রম্য রচনায় ইন্দ্রানী ঘোষ

অচেনা কে ভয় কি আমার ওরে । (সিরিজ ২)
মহাপ্রস্থানের পথে পাণ্ডবদের পথ দেখিয়েছিল এক সারমেয় । মানুষের সাথে এই সারমেয়দের প্রেম আদি, অনন্তকাল ধরে । প্রভুভক্তি এদের বিশেষ উল্লেখ্য । শুনেছি সারমেয় এবং অশ্ব এই দুই জীবের মানুষের সাথে জন্ম জন্মান্তরের বন্ধন । হবে নাই বা কেন আনুগত্য এবং গতি এই দুই গুণের প্রতি মানুষের অনুরাগ তো অনস্বীকার্য ।
তা সে যাই হোক এক সময়কার কথা যখন কলকাতায় এত ফ্লাইওভার, মল, আকাশঝাড়ু বাড়ী, গাদা গাদা গাড়ীর প্যান্ডেমোনিয়াম ছিল না তখন গড়িয়াহাট দিয়ে হেলেদুলে ট্রাম চলত, সকাল বেলা ভিস্তিরা রাস্তা ধুতো, ল্যাম্প পোস্টে টাঙান সুন্দর কাঁচের বাক্সের ভিতরে গ্যাসবাতিগুলো আস্তে আস্তে নিভতে শুরু করত, কুয়াসার চাদর একটু একটু করে পাতলা ফিনফিনে সরের মত ছিঁড়ে যেত ।
এখন যেই বাড়ীটা ফ্যাব ইন্ডিয়া ওই বিশাল প্রাসাদের মত বাড়ীটা ছিল ভাষাবিদ সুনীতি কুমার চাটুজ্যে মশাইয়ের বাড়ী । তার আগে কোনাকুনি নরেন্দ্রনাথ দেব, রাধারানী দেব, নবনীতা দেবসেনদের ভালবাসা বাড়ী । এই পাড়াতেই থাকতেন বুদ্ধদেব বসু । আর এই বাড়ীগুলোর মাঝে ছিল সবুজ গালিচা বিছানো মাঠ । অনেক দূরে সরু ফিতের মত ছাই রঙা পিচের রাস্তাটা পরে থাকত । ওই রাস্তা দিয়ে প্রতিদিন ভোরবেলা এক সোনালি চুলের মেমসাহেব তাঁর বিশাল এক বাছুরের মত কুকুরকে নিয়ে আসতেন । সেই সারমেয়টির নাম ছিল ‘ক্লাউডি’ । তাঁর গায়ের রঙ মেঘের মত কালো, চোখদুটো যেন আগুনের ভাটার মত জ্বলছে । তা তাঁরা খেলতে আসতেন, ঘুরতেন, ফিরতেন চলে যেতেন । দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর শোনা যায় তাদের আর দেখা যায় নি ।
এরপরেও অনেক বছর কেটে গিয়েছে । এক দিদিমণি ভোরবেলা ওই পাড়া দিয়ে ইস্কুল যান রোজ । তিনি যখন ইস্কুলে বেরোন তখন পাড়াতে চায়ের দোকানগুলোতে সবে উনুনে আঁচ পড়ে । দিদিমণি ইস্কুল যাবার সময় দেখেন সব সারমেয়রা গুটিশুটি মেরে ওই উনুনের আঁচের কাছে শুয়ে থাকে । একদিন দিদিমণি দেখেন চায়ের দোকান আর কিংবদন্তী পাঞ্জাবীর দোকানের সামনের রাস্তায় পথ জুড়ে দাঁড়িয়ে আছে এক মেঘের মত কালো রঙের সারমেয়, চোখ দুটো তাঁর আগুনের গোলার মত । দেখে তো সেই দিদিমণির পা আর নড়ছে না, তিনি পিছু হটতে থাকলেন আর তখনি চায়ের দোকানে যেই বৌটি জল তুলে নিয়ে দেয় তাঁর সাথে লাগল ধাক্কা । দিদিমণির ধরে প্রাণ এল । বৌটি গম্ভীর মুখ করে বলল ‘বস দিদি, এই বেঞ্চিতে বস, ও মেঘ, ও গরীব, দু:খীদের পাহারা দেয়, চলে যাবে ।’ একটু বাদেই এক সোনালি চুলের মেম এল । চায়ের দোকানে তখন উনুন ধরে গেছে । বৌটি পরম যত্ন করে মেমের জন্য চা করে দিল, দিদিমণিকেও দিল । মেমসাহেব নিজের পকেট থেকে কন্ডেন্সড মিল্ক বার করে চায়ে ঢেলে নিলেন । দিদিমণিকে বললেন ‘সুইটহার্ট হ্যাভ সাম’ বলে খানিকটা দিদিমণির ভাঁড়েও দিলেন । দিদিমণি দেখলেন ক্লাউডি তখন মেমসাহেব আর দিদিমণির মাঝখানে এসে বসেছে তাঁর ভেলভেটের মত কোটটা দিদিমণির পায়ে লাগছে । দিদিমণি কাঠ হলেন ভয়ে । মেম বললেন ‘ডোন্ট বি আফ্রেড সুইটহার্ট ।’ বলে পকেট থেকে কেক বার করে ক্লাউডিকে খাওয়ালেন । তারপর ক্লাউডিকে নিয়ে ধীরে ধীরে উঠে চলে গেলেন । দিদিমণি ঘড়ি দেখলেন, তখন ভোর সাড়ে ছটা । এবার না উঠলে তো ইস্কুলের নির্ঘাত লেট হবে
। তিনি ভাবলেন মেমের আর নিজের চায়ের পয়সা মিটিয়ে এবার হাটা লাগাবেন, পয়সা দিতে গিয়ে দেখেন চায়ের দোকানটা স্রেফ গায়েব । বৌটিও নেই । দিদিমণি বুদ্ধিমতি ব্যাপারটা বিশেষ জানাজানি হতে দেন নি । তবে তাঁর মুখে মেমসাহেবের দেয়া কন্ডেন্সড মিল্কের স্বাদ আর পায়ে ক্লাউডির পশম পশম কোটের পরশ অনেকদিন লেগে ছিল । দিদিমণি পরে খোঁজ নিয়ে জেনেছিলেন মেমসাহেবের নাম এডিথ, বিলেত থেকে মিশনারিজ অফ চ্যারিটির জন্য কাজ করতে এখানে এসেছিলেন । তিনি তাঁর পোষ্য ক্লাউডি কে নিয়ে সকালে গরীব মানুষের খোঁজ খবর করতে বেরোতেন । এরপর কোনদিন সেই দিদিমণি আর তাদের দেখেন নি । তিনি চাকরী বদল করে পাহাড়ের ইস্কুলে নতুন চাকরী নিয়ে চলে গিয়েছিলেন, সেখানেই বিয়ে করে সংসার করছেন এখন । কাউকে এই গল্প বলেন নি আগে । আমার সঙ্গে সেই দিদিমণির ভারী ভাব, মাঝে মাঝেই কথা হয় । ভাবছি এই দিদিমণির সাথে বন্ধুত্ব আরও জমিয়ে তুলতে হবে । অনেক মেঘ, বৃষ্টির গল্প পাওয়া যাবে।