আশলানের গল্প বলতে গিয়ে আরশির আরেকটু কাছ ঘেষে বসে ঝোরা. খুলে বসে গল্পের ঝাঁপি. ‘আশলানের পিঠে বসে আমি ঘুরে বেড়াতাম জান, আশলান যখন আসত, ক্রিসমাস আসত নাহলে আমার পৃথিবীতে শুধুই শীত. বরফের বিশ্রী লাবণ্যহীনতা. গাছের পাতা প্রাণহীন, পাখীরা উড়ে চলে গেছে উষ্ণ দেশে. আমার ঘরে যথেষ্ট খাবার, দাবার, পানীয় মজুত, কাঠের পরিমান ফায়ার প্লেসের জন্য পর্যাপ্ত থাকত. তবু আমি আশলানের আসার আগেই সেদিন বনের পথে একা বেড়িয়েছিলাম. আশলান পছন্দ করত না, আমি একা পথ চলি. কিন্তু আমায় খালি রহস্য টানত. বনের পথে অজানা রহস্য. সেদিন সাহস করে ওভারকোট, দস্তানা সব চাপিয়ে একাই বেড়িয়ে পড়েছিলাম. প্রথমেই এক জোড়া খরগোশের সাথে দেখা. কোথা থেকে যেন গাজর জোগার করেছে. আমাকে দেখে ভীষন ব্যাস্ততা দেখিয়ে দুই লম্ফ দিয়ে কাছে চলে এল. লাল পুঁতির মত চোখ মেলে বললে তাঁরা ‘এই যে এ পথে একা কেন? পথ চেনা আছে কি?’ আমি বললেম, ‘চিনে নেব’. তাঁরা বললে ‘তবেই হয়েছে উনি চিনে নেবেন পথ, কোনদিন নিজের খাবার নিজে খুঁজেছ? ‘. এই বলে হন্তদন্ত হয়ে গাজর নিয়ে তাঁরা হাঁটা দিলে. আমি তো অবাক, ‘খাবার তো ঘরেই থাকে, খেয়ে নিলেই হল. বলে কি এরা, আর এত মেজাজ দেখানোরই বা কি আছে বাপু? পকেটে হাত ঢুকিয়ে আবার হাঁটা শুরু করি. খরগোশদের উপর বেশ রাগই হল. কতক্ষণ হেটেছিলাম কে জানে. হঠাৎ দেখলাম একটা পাহাড়ী নদী, তাতে কেমন করে যেন জলটা বরফ হয় নি. কুলকুল করে দিব্যি বয়ে চলেছে. জলে প্রচূর রঙীন মাছ. হাতের দস্তানা, পায়ের মোজা খুলে পা ডুবিয়ে বসে পড়ি. ওমনি মাছগুলো মারমেড হয়ে যায়. তাদের ল্যাজে রামধনুর রঙ, গলায় সাত সুরের ঝিলমিল জলতরঙ্গ. তাঁরা জল থেকে উঠে গাছে উঠে পড়লে, তারপরে সেই বরফশুদ্ধু ডাল ভেঙে, এ গাছ ও গাছ লম্ফঝম্ফ করে সে কি কান্ডটাই বাঁধালে. আমাকে বললে তাঁরা ‘আসবি নাকি?’ আমি তো এককথায় রাজি.
ওদের সঙ্গে খেলতে খেলতে এসে পড়লাম একটা ফাঁকা মাঠে. সেখানে দেখি দুটো শজারু তুমুল মারামারি লাগিয়েছে. পিঠের কাঁটা ঝমঝম করছে. চোখগুলো ভাঁটার মত জ্বলছে. মারামারি করতে করতে দুজনে রক্তাক্ত হচ্ছে. আমায় দেখে একটা শজারু কেমন ভ্যেবলে গিয়ে তাকিয়ে রইল আর সেই সুযোগে অন্য সজারুটা সামনে পড়ে থাকা শাখ আলুর বোঝা নিয়ে দে ছুট.এইবার অন্য শজারুটা আমার দিকে ভীষণ রেগে তেড়ে এল কাঁটা বাগিয়ে. মারমেডরা ছুটে এল. শজারুটা হিসহিস করে বলে উঠলে ‘ইস, আবার বন্ধুত্ব করা হয়েছে, জানা আছে কে কত বন্ধু, আমি জানি কোন বেরী কোথায় ফলে, চাপড়া ঘাসের জমির আড়ালে কেমন করে ডিম লুকিয়ে রাখে চখাচখি, রোদ্দুর দিয়ে কাঁটাতে কেমন করে জড়ি বুনতে হয়.’ মারমেডরা বললে ‘হ্যাঁ বেরী খঁুজতে আমরাও জানি, বেরী যদি শেয়ার না করলে তাহলে আর কিসের বন্ধু হলে, এই জন্য তোমার ঝগড়া সবার সাথে. আমরা দেখো না কেমন ক্ষিদে পেলে খাই, ঘুম পেলে ঘুমোই, আর ছবি দেখি নদীর ঢেউয়ে, ঢেউয়ে. এই না বলে আমাকে হাত ধরে নিয়ে তাঁরা দিলে ছূট, গাছের ডাল ভেঙে, নদী পেরিয়ে, আবার সেই জায়গায় এসে ফেললে যেখানে সেই নদী বরফ হয়ে যায় নি. এমন সময় টুং টাং ঘন্টা কানে এল. রেন ডিয়ারের গলার ঘন্টা, তার মানে আসলান আসছে. আমি মারমেডদের বললাম ‘আসলান যদি জানে আমি একা বেড়িয়েছি, তাহলে খুব রেগে যাবে. মারমেডরা বললে ‘ ও এই ব্যাপার, চল তোমায় পৌঁছে দিয়ে আসি. ‘ মারমেডরা আমায় পিঠে করে পৌঁছে দিলে বাড়িতে. আশলান এল, তাঁর বিশাল কেশোর নিয়ে, সঙ্গে ক্রিশমাস বুড়ো. বুড়োর ঝোলায় প্রচুর উপহার. মারমেডদের সাথে বসে ক্রিশমাসের কেক কাঁটা হল. রোস্টেড মাংস, পুডিং, কাষ্টার্ড, আলু পোড়া, আরো কত কি. টেবিলে বসে খাওয়া হল, গান হল. আশলানের যাবার সময় হল,আমার ভাড়ার পরিপূর্ণ করে, সে আবার বেড়িয়ে পড়ল পথে. আশলানের অনেক কাজ, এক জায়গায় থাকলে তাঁর চলে না, সে যে বনের রাজা, বিশাল সিংহ. সেই ক্রিশমাসের পরেই যখন বরফ গলে গেল, রোদ্দুর থই, থই চারিদিক, আমি লুকিয়ে শজারুদের ডেরায় গেছিলাম, তখন আমি একা বনের পথে চলতে শিখে গেছি, ইচ্ছে ছিল দেখার কেমন করে শজারুরা নিজেদের কাঁটাতে রোদ্দুর বোনে. আশলান আমায় বারণ করেছিল শজারুদের ডেরায় যেতে. আমি তাও গেছিলাম, রোদের জড়ি বোনা আমার দেখার শখ ছিল. আবার তেড়ে এল সেই শজারুটা. ভাবল আমি রোদ্দুর চুরি করতে গেছি. আমিও তখন বনের পথের অলিগলি চিনে গেছি. আর ফিরে তাকাই নি. ফেরার পথে বাড়ির কাছে এসে দেখলাম আশলান দাঁড়িয়ে আছে, আমাকে দেখে গর্জন করে বললে ‘পথ চেনা হল তাহলে’. আমি কিছু উত্তর দি নি. সেদিনের পর থেকে অনেকদিন আশলানকে দেখি নি. তবে জানি সে আছে. বিপদে পড়লে সেই বাঁচাবে. পথ বাতলাবে.
গল্প বলতে বলতে ঘুমিয়ে পড়ে ঝোরা. জ্যোৎস্না রূপোর, জুতো পায়ে বাগানে ঘুরে বেড়াচ্ছিল. বাগান ছেড়ে জানলা দিয়ে উঁকি মেরে দেখে যায় ঝোরাকে. স্বচ্ছতোয়াকে পথ চেনার গল্প শুনিয়ে, অঘোরে ঘুমোচ্ছে ঝোরা.