সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে ইন্দ্রাণী ঘোষ (পর্ব – ২৪)

আরশি কথা

ঝোরাদের নিয়ে চিলেকোঠাতে ওঠেন মেই লিং. বিশাল ছাদের উপর একপাশে কঁাচের দেয়াল দেয়া চিলেকোঠার ঘর. কাঁচের দেয়ালটা ছাদের দিকে, রাস্তার দিকের দেয়ালটা কংক্রিটের আর পাঁচটা বাড়ীতে যেমন হয়ে থাকে. এই ঘরেই মেই লিং স্ক্রোলের সমস্ত কালেকশন রাখেন. খুব দামী কিউরিও বা স্ক্রোল এখানে রাখেন না. সেগুলো লকারে থাকে. অকশনের আগে সেগুলো বার করে সোজা অকশন সাইটে নিয়ে যান অবশ্যই তখন পুলিশের নিরাপত্তা নিতে হয়. কাঁচের দেয়ালের একপাশে দাঁড় করানো বেলজিয়ান গ্লাসের আয়না. চারিদিকে মিনে করা কাজ আয়নাটার. মেই লিং বলেন ‘এ আয়নাতেই স্ক্রোলের ছায়া ফেলে গল্প পড়ি, একেকটা স্ক্রোলের একেকটা গল্প, একদিন শোনাব, যে গল্পের যেমন আকর্ষণ তাঁর উপরে স্ক্রোলের দাম নির্ভর করে.’ আয়নার পাশে বিরাট তোরঙ্গ, সেই তোরঙ্গ থেকে স্ক্রোলের পশরা বার করেন মেই লিং. ক্রীম রং, লাল রং, সবুজ রং এর কাগজ আর কাপড়ের উপর আঁকা গল্পের সম্ভার. কিছু ব্রাশ পেইন্টিং, কিছু সুক্ষ তুলির টান.

ফোটোগ্রাফার ছেলেটি ছবি তুলতে থাকে. অপূর্ব এবার বেশ সপ্রতিভ হয়েছে. বিশাল আয়নাটাকে দেখিয়ে বলে ‘ এই আয়নার যে আসল সংস্করণ তা আমাদের মনাস্ট্রির প্রধাণ লামার কক্ষে আছে. চৈনিক পরিব্রাজক ফা হিয়েন, হু য়েন সাং এই আয়নার কথা তাদের নথিতে বলে গেছেন. পরে সিল্ক রুটে কিছু আয়না এ দেশে আসে. আর পরে এর কিছু সংস্করণ তৈরি হয়, লামারা এই আয়নায় তাদের পবিত্র মন্ত্রশক্তি দিয়ে দেন. চৈনিকদের বিশ্বাস যে শুদ্ধ এবং অত্যন্ত কল্পনাপ্রবণ সেই আয়নার ভিতরের মায়ারাজ্যের সন্ধান পায়. এই মায়ারাজ্য সবার চোখে ধরা পড়ে না. এই আয়নাগুলো স্ক্রোলের ভিতরের গল্প পাঠের জন্যই মুলত ব্যবহার হয়. ‘ মেই লিং বলেন’ একদম ঠিক কথা, স্ক্রোলের গায়ে অনেক কিছুর সন্ধান থাকে, ইতিহাসের অনেক কথা, অনেক নির্যাতনের কথাও আছে, একটা সময় ইয়াং সে নদী শুকিয়ে যাচ্ছিল, বৃষ্টির অভাব, চাষবাস নষ্ট, কত মানুষের অনাহারে মৃত্যু, স্বজন হারানো চাষী মেয়েদের জমিদারের রক্ষিতা হয়ে যাওয়ার গল্প, স্ক্রোলের গায়ে থাকে.’
‘ হ্যাঁ ঠিক, আর এই স্ক্রোলের গায়ে এমন এক তথাগতর মূর্তির কথা আছে, যার গায়ের রঙ কাঁচা সোনার মত, আর যে সিংহাসনে তিনি বসে আছেন সেই সিংহাসনের নীচের দিকে বসান রয়েছে
অত্যন্ত প্রাচীন তিনটি রত্ন ,একটি রুবি, একটি পান্না ও একটি হীরে . এই তথাগতর মূর্তির দাম প্রায় কয়েক কোটি ডলার, কিন্তু এখোন অবধি সেই তথাগতর খোঁজ কেউ পায় নি. ‘ অপূর্ব বলে.
আয়নার কথা শুনে ঝোরা খানিক স্তম্ভিত হয়ে গেছিল. ঝোরার আরশী সংগ্রহ করার নেশা সেই ছোটবেলা থেকে. বাইরের ঘরের বিশাল আরশীটাও একটা অকশন থেকেই কিনেছিল ঝোরা. আর এতদিন ঝোরা ভাবত, আরশী কথা শুধুই ঝোরার কল্পনাবিলাস, এখন তো দেখা যাচ্ছে এর একটা ইতিহাসের প্রেক্ষাপট রয়েছে.

আরও কয়েকজনের সাথে মেই লিং আলাপ করিয়ে দেন ঝোরাদের. সকলেই এই এলাকার বাসিন্দা, রেস্টুরেন্টের মালিক. স্ক্রীপ্টের মধ্যে অপূর্ব আর মেই লিং এর কথপকথন রাখবে ঝোরা ঠিক করে নেয়. একবার ড: মঞ্জরী বসুকে ফোন করতে হবে. আকাশলীনা বলেছিল এর মধ্যে ওনার শান্তিনিকেতন পৌঁছে যাবার কথা. আগামী সপ্তাহের মধ্যে একটা এপোয়েন্টমেন্ট করে চীনা ভবনে ঘুরে আসতে পারলে, চীনে ভাষার অধ্যাপিকা মঞ্জরী বসুর মূল্যবাণ বক্তব্য ডকুমেন্টারিতে জূড়ে দেওয়া যেতেই পারে.

ক্রমশ…

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।