লক্ষ্মীর প্যাঁচা বেশ গম্ভীর , এ সময় ঘুমের চটকা ভেঙ্গে গেলে তিনি বিরক্ত হন। তাই খানিকটা গা ঝাড়া দিয়ে পালকে মুখ গুঁজে ফেললেন। রাজহাঁস অবিশ্যি বেশ ডানা ছড়িয়ে, রোদ মেখে আকাশ সমুদ্দুরে সাঁতার কাটছেন। ময়ুর বাবু একবার এসেছিলেন। তা আকাশের রঙের সাথে তাঁর গলার রঙ এখনো মেলে নি বলে গুমোর দেখিয়ে চলে গেলেন। আর সূর্যি কে বলে গেলেন আরও খানিক সোনালী রঙ পেখমের জন্য লাগবে মর্ত্যে যাওয়ার আগে।
মা নেংটিশ্বরীর আজ দেখা পাওয়া যায় নি. শুনলাম মিটিং ছিল স্বর্গে. মা নেংটিশ্বরীর উপর দায়িত্ব পড়েছে মর্ত্যের ধান, পাটালি, চিনি, আটার হিসেব নেবার. মা দুগগার কড়া নজর তাঁর কোলের বাছার যত্ন আত্তির দিকে. ছেলের যত্ন ঠিকঠাক হবে তবে তো মা মর্ত্যে আসবেন সপরিবারে. আজকের মিটিং এ মা দুগগা দায়িত্ব দিয়েছেন বাবা ধেড়েশ্বরকে গনশাকে পিঠে করে নামানোর.
বাবা ধেড়েশ্বর আলাভোলা বটে, তবে মাথাটি তাঁর বরফের মত ঠান্ডা. গণেশ বাবাজী নামার সময় প্রচূর বায়নাবাটি করে থাকেন. অতবড় ভূড়ি সামলে নড়েচড়ে বসাই দায় তাঁর. অন্য ইদুরেরা মনে বিরক্ত হয়. খালি নড়াচড়া করে পিঠে বসে, তারপর এই লম্বা শুড় ডুবিয়ে জল খেয়ে নদীনালা সাফ করে দেন স্বর্গে ফেরার পথে, বরুনদেবকে এক্সট্রা ডিউটি দিয়ে ভাদ্রের শেষ, আশ্বিনের গোড়ায় নদীনালা ভরতে হয়. মুখে কেউ কিছু গণশাকে বলে না, তবে তেলাকুচো বনে এই নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়.
ধেড়েশ্বরের মাথাটি একেবারে ‘এ্যাস কুল এ্যাস কুকুম্বার’. গণেশ ঠাকুরকে পিঠে তোলা কি চাট্টিখানি কথা. তিনি মা দুগগার আদরের ছেলে, মা দুগগা তাঁকে নিজে হাতে খাইয়ে দেন. এই ভাদ্রের গরমে মর্ত্যে নামার আগে বাছার পেট যাতে ঠান্ডা থাকে তাই মা দুগগা তাঁকে পান্তা, খাইয়ে দেন পেট ভরে. আর পান্তা খেয়ে তো গণেশ ঠাকুরের চোখ খুলে থাকাই দায় হয়. নেংটিশ্বরীর বর ধেড়েশ্বর গনেশের ধুতিটুতি সামলে, পিঠে নিয়ে দুলকিচালে মর্ত্যে নামেন প্রতিবছর . সিদ্ধিদাতাকে পিঠে নিয়ে নামা কি কম সম্মানের কথা নাকি. তারপর মর্ত্যে এসে আরও বেশি পরিমানে মোদক, চাল, কলা, সিন্নির নৈবিদ্যি সাঁটিয়ে, ধেড়েশ্বরের পিঠে চেপে বসলে, তিনি বিনা বাক্যব্যায়ে গণেশকে তুলে দিয়ে আসেন মা দুগগার কোলের কাছে. মা দুগগার তেজ কি যে সে তেজ, কে পড়বে বাপু ওই তেজের মুখে, অন্য ইদুরেরা তাই দায়িত্ব নিতেই চায় না. গণশা গিয়ে যদি মায়ের কাছে নালিশ ঠোকে আর দেখতে হচ্ছে না. পরাণ নিয়ে টানাটানি হবে. ইঁদুরেরা আগে বাঁচবে তারপর তো চাকরি করবে.
গণেশ ঠাকুর আবার ভূঁড়িতে জ্ঞান ধারন করেন. ব্যাসদেবের স্টেনোগ্রাফার ছিলেন. ব্যাসের বাণী লিপিবদ্ধ করা আর কারুর কম্ম ছিল না. ব্যাসের মুখনি:সৃত বাণী লিপিবদ্ধ করেছিলেন বলেই না মহাকাব্যের জন্ম হয়েছিল. ধেড়েশ্বর গণেশকে তাই বিশেষ শ্রদ্ধাভক্তি করে থাকেন.
কলাবৌয়ের ব্যাপার আলাদা তিনি নেংটিশ্বরীর বেস্ট ফ্রেন্ড. কাজেই তাঁকেও মিটিং এ থাকতেই হয়েছে. গণশার যাত্রা নিয়ে মা দুগগা ব্রিফিং দেবার পর, এই ইদুর সমাজের দেখভালের ব্যবস্থাপনায় কলা বৌ থাকেন. এতজনের মর্ত্যে আসা যাওয়ার একটা ধকল তো আছে, কাজেই তাদের চা, জলখাবার, বিশ্রাম ইত্যাদি কলাবৌয়ের দায়িত্ব. এবারেও করোনার দাপট আছে, কাজেই মাস্ক, স্যানিটাইজারের ব্যবস্থা রাখতে হয়েছে. গণশার তো আবার শুড়ে মাস্ক লাগানোর ব্যাপার আছে, কাজেই সেসবের ব্যাবস্থাও মা নেংটিশ্বরীর সাহায্য নিয়ে কলাবৌকেই করতে হবে. গণশা মর্ত্যে নেমে গেলে অবশ্যি কলাবৌ তেলাকুচো বনে নেংটিশ্বরীর বাড়িতে থাকবে. দুই সই মিলে অনেক গল্প করবে. মা দুগগা মডার্ন শাশুড়ি, ‘স্পেস’ ব্যাপারটি দিব্যি বোঝেন. তিনি যখন প্যান্ডালে আসবেন তখন তো কলা বোউ ঘোমটা মাথায় শাশুড়ি, ননদ, দেওর সবার সাথেই থাকবে, এখন না হয় থাকুক সইয়ের সাথে.
কলা বৌ আর গণশাকে মা দুগগা দুটো ভ্যাকশিনের ব্যবস্থা আগেই করে দিয়েছেন. বড় মেয়ে মা লক্ষীকে বলে নেংটিশ্বরীদের একাউন্টে এডভান্স দক্ষিণা পাঠিয়ে দিয়েছেন. ইদুরদের ভ্যাক্সিন আগেই হয়ে গেছে, নাহলে তাঁরা স্বর্গে যাতায়াত করবে কি করে. দুটো ভ্যাকশিনের কাগজ স্বর্গের গেটে দেখালে তবে তো এন্ট্রি পাবে তাঁরা, আর স্বর্গে না এলে বছরভর দানাপানি ব্যবস্থাই বা হয় কি করে.
এইসব নিয়েই আপাতত ইঁদুর সমাজে পুজোর পলতে পাকানো চলছে.
ঢং করে ঘড়িতে ঘণ্টা পড়ল। পশম পশম ঘুম পালাল জানলা দিয়ে। সূর্যি মামা ফিচেল হাসি হেসে বাটি ভর্তি নরম নরম আলো উপুড় করতে শুরু করলেন এ শহরের পাড়ায় পাড়ায় বাড়ী গুলোর ছাদের আলসে ছুঁয়ে, চিলেকোঠার ছাদের উপরিভাগে।
ঠিক তখনি একটা বউ কথা কও আর একদল ছাতারে উড়ে গেল সূর্যের দিকে।।
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।