T3 || আমার উমা || বিশেষ সংখ্যায় ইন্দ্রাণী ঘোষ

 প্রজ্ঞার ডায়েরী 

জানুয়ারী ১, ২০২৩ ।

আমি প্রজ্ঞা । এন্থথ্রপোলজী নিয়ে কাজ করি । আমি বাবা, মায়ের একমাত্র সন্তান । সম্পূর্ণ স্বাধীনতা পেয়ে বড় হয়েছি । বিয়ে থা করি নি । কেউ জোর করে নি । সম্প্রতি কাম্বোডিয়ায় সাঁওতালদের নিয়ে একটা পেপার পড়ে এসে কিঞ্চিত নামডাক হয়েছে । ভবিষ্যৎ দিনে হয়ত আমেরিকা যাওয়ার স্বপ্নটা এবং কিছুদিন সেখানে গিয়ে কাজ করার স্বপ্নটাও ফলে যাবে । এখনো কিছু পেপারওয়ার্কে এম্ব্যাসি ঝোলাচ্ছে । আমরা চার বন্ধু । আমি, সোহিনী, শ্রীময়ী, সমৃদ্ধা । আমরা স্কুলের বন্ধু । সবার কথা বলব ।

জানুয়ারী ৪,২০২৩ ।

মায়ের আঁচলের নীচে বড় হওয়া মেয়ে সোহিনী। কবে যে বাবার বাড়ী ছেড়ে মামার বাড়ীতে ঠাই পেয়েছিল মনে পরে না তাঁর। দাদু দিদার কাছে মাথা গোঁজার আস্তানাটুকু পেয়েছিল ওঁরা। বাপের বাড়ীতে অপরাধী হয়ে থাকত সোহিনীর মা নীপবিথি। সকাল থেকে সন্ধ্যে অবধি হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে ,সকলের জন্য রান্না করে গানের টিউসুনিতে বেরতেন নীপবিথি। গান শিখিয়ে ফেরার পথে দু চার ঘর কাসটমারের কাছে বাকিতে বিক্রি করা শাড়ীর দাম আদায় করে বাড়ী ফিরতেন। বাড়ী এসে একান্নবর্তী পরিবারের সকলকে খেতে দিয়ে , সব ঘরে বিছানার ব্যাবস্থা দেখেশুনে, জলের গেলাসের ঢাকা দিয়ে রাত ১২ টার পর মেয়েকে নিয়ে খেতে বসতেন নীপবিথি। মা না খাইয়ে দিলে খেতে পারত না সোহিনী। কলেজ যাওয়ার দিনগুলোতে অবধি মা খাইয়ে দিয়েছেন।
দিন যায়, নীপবীথি বিয়ে ঠিক করেন মেয়ের। হাড়ভাঙা খাটুনির উপার্জনের সামান্য পুঁজি জমিয়ে বিয়ে দেন সোহিনীর। পাত্র বহুজাতিক সংস্থায় কর্মরত। ছিমছাম সংসার। ঝলমলে বিয়ে হয়ে গেল সোহিনীর।
সকলের কপালে বুঝি সুখ সয় না। বিয়ের কদিন বাদে বোঝা গেল সোহনীর স্বামীর উগ্র চণ্ডালের রাগ। সামান্য ভুল ত্রুটিতে চরম শাস্তি দেয় তাঁকে। পালিয়ে আসে সোহিনী । মায়ের মতই আবার সেই দাদুর বাড়ীতে স্থান হয় তাঁর।
বাড়ীতে বসেই চকলেট বানাতে শুরু করে সে। দু চারটে কনফেক্সনারির দোকান তাঁর বানানো চকলেট রাখে।। কলেজে পড়াকালীন ট্রেনিং নিয়েছিল বেকারির জিনিস বানানোর। চকলেটে কখনো ভ্যানিলার গন্ধ ভরে, কখনো কফির গন্ধ, কখনো কেরালার চা বাগানের গন্ধ। এমন একটা গন্ধ খোঁজে সোহিনী যাতে স্বপ্নের গন্ধ আছে। বহু খুঁজেও পায় না সে গন্ধ।

জানুয়ারী ১০,
শ্রীময়ী।
কালো, শ্রীহীন, উটকপালি, মুখভর্তি ব্রণর দাগ। জন্ম থেকেই বাড়ীর সকলের দু চক্ষের বিষ। তাঁর আগের জ্যাঠতুুতো দিদি ফর্সা,পরমা সুন্দরী, লেখাপড়ায় ভালো। তারপরে এক ভাই জন্মাল শ্রীময়ীর মায়ের কোলে। মায়ের গৌরব তবু কিছু বৃদ্ধি পেল। বংশে ছেলে দিয়েছেন। যাই হোক সব সন্তান বাবা , মায়ের কাছে সুন্দর তাই বাবা সাধ করে মেয়ের ইশকুলে ভর্তির সময় নাম রাখল ‘শ্রীময়ী’। এর মধ্যে একান্নবর্তী পরিবার ভিন্ন হল। তবু কিছুটা স্বস্তি এলো শ্রীময়ীদের চারজনের সংসারে। সারাক্ষন ফর্সা জ্যাঠতুতো দিদির সাথে তুলনা বন্ধ হল। শ্রীময়ীর বাবা অবশ্য বলেছিলেন ‘মেয়ে আমার পড়বে, শিক্ষাই হবে তাঁর রূপ”। পড়াশোনায় ভালো ছিল না শ্রী। তবু ঘষে মেজে ইশকুল ,কলেজের গণ্ডী পেরিয়ে ছবি আঁকা আঁকড়ে বড় হয়েছিল শ্রী। একমাত্র রঙ, তুলি নিয়ে ক্যানভাসের সামনে বসলে কুৎসিত হওয়ার দুঃখ ভুলে যায় শ্রী। পাস কোর্সে গ্রাজুয়েশন পাশ করার পর, পাড়ার ইশকুলে আঁকাটা ছাড়ে নি সে। বাবার অবসরের সময় সামনে। মেয়ের বিয়ের কথা ভাবলেই চোখে অন্ধকার দেখেন মা। বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেলেন একা একা। বাবাও একদিন চলে গেলেন এই জগত ছেড়ে।

জানুয়ারী ২০,
সমৃদ্ধা।
‘প্রেম এসেছিল নিঃশব্দ চরণে’। যেমন আসে সবার জীবনে কোন না কোন সময়। কাউকে ভাসিয়ে দেয় অকুল পাথারে, কারুর তীরে তরী ভেরে। সমৃদ্ধাকে প্রেম অকুলে ভাসিয়েছিল। না বোঝার বয়েসের অবুঝ প্রেম। ‘দ্ মার্চেন্ট অফ ভেনিসের’ পোরশিয়ার মত কাস্কেট ছিল না তাঁর। কোন ব্যাসানিও এসে ‘ লিডেন’ কাস্কেট বেঁছে নেয় নি। তাঁকে জিতে নেয় নি অন্তর দেখে। সে এমন এক দুর্বার, দুঃসহ প্রেম যা বসন্তের পলাশের মতই তীব্র, সমৃদ্ধার অবুঝ রক্তাক্ত অন্তরে জ্বালিয়েছিল লেলিহান শিখা। গ্রীষ্ম শেষে বর্ষা তখন শুরু হয়েছে। লাল মাটির দেশে রুরাল ডেভেলপমেন্টে কাজ করত সমৃদ্ধা। সেখানেই এক সাঁওতাল ছেলের সাথে এক প্রখর গ্রীষ্মে আলাপ তাঁর। আর সেই গ্রীষ্মের শেষে বন্যাতে ভেসে যায় গ্রামের পর গ্রাম। পাঁচিল চাপা পরে মারা যায় সাঁওতাল তাঁতি ছেলে ‘জিসান”।
পরে অবশ্য সমৃদ্ধা জেনেছিল জিসান মদ্যপ ছিল। ওঁর উপরওয়ালা দিদি বলেছিলেন সব জেনে “বাড়ী ফিরে যাও সমৃদ্ধা, জিসানের বাড়ীর লোকজন তোমার কথা জানতে পারলে মেরে ফেলবে তোমায়। আবার নতুন করে জীবন শুরু কর।’ একরত্তি লাবডুব জরায়ুতে বয়ে, প্রাণ নিয়ে একরাতের মধ্যে বাড়ী ফিরে এসেছিল সমৃদ্ধা। বাড়ীতে রাশভারী বাবা সব জানতে পেরে মাথায় হাত রেখেছিলেন” বলেছিলেন আমি থাকতে তোর কোন ভয় নেই’। একরাশ ভয়, আতঙ্কের কালো কালি তখন তাঁর সমস্ত অস্তিত্বে।
একফোঁটা কালো গোলাপের কুঁড়ির মত মেয়ে তাঁর কোল জুড়ে এল। বাপের বাড়ীতেই মা, ভাইয়ের সংসারে থেকে গেল সমৃদ্ধা। দিন গেল, সপ্তাহ পেরিয়ে বছর পেরিয়ে গেল। কুর্চি একটু একটু করে বড় হচ্ছে ।
শ্রীময়ী, সোহিনী,আর আমার প্রাণ কূর্চি ।

ফেব্রুয়ারী ১৫, সাওতালডিহি ।

আমরা চার বান্ধবী আর পুচকি কূর্চি বেড়াতে এসেছি । সাঁওতালডিহিতে । অফবিট জায়গা । আমার একটু কাজ আছে এখানে । একটা গেষ্টহাউসের ব্যবস্থা করেছি । প্রচুর সবুজ, মাঝে ছোট ছোট টিলার উপর সাঁওতাল গ্রাম । এক্টু দূরে নীল জলের সরোবর । গাছে গাছে পলাশ ধরেছে । রঙের মাতনে দিশেহারা প্রকৃতি । আজ সকালে পৌঁছে ,গেস্ট হাউসে স্নান সেরে , স্যান্ডউইচ , কফি প্যাক করে হাটতে বেড়িয়ে গেছিলাম কাছাকাছি । পুচকি কূর্চি দিব্যি তাল দিচ্ছিল আমাদের সাথে । কূর্চিকে আমারা পালা করে কোলে করেছি, বেশিরভাগ সময় সে দৌড়েছে । এক্টুবাদে সে ঘ্যান ঘ্যান শুরু করতে আমরা সামনের টিলাতে উঠে একটা অশত্থ গাছের সামনে শতরঞ্চি বিছিয়ে বসেছি । সোহিনী কূর্চিকে খাওয়াতে শুরু করল , আমাদের সমৃদ্ধা কফি ঢেলে দিল । শ্রীময়ী স্কেচ করতে শুরু করল ।
ঠিক তখনি যেন গাছের ভিতর থেকে বেড়িয়ে এল এক দীর্ঘকায় সাঁওতাল । কষ্টিপাথরের মত গায়ের রঙ । কাঁধ অবধি চুল । চোখগুলো যেন ভাঁটার মত । আমার রিসার্চ বলছে এই চেহারার সাঁওতালরা তিন , চার হাজার বছর আগে কাম্বোডিয়া থেকে মাইগ্রেট করে এ দেশে এসেছিল । পিছনে এক সাঁওতালনী ছিল । সে যেন আরেক ভাস্কর্য । পরনে শুধু একটা শাড়ী জড়ানো । মাথার খোঁপায় এক গোছা জবা ফুল । চোখমুখ কেউ যেন পরম যত্নে খোদাই করেছে । এক অপরূপা কৃষ্ণাঙ্গী মূর্তি । তাঁরা আসতেই কূর্চি তাদের কোলে ঝাঁপিয়ে চলে গেল । আমরা সটান উঠে দাঁড়ালাম । সেই যুগল কূর্চিকে কোলে করে একটা ঝুপ্সি গাছের দিকে চলতে শুরু করলে আমরাও তাদের পিছু পিছু চললাম । গাছের কাছে পৌঁছে পাতা দেওয়া একটা দরজা ঠেলে গাছের ভিতরে সবাই ঢুকলাম আমরা । গাছের কোটরের ভিতরে পরিপাটি ঘর । এককোনে একটা সিঁদুর লেপা পাথর । সামান্য একটা বিছানা পাতা আরেকদিকে। ঝকঝকে কয়েকটা বাসন রয়েছে । আমাদের তাঁরা জল দিল সঙ্গে আখের গুড় । তারপর ওই পাথরটার কাছ থেকে কয়েকটা কাঠের ছোট ছোট টুকরো নিয়ে আমাদের দিল। আমরা জল, গুড় খেয়ে কূর্চিকে কোলে নিয়ে সম্মোহিতের মত বেড়িয়ে এলাম ।

ফেব্রুয়ারী ১৮ ।
সাঁওতালডিহি ।
তিনদিন এখানে থেকে প্রচুর ভালোলাগা নিয়ে আমরা ফিরছি । আমাদের সেই সাঁওতাল দম্পতি যে কাঠের টুকরোগুলো দিয়েছিল তা আসলে সাঁওতালি ভাষায় ‘ভরসা চিহ্ন “ । কাঠের টুকরোর উপর কারুকাজ করা । আমি আরেকদিন ওই টিলার উপরে উঠে ঝুপ্সি গাছটাকে খুঁজেছিলাম ।পাই নি । সেই প্রকাণ্ড সাঁওতাল দম্পতিকে দেখতে পাই নি । আমি কাউকে কিছু জানাই নি । এতে আমার আগ্রহ আদিম জনজাতিকে নিয়ে আরো বেড়েছে ।
এপ্রিল ২৫ ।
বোস্টন ।
আমি আমেরিকাতে চলে এসেছি । কাজ শুরু করে দিয়েছি । এরমধ্যে অনেকিছু ঘটে গেছে । রোজ বন্ধুদের সাথে চ্যাটে জানতে পারি দারুন সব খবর । আমার বন্ধুরা বলে ওই সাঁওতাল দম্পতির দেওয়া ‘ভরসা চিহ্ন “ পাওয়ার পর সবার কপাল খুলে গেছে ।
প্রথমে বলি সোহিনীর কথা –
চকলেটের ফ্লেভার কিনে একদিন নিউ মার্কেট থেকে ফিরছে সোহিনী । কলকাতার মিনিবাসগুলোতে দমচাপা ভিড়। একজনকে দেখল, চোখ বন্ধ করে জোরে জোরে নিঃশ্বাস টানছে। ফিক করে হেসে ফেলে সোহিনী । মনে ভাবে ” একি রে বাবা পাগল নাকি’, এ ভাবে কেউ গন্ধ শোঁকে। সেই ছেলেটার কিন্তু তখনো চোখ বন্ধ। স্টপেজ এসে যাওয়াতে বুকের কাছে এসেন্সের শিশিগুলো আঁকড়ে নেমে পরে সোহিনী । বাসন্তী হাওয়া বিকেল বেলায় দাবদাহের শেষে সুগন্ধি কলন মেশানো আদর করছে এই শহরটাকে। চোখ বুজে নিঃশ্বাস নেয় সোহিনী । চোখ খুলে চমকে ওঠে সোহিনী । তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে একইভাবে নিঃশ্বাস নিচ্ছে সেই বাসের ছেলেটি। চোখ খুলে অপ্রস্তুত ছেলেটি হেসে ফেলে। হাসে। কতদিন বাদে প্রাণ খুলে হাসল দুজনেই।
ক্রমে আলাপ বেড়েছে। আলাপ থেকে বন্ধুত্বের তরী বেয়ে যাত্রা শুরু হয়েছে।
ছেলেটির নাম অনির্বাণ। সেও এক ঝড়ে ভাঙা তরী। হপ্তায় একদিন চকলেটের এসেন্স কিনতে যায় সোহিনী ।তখনি দেখা হয় তাদের। অনির্বাণের স্থায়ী চাকরী নেই। একটা ইশকুলের প্যারা টিচার, টিউসুনিও পড়ায়। মা বাবা নেই তাঁর। একার সংসার। লেখালিখির বাতিক আছে। বিয়ে একটা হয়েছিল তবে অনির্বাণের উচ্চাকাঙ্ক্ষার অভাবের জন্য সে বিয়ে ভেঙে গেছে।
আজও ওঁরা নিউ মার্কেট থেকে ফিরছিল। ফেরার পথে অনেকদিন পর কলকাতায় কালবৈশাখী এলো। চকলেটের এসেন্সগুলোকে ঝোলায় চালান করল সোহিনী । অনির্বাণ কাছে সরে এসে বলল “আরেকবার স্বপ্ন দেখবি সোহিনী?”, চকলেটে ভেজা মাটির গন্ধ ভরা যায় না। তাঁর চেয়ে চল দুজনে মিলে ভেজা মাটির গন্ধ খুঁজি।
সে খোঁজার কোন পরিণতি নাই বা হল। খুঁজতে ক্ষতি কি?
কেঁদে ফেলেছে সোহিনী । উপুড় ঝুপুর বৃষ্টি শুরু হয়েছিল তখনি।
কাল বলল গ্রুপ চ্যাটে ।
আর আমি বাজেরকমভাবে আমার বুড়ো শহরটাকে মিস করতে থাকলাম ।

মে ৩১ ।
বষ্টন ।

শ্রীময়ীর কথা –

অর্জুন, সরকারি চাকুরে বাবা মায়ের একমাত্র সন্তান। নামটি তৃতীয় পাণ্ডবের নামে, তবে তাঁর মত তুখোড় নন এই গল্পের অর্জুন। মা তাঁর কুন্তীর মত বিদুষী নন। অর্জুন মাছ খাবে না গলায় কাঁটা ফুটবে। সমুদ্রে বেড়াতে গিয়ে জলে ডুবে যেতে পারে তাই নামবে না জলে। এরম আরও কত কি। এই করে তুলোয় মোড়া শিশুটি রয়ে গেল অর্জুন।উচ্চমাধ্যমিকের গণ্ডী পেরল না। ভয়ে কুঁকড়ে রইল অর্জুন। মায়ের মমতার পিছল পথে মুখ থুবড়ে পড়ল অর্জুন। কালে দিনে মা বাবা গত হলেন।
কিছু সহৃদয় আত্মীয়রা মিলে ঠিক করলেন অর্জুনের বিয়ে দিতে হবে। বাবা মায়ের রেখে যাওয়া সম্পত্তিতে চলে যাবে অর্জুনের সারাজীবন, কিন্তু তা গুছিয়ে সামলিয়ে রাখার তো লোক চাই। শুরু হল পাত্রী খোঁজা। খোঁজ মিলেছে শ্রীময়ীর, পাড়ার আঁকার শিক্ষিকার মাধ্যমে। আঁকার দিদি বললেন ‘যেমন করে ক্যানভাসে রঙ দিস, পারবি না মা অর্জুনের জীবনে রঙ আনতে?’ ঘাবড়ে গেছিল শ্রীময়ী। মা হাতে চাঁদ পান এমন প্রস্তাব পেয়ে। মা কে নির্ভার করতেই বিয়েতে রাজি হয়ে গেছে শ্রীময়ী। বিয়ে হয়ে গেছে অর্জুন আর শ্রীময়ীর।
ছবি আঁকাতে কোন আপত্তি নেই শ্বশুরবাড়ীর লোকের। মনের আনন্দে ছবি আঁকে আর সংসার করে শ্রীময়ী। মা ভাইয়ের দেখাশোনাও করে। সপ্তাহে দুদিন আঁকার ইশকুলে আসে, ছোটদের আঁকা শেখায়। আঁকার টিউসুনিও করে। অর্জুন ওঁর আঁকার সরঞ্জাম নিয়ে যায়। শ্বশুরবাড়ির আত্মীয়রা চোখে হারায় শ্রীময়ীকে। সবাই বলে ‘বড় ভালো মেয়ে শ্রীময়ী’।
অর্জুন আর কুঁকড়ে নেই, সোজা হয়ে দাঁড়াতে শিখে গেছে।
শ্রীময়ীর কালো বসে যাওয়া গালে অল্প রক্তিম আভা লেগেছে যেন। ছবি দেখেই বুঝলাম ।

আগষ্ট ১ ।
বষ্টন ।

কূর্চির ইশকুল যাওয়ার পালা এবার। রোজগারও দেখতে হবে সমৃদ্ধাকে। এই একফোঁটা মেয়েকে সারাদিনের জন্য ফেলে রাতে ফিরলে মা রাগ করেন। চিন্তায়, ভাবনায় অস্থির হচ্ছিল সমৃদ্ধা। কেমন করে পার করবে জীবন বৈতরণী। মেয়েকে বাপের বাড়ীর ভরসাতেই ইশকুলে ভর্তি করেছে সমৃদ্ধা। সেই মিশনারি ঈশকুলের ফাদার কুর্চির ভর্তির সময় বাবার নাম জানতে চান, সব খুলে বলে সমৃদ্ধা। ফাদারের পরামর্শে টিচার্স ট্রেনিং কোর্স করছে সমৃদ্ধা। মেয়ের ইস্কুলেই পড়ানোর চাকরী জুটে গেছে তাঁর। বাঁচতে শুরু করেছে সে।
অনেকেই বলছে আবার বিয়ে করতে। সমৃদ্ধার চেহারায় একটা আভিজাত্যের ছাপ বর্তমান। কাঁচা সোনার মত গায়ের রঙ, লম্বা, দোহারা চেহারা, পীঠ ছাপানো এক ঢাল কোঁচকান চুল। অনেক রূপমুগ্ধ ভ্রমরের আনাগোনা হয়। জীবনে ভালবাসার অভিঘাত যাকে সমৃদ্ধ করেছে, তাঁর ফিরে তাকাতে ইচ্ছে করে না। তবু প্রেম আসে আবার নিঃশব্দ চরণে। বৈচিত্র্যহীন পথে রঙ লাগে। লাল শিমূলের অহংকারী রক্তিম আভা লাগে সমৃদ্ধার গালে। মরুভূমিতে দোলা দিয়ে যায় দখিণা পবন।ইতিউতি উড়তে থাকে শুকনো পাতা।আবার যেন নীল মনে হয় আকাশটাকে। কুর্চিকে বুকে চেপে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে সে। অবিরাম ঢেউ ওঠে সমুদ্রে। পায়ের কাছে ভেসে আসে রঙিন ঝিনুক। মুঠো ভরে ঝিনুক তুলে আবার জলে ভাসিয়ে দেয় সমৃদ্ধা। নাহ রঙ থাক রঙের জায়গায়। যদি কখনো তাঁর ক্যাকটাসে ফুল ধরে সেই ফুলেই পূজা সারবে সে একদিন। নাই বা হল তা পলাশের রক্তিম প্রেমের অহমিকা।

অক্টোবর ৬ ।

বোষ্টন ।
আমি ফল ব্রেকে দেশে ফিরছি । আমার কাজ অনেকটা এগিয়েছে । কাম্বোডিয়ার সাঁওতালদের সত্যি ‘ভরসা চিহ্ন’ বলে একটা ট্যাটু গোছের জিনিষ ছিল , আমার রিসার্চ বলছে । তবে তিন, চার হাজার বছর পর সাঁওতালডিহির টিলার উপর কারা আমাদের দেখা দিয়েছিল এবং কেন আমাদের ‘ভরসা চিহ্ন’ উপহার দিয়েছিল সেসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে যাই নি । এখন যদিও মাঝে মাঝে মনে হয় ওই সাঁওতাল দম্পতি কি কুর্চির পূর্বসুরিরা কেউ ? কুর্চির শিরায় তো সাঁওতাল রক্ত বইছে । তাঁরা কি কুর্চিকে দেখতে এসেছিলেন ? বলি নি কাউকে এ কথা ।
আমাদের সবার স্বপ্নপুরণ হয়েছে এই যথেষ্ট । আমার সঙ্গে মার্ক যাচ্ছে এবার কলকাতা । ও প্রথমবার কলকাতা আসবে । আমি আর মার্ক বিয়ে পরে করতেও পারি, নাও করতে পারি । মার্ক একজন প্রকৃতিবিদ । আমাদের প্লেন কলকাতার ছোঁবে আরেকটু পরে । আমি কাশফুল দেখতে পাচ্ছি নদীর ধারে । পুজো এবার দেখতে পাব কলকাতায়।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।